ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১

পাপের সন্তান উপন্যাসে সত্যেন সেন

প্রণব মজুমদার

প্রকাশিত: ২০:৩৯, ৮ জুন ২০২৩

পাপের সন্তান উপন্যাসে সত্যেন সেন

পাপের সন্তান উপন্যাস

গ্রামবাংলার পথে পথে তিনি হেঁটেছেন। মেহনতি মানুষের অভিযাত্রী তিনি। সাধারণ মানুষের সমবণ্টনের রাজনীতি দর্শন ও সাহিত্য শিল্পের যে পদচিহ্ন তিনি রেখে গেছেন, তা আজ সাম্রাজ্যবাদের থাবায় অপরাজেয় নয়। অথচ তার লক্ষ্য ছিল মানব মুক্তির দিকে। প্রগতির জন্য লড়াই করেছেন জীবনের অধিকাংশ সময়। একটার পর একটা দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছেন। মানবতাবাদী প্রগতিশীল দার্শনিক আমৃত্যু বাঙালি সংস্কৃতিবান মহান পুরুষ সত্যেন সেনের কথাই বলছি। অনন্য পুরুষ হিসেবে নিজেকে উপস্থাপিত করার ক্ষেত্রে সত্যেন সেন যে অসামান্য অবদান রেখে গেছেন আজকের প্রজন্মের কাছে তা প্রায় অজানা।

কথাশিল্পী সত্যেন সেনের গোটা জীবনের কর্মকাণ্ডের প্রায় সবটাই ব্যাপ্ত ছিল বাংলাদেশকে কেন্দ্র করে। বহু শাখায় তার বিচরণ। একদিকে রাজনৈতিক অভিধা, অপরদিকে বাংলা ভাষায় ধ্রুপদি ধারার উপন্যাস এবং তাতে চরিত্রের সৃষ্টির ভেতর দিয়ে যে এক অনবদ্য অবদান সত্যেন সেন রেখে গিয়েছেন, তাতে বলা যায় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস তাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ। মেহনতি মানুষের জীবনের সমস্যা ও সংকটকে অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে বর্ণনা করেছেন সত্যেন সেন। শ্রেণি দ্বন্দ্ব, নারী প্রেম, ধর্মীয় সংকীর্ণতা দেশপ্রেম- এসব সত্যেন সেনের উপন্যাসের উপজীব্য।
মোট ১২টি উপন্যাসের মধ্যে অভিশপ্ত নগরীর দ্বিতীয় খণ্ড হিসেবে ‘পাপের সন্তান’ (১৯৬৯) শুধু সত্যেন সেনেরই সেরা সৃষ্টি নয়, বাংলা ভাষায় লিখিত শ্রেষ্ঠ একটি উপন্যাস।
অভিশপ্ত নগরীতে জেরুজালেম নগরী পতনের কথা বর্ণিত আছে। ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসের মধ্য দিয়ে সেই পতনের প্রায় পঞ্চাশ বছর পর সত্যেনপ্রতিক্রিয়া ব্যক্ত হয়। দুটি উপন্যাসের ঘটনা-কালের ব্যবধান এই সময়কাল। দীর্ঘ এই সময়ে ইহুদিদের সঙ্গে অন্য ধর্ম-জাতির অনেকেরই বিষয়ে এবং সন্তান জন্মের ঘটনা ঘটে। পরজাতি স্ত্রীর গর্ভে জন্মগ্রহণকারী ইহুদি সন্তানদের পাপের সন্তান আখ্যা দিয়ে তাদের ধ্বংস কামনা করা হয় উপন্যাসে।
উপন্যাসের প্রধান পাত্র-পাত্রী মিকা ও শদরা ধর্মীয় এবং সামাজিক এই বিধি নিষেধ অতিক্রম করে নীলনদের তীরে এসে নতুন পৃথিবী গড়ে তুলতে চায়। এই নতুনের প্রতি ইঙ্গিতই উপন্যাসের মূল বক্তব্য।
সত্যেন সেন মার্কসবাদের সমর্থক ছিলেন এবং দীর্ঘকাল সরকারের কোপানলে পড়ে অন্তরিন ছিলেন। ১৯৪৯ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত এক যুগ তিনি কারাগারে ছিলেন। প্রায় বছর দশেক তিনি কৃষক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন।
লেখালেখিতে তার রাজনৈতিক জীবন ব্যাপক প্রভাব ফেলে। 
‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসে একদম শুরুর বাক্যেই লেখক পাঠককে একটি জিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করান। প্রশ্ন শদরার হলেও কৌতূহল জাগে পাঠকের মনে।
‘যাহুদা তোমার জন্মভূমি নয়, তুমি তাকে চোখেও দেখনি কোনো দিন। তবু তার কথা বলতে বলতে তোমার চোখ অমন ছলছল করে ওঠে কেন, কেন তোমার কণ্ঠ আবেগে রুদ্ধ হয়ে আসে, আমাকে বলতে পারো মিকা?
