ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১২ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১

সাহিত্য

সাহিত্য বিভাগের সব খবর

নাটকের সংলাপ ভাবনা ও শিল্পগুণ

নাটকের সংলাপ ভাবনা ও শিল্পগুণ

অন্যান্য সাহিত্য থেকে নাটকের আঙ্গিক ও গঠনকৌশল সম্পূর্ণ আলাদা। নাটকের সঙ্গে পাঠক বা দর্শক ও শ্রোতার সম্পর্ক সরাসরি ও প্রত্যক্ষ। ফলে নাটকের ভাষা ও ভাবনা স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্যের দাবি রাখে। প্রতিটি নাটকে প্রধান চারটি উপাদান থাকে। এগুলো হচ্ছে- ১. কাহিনী বা বিষয়, ২. চরিত্র, ৩. সংলাপ, ৪. মঞ্চ সজ্জা বা পরিবেশ। একজন নাট্যকারকে এ চারটি উপাদানের প্রতি বিশেষভাবে লক্ষ্য রেখে নাট্যভাবনাকে এগিয়ে নিতে হয়। প্রতিটি নাটকে একটি নির্দিষ্ট কাহিনী থাকে। মানবজীবন মূল অবলম্বন হলেও মানুষের সম্পূর্ণ জীবন নাটকে উপস্থাপন করা যায় না। নাট্যকারকে সব সময় মনে রাখতে হয়, নাটক নির্দিষ্ট চরিত্রের সংলাপ বর্ণনায় বা অভিনেতা-অভিনেত্রীর অভিনয়ের মাধ্যমে ফুটিয়ে তুলতে হয়।

মীনা অ্যালেক্সান্দারের কবিতা

মীনা অ্যালেক্সান্দারের কবিতা

২০১৩ সালের ৩০ মে নিউইয়র্কে জাতিসংঘের সদর দপ্তরে কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল বিজয়ের শত বার্ষিকী উদযাপন অনুষ্ঠান হয়। বিখ্যাত ভারতীয়-মার্কিন কবি মীনা অ্যালেক্সান্ডার সেদিন শুনিয়েছিলেন শৈশবে কেরালায় ডাকঘর নাটকে অমলের চরিত্রে অভিনয়ের কথা। মীনা অ্যালেক্সান্ডার জন্মগ্রহণ করেন ১৯৫১ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি ভারতের আল্লাহাবাদে। তার বাবা সরকারি চাকরি করতেন আবহাওয়াবিদ হিসাবে। তিনি সদ্য স্বাধীন সুদানে আসেন সপরিবারে চাকরি নিয়ে। জাহাজে মীনার পঞ্চম জন্মদিন পালন করা হয়।  মীনা অ্যালেক্সান্ডার ১৯৬৯ সালে খার্তুম বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি এবং ফরাসি ভাষায় ¯œাতক ডিগ্রি লাভ করেন। তিনি পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করেন ইংরেজিতে ১৯৭৩ সালে ইংল্যান্ডের নটিংহাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি ভারতে ফিরে আসেন এবং দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয় এবং হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেন। ভারতে থাকাকালীন ডেভিড লেলিভেল্ডের সঙ্গে দেখা হয়, একজন ইতিহাসবিদ যিনি মিনেসোটা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গবেষণা বই লেখার জন্য ছুটিতে এসেছিলেন। তারা ১৯৭৯ সালে বিয়ে করেন এবং নিউইয়র্ক সিটিতে স্থায়ী হন। মীনা অ্যালেক্সান্ডারের লেখা মালয়ালম, হিন্দি, জার্মান, সুইডিশ, আরবি এবং স্প্যানিশ ভাষায় অনূদিত হয়েছে। তিনি গুগেনহেইম ফাউন্ডেশন, ফুলব্রাইট ফাউন্ডেশন, রকফেলার ফাউন্ডেশন, আর্টস কাউন্সিল অফ ইংল্যান্ড, সাউথ এশিয়ান লিটারারি অ্যাসোসিয়েশন এর মতো প্রতিষ্ঠান থেকে পুরস্কার পেয়েছেন। মীনা অ্যালেক্সান্ডার ব্রাউন, কলাম্বিয়া, সোরবোন এবং হায়দ্রাবাদ বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেছেন। দীর্ঘদিন তিনি হান্টার কলেজ এবং নিউইয়র্কের সিটি ইউনিভার্সিটিতে অধ্যাপনা করেন। তার প্রকাশিত কাব্য গ্রন্থের সংখ্যা আট। মার্কিন কবি ইউসেফ কমুনিয়াকা কবি মীনা আলেকজান্ডারকে প্রশংসা করে বলেছেন, তিনি একজন সত্য-বক্তা যিনি জানেন ভাষাকে তার ইচ্ছামতো রূপ দিতে। তার গদ্য এবং কবিতায় নারীবাদ, উত্তর ঔপনিবেশিকতা, অভিবাসন ও স্মৃতি স্থান পেয়েছে। তার কবিতায় পশ্চিমা রোমান্টিসিজমের সঙ্গে ভক্তি ও সুফিজমের প্রভাব দেখতে পাওয়া যায়। মীনা অ্যালেক্সান্ডার এন্ডোমেট্রিয়াম ক্যান্সারে মারা যান ৬৭ বছর বয়সে।  মীনা আলেকজান্ডারের গীতিকবিতা ‘গঁংব’ প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল তার কবিতা সংকলন ‘ওষষরঃবৎধঃব ঐবধৎঃ’ এ । বইটি প্রকাশিত হয়েছিল ২০০২ সালে ও একই বছরে পেন ওপেন বুক পুরস্কার পায়। ভারতের কেরালায় থাকার সময় তার শৈশবের স্মৃতির আলেখ্য এই কবিতা।

