ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৮ মার্চ ২০২৬, ৩ চৈত্র ১৪৩২

ঈদযাত্রা

বাস-লঞ্চ-ট্রেন স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের ভিড়

প্রকাশিত: ০০:৪২, ১৮ মার্চ ২০২৬

বাস-লঞ্চ-ট্রেন স্টেশনে ঘরমুখো মানুষের ভিড়

পরিবারের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপনে রাজধানী ছাড়ছে নগরবাসী। মঙ্গলবার সদরঘাট কানায় কানায় ভর্তি যাত্রী নিয়ে ছেড়ে যায় লঞ্চগুলো

ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে গত কয়েকদিন ধরে ঢাকা ছাড়ছে মানুষ। বাস টার্মিনাল, রেলস্টেশন ও লঞ্চ ঘাটগুলোতে উপচেপড়া ভিড় থাকলেও শহরের ভেতরের রাস্তাগুলো এখন অনেকটাই ফাঁকা। কর্মব্যস্ত ও যানজটের এ শহর ধীরে ধীরে তার চিরচেনা কোলাহল হারিয়ে শান্ত হতে শুরু করেছে। প্রতিবছরের মতো এবারও ‘নাড়ির টানে’ লাখ লাখ মানুষ ঢাকা ছাড়ছেন। ফলে রাজধানীর গাবতলী, মহাখালী, সায়েদাবাদ বাস টার্মিনালে, কমলাপুর রেলস্টেশনে, সদরঘাটে এবং নতুন করে মোহাম্মদপুরের বছিলা ও শিমুলিয়া লঞ্চ ঘাটে মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। 
ঈদকে সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে কমলাপুর রেলস্টেশনে। ভোর থেকেই যাত্রীদের উপচেপড়া ভিড় থাকলেও নির্ধারিত সময় মেনেই ছেড়ে যাচ্ছে ট্রেনগুলো। এতে যাত্রীদের মাঝে ফিরেছে স্বস্তি। স্টেশনে ভিড় থাকলেও শৃঙ্খলাপূর্ণ পরিবেশ বজায় রাখতে কাজ করছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এ ব্যাপারে কমলাপুর স্টেশন ম্যানেজার সাজেদুল ইসলাম জানান, সকাল ৬টা থেকে এরই মধ্যে ২৪টি ট্রেন বিভিন্ন গন্তব্যের উদ্দেশে ছেড়ে গেছে, যার মধ্যে ৫টি লোকাল ট্রেন। সারাদিনে মোট ৬০টি ট্রেন স্টেশন থেকে ছেড়ে যাবে, এর মধ্যে ৪৪টি আন্তঃনগর ট্রেন। রাত ১১টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রামগামী একটি লোকাল ট্রেন দিয়ে দিনের কার্যক্রম শেষ হয়। এবারের ঈদযাত্রায় যাতে কোনো ধরনের সিডিউল বিপর্যয় না ঘটে সেজন্য সবাই সতর্কভাবে দায়িত্ব পালন করছেন। যাত্রীরা নির্বিঘেœ ও স্বাচ্ছন্দ্যে গন্তব্যে পৌঁছাতে পারবেন বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি। 
যাত্রীরা জানান, ভিড় এড়াতে এবং সময়মতো বাড়ি পৌঁছাতে আগেভাগেই যাত্রা শুরু করেছেন তারা। অনলাইনে টিকিট কাটার কারণে স্টেশনে কাউন্টারে ভিড় তুলনামূলক কম থাকলেও প্ল্যাটফর্মে যাত্রীদের উপস্থিতি বেশি। ট্রেনে আসন না পেয়ে অনেক যাত্রীকে ছাদে উঠে যেতে দেখা গেছে। 
ঘরমুখো মানুষের ঢল নেমেছে কল্যাণপুর ও গাবতলী বাস টার্মিনালেও। সকাল থেকে দূরপাল্লার বাস ছেড়ে যায় এবং ঢাকায় প্রবেশ করে। বাস কাউন্টারগুলোতে যাত্রীদের ভিড় থাকলেও তেমন কোনো সিডিউল বিপর্যয় নেই বলে জানালেন শাহ ফতেহ আলী পরিবহনের ম্যানেজার কামরুল আলম সবুজ। তিনি বলেন, যানবাহনের চাপ বাড়লেও কোথাও কোনো যানজট নেই। এ কারণে এখন পর্যন্ত আমাদের সিডিউলে কোনো সমস্যা হয়নি। নির্ধারিত সময়ে গাড়ি ছেড়ে যাচ্ছে। বড় প্রতিষ্ঠানগুলো সরকারের নির্ধারিত ভাড়ায় যাত্রী নিয়ে যাচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে গাজীপুর ও ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটের কোথাও কোথাও ব্যাপক যানজটে পড়তে হয়েছে যাত্রীবাহী বাসগুলোকে। 
সায়েদাবাদ বাস টার্মিনাল এলাকায় ঈদকে সামনে রেখে ঘরমুখো মানুষের উপচেপড়া ভিড় দেখা গেছে। সকাল থেকেই বিভিন্ন জেলায় যাওয়ার উদ্দেশে যাত্রীরা টার্মিনালে জড়ো হতে থাকেন। দিন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সেই ভিড় আরও বাড়তে থাকে। 
যাত্রীদের অভিযোগ, নির্ধারিত সময় মেনে বাস ছাড়ছে না অনেক ক্ষেত্রেই। কোথাও দীর্ঘ অপেক্ষা, আবার কোথাও অতিরিক্ত ভাড়ার চাপ সব মিলিয়ে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। তবুও পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদের আনন্দ ভাগাভাগি করতে এসব কষ্টকে তুচ্ছ করেই বাড়ির পথে রওনা দিচ্ছেন তারা। 