শদরার এই কৌতূহল-মিশ্রিত প্রশ্নের দ্বারা ‘পাপের সন্তান’ উপন্যাসটির শুরু। এখানে মিকা কবার নদীর তীরে গড়ে ওঠা বাবিল নগরীর নারগেল সারেজের নামের সম্ভ্রান্ত একজন ব্যক্তির আশ্রয়ে পালিত একজন সুশিক্ষিত যুবক যে নিজেকে মনেপ্রাণে একজন ইহুদী মনে করে, কিন্তু নারগেল সারেজেরের কাছে আশ্রিত বলে তাকে ক্যালদীয়দের মতো পোশাক পরতে ও আচরণ করতে হতো। আর শদরা নারগেলের কন্যা ও মিকার সঙ্গী, সেও তার পিতার মতো ক্যালদীয়। শদরার এই জিজ্ঞাসা খুব তাৎপর্যপূর্ণ। কারণ, মিকার এই যাহুদার প্রতি অসামান্য টান নিয়ে পুরো উপন্যাসের কাহিনী এগিয়ে গেছে।
সত্যেন সেনের অসাধারণ এ উপন্যাস ‘পাপের সন্তান’ সম্পর্কে কথাশিল্পী বলেন- অভিশপ্ত নগরীর শেষাংশে জেরুজালেম নগরীর পতনের কথা বর্ণিত হয়েছে। এ পতন সাধারণ পতন, বাবিলরাজ নেবুকাডনাজার জেরুজালেমকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করে দিয়ে নগরীর নাম-নিশানা নিঃশেষে মুছে দিয়েছেন। শুধু তাই নয়, স্ত্রী পুরুষ নির্বিশেষে নগরবাসী ইহুদীদের রজ্জুবদ্ধ পশুর মতো তাড়িয়ে দিয়ে গিয়েছিলেন বাবিলে। দীর্ঘকাল ধরে সেখানে তাদের নির্বাসিত জীবনযাপন করতে হয়েছিল। ইহুদীজাতির ইতিহাসে এ একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়।
কালের চক্রে পাশার দান উল্টে গেল। পারসিকদের আক্রমণে বিশ্ববিশ্রুত মহাপরাক্রমশালী বাবিল সা¤্রাজ্যের পতন ঘটল। বাবিল আর বাবিল-সাম্রাজ্যভুক্ত এলাকা পারস্য সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেল।

বাবিলের নির্বাসিত ইহুদীরা নিজভূমি  জেরুজালেমে ফিরে যাবার জন্য আবেদন নিবেদন করে চলল। অবশেষে পারস্যরাজ তাদের এই প্রার্থনা মঞ্জুর করলেন এবং তার ইহুদী পানপাত্রবাহক নেহেমিয়াকে জেরুজালেমের তীরশথ বা শাসনকর্তা নিযুক্ত করে পাঠালেন। তীরশথ নেহেমিয়ার নেতৃত্বে ইহুদীরা জেরুজালেমের বিধ্বস্ত প্রাচীর নতুন করে গড়ে তুলল। কাজটা সহজ ছিল না। পারস্যরাজের স্থানীয় রাজকর্মচারীরা ও প্রতিবেশী পরজাতীয়েরা ইহুদি বিদ্বেষের বশবর্তী হয়ে এই কাজে বাধা দেয়ার জন্য যথাসাধ্য চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের সমস্ত বাধা অতিক্রম করে গড়ে উঠল নতুন জেরুজালেম নগরী।
