ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ১৯ মার্চ ২০২৬, ৫ চৈত্র ১৪৩২

সাহিত্য

সাহিত্য বিভাগের সব খবর

স্মৃতিমগ্নতার বিষণ্ন কবি

স্মৃতিমগ্নতার বিষণ্ন কবি

বাংলা সাহিত্যে জীবনানন্দ দাশের আবির্ভাব যেন এক অদৃশ্য ঝড়ের মতো- নীরব, ধীর, কিন্তু গভীরতর এক আলোড়ন জাগানো। বাংলা কবিতার পরম্পরায় যখন রবীন্দ্রনাথের ছায়া এতটাই বিস্তৃত যে অন্য সব কণ্ঠ যেন তাতে ঢাকা পড়ে যায়, তখনই আবির্ভূত হন জীবনানন্দ- নিজস্ব এক ভাষা, ছন্দ ও ভাবনাজগৎ নিয়ে। তাঁর কাব্যধারায় রয়েছে এক গভীর মৌনতা, ধ্যানমগ্নতা এবং প্রকৃতির রহস্যময় নীরবতা। তাঁর কবিতা যেন শব্দের পেছনে হারিয়ে যাওয়া এক জীবনদর্শনের অনুসন্ধান। ‘নির্জনতা’, ‘নিসর্গ’, ‘স্মৃতি’, ‘আত্মদহন’- এই সবকিছুর সঙ্গে মিশে গড়ে উঠেছে জীবনানন্দের কাব্যভুবন, যা তাকে বাংলা আধুনিক কবিতার অন্যতম প্রধান কণ্ঠে পরিণত করেছে। জীবনানন্দের কবিতা একদিকে যেমন অতীত স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে, অন্যদিকে তেমনি ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়ে থাকে গভীর এক বিষণ্নতা ও আশঙ্কার চোখে। তাঁর কবিতায় বারবার ফিরে আসে স্মৃতির শহর বরিশাল, বটতলা, নিঝুম মাঠ, সন্ধ্যার আলো কিংবা চন্দ্রহীন রাত। এইসব চিত্রকল্প কবির এক অন্তর্জগতের মানচিত্র। ‘বনলতা সেন’ কবিতায় যেমন আমরা দেখি এক চির সন্ধানরত মানুষের গল্প, যে হাজার বছর ধরে ‘নিমগ্ন পথ’ দিয়ে হেঁটে চলেছে। তেমনি তাঁর অন্যান্য কবিতাও একইভাবে এক অসীম সময়ের ভিতর মানুষের নিঃসঙ্গতার অন্বেষণ। জীবনানন্দ তাঁর কবিতায় একজন আত্মসন্ধানী মানুষের মানসিক যাত্রাপথ হিসেবে তুলে ধরেন। তার কাব্যে প্রকৃতি কেবল বাহ্যিক সৌন্দর্য নয়, এক জীবন্ত চরিত্র, এক আত্মার সহযাত্রী। তিনি বাংলার প্রকৃতি, নদী, গাছপালা, পাখি, ধানখেত- সবকিছুর মধ্যে মানুষের অস্তিত্বের খোঁজ করেন। তার কবিতার প্রকৃতি মায়াবী, কখনো ভীতিকর, কখনো প্রেমময়। আধুনিকতাবাদী কবি হিসেবে জীবনানন্দ ছিলেন ভিন্নধর্মী। তিনি ইউরোপীয় আধুনিকতার অন্ধ অনুসারী ছিলেন না, বাংলার সংস্কৃতি ও প্রকৃতির ভেতরেই গড়ে তুলেছিলেন এক নিজস্ব আধুনিকতা। তাই তাঁর কবিতার মধ্যে আমরা যেমন পাই নাগরিক ক্লান্তির কষ্ট, তেমনি পাই প্রান্তরের নির্জনতা। এই দুই বিপরীত অভিজ্ঞতার এক অসাধারণ মিশ্রণই তাঁকে দিয়েছে এক অনন্য সাহিত্যিক অবস্থান। জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যচর্চার পেছনে ছিল এক নিভৃত জীবনযাপন, যেখানে তিনি নিজেকে আলাদা করে নিয়েছিলেন প্রচারের আলো থেকে। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ইংরেজি সাহিত্যে স্নাতক ও স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করে শিক্ষকতা পেশায় যুক্ত হন তিনি। জীবনের অধিকাংশ সময় তিনি কলেজে অধ্যাপনার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করলেও কাব্যচর্চা ছিল তাঁর প্রকৃত ধ্যান ও আত্মপ্রকাশের মাধ্যম। তবে অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, শিক্ষকতার চাকরি নিয়ে বারবার বিপর্যয় ও সমাজের সঙ্গে নিজস্ব বোহেমিয়ান মনোভাব- সবকিছু মিলিয়ে তাঁর জীবন ছিল অস্থির ও বেদনাময়। তার কবিতায় উঠে এসেছে এই অস্থির আত্মার বহিঃপ্রকাশ। জীবনের কঠোর বাস্তবতা, চাকরিচ্যুতি, ব্যক্তিগত নিঃসঙ্গতা এবং সমাজে নিজের অবস্থান নিয়ে দ্বন্দ্ব- এই সবকিছুকে তিনি রূপান্তরিত করেছেন কাব্যে, যা তাঁর সাহিত্যিক সত্তাকে করে তুলেছে অতলস্পর্শী ও বহুমাত্রিক। জীবনানন্দ দাশের কবিতার ভাষা প্রথমদিকে পাঠকদের জন্য ছিল কিছুটা দুর্বোধ্য ও ব্যতিক্রমী, কারণ তিনি প্রচলিত ছন্দ, শব্দচয়ন ও কাব্যধারাকে ভেঙে নতুন এক প্রকাশভঙ্গি গড়ে তুলেছিলেন। তাঁর কাব্যে অনুপ্রবেশ করে এক ধরনের বিমূর্ততা, যেখানে সময় ও স্থানের সীমানা ধূসর হয়ে যায়। তাঁর শব্দচয়নে যেমন এক ধরনের ধ্বনিগত আবেশ রয়েছে, তেমনি রয়েছে অর্থের গভীরতা। তার কবিতায় যে বিষণ্নতা, নিঃসঙ্গতা এবং এক ধরনের অধরা সৌন্দর্যের সন্ধান দেখা যায়, তা বাংলা কবিতায় এক নতুন মাত্রা যোগ করেছে। আধুনিক মানুষের বেদনা, অস্তিত্বহীনতার আশঙ্কা এবং অন্তঃস্থ স্মৃতিকে তিনি এমনভাবে তুলে ধরেন, যা অনেক সময়ই জটিল ও অভেদ্য, কিন্তু গভীর পাঠে তা এক অনুপম রূপ পায়। তাঁর ভাষা কখনো ধীরে ধীরে মুগ্ধ করে, আবার কখনো পাঠককে নিজের ভেতরে ডুবিয়ে নিয়ে যায়, যেখানে শব্দের অর্থ খোঁজার বদলে অনুভবই হয়ে ওঠে প্রধান। জীবনানন্দ দাশ যখন কবিতা লিখছেন, তখন বাংলার কবিতায় রাজত্ব করছেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম কিংবা সুধীন দত্তের মতো কবিগণ। এই সময়ে জীবনানন্দের কাব্যধারা ছিল ভিন্ন এক স্রোতধারা, যেখানে রোমান্টিকতা, দেশপ্রেম কিংবা বাগ্মীতার বদলে স্থান পেয়েছে নির্জনতা, অতীতচারণ এবং নিঃসঙ্গ স্বপ্ন দেখা। অনেকে তাঁকে সুধীন দত্ত বা বিষ্ণু দে-র সঙ্গে তুলনা করলেও জীবনানন্দের ভিন্নতা ছিল তাঁর আত্মসংকট ও অস্তিত্ববাদী দৃষ্টিভঙ্গিতে। রবীন্দ্রনাথের পরবর্তী কালের আধুনিকতার পথিকৃত বলা হয় তাঁকে, কারণ তিনি রবীন্দ্র কাব্যের ঐশ্বর্য ও স্বরবর্ণের বিপরীতে এক ধীর, গহন, এবং একান্ত কাব্যভাষা নির্মাণ করেছিলেন। এক অর্থে, তাঁর কবিতা ছিল আত্মার এক নিঃশব্দ প্রতিবাদ, সমাজের বিরুদ্ধে নয়, বরং নিজের অস্তিত্বের সংকটের বিরুদ্ধে। সমসাময়িকরা হয়তো তাৎক্ষণিক খ্যাতি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু জীবনানন্দ পেয়েছেন সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে পাঠকের মর্মে গেঁথে যাওয়ার ক্ষমতা। জীবনানন্দ দাশের সাহিত্যিক উত্তরাধিকার বাংলা কাব্যজগতের ইতিহাসে এক গভীর প্রভাব ফেলেছে। তিনি যেমন নিজস্ব ছন্দ, নিজস্ব ভাষা ও ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার একান্ত আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে আধুনিকতার ভিত গড়েছেন, তেমনি পরবর্তী প্রজন্মের কবিদের কাছে হয়ে উঠেছেন এক ধ্রুপদী অনুপ্রেরণা। শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ, হেলাল হাফিজ কিংবা সত্তর-আশির দশকের তরুণ কবিদের কবিতায় জীবনানন্দের ছায়া সুস্পষ্টভাবে ধরা পড়ে। তাঁর কবিতায় প্রকৃতির রূপবৈচিত্র্য যেমন গভীরভাবে চিত্রিত হয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের সঙ্গে প্রকৃতির গভীর সখ্যের অনুভব, যা বাংলা কবিতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে। জীবনানন্দের কবিতা হয়ে উঠেছে বিশ্লেষণের, অনুধাবনের ও উপলব্ধির বিষয়। তাঁর মৃত্যুর পর যত সময় গড়িয়েছে, ততই তাঁর কাব্যের আবেদন বেড়েছে এবং তিনি বাংলা সাহিত্যের আধুনিক ধারার এক অনন্য পুরুষ হিসেবে সুপ্রতিষ্ঠিত হয়েছেন।