ষাট দশকের উচ্চকিত স্বর

ষাট দশকের উচ্চকিত স্বর

নির্মলেন্দু প্রকাশ গুণ চৌধুরী (জন্ম ২১ জুন ১৯৪৫), যিনি নির্মলেন্দু গুণ নামে ব্যাপক পরিচিত। দেশভাগের পর পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্মপরবর্তী ঘটনা বাঙালিকে এক মোহনায় সংযুক্ত করে দেয়। একটি রাষ্ট্র দুইভাগে বিভক্ত হয়ে পড়ে- একদিকে পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালনার দায়িত্বে। অন্যদিকে পূর্ব পাকিস্তান। পূর্ব পাকিস্তান নামক ভূখ-ে বৈষম্য, দমন-পীড়ন, অর্থনৈতিক-সামাজিক ব্যবধান প্রকট হয়ে ওঠে। স্বায়ত্তশাসনের দাবি থেকে মুক্তিসংগ্রামে যুক্ত হয় দেশের আপামর জনতা। ছয় দশকের কবিরা দ্রোহী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়। রাজনীতি, ব্যক্তিগত অনুভব, সমাজের অবক্ষয়, অসঙ্গতি এসব নির্মলেন্দু গুণের কবিতায় নতুন মাত্রা যোগ করে। ছয় দশকে বাংলাদেশে কবিতা আন্দোলনের এক নতুন ধারা সূচিত হয়! বিষয়, বৈচিত্র্য ও আঙ্গিক পরিবর্তন নিয়ে মনোনিবেশ করেন এই সময়ের কবিরা। এই দশকের প্রধান কবি নির্মলেন্দু গুণ বাংলা কবিতাকে শিল্পনন্দন ও জীবনঘনিষ্ঠভাবে উপস্থাপন করেছেন। তিনি, তার কবিতায় মানব-মানবীর প্রেম, শ্রেণি-সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধ, ব্যক্তিগত অনুভব ও দ্রোহ ধারণ করেছেন। ১৯৭৫-এ জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের নির্মম হত্যাকা-ের পর তিনি তার সেসব স্মরণীয় কবিতা নিয়ে প্রকাশ্য অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। এই সাহস ও দেশপ্রেম তাকে সমগ্র বাঙালির কাছে বিশেষভাবে আদৃত করেছে। স্কুলের ছাত্রাবস্থায় নির্মলেন্দু গুণ কবিতার মোহনীয় জালে জড়িয়ে পড়েন। খালেক দাদ চৌধুরী সম্পাদনা করতেন উত্তর আকাশ নামে একটি পত্রিকা। এই পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তার প্রথম কবিতা। সপ্রতিভ উজ্জ্বল উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায় এখানে: উত্তর আকাশ ঢাকা ছিল মেঘের আড়ালে।/ যদিও ছিল না আলোর অভাব/ যাত্রীরা তবু নীরব/ সন্ধ্যা আগত প্রায়/ নদীতে ভীষণ ঝড়, নৌকা ডুবু/ ছিঁড়ে গেলো পাল/ বাতাসের বেগ আরও বাড়ে আরও (উত্তর আকাশ : ১৬ জানুয়ারি, ১৯৬২)। নেত্রকোনা কলেজ বার্ষিকীতেও তার রচিত কিছু কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৬২-তে রচিত নতুন কা-ারি, ওই আকাশের নিচে প্রভৃতি কবিতার মাধ্যমে তার সম্মুখ যাত্রা অব্যাহত থাকে। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দে নির্মলেন্দু গুণের প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রেমাংশুর রক্ত চাই’ প্রকাশিত হয়। ছয় দশকের আন্দোলন, মুক্তি ও সংগ্রাম, ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, প্রেম-দ্রোহ এই কাব্যগ্রন্থের মূল উপজীব্য বিষয়। তিনি তার কবিতায় বিশেষ ভাষা, বক্তব্য, উপমা-চিত্রকল্পের ব্যবহারের মাধ্যমে সবাইকে সচকিত করেছেন। ঊনসত্তরের উন্মাতাল ঘটনা, লড়াই-সংগ্রাম মুখ্য প্রতিপাদ্য বিষয় হয়ে উঠেছে তার গল্প ও কবিতায়। তিনি বিশ্বাস করেন প্রিয় বস্তু ত্যাগ করার পর স্বাধীনতা অর্জন করা সম্ভব।

