ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ০৩ মার্চ ২০২৪, ১৯ ফাল্গুন ১৪৩০

তিস্তার বুকে সবুজের সমারোহ

আব্দুল হাই রঞ্জু

প্রকাশিত: ২২:২২, ১১ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

তিস্তার বুকে সবুজের সমারোহ

.

চির যৌবনা প্রমত্তা তিস্তা নদী ক্রমাগত প্রবীণ হয়ে আজ মৃতপ্রায়। নদীর বুকজুড়ে খরস্রোতা পানির সময় আর দেখা মেলে না। বরং ঢেউহীন তিস্তার বুকজুড়ে জেগে উঠেছে অসংখ্য বালুচর। বর্ষা মৌসুমের মতো তিস্তা পাড়ে নেই মাঝিমাল্লাদের হাঁকডাক। নেই জেলেদের মাছ ধরার কর্মব্যস্ততা। সব মিলে তিস্তা পাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকা যেন থমকে দাঁড়িয়েছে নিরাশার বালুচরে। তবু বেঁচে থাকার লড়াইয়ে পিছিয়ে নেই চরাঞ্চলের খেটে খাওয়া মানুষজন। তিস্তার বুকে জেগে ওঠা বালুচরে চাষিদের নিরন্তর প্রচেষ্টায় চলছে আলু, ভুট্টা, কালাই, সরিষাসহ নানা জাতের সবজির চাষাবাদ। তিস্তা নদীর বুকজুড়ে বিস্তীর্ণ এলাকায় গড়ে উঠেছে সবুজের সমারোহ। দেখলে মনে হয় নদী তো নয়, যেন ফসলের দিগন্ত বিস্তারি কোনো মাঠ। বিশেষ করে তিস্তার চরে এখন প্রচুর পরিমাণ বাদাম, মিষ্টি কুমড়া তরমুজের আবাদ হচ্ছে।

তিস্তা নদীর ইতিহাস-ঐতিহ্য অনেক পুরনো। তিস্তা কোন শাখা নদী নয়। তিস্তা সিকিমের হিমালয়ের হাজার ২০০ মিটার সুউচ্চ চিতামু হ্রদ থেকে উৎপত্তি হয়ে দার্জিলিংয়ের শিভক গোলা সিরিসংকটের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে ভারতের পশ্চিমবঙ্গের সমভূমিতে প্রবেশ করেছে। এরপর জলপাইগুড়ির মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের নীলফামারীর সীমান্ত দিয়ে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ অংশে তিস্তা প্রায় ১১৭ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে গাইবান্ধার ওপর দিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে এসে মিলিত হয়েছে। বর্ষাকালে তিস্তা হয়ে ওঠে খরস্রোতা নদী। যার ভাঙনের কবলে আবাদি জমি-বসতভিটা হারিয়ে শত শত পরিবারকে বসত গড়তে হয় নতুন কোনো জায়গায়। বসতভিটা হারা মানুষদের দুঃখ-কষ্টের যেন শেষ থাকে না। সেই প্রমত্তা তিস্তা শুষ্ক মৌসুমে চিরচেনা যৌবন হারিয়ে হয়ে যায় মরা খালের মতো। নীলফামারী জেলার ডিমলা উপজেলার সীমানা থেকে মাত্র কিলোমিটার দূরে লালমনিরহাট জেলার হাতীবান্ধা উপজেলার দেয়ানী নামক স্থানে তিস্তা নদীর ওপর ১৯৭৯ সালে তিস্তা ব্যারাজ নির্মাণ করা হয়। ৬১৫ মিটার দৈর্ঘ্য সর্বমোট ৫২টি গেটের সমন্বয়ে নির্মিত হয় ব্যারাজটি। বর্ষাকালে উজান থেকে নেমে আসা পানির ঢল আটকে দিয়ে বাংলাদেশ অংশে তিস্তার আকস্মিক বন্যা প্রতিহত করা হয়। আবার উজানের অতিরিক্ত পানির চাপ আটকে রাখা সম্ভব না হওয়ায় অনেক সময়ই ব্যারাজের গেট খুলে দিতে হয়। তখন তিস্তা পানিতে শুধু টইটম্বুরই নয়, অনেক সময়ই বাংলাদেশ অংশে আবাদি জমি, বসতবাড়ি সব ভেসে একাকার হয়ে যায়। সর্বস্বান্ত হয় কৃষক। এমনকি বর্ষা মৌসুমে পানির প্রবল স্রোতে নদীর পাড় ভেঙেও যায়।

তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প ১৯৮৫ সালে সৌদি উন্নয়ন তহবিল, ইসলামিক ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক এবং আবুধাবি উন্নয়ন তহবিলের সহায়তায় নির্মিত হয়। তিস্তা  সেচ প্রকল্পের আওতায় নীলফামারী জেলার সদর, জলঢাকা, সৈয়দপুর, কিশোরগঞ্জ, ডিমলা, রংপুর জেলার সদর, গংগাচড়া, বদরগঞ্জ, তারাগঞ্জ দিনাজপুর জেলার চিরিরবন্দর, পার্বতীপুর, খানসামা উপজেলার চাষিদের জমিতে চলে সেচের ব্যবস্থা। উক্ত সেচ প্রকল্পের আওতায় প্রায় লাখ ১১ হাজার ৪০৬ হেক্টর জমিতে সেচ সুবিধা দেওয়া হয়। ৬৪৯ কি. মিটার দীর্ঘ সেচ খালের উভয় পাড়ে প্রায় ১২৯৮ কিলোমিটার ক্যানেল ডাইক ১০০ কি. মিটার পাকা রাস্তার উভয় পাশে লাগানো হয়েছে লাখ লাখ গাছের চারা। ফলে তিস্তা ব্যারাজের অতুলনীয় সৌন্দর্য এবং এর সবুজ বেষ্টনীর সমন্বয়ে অপরূপ দৃশ্য দেখতে নানা বয়সী মানুষকেও আকৃষ্ট করে থাকে।

দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, তিস্তা ব্যারাজটি শুষ্ক মৌসুমে পানিশূন্য হয়ে যায়। ভারত সরকার একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় সেচ প্রকল্পের আওতায় চাষের জমিতে সেচ দেওয়া সম্ভব হয় না। যেখানে ২০ হাজার কিউসেক পানি ব্যারাজ সংলগ্ন এলাকায় থাকার কথা, সেখানে শুষ্ক মৌসুমে মাত্র ৫০০ কিউসেকের মতো পানি প্রবাহ চালু থাকে। ফলে তিস্তা ব্যারাজ সেচ প্রকল্প হারিয়ে ফেলে তার কার্যকারিতা। যার সমাধান হতে পারে একমাত্র ভারতের সঙ্গে তিস্তার সুষম পানি বণ্টন চুক্তির মাধ্যমে। কিন্তু বন্ধুপ্রতিম দেশ হওয়া সত্ত্বে¡ যুগের পর যুগ ধরে তিস্তার পানি চুক্তির ব্যাপারে ভারতের তরফে আশ্বাসের বদলে কার্যত কোনো সুফল মিলছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন সরকার টানা চার মেয়াদে ক্ষমতায়। যাদের সঙ্গে ভারত সরকারের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। স্বভাবতই প্রত্যাশা ছিল, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে তিস্তা চুক্তির সফল বাস্তবায়ন হবে। সে আশায় গুড়ে বালি। হচ্ছে হবে বলা হলেও তিস্তা চুক্তি তো হচ্ছেই না, বরং আন্তর্জাতিক আইন লঙ্ঘন করে পানির স্বাভাবিক গতি প্রবাহকে পরিবর্তন করে ভারত তিস্তা নদীর পানির প্রবাহকে পরিবর্তন করে পশ্চিমবঙ্গের জলপাইগুড়ি জেলার গজলডোবার ব্যারাজ তৈরি করে সংযোগ খালের মাধ্যমে তিস্তা নদীর পানি মহানন্দা নদীতে নিয়ে যাচ্ছে। এই সংযোগ খাল থেকে তারা জলপাইগুড়ি জেলা, দার্জিলিং, পশ্চিম দিনাজপুর, উত্তর দিনাজপুর, মালদহ কুচবিহার জেলায় সেচ সুবিধা নিচ্ছে। ফলে তিস্তা নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা থেকে আমরা বঞ্চিত হচ্ছি। যা নিরসনে পররাষ্ট্রমন্ত্রী . হাছান মাহমুদের ভারত সফরে তিস্তা চুক্তি নিয়ে আলোচনা। বাস্তবে তিস্তা চুক্তির বাস্তবায়নে ভারত কি পদক্ষেপ নেবে তা এই মুহূর্তে বলা কঠিন। তবে আমরা আশা করি, বরফ গলে যেন তিস্তা চুক্তি সম্পাদন হয়।

আমরা ছোট্ট ভূখন্ডে বৃহৎ জনগোষ্ঠী। আমাদের খেয়ে-পরে বেঁচে থাকার জন্য খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা বাঞ্ছনীয়। যার সফলতায় তিস্তার পানির সুষ্ঠু ব্যবহার অপরিহার্য। আমরা আশাবাদী, তিস্তা নদী যেন ফিরে পায় তার হারানো ঐতিহ্য। সর্বোপরি তিস্তা নদী যেন হয় মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

×