‘নদী ও নারী’ এবং হুমায়ুন কবীর

‘নদী ও নারী’ এবং হুমায়ুন কবীর

মালেকের আর নূরুর সঙ্গে ঘর বাঁধা হলো না, সব কিছুই বন্যার তোড়ে উড়ে গেলো ভেসে গেলো, জীবন যেন এমনি, নদী যেমন ধারা বদলাই, জীবনও কখনো-সখনো নিজেকে ধুয়ে-মুছে একাকার করে নেয়, হয়তো পরিসুদ্ধ করবার জন্য, মালেক যেন একটা সমুদ্রের বুকে জেগে ওঠা নতুন টিলা, সেখানে আশ্রয় বাঁধা যায় না, কারণ সে যে অস্তায়মান, বড় প্রেম শুধু কাছেই টানে না, দূরেও যে সরিয়ে দেয়, তা প্রমাণ হলো হুমায়ুন কবীর (১৯০৬-১৯৬৯) এর ‘নদী ও নারী’ (১৯৫২) উপন্যাসের মধ্য দিয়ে, তিল-তিল করে যে স্বপ্ন যে আকাক্সক্ষা মনের নিভৃতে জমা হয়েছিলো, মালেক আর নূরুর রক্ত সঞ্চলনে যে স্বপ্নবীজ রোপণ হওয়ার কথা, তা কাকতালীয়ভাবে ভেঙে গেলো খানখান হয়ে একটা চিরসত্য বাণীতেই, তারপরও সত্য চিরন্তন সত্যই সুন্দর, সত্য এবং সুন্দর দুটোকেই মানুষ ভালো না বেশেও ভালোবাসে, সে সুন্দরের কাছে পৃথিবী থেকে হয়তো হোঁচট খায়, অথবা সঠিক পথেই চলে, মানুষ শুধু সত্যকে ভয় পায়, আসগর মিয়া কিন্তু সত্যকে চেপে রাখেনি, সত্যকে নদীর কাছে নারীর কাছে উন্মেচিত করেছে, মালেক যে আমেনার প্রথম পক্ষের স্বামীর ঘরের সন্তান, যে আমিনাকে নজুমিয়া বিয়ে করেছিলো এবং পরবর্তী সময়ে নজুমিয়া তালাক দেয় এবং পুরানো প্রেমিক ফুপাতো ভাই আসগরকে বিয়ে করে আমিনা এবং সেই আমিনার দ্বিতীয় স্বামীর ঘরের দিকের সন্তান নূরু, অর্থাৎ মালেক এবং নূরু একই মায়ের পেটের ভাই-বোন, যদিও বাপ ভিন্ন কিন্তু মাতৃদুদ্ধ তো আমিনারই গ্রহণ করেছে দুজন। চিরসত্য কথাটা শুনে মালেক এবং নূরু নিজেদের অন্য জগতে আবিষ্কার করলো, এই আবিষ্কারের মধ্যে যন্ত্রণা এবং দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্নের কবর রচনা, পাঠক শেষ অধ্যয়ে দেখলো, মালেক চলে গেলো বৃহৎতরের সন্ধানে, কে থাকে আর শূন্য মাঝারে, দুনিয়ার নীতিই এই, যে ভাঙাগড়ার ভেতর বিকাশিত হয় অন্য আরেক গল্প, ‘নদী ও নারী’ উপন্যাসের মূল বিষয়টা আসলে এখানেই নিহিত। উপন্যাসটিকে তিন ভাগে বিভক্ত করা হয়েছে, প্রথম খণ্ড ‘নজুমিয়া’ (প্রথম খণ্ডে আটটি অধ্যায়) দ্বিতীয় খণ্ড ‘আসগর’ (দ্বিতীয় খণ্ডে আটটি অধ্যায়) তৃতীয় খণ্ড ‘নূরু ও মালেক’ (তৃতীয় খণ্ডে ছয়টি অধ্যায় রয়েছে) এবং নূরু ও মালেকের শেষ অধ্যায়ে আরেকটি অধ্যায় সংযোজিত হয়েছে। প্রতি অধ্যায়ের কাহিনীমালা পাঠককে টেনেছে, গল্পের যে গতি তা থেকে বিচ্যুতি হয়নি কখনো।  দার্শনিক এবং রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব (ভারতীয় কেন্দ্রীয় মন্ত্রী)-কবি-কথাশিল্পী হুমায়ুন কবীরকে নিয়ে পশ্চিমবঙ্গ বা বাংলাদেশে তেমনভাবে কোনো আলোচনা হয় না বললেই চলে, যদিও তিনি জন্মসূত্রে বাংলাদেশের (ফরিদপুর জেলার) মানুষ, তার একমাত্র বাংলা সার্থক উপন্যাস ‘নদী ও নারী’ বিস্মৃতপ্রায় বলা যায়। উপন্যাসে তিরিশ/চল্লিশ দশকের চিত্ররূপ-আবহাওয়া স্পষ্ট লক্ষ্য করা যায়, হুমায়ুন কবীর গ্রামীণ একটা কিছু প্রেম এবং অপ্রেম বা সামাজিক সংঘাতের মতো বিষয়বস্তুকে অবলম্বন করে ‘নদী ও নারী’ উপন্যাসের বীজ বপন করেন, যেখানে পদ্মা নদীর উপস্থিতি গভীরভাবে দৃশ্যমান হয়েছে, পদ্মানদীকে কেন্দ্র করে কাহিনী এগিয়ে গেছে বিভিন্ন দিকে, পদ্মাপাড়ের মানুষের জীবিকার পাশাপাশি প্রকৃতির সঙ্গে নিরবচ্ছিন্নভাবে তাদের যে সংগ্রাম এবং বেঁচে থাকার তাগিদে কঠিন পেশায় নিয়োজিত, সর্বোপরি সংঘাত-প্রেম-দ্বেষ এবং মানবিকতা ফুটে উঠেছে, ‘নদী ও নারী’ উপন্যাসের একেকটি চরিত্র হয়ে উঠেছে একেকটি অতি মানব, এখানে মৃত্যু আছে এবং অবধারিতভাবে মৃত্যু একটা সাধারণ বিষয় হলেও জন্ম ও মৃত্যুর মাঝে জীবন চলমান নদীর মতো বহমান প্রতিনিয়ত, কঠিন বিপদের সময়েও মানুষ মৃত্যুর কথা ভুলে জীবনের কথা ভাবে, নতুন চরের মতো নতুন জীবন তাকে বেঁচে থাকার আকাক্সক্ষা জোগায়। নদী পার হয়ে মানুষ যেমন সমুদ্রে যেতে চায়, সমুদ্রও নদীকে কদাচিৎ হাতের নাগালে পেয়ে একটু ঝাঁকুনি দেয়, হয়তো বুকে তুলে নেয়, নজুমিয়ার মা আয়েশার একমাত্র অবলম্বন নাতি মালেকই ছিলো যক্ষের ধন, নাতিকে ছাড়া যেমন তার একদন্ডও কাটে না, তেমনি মালেকেরও দাদিকে ছাড়া জীবন যেন অন্ধকার, এই ভালোবাসার মধ্যে মাতৃস্নেহ যেমন রয়েছে, তেমনি আছে অনেক না বলা গল্প, পদ্মানদীর স্রোতরাশির মতোই তাদের এক-অপরের নীবিড় সম্পর্ক, কেউ কাউকে ছাড়া অচল, নজুমিয়াও মাকে এতোটাই ভালোবাসে এবং সম্মান করে যে কখনো তাকে উপেক্ষা করবার চিন্তাও করে না, সমস্ত রকম আদেশ-নির্দেশ মান্য করে বরাবর। উপন্যাসটিতে গ্রামীণ কৃষক পরিবারের মূলত এই তিনজনই প্রধান, কেউ কারো চেয়ে ছোট নয়, যেন সবাই প্রধান। তারপরও কাজের লোকের বা পারিপাশ্বিক আরো বেশ কিছু চরিত্র ‘নদী ও নারী’ উপন্যাসে ভীড় করেছে, তাতে কাহিনী আরো বেগবান হয়েছে বলতেই হয়। নজুমিয়া খন্ডের অধ্যায়ে পাঠক বিভিন্ন চড়াই-উৎরায়ের ভেতর দিয়ে একটা গন্তব্যে পৌঁছে যায়, আয়েষাকে কখনো মনে হয়ে বৃক্ষ আবার কখনো সে হয়ে উঠেছে পদ্মানদীর একটা শাখা, যার বুকের দুটো ধন, দুটো নয়নমনি, ছেলে এবং নাতি। রহিমপুরের এই নজুমিয়া এক বৈশাখ শেষে ঝড়ের তান্ডবে রাক্ষুসি পদ্মানদীর গহবরে হারিয়ে যায়, যখন খবরটা এসে আয়েষার কানে পৌঁছালো ধুলদির অন্য আর সব মানুষের মতোই স্তম্ভিত হয়ে গেলো সেও, পদ্মানদীর বুকে ঝাঁপ দিয়ে সে ছেলেকে সন্ধান করতে চাইলো, দুঃখ-শোকে আয়েষা সত্যসত্যিই এক মাঝরাত্রে পদ্মার বুকে ঝাঁপ দিয়ে বুকের জ্বালা চিরতরে মেটালো, তারপর থেকে মালেক হয়ে গেলো অনাথ, কিন্তু এই অনাথ বালক মালেকের ভার কে নেবে, কুলসুম বা বসিরচাচা কতোদিন আর মালেক বা মালেকের বাপের বিষয়-সম্পত্তি আগলে রাখতে পারে, কিন্তু তারপরও মালেক যে একমাত্র উত্তরাধিকার, অথচ পূর্ব চরের জমির প্রজার বিলি বণ্টনের টাকা দিতে চায় না, যার