ইঁদুর দৌড়ের গল্প

ইঁদুর দৌড়ের গল্প

বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত খ্যাতিমান কথাসাহিত্যিক, প্রবন্ধকার, গবেষক এবং ইতিহাসবিদ হোসেনউদ্দীন হোসেন। জন্ম ১৯৪১ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি। যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার কৃষ্ণনগর গ্রামে। মৃত্যু ২০ মে ২০২৪।  হোসেনউদ্দীন হোসেন তাঁর সৃজনশীল সাহিত্যকর্মের জন্য আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেছেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা ২৩। এর মধ্যে উপন্যাস ‘প্লাবন এবং একজন নুহ’ ইংরেজিতে ‘ঋষড়ড়ফ ধহফ ধ ঘড়ড়য’ নামে অনূদিত হয়ে ইংল্যান্ডের মিনার্ভা প্রকাশনার নয়াদিল্লি শাখা থেকে প্রকাশিত হয়েছে। আর একটি উপন্যাস ‘ইঁদুর ও মানুষেরা’  ‘গরপব ধহফ গবহ’ নামে ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। এই উপন্যাসটি পশ্চিম বাংলার রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে এম, এ শ্রেণির পাঠ্য। আমি এখন হোসেনউদ্দীন হোসেনের ‘ইঁদুর ও মানুষেরা’ উপন্যাস নিয়ে কিছু কথা বলবো। মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ঘুঘুদহ গ্রামে অসহায় গরিব মানুষের জন্য সরকার যে রিলিফের চাল ডাল তেল পাঠিয়েছে তা রীতিমতো গায়েব করে দেন ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বজলে রহমান।  এ খবর ছড়িয়ে পড়ার পর অসহায় গ্রামের মানুষেরা সরখেলের কাছে যায়।  সরখেল নিজেও অসহায় মানুষ। কিন্তু ঘুঘুদহের মানুষ সরখেলকে ভীষণ বিশ্বাস করে। কারণ, সরখেল মুক্তিযোদ্ধা। দেশের মানুষের জন্য যুদ্ধ করেছে। সরখেল মানুষের বিপদের বন্ধু। ধান্ধাবাজ চেয়ারম্যান বজলে রহমান আর এলাকার সংসদ আকমল ইলাহীর কথার প্রতিবাদ একমাত্র সরখেল ভাই-ই করতে পারে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বেড়ে ওঠা সরখেল গরিবের হক ফিরিয়ে দেবার জন্য ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আর সংসদের কাছে যায়। এলাকার গণ্যমান্য মানুষের কাছে ছুটে ছুটে যায়। কিন্তু গ্রাম্য রাজনীতির মারপ্যাঁচে পড়ে সরখেল প্রায় ধরাশায়ী। তবু সে হাল ছাড়েনি। ওর সহোযোগীর বউয়ের সাথে ফষ্টিনষ্টি করার মিথ্যে অপবাদ দেয় চেয়ারম্যান আর পুলিশের লোকজন।  সরখেল ঘুঘুদহ গ্রামের মানুষের অধিকার ফিরিয়ে দিতে গিয়ে নিজে জেল খেটেছে। ঘুঘুদহের নিরীহ কৃষক, খেটেখাওয়া মানুষেরা চাঁদা তুলে সরখেলকে জেল থেকে ছাড়ানোর ব্যবস্থা করেছে। জয়গুন, নাদেরার প্রতি চেয়ারম্যানের চ্যালা কটা চান্দালীর কুপ্রস্তাব এবং যুদ্ধপরবর্তী সময়ের জমিজিরেত হারানো অসহায় হিন্দু-মুসলমানদের হাহাকার দেখে সরখেল শুধুই ভাবে চারিদিকে শুধু ইঁদুরের গর্ত। এই গর্ত থেকে বের হতে হলে জনগণের সাথে নিয়েই থাকতে হবে রাস্তায়।  হোসেনউদ্দীন হোসেন নিভৃতচারী লেখক। স্বভাবেও মৃদুভাষী। কিন্তু তাঁর ভেতরে যে আগুন আছে তা টের পাওয়া যায় ‘ইঁদুর ও মানুষেরা’ উপন্যাস পড়লে। হোসেনউদ্দীন হোসেন আমার খুবই প্রিয় লেখক। দীর্ঘদিন তাঁকে কাছ থেকে দেখার সুযোগ আমার হয়েছে। কথা নয়, কাজে বিশ্বাসী হোসেন ভাইয়ের জন্য বিনম্র শ্রদ্ধা।