ইহুদী জনসাধারণের প্রাণপাত প্রচেষ্টায় নতুন জেরুজালেম গড়ে উঠলো বটে, কিন্তু ধর্মোন্মাদ ইহুদী সমাজপতিদের ধর্মের গোঁড়ামি, কঠিন রক্ষণশীল মনোভাব ও তীব্র পর-জাতিবিদ্বেষ সমাজকে এক আত্মধ্বংসী আবর্তের দিকে ঠেলে নিয়ে চলল। শাস্ত্রীয়বিধান মানবিকতাকে গ্রাস করে চলল ধর্মীয় অন্ধতার বেদীমূলে নিষ্পাপ নিষ্কলঙ্ক পাপের সন্তানদের বলি হতে লাগল। দুর্ভাগা ইহুদী সমাজকে এজন্য ভবিষ্যতে বড় কঠিন মূল্য দিতে হয়েছিল- ইতিহাস তার সাক্ষী।
‘অভিশপ্ত নগরী’ সত্যেন সেনের প্রথমদিকে প্রকাশিত উপন্যাস। তা প্রথম প্রকাশিত হয় বাংলা ১৩৭৪ সনের বৈশাখ মাসে অর্থাৎ ১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের এপ্রিল মাসে। সে উপন্যাসের শুরুতে আমরা দেখি যেরোমিয়া বলছেন,  ‘শোন জেরুজালেমবাসী পাপের সন্তানগণ। তোমাদের প্রাচীর ওদের ঠেকিয়ে রাখতে পারবে না, স্বয়ং যিহোবা ওদের হাতে ধরে নিয়ে আসবেন।’ যেরোমিয়ার এই ভবিষ্যদ্বাণী পরবর্তীকালে সত্য বলে প্রতীয়মান হয়েছিল। আবার পাপের সন্তান শব্দটিকেও আমরা এখানে ব্যবহৃত হতে দেখছি।
‘অভিশপ্ত নগরী’ উপন্যাসে যে অভিশপ্ত জেরুজালেম নগরীর কথা বলা হয়েছে, ‘পাপের সন্তানে’ সেই নগরীটি পুনর্গঠনের কাহিনী ফুটে উঠলেও তাকে ছাপিয়ে মুখ্য হয়ে উঠেছে মানব প্রেম।আমরা এখানে প্রেমিকযুগল মিকা ও শদরাকে কবার নদীতীরের বাবিল নগরী থেকে জেরুজালেম হয়ে নীলনদের তীরে মিসরে পৌঁছতে দেখি।
চরিত্র চিত্রায়নে সত্যেন সেনের দক্ষতা তুলনাহীন। ঐতিহাসিক ও পৌরাণিক ঘটনা অবলম্বনে সত্যেন সেন যেভাবে বিশ্বাসযোগ্যভাবে চরিত্রগুলোকে তৈরি ও বিকশিত করেছেন, তাতে মনে হয় যেন কোনো সত্যিকার ঘটনা আমরা চোখের সামনে দেখতে পাই।
শদরা যখন মিকাকে বলে, ‘তুমি ক্যালদীয় নও, তুমি ইহুদীও নও, তুমি ওসব কিছুই নও, তুমি আমার মিকা, তুমি শদরার মিকা, এটাই কি তোমার যথেষ্ট পরিচয় নয়?’ উক্তিটিতে কেবল মিকা ও শদরার প্রেমের গভীরতাই ফুটে ওঠে না, মানুষের প্রেমের মহত্ত্ব ও মানুষের সবচেয়ে বড় পরিচয় যে সে মানুষ, তার জাত-ধর্ম কোনো কিছুই তার পরিচয়ের জন্য মুখ্য নয়, সেটাও প্রকাশ পায়।
উপন্যাসের প্রায় সময় মিকা ও শদরাকে পরস্পরের প্রেমে মশগুল থাকতে দেখি। মিকা যখন জেরুজালেম নগরীটি পুনর্গঠনে ব্যস্ত তখন শদরাকেও তার সঙ্গে দেখি। উদাসীন মিকা যে শদরাকে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারে না, এ নিয়ে শদরাকে অভিমান করতে দেখলেও কখনও মিকাকে সে ত্যাগ করে না। আবার নবগঠিত জেরুজালেম নগরীতে চাইলেই মিকা অন্য কোনো ইহুদী তরুণীকে বিবাহ করতে পারতো। কিন্তু এমন ভাবনা মিকার মাথায় আসেনি। আবার মিকার জন্যে শদরা যে তার বাবা ও পরিবারকে ছেড়ে ক্যালদীয় হয়েও মিকার সঙ্গে জেরুজালেমে চলে এসেছিল, এজন্য মিকার কৃতজ্ঞতা ছিল শদরার প্রতি।