কারণে পূর্ণিমার খাজনা শোধ হয় না, দিনেদিনে খাজনার পরিমাণ বাড়তে থাকে, বসিরচাচা-কুলসুমের কাছে যা ছিলো অবশিষ্ট সবই চলে যায় একেএকে, এমনকি আয়েশার সোনাদানাও বিক্রি করতে হয় খাজনা শোধ করতে, অবশেষে মালেক এবং নজুমিয়ার সম্পদ-সম্পত্তি বিলি-বণ্টনের চর একদিন নজুমিয়ার চিরশত্রু আসগরের হাতে সঁপে দেয়, কারণ পঞ্চয়েত প্রধান নজুমিয়ার মৃত্যুর পর রহিমপুরের পঞ্চয়েত প্রধান হন আসগর, তাই তার অর্থ-ক্ষমতা-যশ-খ্যাতি সবই বেশি,আর সে কারণে গ্রামবাসী আসগরকেই মালেকের দায়-দায়িত্ব দেয়। এই আসগরের মেয়ে নূরুকে পাঠক মালেকের শৈশব-কৈশোরের সঙ্গি হিসাবে পেয়েছে, তাদের জীবন যেন ছকে বাঁধা, মালেক এবং নূরুর মা যে আসগরের বিবি আমেনা, এখানেই উপন্যাসটিকে বহুমাত্রায় নিয়ে যায়। পদ্মাচরের ভাঙা জমি ভেঙে রহিমপুরের গ্রাম এবং নূরু এবং মালেককে মাতৃদুদ্ধ পান করিয়েছে যে নারী সেই আমেনাকে ধীর-স্থির একটা প্রতীক হিসেবে দেখা যায়, নদী যেখানে রাক্ষুসী-উন্মুক্তা-পাগলপারা-সর্বগ্রাসী, সভ্যতাকে ভেঙে চলে তার নির্দিষ্ট গন্তব্যে, অথচ আমেনা একটা নারী, তাকে যতোই মাত্বত্বের পরিচয়ে বেঁধে রাখি না কেনো, সে এমনই একটা নদী, যার ওপর অনেক স্রোত অনেক ঝড়-ঝঞ্ঝা চলে গেছে তারপরও আমেনা নদীর মতোই অটল-শান্ত। হয়তো নদীর সঙ্গে নারীর একটা মিলের সেতুবন্ধন রচনা করতে চেয়েছেন হুমায়ুন কবীর। রহিমপুরের পঞ্চয়েত প্রধান আসগর মিয়ার দেখভালের মধ্যেই মালেক বড় হতে থাকে, আসগরের স্ত্রী আমেনা হাতে স্বর্গ পেলো, তার পূর্বের স্বামীর ঔরশের সন্তান মালেক হলেও তারই যে জঠরের নাড়ি ছেঁড়া ধন, সে কথা তো আর অস্বীকার করা যায় না। আমিনার মন কানায়-কানায় ভরে গেলো, মালেককে দীর্ঘসময় পর কাছের পেয়ে সত্যিই সে আনন্দে আত্মহারা, নূরু-মালেক মানুষ হতে থাকে তারই চোখের সামনে। ভালোবাসা আবদারে দুজন যেন একই বৃন্তে ফোটা দুটো ফুল হয়ে যায়। আমিনার মন শান্ত হয়, আমিনা যে দীর্ঘ অপেক্ষার পর মালেককে পেয়েছে তার জন্য শুকরিয়া আল্লাহ’র কাছে জানায়, নজুমিয়ার মৃত্যুর সঙ্গে-সঙ্গে তার এই প্রাপ্তি তা হয়তো কখনো কামনা করেনি, কিন্তু তারপরও পেয়ে যায়। উপন্যাসের মানুষগুলো সত্যসত্যিই নদীর মতো কখনো সরল এবং কখনো মনে হয়েছে নদীর মতোই বাঁকা। তিরিশের প্রধান কবি বুদ্ধদেব বসু ‘চতুরঙ্গ’ পত্রিকায় লিখেছেন, ‘নদী ও নারী’ উপন্যাসের পদ্মা বর্ষায় প্রখর, শরতে সুন্দর, কালবৈশাখীর ঝড়ের সন্ধ্যায় ভয়াল, অপমৃত্যুর আধার, প্রাণের পালয়িত্রী -আবার সুদীর্ঘ অনাবৃষ্টির পরে হঠাৎ বর্ষণে বন্যাস্ফীতা সর্বগ্রাসিনী।” উপন্যাসের চরিত্রের সঙ্গে পদ্মার সম্পর্ক সেভাবে চোখে পড়ে না, ভূমি এবং সামন্ততান্ত্রিক বিষয়াদি যেভাবে প্রাধান্য পেয়েছে এবং সম্পর্কের টানাটানি উপন্যাসটিকে ভিন্ন মাত্রায় নিয়ে গেছে, সম্পর্কের যে পালাবদল এবং ভাঙাগড়া যা সমাজজীবনে বহমান, তাই দেখাতে গিয়ে দার্শনিতাকে বহুগুণে আশ্রয় দিয়েছেন, প্রেমের যে আলোক ঝলসানো দৃশ্যাবলী অধ্যায়ের পর অধ্যায় লিপিবদ্ধ করেছেন, বুদ্ধদেব বসু তাতেও বিরূপ মন্তব্য করেছেন, হয়তো মন্তব্য করতে হয় বলেই মন্তব্য করা আর কি, দেশকাল পাত্র ভেদে মানুষ কি চায় এবং তার প্রকৃত ঘটনাকে সাহিত্যে তুলে আনাই হলো একটা বৃহৎ প্রাপ্তি। কিন্তু তারপরও অনবদ্য ভাষা, ভাষার যে শক্তি এবং নদী-মানুষ-প্রকৃতির যে একাকার হয়ে মিশে যাওয়ার ছবি দেখা যায়, তাতে উপন্যাসটির সরল আখ্যানে একটা দার্শনিক মাত্রা যোগ হয়েছে বলা অপেক্ষা রাখে না। প্রথম দুটো খন্ডে নদী ও নারীর বুনন যেভাবে চলছিলো, প্রায় সবটুকুই তা ছিলো ভূমিনির্ভর। শেষখন্ডে দেখা গেলো সমুদ্রের অভিমুখে যাত্রা, অবশ্যই নদী তো আপন বেগে পাগলপারা, তার শেষ গন্তব্যস্থল সমুদ্র, সমুদ্রেই যে মিশবে, সেখানে সে তার আপন অস্তিত্ব খুঁজে নেবে, কাহিনী পটভূমিটিও রহিমপুর থেকে ক্রমে বন্যা-দুর্যোগ ঝড়-ঝঙ্ঘায় সমুদ্রবেলার বিরানচরে সরে এসেছিলো, যে চরে নতুন বসতি সৃযিত হয়েছিলো, নদীতীরবর্তী মানুষ তো সংগ্রামী, প্রকৃতির দুর্যোগকে ভয় করে না, বারবার ভাঙে আবার গড়ে, আবার ভাঙে তারপরও গড়ে তোলে বসতি-সমতল, নতুন চরে নতুন ভূমিতে ফসল ফলায় শ্রম দিয়ে শক্তি দিয়ে, তাকে কে বাঁধিবে কে বা রূখিবে, নদীর মতোই নদীতীরবর্তী বাসিন্দারাও তো চলমান-বেগবান। হুমায়ুন কবীরের ‘নদী ও নারী’ ভাববাদী মানবতা-চাঞ্চল্য জীবনদৃষ্টির শিল্প প্রতীমা, উপন্যাসে সার্থক সর্বজ্ঞ সহানুভূতি বর্ধিত হয়েছে স্বচ্ছল কৃষিজীবীদের প্রতি, জীবনাচরণের দৃষ্টিতে কৃষক হলেও সম্পত্তি বৃদ্ধির আকাক্সক্ষার মধ্য দিয়ে তারা অকপটে উন্মেচিত হলেও তাদের সামান্ততান্ত্রিক মনোবৃত্তি প্রকাশ পেয়েছে, তারপরও বলতে হয় হুমায়ুন মূলত নবজাগ্রত মুসলমান মধ্যবিত্তশ্রেণীর ভাবসত্যকে মনে-প্রাণে উপলব্ধি করে তাদেরই মনের কথাকে গল্পে-গল্পের আখ্যানে স্থান করে দিয়েছেন, যা একজন প্রকৃত সাহিত্যিকের করণীয়, এজন্যই তিনি বাংলাসাহিত্যের সার্থক রূপকার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, নদী এবং নারী যে আমাদেরই জীবনের অবিচ্ছিদ্য অংশ তা তো কখনো অস্বীকার করা যাবে না, সেই সত্যেরই বহিপ্রকাশ ‘নদী ও নারী’। বাংলাসাহিত্য বা বাংলা ভাষাভাষী মানুষের কাছে উপন্যাসটি একটি অলংকার এবং অহংকার, যা হয়তো কখনো ফুরোবার নয়, পদ্মানদী, এই সেই পদ্মানদী বাংলাসাহিত্যে বাংলাভাষী বা বাংলাদেশের নানা রূপবিভঙ্গে বারংবার ঘুরে-ফিরে এসেছে নারীর মতো কখনো রাগে আবার কখনো অনুরাগে। পদ্মাপাড়ের নিম্নবিত্ত বা নিম্নমধ্যবিত্ত মানুষের প্রাগাধুনিক জীবনের ছাঁদ অনেকটাই নিয়ন্ত্রিত হয় পদ্মার মতো খেয়ালী নদীর সঙ্গ-সাবুজ্যে, কেমনভাবে নদীর ঢেউয়ের সঙ্গে গাঁথা থাকে যাপনের ভরকেন্দ্র, তারই আখ্যান হুমায়ুনের ‘নদী ও নারী’ উপন্যাস, পদ্মার জলপদ্যে যেখানে আঁকা হয়েছে লোকায়েত জীবনের সরল বর্ণালী।  

