ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৯ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১৬ ফাল্গুন ১৪৩০

মানিকগঞ্জ জেলা

দুই আসনে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে

গোলাম ছারোয়ার ছানু, মানিকগঞ্জ

প্রকাশিত: ০০:৫৩, ৩ ডিসেম্বর ২০২৩

দুই আসনে নৌকা ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হতে পারে

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মানিকগঞ্জের তিনটি আসনের সর্বত্র উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে

আগামী দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে মানিকগঞ্জের তিনটি আসনের সর্বত্র উৎসবমুখর হয়ে উঠেছে। মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার পর থেকেই নির্বাচনী আলোচনায় উঠে এসেছে বিদ্রোহী প্রার্থী। কে হারবে, কে জিতবে তা নিয়ে শুরু হয়েছে তর্কবিতর্ক। মানিকগঞ্জ-১ ও মানিকগঞ্জ-২ আসনে জমজমাট নির্বাচন হবে আওয়ামী লীগের প্রার্থী ও বিদ্রোহী প্রার্থীদের মধ্যে। মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বিএনপি না থাকলে নির্বাচন হবে নিরুত্তাপ।
মানিকগঞ্জ-১ মানিকগঞ্জ-২ আসনে বেশি প্রার্থী এবং দলীয় কোন্দল থাকায় স্বস্তিতে নেই আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা। এই দুটি আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিরুদ্ধে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত প্রার্থীদের কঠিন প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। মানিকগঞ্জ-২ আসনে জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রার্থী সাবেক সংসদ সদস্য এসএম আব্দুল মান্নান নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। মানিকগঞ্জ-৩ আসনে বর্তমান এমপি স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন। এই আসনে দলীয় বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী নেই।
মানিকগঞ্জ-১ (ঘিওর, দৌলতপুর ও শিবালয়) ॥ এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বীর মুক্তিযোদ্ধা আব্দুস সালাম। আসনটিতে গত দুইবারের সংসদ সদস্য সাবেক ক্রিকেট তারকা নাঈমুর রহমান দুর্জয় বাদ পড়েছেন। মনোনয়ন না পেয়ে শক্তিশালী বিদ্রোহী (স্বতন্ত্র) প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন জমা দিয়ে মাঠ গরম করেছেন জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা ও কেন্দ্রীয় যুবলীগের সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক এসএম জাহিদ। এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জাপা, জাসদ, বিএনএম, তৃণমূল বিএনপিসহ ১০ প্রার্থী।

নির্বাচন ঘিরে আসনের তিনটি উপজেলা সদরসহ হাটবাজারে প্রার্থীদের পোস্টার ব্যানার ও বিল বোর্ডে ছেয়ে গেছে। শীতের আমেজে ভোটারও ভোট নিয়ে আলোচনায় গরম হচ্ছেন চায়ের দোকানে। বিএনপি নির্বাচনে না থাকায় আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুস সালাম ও বিদ্রোহী প্রার্থী জাহিদের মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই হবে বলে রব উঠেছে। এ আসনে বিএনপির জেলা সাধারণ সম্পাদক এসএ জিন্নাহ কবির ছাড়াও জেলা কৃষক দলের সভাপতি তোজাম্মেল হক তোজাও মনোনয়নের দৌড়ে ছিলেন। এই দুই বিএনপি নেতা সরকার পতনের এক দফা আন্দোলনের মধ্যেও নেতাকর্মীদের নিয়ে আলাদা আলাদা কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছেন। জাপা থেকে জেলা সাধারণ সম্পাদক হাসান সাইদ মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। জেলা জাসদের সভাপতি, সাবেক ঘিওর উপজেলা চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা আফজাল হোসেন খান জকি প্রার্থী হয়েছেন।
আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুস সালাম ২০০১ সালের নির্বাচনে বিএনপি মহাসচিব খন্দকার দেলোয়ার হোসেনের কাছে পরাজিত হন।
মানিকগঞ্জ-২ (সিঙ্গাইর, হরিরামপুর ও সদরের তিন ইউনিয়ন) ॥ এই আসনে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন গত দুইবারের এমপি কণ্ঠশিল্পী মমতাজ বেগম। আওয়ামী লীগের মনোনয়ন না পেয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছেন চারজন। এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন জাপা, জাসদ, বিএনএম, তৃণমূল বিএনপি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ, তরিকত ফেডারেশনের প্রার্থীসহ ১৪ জন। জাপার সাবেক সংসদ সদস্য এসএম মান্নানও শক্ত প্রার্থী।
রাজধানী ঢাকার সীমানা ঘেঁষা এই আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী গত দুইবারের সংসদ সদস্য মমতাজ বেগম দলীয় কোন্দলে নড়বড়ে অবস্থায় আছেন। মনোনয়নবঞ্চিত জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ শিল্পপতি দেওয়ান জাহিদ হাসান টুলু, সাবেক ফুটবল তারকা ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের সাবেক যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক দেওয়ান সফিউল আরেফিন টুটুল, দুইবারের সিঙ্গাইর উপজেলা চেয়ারম্যান জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য বীর মুক্তিযোদ্ধা মুসফিকুর রহমান হান্নান ও হরিরামপুর উপজেলার মনোনয়নবঞ্চিত তরুণ প্রার্থী সাহাবুদ্দিন চঞ্চল মমতাজের প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করছেন ভোটাররা। তারা সর্বশক্তি দিয়ে মমতাজের বিরুদ্ধে মাঠে রয়েছেন।