মিকার ইহুদীবোধ প্রবল হয়ে উঠতে দেখি যখন সে ইহুদী কিশোরীর উপর ক্যালদীয় পুরুষদের ও অসহায় দরিদ্র ইহুদীদের উপর ক্যালদীয় প্রভুদের নির্যাতন খুব কাছ থেকে দেখে। এরপর যখন সে ইহুদীদের পাড়ায় যাতায়াত শুরু করে। দরিদ্র ইহুদীরা তাকে ভালোবেসে আপন করে নেয়। এরপর পাগলা বাবার কাছে সে জানতে পারে তার জীবনের করুণ কাহিনী।
সুসান রাজপ্রাসাদের পারস্যরাজ আর্তাকরেসের পানপাত্রবাহক নেহেমিয়ার তীরশথ হয়ে জেরুজালেম নগরে যাত্রা করা, সেখানে অবস্থান নেয়া নেতৃত্ব দেয়া আর সকল বৈরিতা উপেক্ষা এবং নগর প্রাচীর নির্মাণ করে ইহুদী জাতির তথা জেরুজালেম নগরের প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তাবিধান করা সব ক্ষেত্রে আমরা দক্ষতা ও বিচক্ষণতার পরিচয় দিতে দেখি। তার প্রজ্ঞাও সুচিন্তিত পদক্ষেপ তাকে যোগ্য নেতার সম্মান এনে দিয়েছে।
হানানি-নহিমার প্রেম ও সংসার জীবনের সুখকে খুব স্বল্প পরিসরের মধ্যে লেখক স্পষ্টভাবে তুলে ধরেছেন। আবার হানানির সঙ্গে মিকার বন্ধুত্বটা বেশ গুরুত্ব দিয়ে কথাশিল্পী সত্যেন সেন ফুটিয়ে তুলেছেন। হানানি ও নহিমার সন্তানদের আচরণ ও উক্তিগুলো খুব প্রামাণ্য মনে হয়েছে, হানানি পরিশ্রমী চিন্তাশীল ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি। আবার নহিমাও অসাধারণ নারী।
পাপের সন্তান উপন্যাসে আচার্য ইষ্রা সাধারণ লোক নন। তিনি ইহুদীদের ধর্মজগতের মধ্যমনি। ইষ্রা চরিত্রটিতে আমরা ইহুদী ধর্মোন্মাদনার একটি রূপ ফুটে উঠতে দেখি। যখন ইহুদীরা তাদের জেরুজালেমে একত্র হয়েছে তখন তাদের দরকার ছিল একতার মন্ত্রে নিজেদেরকে সংহত করা কিন্তু আচার্য ইষ্রা বরং বিশুদ্ধতার ধুয়া তুলে বহু ইহুদীকে সঙ্কটের মুখে ফেললেন। এ সময়ে নেহেমিয়াকে দেখি আমরা হানানি-মিকা থেকে দূরে সরে যেতে। কিন্তু শেষে মিকা ও শদরাকে রক্ষা করে তিনি তার মহানুভবতার পরিচয় দিলেন। তিনি শদরাকে কিছুটা পছন্দ করতেন। আবার মিকার প্রতি তার আস্থা ছিল। এজন্য তিনি মিকার ইঙ্গিতে কেবল নগরের অভিজাত ইহুদীদের সামনে বক্তব্য না দিয়ে সবাইকে কাছে টেনেছেন। তিনি হয়তো ইহুদীদের ভেতরের বৈষম্যকেও দূর করতেন।