জীবন একটাই

জীবন একটাই

মিরা তিতলির কলেজ জীবনের বান্ধবী। একসঙ্গে ক্লাস করেছে, একসঙ্গে ক্যান্টিনে বসে স্বপ্ন বুনেছে, ভবিষ্যৎ নিয়ে হাসাহাসি করেছে। দশ বছর কেটে গেছে এই দীর্ঘ সময়ে জীবনের চেহারা যেমন বদলেছে, তেমনি বদলেছে তাদের নিজেদের ভেতরকার মানুষটাও।  আজ হঠাৎ করেই মিরা শহরে এসেছে। ফেসবুকের মেসেঞ্জারে কথাবার্তা হয়েছে কয়েকদিন ধরে। কথার ফাঁকে পুরোনো স্মৃতি, কলেজের দিন, সেসব ফেলে আসা দুঃখ-হাসি সবকিছু মিলেমিশে একটা দেখা করার আকুলতা তৈরি হয়েছিল। ঠিক হয়, নদীর ধারের পার্কে দেখা করবে তারা। নির্ধারিত সময়ে মিরা পার্কে এসে পৌঁছায়। বসে বসে অপেক্ষা করে। তার চোখে বিরক্তি নেই, বরং একধরনের আত্মবিশ্বাসী স্থিরতা।  মোবাইলটা বারবার হাতে নিচ্ছে, সেলফি তুলছে, আয়নায় নিজের চুল ঠিক করছে। তিতলির আসতে একটু দেরি হয়। দেরির কারণ চার বছরের দুরন্ত এক বাচ্চা তিতির। তিতিরকে ভাত খাওয়াতে বসলে যেন সময় দাঁড়িয়ে যায়। এক গ্রাস খাওয়াতে গেলে সে দৌড়ায়, আরেক গ্রাসে খেলনা নিয়ে বসে। তিতলির মাথার ভেতর তখন ঘড়ির কাঁটার শব্দ বাজে। কিন্তু তিতিরকে রেখে বের হওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়। তিতলি জানে এই বাচ্চাটার দুনিয়া এখনো তার মা। তিতলি চাকরি করে। প্রতিদিন ভোরে উঠে সাতটার মধ্যে তিতিরকে ঘুম থেকে তুলে ভাত খাওয়ায়, ব্যাগ গোছায়, তারপর নিজের কাজের প্রস্তুতি। আজ অফিস বন্ধ, তাই সে একটু স্বস্তি নিয়ে বেরুতে পেরেছে। সব কাজ শেষ করে রিকশায় চেপে সোজা পার্কের দিকে রওনা হয়। দশ বছর পর দেখা। তিতলি মিরাকে দেখেই থমকে যায়। চকচকে, ঝকঝকে, সাজানো একদম কলেজ জীবনের মতোই। সময় যেন ওকে ছুঁতেই পারেনি। তিতলি বিস্ময়ে বলে, Í“তুই তো একটুও বদলাস নাই! একদম আগের মতনৃ কি সুন্দর লাগছে তোকে !”  মিরার ঠোঁটে হালকা তাচ্ছিল্যের হাসি। সে জানে, এই প্রশংসার ভেতরে বিস্ময়ের সঙ্গে একটা তুলনাও লুকিয়ে আছে। ‘আরে কি যে বলিস না,’ সে হেসে বলে, ‘এগুলো কিছুই না।’  মিরাকে সত্যিই পুতুলের মতো লাগছিল। আধুনিক পোশাক, পরিমিত মেকআপ, আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গি। যেন নিজের শরীর, নিজের উপস্থিতি সবকিছুর ওপর তার পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ। হাঁটতে হাঁটতে তারা চায়ের কথা তোলে। দুজনেরই চা খুব প্রিয়। ‘চল, ভালো চা খাই,’ মিরা বলে, ‘শহরে এখন ভালো চা কোথায় পাওয়া যায়?’ তিতলি তাকে নিয়ে যায় একটা দোকানে। ‘এখানে গরুর দুধের চা খুব ভালো,’ সে নিশ্চিত গলায় বলে। মিরা নাক কুঁচকে বলে, ‘না না, আমি গরুর দুধের চা খাই না। গুঁড়া দুধের চা খেতে হবে।’  তিতলি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তার কাছে এই পছন্দটা অদ্ভুত লাগে। তবু কিছু বলে না। তারা আবার হাঁটা শুরু করে। অবশেষে একটা দোকান পাওয়া যায়। তারা বসে। চা আসার পর কথাবার্তা ধীরে ধীরে জীবনের দিকে মোড় নেয়। মিরা জানায়, সে চাকরিটা ছেড়ে দিয়েছে। এখন দুই বাচ্চার দেখাশোনা করছে। তিতলি অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করে, ‘চাকরি ছেড়ে দিলি? কেন? কি সমস্যা হলো ?’  মিরার গলাটা এবার একটু ভারী হয়। সে বলে, তার দুই বাচ্চা এখন স্কুলে যায়। স্কুলে আনা-নেওয়ার মতো কেউ নেই বাসায়। শাশুড়ির হার্টের অপারেশন হয়েছে ১১ ঘণ্টার দীর্ঘ অপারেশন। শরীরে আর সেই শক্তি নেই। শ্বশুর ডিমেনশিয়ায় ভুগতেন সব ভুলে যেতেন। মাস কয়েক আগে মারা গেছেন। ‘হাজব্যান্ড বলেছিল, চাকরি করলে সে সাপোর্ট দেবে,’  মিরা শান্ত গলায় বলে, ‘কিন্তু বাস্তবে সাপোর্টটা কিভাবে দেবে? নিজের চাকরি রেখে কি সে বাচ্চাদের স্কুলে আনবে ? ভবিষ্যৎটা তো ওদেরই নষ্ট হতো।’  সব ভেবেচিন্তেই সে চাকরি ছেড়েছে। তিতলি কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। তারপর হঠাৎ প্রশ্ন করে, ‘কিন্তু আধা ঘণ্টার মধ্যে তুই দুই বাচ্চাকে খাইয়ে, রেডি করে, নিজে এত সাজগোজ করে এখানে এলি কিভাবে?’ মিরা হেসে ফেলে। ‘খুব সোজা,’ সে বলে, ‘দুইজনের হাতে দুইটা ব্রেড দিয়ে বেরিয়ে এসেছি।’  তিতলি অবাক হয়ে তাকায়। ‘সকালবেলা বাচ্চাদের খাওয়ানোর এত প্যারা আমি নেই না,’ মিরা নির্বিকারভাবে বলে, ‘আমি নিজেকে ভালোবাসি। আমার যখন যেখানে যেতে ইচ্ছা করে যাই। বাচ্চাদের এত বেশি প্রশ্রয় দিলে শেষে ওরাই আমাদের ভুলে যায়।’ সে একটু থামে, তারপর বলে, ‘নিজের জীবনে আমি কোনো আক্ষেপ রাখতে চাই না। বাচ্চার জন্য এটা করতে পারিনি, ওটা করতে পারিনি এই আফসোস নিয়ে বাঁচতে চাই না।’  মিরা জীবনকে উপভোগ করার কথা বলে। সে বলে, জীবন একটাই, সেটাকে ভোগ করতে হয়। কিন্তু হঠাৎই সে স্বীকার করে ‘আমি কিন্তু ডিপ্রেশনের ওষুধ খাই।’ তিতলি চমকে যায়। ‘কেন?’  সে ধীরে প্রশ্ন করে। মিরা উত্তর দেয় না। চায়ের কাপের দিকে তাকিয়ে থাকে। তিতলি তখন বুঝতে চেষ্টা করে হয়তো এই অতিরিক্ত আত্মভোগের আড়ালে কোথাও একটা শূন্যতা আছে। হয়তো নিজের জন্য বাঁচার এই ঘোষণার ভেতরেও এক ধরনের ক্লান্তি লুকিয়ে আছে। হয়তো ‘আমি নিজেকে ভালোবাসি’ এই বাক্যটা সে নিজেকেই বারবার বোঝাতে চায়। পার্কের নদীর পানি তখন ধীরে বয়ে যায়। দুজন নারী দুজন আলাদা পথ বেছে নেওয়া মানুষ নীরবে বসে থাকে। তিতলি মনে করে, জীবন একটাই। কিন্তু সেই জীবনের অর্থ, উপভোগ আর দায়বোধ সবার কাছে এক রকম নয়। 