জাপার সিনিয়র প্রেসিডিয়াম সদস্য, জেলা জাপা সভাপতি এবং সাবেক সংসদ সদস্য এসএম আব্দুল মান্নান মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আসনটি ২০০৮ থেকে এ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ ও জাপার দখলে থাকলেও ১৯৯১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপির দখলে ছিল। এই আসনে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল চরমে রয়েছে। কোন্দলে বিপর্যস্ত সিঙ্গাইর ও হরিরামপুর উপজেলা আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা। 
সিঙ্গাইর উপজেলা আওয়ামী লীগের সম্মেলনের পর দ্বন্দ্ব আরও প্রকট আকার ধারণ করে। জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও সিঙ্গাইরের ইউপি চেয়ারম্যান প্রবীণ নেতা মাজেদ খানের সঙ্গে মমতাজের চরম দ্বন্দ্ব রয়েছে। হরিরামপুর উপজেলার চেয়ারম্যান ও জেলা আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান সাইদুর রহমানের সঙ্গেও মমতাজের চরম দ্বন্দ্ব। সিঙ্গাইর উপজেলার দুইবারের চেয়ারম্যান বীর মুক্তিযোদ্ধা মুসফিকুর রহমান হান্নানের সঙ্গেও তার মতভেদ রয়েছে। সিঙ্গাইর উপজেলার অধিকাংশ ইউপি চেয়ারম্যানের সঙ্গে দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়েন মমতাজ। নেতাকর্মীদের মধ্যে কোন্দল ও একাধিক স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় এই আসনে আওয়ামী লীগের বিপর্যয় ঘটতে পারে বলে ব্যাপক গুঞ্জন রয়েছে।

মানিকগঞ্জ-৩ (সদর ও সাটুরিয়া উপজেলা) ॥ এই আসনে ৫ম বারের মতো আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেয়েছেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক এমপি। এ আসনে তার বিরুদ্ধে মনোনয়ন বঞ্চিত কোনো নেতা নির্বাচন করবেন না। তবে এই আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন নয়জন প্রার্থী। জাপা, জাসদ, তৃণমূল বিএনপি, বিএনএম, গণফোরামের (কামাল) নতুন সভাপতি সাবেক সংসদ সদস্য বীরমুক্তিযোদ্ধা মফিজুল ইসলাম খান কামাল এ আসনে স্বতন্ত্র হিসেবে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছেন। আসনটি জেলা সদর ও পৌরসভা কেন্দ্রিক হওয়ায় ভোটার ও নেতাকর্মীদের কাছে এটি অতি গুরুত্বপূর্ণ আসন হিসেবেই দেখা হয়। এই আসন জুড়েই জেলার বড় রাজনৈতিক দলগুলোর জেলার প্রথম সারির নেতারা আন্দোলন সংগ্রাম করে আসছেন। স্বাধীনতার পর থেকেই এ আসনের এমপি প্রতিমন্ত্রী-মন্ত্রী পদমর্যাদার পদ পেয়েছেন।
বর্তমান এমপি ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী জাহিদ মালেক আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীদের নিয়ে বেশ আগে থেকেই কর্মী-সমাবেশ ও জনসভা করে ভোট চাইছেন নৌকার জন্য। গত ১০ বছরে জেলা সদর, সাটুরিয়া উপজেলা ও পৌরসভার বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, বিশেষ করে স্বাস্থ্য খাতে উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন হয়েছে। এই উন্নয়নই তার মূল হাতিয়ার।
এ আসনটি বিএনপির ঘাঁটি বলা হলেও এখন আওয়ামী লীগের দখলে। এই আসনে বিএনপির প্রার্থীরা ছয়বার জয়লাভ করেন। গত তিনটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগের প্রার্থী জাহিদ মালেক স্বপন জয়লাভ করেন।
এই আসনে বিএনপির কর্ণধার আফরোজা খান রিতা। এই আসন থেকে তার প্রয়াত পিতা হারুনার রশিদ খান মুন্নু নির্বাচিত হয়ে মন্ত্রী হয়েছিলেন। আফরোজা খান রিতা সেই টার্গেট সামনে নিয়ে নেতাকর্মীদের নিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন। দলীয় সকল কর্মসূচি সফল করতে তিনি প্রধান ভূমিকা রাখছেন। নানা প্রতিকূলতার মাঝেও তিনি দলের সকল নেতাকর্মীকে একত্রিত করে রাজনীতির মাঠ গরম রাখছেন। তিনি বিপুল ভোটের ব্যবধানে জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হয়েছেন।

×