আমরা বাবিলের ইহুদীদের জেরুজালেম যাত্রার উদ্যোগের সময় এক সুদখোর মহাজনকে বিলম্ব করতে দেখি। আবার দরিদ্র ও দাসশ্রেণির ইহুদীদের মধ্যে উৎসাহ ছিল সবচেয়ে বেশি। সমাজের সুবিধাভোগী শ্রেণির মানুষ যে কোনো পরিবর্তনে সবচেয়ে কম আগ্রহ দেখায় তা এ রচনায়ও আমরা দেখি। আবার অবহেলিত মানুষেরা নতুন কিছুতে যে আশায় বুক বাঁধে তাও দেখা যায়। খোলসটা যত সহজে বদলায়, ভেতরের দিকে ততটা বদলায় না। আমরা দেখলাম দরিদ্র ইহুদীদের এলাকায় সুগন্ধী দিয়ে সম্ভ্রান্ত ঘরের ইহুদী যুবক যাচ্ছে। অর্থাৎ দেহব্যবসা সেই সমাজেও চলছে।
আমরা শদরাকে বারবার আকাশের একটি তারার সঙ্গে তার ভাগ্য জড়িত এ কথা বলতে দেখলেও মূলত মিকার ভাগ্যের সঙ্গে জেরুজালেমের ভাগ্যকে জড়িয়ে থাকতে দেখি। মিকা নানা চাপে বিধ্বস্ত যখন, তখন নারগেল সারেজেরের একটি চিঠি আসে। এতে সে জানতে পারে যে সে শদরার পিতার ঔরসজাত। সে হিসেবে মিকা ও শদরা পরস্পর ভাইবোন। এ সংবাদ তাকে বিচলিত করে মিকাকেও। তারপর শদরা ও মিকা মিসরে চলে যায়, কেউ কাউকে ত্যাগ করে না। এ প্রসঙ্গে মিকার উক্তিটি অসাধারণ। মিকা বলে- জেরুজালেম ছেড়ে পথ চলতে চলতে সূর্যোদয়ে কুয়াশার মতো আমার মনের গ্লানি ক্রমে কেটে যেতে লাগল। আমার মন সুস্থ ও সাহসী হয়ে উঠল। ভাবলাম নিষ্পাপ আমরা, নিষ্কলঙ্ক আমরা, আমরা কেন ওদের কাছে মাথা নিচু করে থাকবো? কে, কবে, কোথায় তার অসংযত প্রবৃত্তি চরিতার্থ করবার ফলে এক সন্তানের জন্ম দিয়েছিল, তার দায়দায়িত্ব কি আমাদের বয়ে নিয়ে চলতে হবে? বাইরের লোকের কাছে যাই হই না কেন, আজ আমার নিজের মনে কোনোই গ্লানি নেই।’
উপন্যাসটিতে আমরা ইহুদীদের জেরুজালেম নগরীতে শান্তি নষ্টের জন্যে ক্রিয়াশীল অনেক চরিত্র পাই। যেমন রাজা সানবল্লাট, আম্মোনীয় মন্ত্রী টোবিয়া, মহাযাজক ইলিয়াশীব, মহিলা নবী নোয়াদিয়া প্রমুখ। তাদের চরিত্রের ঘৃণা ও হিংসা একই সঙ্গে ষড়যন্ত্রী মাসসিকতার দিকটি বেশ ভালোভাবে এসেছে উপন্যাসে।
এভাবে মিথ কাহিনীর অন্তরালে স্থান কাল নির্বিশেষে মুক্তিকামী ও সংগ্রামী মানুষের সামনে নতুন যাপিত জীবন অভীপ্সারউদ্ভাসন আমরা দেখি পাপের সন্তান উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রে। সত্যেন সেন ছিলেন আজীবন সংগ্রামী মানুষের জন্যে লড়াকু ব্যক্তি, জীবনের দীর্ঘসময় অন্তরিন ছিলেন তিনি। জেল থেকে মুক্তি পেয়ে তিনি কৃষক আন্দোলনে যোগ দেন এবং আমৃত্যু বাম রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পাপের সন্তান উপন্যাসে তার সংগ্রামী জীবনের মতো ইহুদীদের সংগ্রামী জীবন দেখি। মিকা-শদরার প্রেমও যেন একটা সংগ্রামের প্রতিচ্ছবি। 