ঈদ ও বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যচেতনা

ঈদ ও বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যচেতনা

বাংলা সাহিত্য হাজার বছরের ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ। এই দীর্ঘ সাহিত্যধারায় ধর্ম, সংস্কৃতি ও সমাজজীবনের নানা অনুষঙ্গ প্রতিফলিত হয়েছে নানাভাবে। বিশেষত বাংলার মুসলিম সমাজের ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক চেতনা সাহিত্যকে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। মুসলমানদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব ঈদ কেবল ধর্মীয় আনন্দের উপলক্ষই নয়, বরং তা বাঙালি মুসলমানের জীবনযাপন, অনুভূতি ও সংস্কৃতির সঙ্গেও গভীরভাবে সম্পর্কিত। তাই স্বাভাবিকভাবেই ঈদকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে সৃষ্টি হয়েছে বহু কবিতা, গান, প্রবন্ধ ও নানা সাহিত্যকর্ম। মধ্যযুগ থেকে আধুনিককাল পর্যন্ত বিভিন্ন কবি ও সাহিত্যিক তাঁদের সৃষ্টির মাধ্যমে ঈদের আনন্দ, ভাবনা ও সামাজিক তাৎপর্যকে তুলে ধরেছেন। বাংলা সাহিত্যে ঈদ বিষয়ক রচনার এই ধারাটি যেমন ঐতিহ্যবাহী, তেমনি তা বাঙালি মুসলমানের সাহিত্যিক চেতনারও এক গুরুত্বপূর্ণ প্রকাশ। খ্রিস্টীয় সপ্তম শতক থেকে দশম শতাব্দীর মধ্যে বাংলাদেশে ইসলামের আগমন ঘটে। মুসলমানরা এদেশের যখন আগমন করেন, তখন এই অঞ্চল বঙ্গ নামে পরিচিত ছিল। মুসলমানগণ ইরান, তুরস্ক, আরব দেশ থেকে এদেশে গমন করেন। তবে যেখান থেকে আসুন না কেন, অথবা এ দেশেই উদ্ভূত হোন না কেন, মধ্যযুগেই মুসলমানরা বাঙালি হয়ে উঠেছিল এবং তাদের মাতৃভাষা হয়ে উঠেছিল বাংলা। বাঙালি হিন্দু-মুসলমান যৌথভাবে পাশাপাশি বাস করছিলেন। সাহিত্য চর্চায়ও লিপ্ত ছিলেন। কিন্তু শাহ মুহম্মদ সগীর থেকে খোন্দকার শামসুদ্দিন মুহম্মদ সিদ্দিকী বা মীর মশাররফ হোসেনের আবির্ভাবের আগে পর্যন্ত মধ্যযুগের মুসলিম রচিত যে-সাহিত্য, তাতে রোমান্স, কল্পকথা, ইসলামী পুরাণ, লোকপুরাণ, ইসলামের ইতিহাস, আরবি-ফারসি-হিন্দি কাব্যগ্রন্থের তর্জমা বা ভাবানুসরণই মুখ্য হয়ে দাঁড়ায়। লোকাচার, জীবনাচার, ধর্মাচার অর্থাৎ বাঙালি-মুসলমানদের প্রাত্যহ-আচরিত জীবন তারও খুব একটা প্রশ্রয় পায়নি। তার জন্য আমাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে আধুনিককাল পর্যন্ত- যখন কেবল আর স্বভাব-কবিতা লেখা হচ্ছে না চিন্তার চর্চাও শুরু হয়েছে। ঈদ মুসলমানদের ধর্মীয় উৎসব। প্রতি বছর দুটি ঈদের আগমন ঘটে বাঙালির ঘরে ঘরে আনন্দের আমেজ নিয়ে।ঈদ ধর্মীয় উৎসব তো বটেই, তবে আজ সাংস্কৃতিক উৎসবেও পরিণত হয়েছে। বাংলা সাহিত্যের অসংখ্য কবি, সাহিত্যক ঈদ ঘিরে রচনা করেন অসংখ্য গান, কবিতা, প্রবন্ধ...। তার মধ্যে অন্যতম বাংলার আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম। তিনি ঈদ নিয়ে রচনা করেছেন কবিতা,গান ও গজল, নাটক। নজরুলের পূর্ববর্তী ও পরবর্তী আরও অনেক কবি, সাহিত্যিক ঈদের কবিতা, গান, প্রবন্ধ রচনা করেছেন। তবে নজরুলই তাদের মধ্যে অন্যতম। ঈদকে ঘিরে প্রতিবছরই রচিত হচ্ছে গান, কবিতা, উপন্যাস, নাটক,গল্প ইত্যাদি। সৈয়দ এমদাদ আলীর (১৮৮০-১৯৫৬) কবিতাগ্রন্থ ডালির দ্বিতীয় সংস্করণে (১৯৬৬) ‘ঈদ’ নামে দুটি কবিতা আছে: প্রথমটির প্রথম ছত্র ‘কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে’ এবং দ্বিতীয়টির প্রথম ছত্র ‘বিশ্ব জুড়ে মুসলিমের গৃহে গৃহে আজি’। ‘কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে’ পঙক্তি সংবলিত ‘ঈদ’ কবিতাটির নিচে কবির টীকা আমাদের জন্য খুব মূল্যবান: ১৯০৩ সালের ডিসেম্বর মাসে প্রথম বর্ষ নবনূরের ঈদ সংখ্যায় প্রকাশিত। ইহাই মুসলিম বাংলার প্রথম ঈদ কবিতা।’ প্রথম এই ঈদের কবিতার প্রথম দুটি স্তবক উদ্ধৃত করছি: কুহেলি তিমির সরায়ে দূরে/তরুণ অরুণ উঠিছে ধীরে/রাঙিয়া প্রতি তরুর শিরে/ আজ কি হর্ষ ভরে। ১৯০৩ সালে প্রথম প্রকাশিত সৈয়দ এমদাদ আলী-সম্পাদিত ‘নবনূর’ পত্রিকাই খুব সম্ভবত প্রথমবার ঈদ-সংখ্যা প্রকাশ করে। ১৯০৩, ১৯০৪, ১৯০৫- পর পর এই তিন বছরই ‘নবনূর’ ঈদ-সংখ্যা প্রকাশ করে, ‘এই অর্থে অন্তত যে প্রত্যেক বছরই এই পত্রিকায় ঈদ সংক্রান্ত লেখা প্রকাশিত হয়েছে। ‘নবনূর’ পত্রিকার প্রধান সাহিত্যিক আবিষ্কার ও ফসল সৈয়দ এমদাদ আলী নিজে এবং কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১) ও মিসেস আর, এস হোসেন অর্থাৎ বেগম রোকেয়া (১৮৮০-১৯৩২)। এই তিনজন লেখকই ‘নবনূরে’ ঈদ-সংক্রান্ত কবিতা বা গদ্য লিখেছেন। ‘নবনূর’- এর পৌষ ১৩১১ সংখ্যায় কায়কোবাদ লেখেন ‘ঈদ’ শীর্ষক কবিতা। বিখ্যাত ঐতিহাসিক রামপ্রাণ গুপ্ত (১৮৬৯-১৯২৭) ‘নবনূর’-এর ফাল্গুন ১৩১১ সংখ্যায় লিখেছিলেন ‘ঈদজ্জোহা’ নামক প্রবন্ধ। ‘নবনূর’ এর পৌষ ১৩১২ সংখ্যায় একই সঙ্গে ঈদ-সম্পর্কিত তিনটি লেখা প্রকাশিত হয়। সৈয়দ এমদাদ আলীর ‘ঈদ’ কবিতা, জীবেন্দু কুমার দত্তের ‘ঈদ সম্মিলন’ কবিতা এবং মিসেস আর এস হোসেন অর্থাৎ বেগম রোকেয়ার ‘ঈদ সম্মিলন’ গদ্যপ্রবন্ধ। ‘ঈদ আবাহন’ এই একই নামে কায়কোবাদ দুটি কবিতা লিখেছিলেন: একটি তাঁর অশ্রুমালা (১৩১১) গ্রন্থর্ভূত, অন্যটি তাঁর অমিয়ধারা (১৩২৯) গ্রন্থর্ভূত। মোজাম্মেল হক (শান্তিপুর, ১৮৬০-১৯৩৩) ‘ঈদ’ শেখ ফজলল করিম (১৮৮২-১৯৩৬) ‘ঈদ’ নজরুলের অব্যবহিত দুই পূর্বসূরি শাহাদাৎ হোসেন (১৮৯৩-১৯৫৩) ও গোলাম মোস্তফা (১৮৯৭-১৯৬৪) ও ঈদ বিষয়ক কবিতা লিখেছেন। নজরুল ইসলাম অবিসংবাদীভাবে বাংলা সাহিত্যে আরবি-ফারসি শব্দ তথা ‘মুসলমানী ঢং’-এর প্রতিষ্ঠা করেন। এ বিষয়ে তাঁর নানামুখী উদ্যমের মধ্যে ইসলামী আচার-অনুষ্ঠান-ব্যবহারিক দিকগুলোও রয়েছে। ঈদ তার মধ্যে একটি। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা এই দুই ঈদ নিয়েই নজরুল কবিতা গান-নাটক-গীতিবিচিত্রা লিখেছেন। এখানে তার একটি তালিকা দেওয়া যেতে পারে। কৃষকের ঈদ। সাপ্তাহিক ‘কৃষক’, ঈদ-সংখ্যা ১৯৪১। ঈদ মোবারক। রচনা: কলিকাতা, ১৯ চৈত্র ১৩৩৩। জিঞ্জির। জাকাত লইতে এসেছে ডাকাত চাঁদ, ঈদের চাঁদ, সর্বহারা, বকরীদ। কোরবানি ‘মোসলেম ভারত’, ভাদ্র ১৩২৭। অগ্নি-বীণা। শহীদী ঈদ। সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’। খুশির ঈদ (ওমন রমজানের ঐ রোজার শেষে এলো খুশির ঈদসহ আরও বেশকয়েকটি কবিতা লিখেছেন নজরুল। মীর মশাররফ হোসেন (১৮৪৭-১৯১১), কায়কোবাদ (১৮৫৭-১৯৫১) ও মোজাম্মেল হক (শান্তিপুর, ১৮৬০-১৯৩৩) উনিশ শতাব্দীর এই শ্রেষ্ঠ তিন সৃষ্টিশীল মুসলিম প্রতিভাবান লেখকের উত্তরাধিকার বহন করেছেন নজরুল এবং একা তিনি এগিয়ে নিয়ে গেছেন অনেকখানি। ইসলামী ঐতিহ্যের ব্যবহারে তার একটি পরিষ্কার সাক্ষ্য পাওয়া যায়। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আজহা- মুসলমানদের এই প্রধান দুটি ধর্মীয় উৎসব নিয়েই কবিতা লিখেছেন নজরুল। এবং যথারীতি ঈদ নিয়ে এতোকাল যে কবিতা গান লেখা হয়েছে, নজরুল তাকে অনায়াসে অতিক্রম করেছেন, ঈদ-সম্পৃক্ত তাঁর কবিতা- গান-নাটকে তাঁরই করাঙ্গুলির ছাপ স্পষ্ট মুদ্রিত। শুধু তাই নয়, বাঙালি-মুসলমানকে তা নতুনভাবে উজ্জীবিত-উদ্বোধিত করেছে এবং আজো করে। নজরুল ইসলামের পরবর্তীকালে ঈদের কবিতাণ্ডগান লিখেছেন সিকানদার আবু জাফর, ফররুখ আহমদ, আবুল হোসেন, তালিম হোসেন, আহসান হাবীব, সানাউল হক, আজিজুর রহমান, আশরাফ সিদ্দিকী, মনোমোহন বর্মণ প্রমুখ অনেক কবি। ফররুখ আহমদ তাঁর ‘ঈদের স্বপ্ন’ (কাফেলা) সনেটে ঈদের চাঁদ দেখে তাঁর স্বপ্নজগতেই প্রস্থান করেন। শামসুর রাহমান তাঁর একটি কবিতায় শৈশবের ঈদের আনন্দের বর্ণনা দিয়েছেন। শহীদ কাদরীর কবিতায় ‘সুনীল ঈদগা’ দেখা দেয় প্রতীকের মতো। এমনিভাবে ঈদের আনন্দ-বেদনা মূর্ত হয়েছে সৈয়দ এমদাদ আলী থেকে শহীদ কাদরী বা তাঁর পরবর্তীদের রচনায়। সার্বিকভাবে দেখা যায়, ঈদকে কেন্দ্র করে বাংলা সাহিত্যে এক সমৃদ্ধ ধারা গড়ে উঠেছে। প্রাচীন ও আধুনিক বহু কবি-সাহিত্যিক তাঁদের রচনায় ঈদের আনন্দ, সাম্য, ভ্রাতৃত্ব ও মানবিকতার বাণী তুলে ধরেছেন। এই ধারায় বিশেষ অবদান রয়েছে কাজী নজরুল ইসলামের, যিনি ঈদের ভাবনা ও ইসলামী ঐতিহ্যকে বাংলা সাহিত্যে নতুন প্রাণ দিয়েছেন। তাঁর পরবর্তী কবি-সাহিত্যিকরাও ঈদের আনন্দ-বেদনা ও সামাজিক তাৎপর্যকে তাঁদের সৃষ্টিতে প্রকাশ করেছেন। ফলে ঈদ শুধু একটি ধর্মীয় উৎসব হিসেবেই নয়, বরং বাংলা সাহিত্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক অনুষঙ্গ হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ভবিষ্যতেও বাংলা সাহিত্যে ঈদকে কেন্দ্র করে নতুন নতুন সৃষ্টিকর্ম রচিত হবে- এই প্রত্যাশাই করা যায়।