সেই চেনা রূপে সদরঘাট ॥ পদ্মা সেতুর কল্যাণে সারা বছর যাত্রী খরা চললেও ঈদকে ঘিরে আবার সেই চেনা রূপে ফিরে এসেছে সদরঘাট। টানা সাতদিনের সরকারি ছুটির প্রথম দিনেই রাজধানীর প্রধান ও একমাত্র নৌবন্দরে ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। অন্য সময় বিকেল থেকেই যাত্রা শুরু হলেও ঈদকে ঘিরে এখন সকাল থেকেই লঞ্চ ছাড়তে শুরু করেছে। ফলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন দুইদিন নৌপথে ঘরমুখী যাত্রীদের চাপ আরও বাড়বে। তারা জানান, ঈদযাত্রায় ঘরমুখো মানুষের নিরাপদ, স্বাচ্ছন্দ্যময় ও নির্বিঘœ যাত্রা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এছাড়া যাত্রীদের সেবার মান শতভাগ নিশ্চিত করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রতারণা ঠেকাতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তৎপরতাও চোখে পড়ার মতো।
ঢাকা-বরিশাল রুটে চলাচল করে মাহফুজ খান বা এম খান লঞ্চ। ভিআইপিসহ ১৮২টি কেবিন রয়েছে এতে। এম খানের সুপারভাইজার শাহাদাত হোসেন শুভ জানান, সোমবার রাতে বরিশাল গিয়ে মঙ্গলবার দুপুরে ফিরে এসেছেন। রাত সাড়ে ৮টায় আবার যাত্রা শুরু করেন। এর মধ্যে কিছু কেবিন বাদ দিয়ে সব বুক হয়ে গেছে। যাত্রীর চাপ বেড়েছে। আজ এবং আগামীকালও চাপ থাকবে।
এম খানের পাশেই যাত্রার জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছে এমভি কাজল-৭। লঞ্চটি ঢাকা থেকে বগা হয়ে পটুয়াখালী পর্যন্ত চলাচল করে। কাজলের সুপারভাইজার তুফান জানান, আমাদের কিছু কেবিন ফাঁকা আছে, বাকিগুলো বুক হয়ে গেছে।
ঢাকা-হাতিয়া রুটে চলাচল করে এমভি ফারহান-৩। সুপারভাইজার জাহিদ বলেন, আমাদের লঞ্চে ডাবল ও সিঙ্গেল মিলে ৫১টি কেবিন রয়েছে। এখন একটি খালি নেই। বিকেল সাড়ে ৫টায় যাত্রা শুরু করে লঞ্চটি। 
লঞ্চযোগে যাওয়া দক্ষিণাঞ্চলের যাত্রীরা ভোরবেলা থেকে সদরঘাটে ভিড় করছেন। কেউ কেউ সকালের লঞ্চে বাড়ি ফিরছেন। আবার কেউ কেউ সন্ধ্যার লঞ্চে যেতে ঘাটে ভিড় করছেন। লঞ্চ ছাড়ার নির্দিষ্ট সময়ের অনেক আগেই ঘাটে এসে হাজির হচ্ছেন ঘরমুখো মানুষ, যাতে কোনো ধরনের ঝামেলা পোহাতে না হয়। তাই ঘাটে এসে নির্দিষ্ট লঞ্চে উঠছেন। এতে দিন-রাত সদরঘাটে ভিড় দেখা গেছে। 
এদিকে ঢাকা-ইলিশাসহ কয়েকটি রুটের যাত্রীদের জন্য বছিলা ও শিমুলিয়া থেকে মঙ্গলবার লঞ্চ ছেড়ে যায়। নতুন করে এখানে লঞ্চ দেওয়ায় অনেক যাত্রী জানেন না। তবুও অনেক যাত্রীকে এই দুই ঘাটে ভিড় করতে দেখা গেছে। 
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) এবং পরিবহন সংশ্লিষ্টদের মতে গত ৭ থেকে ১৬ মার্চ পর্যন্ত প্রায় ৫০ লাখেরও বেশি মানুষ ঢাকা ছেড়েছেন। মোবাইল সিমের সক্রিয়তা পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, ঢাকা দক্ষিণ ও উত্তর সিটি কর্পোরেশনের একটি বড় অংশ এখন ঢাকার বাইরে অবস্থান করছে। ২০২৬ সালের এ ঈদ যাত্রায় গত বছরের তুলনায় ১০ শতাংশ বেশি মানুষ গ্রামের বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করেছেন, যার প্রধান কারণ বর্ধিত ছুটি এবং উন্নত যোগাযোগ ব্যবস্থা বলেও মনে করেন তারা। 
ঢাকা ফাঁকা হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শহরের ছোট দোকানপাট, রেস্তোরাঁ এবং অস্থায়ী বাজারগুলো বন্ধ হতে শুরু করেছে। ফাঁকা ঢাকা মানেই এক ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁঁকির কথা চিন্তা করে ডিএমপির পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আবাসিক এলাকাগুলোতে টহল পুলিশ এবং সিসিটিভি নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রাস্তা খালি পেয়ে বাস ও ব্যক্তিগত গাড়িগুলো বেপরোয়া গতিতে চলছে, যা দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দিচ্ছে। ট্রাফিক পুলিশকে এখন যানজট নিয়ন্ত্রণের চেয়ে গতি নিয়ন্ত্রণের দিকে বেশি মনোযোগ দিতে হচ্ছে।

স্টাফ রিপোর্টার

×