প্রগতিশীল লেখক ও শিল্পী সংঘ, উদীচী সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিষ্ঠাতা সাহিত্যিক, সাংবাদিক, ও রাজনীতিবিদ সত্যেন সেন। বাংলাদেশের সাংস্কৃতিক, রাজনৈতিক আন্দোলনের সঙ্গে সত্যেন সেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত ছিলেন। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের কিংবদন্তি বিপ্লবী, শ্রমিক সংগঠক সত্যেন সেন ১৯৮১ সালের ৫ ডিসেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। সত্যেন সেন ১৯০৭ সালের ২৮ মার্চ  বিক্রমপুর (বর্তমান মুন্সিগঞ্জ) জেলার টঙ্গীবাড়ী উপজেলা সোনারঙ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। ছোটবেলায় ডাক নাম ছিল লস্কর। তার পিতা নাম ধরনীমোহন সেন এবং মাতার নাম মৃণালিনী সেন। চার সন্তানের মধ্যে সত্যেন ছিলেন সবার ছোট। সোনারঙ গ্রামে সেন পরিবার ছিল শিক্ষা ও সংস্কৃতি চর্চার এক অনন্য উদাহরণ। সত্যেনের কাকা ক্ষিতিমোহন সেন ছিলেন বিশ্বভারতীর উপাচার্য। তার আর এক কাকা মনোমোহন সেন ছিলেন শিশুসাহিত্যিক। 
১৯২১ সালে সত্যেন সেন যখন সোনারঙ হাইস্কুলের অষ্টম শ্রেণির ছাত্র তখন থেকেই তার মধ্যে রাজনৈতিক চেতনার বিকাশ লাভ করে। ১৯২৪ সালে সোনারঙ হাই স্কুল থেকে এন্ট্রান্স পাস করে কলকাতায় কলেজে ভর্তি হন এবং সেখানকার একটি কলেজ থেকে এফএ ও বিএ পাস করেন। এরপর তিনি কলকাতা ইউনিভার্সিটিতে ইতিহাস বিভাগে এমএ শ্রেণিতে ভর্তি হন। কিন্তু বিপ্লবী রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত হওয়ার কারণে ১৯৩১ সালে কারাবরণ করলে কারাগারে থেকেই তিনি বাংলা সাহিত্যে এমএ পাস করেন। 
তার পরিবার ছিল সৎ ও পূণ্যবান। পারিবারিক সুকুমার বৃত্তির আবহে থেকে বিপ্লবী ব্যক্তিত্ব কমরেড সত্যেন সেন কিভাবে পঙ্কিল ও বিপ্লবী জীবনের কালজয়ী আখ্যানবহুল উপন্যাস সৃষ্টি করেছেন তা বিস্ময়কর! পাপের সন্তানের মতো সুলিখিত কথাশিল্প আমার কাছে এক অমৃত জ্ঞান। এখনও যেন তা বাস্তবতার নিরিখে সমসাময়িক দৃশ্যসজ্জা। তবে পাপের সন্তান নন সত্যেন সেন। 

×