প্রিয় স্বাধীনতা

প্রিয় স্বাধীনতা

মার্চ এলেই আমাদের ছোট্ট গ্রামটা যেন একটু বদলে যায়। বাতাসে কেমন এক গম্ভীর সুর বাজে। স্কুলের উঠানে লাল-সবুজ পতাকা উড়তে থাকে, আর আমরা সারি বেঁধে দাঁড়িয়ে গাই- ‘আমার সোনার বাংলা’। পঞ্চম শ্রেণির ছাত্র উল্লাস এবার প্রথমবারের মতো বুঝতে চাইল- মার্চ কেন এত বিশেষ? এক বিকেলে সে দাদির পাশে বসে জিজ্ঞেস করল, ‘দাদি, সবাই বলে অগ্নিঝরা মার্চ। আগুন ঝরেছিল নাকি আকাশ থেকে?’ দাদি মৃদু হেসে বললেন, ‘না রে, আগুন ঝরেছিল মানুষের বুক থেকে।’ উল্লাস বিস্মিত চোখে তাকিয়ে রইল। দাদি বলতে শুরু করলেন, ‘১৯৭১ সালের মার্চ মাসে আমাদের দেশ তখনো স্বাধীন হয়নি। মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখত। আর তখনই পাকিস্তানি শাসকদের জুলুম-শোষণের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াবার ডাক আসে। সেই ডাকে সারা বাংলার মানুষ তখন জেগে ওঠে। শুরু হয় রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ। কিন্তু ২৫শে মার্চের কালরাত্রিতে নেমে এলো ভয়ংকর আঘাত। নিরস্ত্র মানুষের ওপর শুরু হলো নির্মম হামলা। সেই রাতের পর থেকেই দেশজুড়ে শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। গ্রাম থেকে শহর- সবখানে মানুষ প্রতিরোধ গড়ে তোলে। কেউ অস্ত্র হাতে, কেউ আশ্রয় দিয়ে, কেউ খবর পৌঁছে দিয়ে মুক্তিযোদ্ধাদের পাশে দাঁড়ায়। দাদি একটু থেমে বললেন, ‘সেই যুদ্ধে প্রায় ৩০ লক্ষ মানুষ শহিদ হয়েছিলেন। আর প্রায় ২ লাখ মা-বোন অসম্মান আর নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। তাদের ত্যাগেই আমরা পেয়েছি স্বাধীন দেশ। তোদের পাশের গ্রাম বাউশগাড়ি ডেমরাতে শহিদ হয়েছিল প্রায় আটশো নিরস্ত্র মানুষ!’ উল্লাসের চোখ ভিজে উঠল। সে বুঝতে পারল, স্বাধীনতা শুধু আনন্দের গল্প নয়, এটা অনেক কষ্ট আর ত্যাগের ইতিহাস। দাদি বলল, ‘আমিও তখন তরুণী ছিলাম, ভয় ছিল, কিন্তু দেশের জন্য ভালোবাসা ছিল আরও বড়ো।’ পরদিন স্কুলে শিক্ষক বললেন, ‘মার্চ মানে সাহসের মাস। স্বাধীনতার মাস। রক্তে লেখা স্বপ্নের মাস।’ উল্লাস বাসায় ফিরে নিজের খাতায় লিখল, ‘অগ্নিঝরা মার্চ মানে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর নাম সাহস। ত্যাগের স্মৃতি মনে রেখে দেশকে ভালোবাসা।’ ২৬শে মার্চ সকালে পতাকা উত্তোলনের সময় উল্লাস সবার সঙ্গে দাঁড়িয়ে স্যালুট করল। তার মনে দৃঢ় প্রতিজ্ঞা- সে ভালো মানুষ হবে, দেশকে ভালোবাসবে, শহিদদের স্বপ্ন রক্ষা করবে। মার্চের রোদ সবুজ মাঠজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে। হাওয়ায় দুলছে পতাকা। উল্লাস বুঝে গেল- অগ্নিঝরা মার্চ শুধু ইতিহাস নয়, এটা আমাদের স্বাধীনতার মাস; যা প্রতিটি শিশুর মনে জ্বলজ্বল করবে চিরদিন।

নিমা ইউশিজের কবিতা

নিমা ইউশিজের কবিতা

নিমা ইউসিজ (১৮৯৫-১৯৬০), ইরানের কবি যিনি সেদেশে আধুনিকতার জনক। পুরানো ধারা ভেঙে তিনি মুক্ত ছন্দ ও নতুন চিত্রকল্প ও সামাজিক বিষয়ের অবতারণা করেন। তিনি ১৮৯৫ সালে ইউশ নামক গ্রামে প্রকৃতির কোলে জন্মগ্রহণ করেন যা তার কবিতার ওপরে প্রভাব ফেলে। তিনি ১২ বছর বয়সে তেহরানে চলে আসেন এবং সেন্ট লুইস স্কুলে ভর্তি হন। সেখানে তিনি ফরাসি ভাষা শেখেন, যা তার রোমান্টিক শৈলীকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। নিমা প্রথাগত ফারসি কবিতার কঠোর কাঠামোকে ভেঙে কবিতার আঙ্গিক ও বিষয়বস্তু- উভয় ক্ষেত্রেই আমূল পরিবর্তনের পক্ষে মত দেন। তার ‘আফাসানেহ’ (কল্পকথা) কবিতাটিকে আধুনিক ও আবেগঘন এই নতুন শৈলীর ইশতেহার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। শুরুতে ব্যাপক বিরোধিতার সম্মুখীন হলেও তার ‘শে’র-এ নিমায়ি ‘(নিমায়ি কবিতা) আধুনিক ইরানি সাহিত্যের ভিত্তি হয়ে ওঠে। এটি সোহরাব সেপেহরি ও ফোরুগ ফাররোখজাদের মতো বিখ্যাত কবিদের অনুপ্রাণিত করেছে। তিনি ১৯৬০ সালে পরলোক গমন করেন। রূপান্তরিত কবিতাটি চড়বস ঐঁহঃবৎ থেকে নেওয়া হয়েছে।

সাত রঙয়ের নদী রেইনবো রিভার

সাত রঙয়ের নদী রেইনবো রিভার

নদী বলতে কি বুঝি আমরা? বর্ণবিহীন স্বচ্ছপানির বয়ে চলা এক স্রোতস্বিনী ধারা, যা উৎপন্ন হয়েছে সুউচ্চ কোন পাহাড় বা পর্বত থেকে এবং গিয়ে শেষে মিলিত হয়েছে কোন অথই সাগর বা মহাসাগরে। কিন্তু যদি বলি একটি নদীতে একটা দুটো নয় পুরো রংধনুর সাত সাতটি রঙয়ের পানিই একই সাথে প্রবাহিত হয়, তবে এটি কি কারো বিশ্বাস হবে, বলো? হ্যাঁ আজ এমনই এক আশ্চর্য ও নয়নাভিরাম নদীর কথা আমরা জানবো যেটাকে সমগ্র পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর নদী বলে অ্যাখ্যায়িত করা হয়। অনেকে এর নাম দিয়েছেন ‘রংধনু নদী’ কেননা এটাতে দূর আকাশে আঁকা রামধনু বা রংধনুর সাতটি রং ই বিদ্যমান রয়েছে। কেউ কেউ আবার একে তরল রংধনু বলেও অভিহিত করে থাকেন। আর এতক্ষণ যে বিচিত্র ও আশ্চর্য নদীটির কথা আমরা জানলাম সেই চোখধাঁধানো নয়নাভিরাম নদীটির নাম হচ্ছে ‘ক্যানু ক্রিস্টেলস’। চলুন এবার এ অসাধারণ নদীটি সম্পর্কে বিস্তারিত সবকিছু জেনে নেওয়া যাক। অবস্থান  এ নদীটি অবস্থিত উত্তর আমেরিকার একটি দেশ ‘কলোম্বিয়া’তে। কলোম্বিয়া দেশের মেটা নামক প্রদেশের ‘সেরেনিকা’ অঞ্চলের ‘ডি লা ম্যাকারেনা’ নামক একটি জায়গায় হচ্ছে এই অসাধারণ সুন্দর নদীটির অবস্থান। সেই অঞ্চলের স্থানীয় লোকেরা একে ‘স্বর্গ থেকে প্রবাহিত নদী’ বলে অভিহিত করে থাকে। তাছাড়া এই নদীতে মাছ বা অন্য কোন জলজ প্রাণীর বাস নেই সেজন্য যে কোনো পর্যটক এখানে এসে স্বচ্ছন্দে এই নদীতে সাঁতার কেটে এর আনন্দ উপভোগ করতে পারেন। এবং এ নদীটি যে জায়গায় অবস্থিত সেটা কিন্তু  খুবই দুর্গম স্থান। সেখানে যাওয়ার কোনো যানবাহন নেই। অনেক লম্বা পথ শুধু হেঁটেই পাড়ি দিতে হয়। কিন্তু তবুও প্রতি বছর এখানে অনেক ভ্রমণপিপাসু পর্যটক আসেন স্বর্গীয় এই নদীর সুধা পান করতে। এই তরল রংধনু নামক সাত রঙয়ের রঙিন নদীর সৌন্দর্য উপভোগ করতে।  উৎপত্তিস্থল এই ‘ক্যানু ক্রিস্টেলস’ নামের (রেইনবো রিভার) টি আসলে কোন প্রধান নদী নয়। এটি হচ্ছে মূলত ‘গায়াবেরো’ নামে এক নদী থেকে উৎপন্ন একটি শাখা নদী। এ নদী যে জায়গায় অবস্থিত প্রত্নতাত্ত্বিকদের হিসাব মতে সে জায়গা প্রায় ১০০ কোটি বছরের চেয়েও বেশি পুরানো স্থান। তাই একে পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীনতম স্থানগুলোর একটি বলে বিবেচনা করা হয়। যে স্থানটি পার হয়ে এই নদীটির দেখা মেলে সে স্থানটিকে বলে ‘গায়ানার বর্ম’। তাছাড়া বাহারি রঙয়ের জন্য অনেকে এই নদীকে রঙের স্বর্গও বলে থাকে। ভিন্ন রঙের কারণ কলোম্বিয়ার এই রঙিন নদীতে প্রায় রংধনুর সাতটি রং-ই মিশে রয়েছে। এখানে লাল, নীল, বেগুনি, গোলাপি, হলুদ, কালো ও ধূসর রং এর পানি দেখা যায়। এ নদীর নিম্নভাগে রয়েছে একপ্রকার রঙিন জলজ গুল্ম উদ্ভিদ যার নাম হচ্ছে- ‘ম্যাকারেনিয়া ক্লাভিগেরা’। আর এই গাছ লাল, নীল,কমলা, হলুদ, সবুজ ইত্যাদি অনেকগুলো রঙয়ের হয়ে থাকে। আর সেজন্য নিচের গুল্মগুলো বিভিন্ন রঙের হওয়ার কারণে ও সূর্যের আলোর ওপর ভিত্তি করে উপরের স্বচ্ছ পানিও নিজ রং পরিবর্তন করে সেই রং ধারণ করে। কোন কোন স্থানে পানির  নিচে কোন জলজ উদ্ভিদ থাকে না। সেখানে পড়ে থাকে শুধু বালি। এই বালিতে সূর্যের আলো পড়ে সেটা হয়ে যায় গাঢ় হলুদ। সে হলুদ বালি থাকার জন্য উপরের স্বচ্ছ পানিও হলুদ বর্ণ ধারণ করে। নদীর স্থানে স্থানে আবার কয়েক মিলিয়ন বছরের পুরানো বড় বড় খনিজ পাথর থাকায় এর সৌন্দর্যে যোগ হয়েছে নতুন মাত্রা। কখনোবা কয়েক মিলিয়ন বছরের পুরানো এই পাথরগুলো নিজের রং পাল্টে ধূসর বর্ণ ধারণ করে আর যার ফলে তার উপরের স্বচ্ছ পানিও দেখতে ধূসর দেখায়। তাই আসলে এই পানির নিজস্ব কোন রং নেই। এটাও অন্যান্য নদীর মতোই স্বচ্ছ পানির নদী। কিন্তু প্রকৃতির এই খেয়ালে জলের নিচের বিভিন্ন রঙের জলজ উদ্ভিদ, পানির নিচের স্বচ্ছ হলুদ বালি ও সূর্যের আলোর সাথে বিক্রিয়া করে এই পানি রংধনুর সাত রঙে রঙিন হয়ে আমাদের চোখে ধরা দেয়। সেই থেকে এই নদীর নামটাই হয়ে গেছে ‘রংধনু নদী’। আসলে এই সবই হলো রহস্যময় প্রকৃতির খেলা ও মহান আল্লাহর পাকের কুদরতের নমুনা। 

বিদায় শংকর

বিদায় শংকর

‘কত অজানারে’ কথাটির মধ্যে লুকিয়ে আছে অজানার এক অসীম পরিধি। তা যদি হয় আইন আদালত সম্পর্কে। বিশেষ করে কোলকাতা হাইকোর্ট সম্পর্কে তাহলে তো কোন কথাই নাই। যে অজানার নেই কোন সীমা পরিসীমা। এই অধরা উপাখ্যানের হৃদয়গ্রাহী এক সাহিত্য রূপ দিয়েছিলেন সদ্য প্রয়াত কথা সাহিত্যের উজ্জ্বল নক্ষত্র শংকর তাঁর কত অজানা রে বইতে। ১৯৫৪ সালে দেশ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় কত অজানারে। ১৯৫৫ সালে বই আকারে প্রকাশিত হয়। যখন চলে গেছে ইংরেজ। বিদায় নিয়েছে উপনিবেশবাদী ব্রিটিশ। অবসান হয়েছে কোম্পানির শাসন। গত হয়েছে ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল। থেমে গেছে টাইপ রাইটারের খট খট শব্দ। বদলে গেছে দিন। পাল্টে গেছে সমাজ। তবে রয়ে গেছে ইংরেজদের তৈরি আইন : পেনালকোড, ক্রিমিনাল প্রসিডিওর, সিভিল প্রসিডিওর, এভিডেন্স অ্যাক্টসহ অসংখ্য আইন। আরো রয়ে গেছে তাঁদের তৈরি কোলকাতা, বোম্বে, এলাহাবাদ, মাদ্রাজ হাইকোর্ট। এই হাইকোর্টের লাল দালানের ইটের সাথে, এজলাসের টেবিলে, চেম্বারের কক্ষে, টাইপ রাইটারের খট খট শব্দের সাথে কিংবা আদালতের করিডোরে মিশে ছিল কত বিচারক, কত ব্যারিস্টার, কত আইনজীবী, আইনজীবী সহকারী, স্টেনোগ্রাফার, বাদী- বিবাদী, ফরিয়াদি আসামির দুঃখ-কষ্ট, হাসি কান্না, জয় পরাজয়ের কাহিনি। তার অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে কালের গহ্বরে। তবুও কিছু রয়ে গেছে স্মৃতির পাতায়। যার কিছু পৌরাণিক অক্ষরে রয়ে গেছে সাহিত্যের উদ্যানে। যেখানে পুষ্পিত হয়েছে স্মৃতির গোলাপ রূপে। গন্ধ ছড়াচ্ছে সুগন্ধি আগর হয়ে। কোলকাতা হাইকোর্টের স্মৃতির উদ্যানে তেমনি ‘কত অজানারে’ নামে একটি সুগন্ধি গোলাপ বৃক্ষ রোপণ করে গেছেন কোলকাতা হাই কোর্টের শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল সাহেবের স্টেনোগ্রাফার কালজয়ী কথা সাহিত্যিক শংকর। বাস্তব ঘটনার সাহিত্যমাখা স্মৃতি কথা। ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বার ওয়েল সাহেবের পেশার প্রতি আন্তরিকতা, কাজের দক্ষতা, ক্লায়েন্টের প্রতি মমতা, পেশাগত লেখাপড়াসহ এক মানবিক ব্যারিস্টারের কালো গাউনের নীচে কোমল পাঁপড়ির সমন্বয়ে প্রস্ফুটিত গোলাপটাই হলো কতো অজানারে। এখনো বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন অনুষদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষকেরা পেলাল কোড, এভিডেন্স অ্যাক্ট পড়াতে গেলে শংকরের কত অজানারে বইয়ের রেফারেন্স দেন। ছাত্র ছাত্রীদের বইটা পড়তে বলেন। আইনের ছাত্র হিসেবে আমিও বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় গাজী আব্দুল বারী স্যারের নির্দেশনায় খুব মন দিয়ে পড়েছি ‘কত অজানারে’। এখন প্র্যাকটিসে সহযোগিতা নেই কত অজানারে বইয়ের। ভেসে ওঠে ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল সাহেবর মুখ। কানে আসে শংকরের টাইপ রাইটারের কর্কশ অথচ ছান্দসিক খট খট শব্দ। শুনানি, সাক্ষী, জেরা, আর্গুমেন্ট, রায়, রিভিউ, আপিল, রিভিশনের প্রতিচ্ছবি। কারাগারের কষ্ট। যাবজ্জীবন সাজা। ফাঁসির আসামির কান্না, জল্লাদের দৃঢ়তাসহ কত অজানা উপাখ্যান। বিশেষ করে এক হত্যা মামলার শুনানির তথ্য সংগ্রহের জন্য ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল ঘটনাস্থল বাকের গঞ্জে গিয়েছিলেন স্টিমারযোগে এবং সেখান থেকে পাল্কিতে হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হওয়ার স্থানে। এবং এক খৃষ্টান পরিবারকে নিশ্চিত ফাঁসির হাত থেকে রক্ষা করেছিলেন। যা আইনের ছাত্র ছাত্রীদের বইটি পড়তে বেশি আগ্রহী করে তোলে। একাডেমিক নাম মণি শংকর মুখোপাধ্যায়।লেখক নাম শংকর। জন্ম ৭ ডিসেম্বর ১৯৩৩ সালে যশোর জেলার বনগাঁয়। বাবা হরিনাথ মুখোপাধ্যায় ছিলেন আইনজীবী। বনগাঁ থেকে কোলকাতা, পরে হাওড়ায় থিতু হন। বাবার মৃত্যুতে শংকর ভিষণ রকম ধাক্কা খান। শুরু করেন ফেরিওয়ালার কাজ। কখনো টাইপ রাইটার ক্লিনার। জুট ব্রোকারের কেরানি। সাথে সাথে চলতে থাকে লেখাপড়া। ডিস্টিংশনসহ বি,এ পাশ করে, শুরু করেন শিক্ষকতা। শিক্ষকতা নিয়ে কত অজানারে বইতে তিনি লিখেছেন : এর আগে তো রাস্তায় ছোট খাটো জিনিস ফেরি করেছি। কিন্তু ‘বাণিজ্যে বসতে লক্ষ্মী’ মন্ত্র মনে প্রাণে জপ করেও জীবন ধারণ যখন প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠেছিল তখন বাণিজ্য দেবীর ভাগিনী দেবী সরস্বতী অপ্রত্যাশিত ভাবে কৃপা বর্ষণ করলেন। অবশ্য আমার পক্ষে খুরেট রোডের বিবেকানন্দ স্কুলে মাস্টারী লাভ করা কোন দিনই সম্ভব হতো না, যদি না ঐ স্কুলের শ্রদ্ধেয় প্রধান শিক্ষক আমার ‘বাজেট সংকট’ সম্বন্ধে কিছুটা ওয়াকিবহাল হতেন। মাস্টার মানে অংক ইংরেজি। মাস্টার সমাজে অংক ইংরেজির শিক্ষকরা কুলিন। বাকী সবাই ইতরজনা সর্ব শাস্ত্রবিদ। আমি শেষোক্ত দলে। সুতরাং ভূগোল, ইতিহাস, বিজ্ঞান, স্বাস্থ্য, বাংলা, সংস্কৃতি কোনটা পড়াতে বাকি রাখিনি। সেখান থেকে সোজা চলে এসেছি রাম কৃষ্ণপুর ঘাট এবং হোরমিলার কোম্পানির ‘অম্বা’ ষ্টীমারে নদী পেরিয়ে হাইকোর্টে। ‘লেখক হিসেবে শংকর কালজয়ী। তাঁর চৌরঙ্গী, সীমাবদ্ধতা, জনঅরণ্য পেয়েছে পাঠক প্রিয়তা। যা নিয়ে নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্র। তাঁর অনেক বইয়ের শতাধিক সংস্করণ বের হয়েছে। তাঁর বই রুশ ভাষায় অনুবাদ হয়েছে। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য গ্রন্থ হলো : স্থানীয় সময়, সুবর্ণ সময়, চরণ ছুঁয়ে যাই (প্রথম ও দ্বিতীয় খণ্ড), বাংলার মেয়ে, ঘারের মধ্যে ঘর, এপার বাংলা ওপার বাংলা, এক দুই তিন ইত্যাদি। ২০১৬ সালে তিনি উত্তর বঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিলিট সম্মানে ভূষিত হন। ২০২০ সালে একা একা একাশি বইয়ের জন্য সাহিত্য আকাদেমি পুরস্কারে ভূষিত হন। শংকরের প্রথম বই কত অজানারে উৎসর্গ করেছিলেন শেষ ইংরেজ ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েলকে। এই ব্যারিস্টারের উৎসে শংকর লেখক হয়ে ওঠেন। শংকরের লেখক জীবনে কোলকাতা হাইকোর্ট এক অন্য রকম প্ররণা দিয়েছিল। তাই বুঝি কোলকাতা হাই কোর্ট সম্পর্কে শংকর লিখেছেন : ‘হাইকোর্টের চুড়োটার দিকে তাকালাম। বর্শার ফলকের মতো তীক্ষè যেন মেঘের আবরণ ভেদ করে আকাশের সঙ্গে মিলিয়ে যেতে চাচ্ছে। আমার অবস্থা দেখে বিভূতিদা হেসে বলেছিলেন : বাঙ্গালকে হাইকোর্ট দেখানো একেই বলে ; রোজ এখানে আসতে হবে, চুড়ো কেন ওই বাড়িটার ভিতরের অনেক কিছুই ক্রমশঃ দেখতে ও জানতে পারবে। এখন চেম্বারে চলো।’ শংকর নামের যে মানুষটা সংগ্রাম করেছেন দারিদ্র্যের সাথে। করেছেন পণ্য ফেরি। হয়েছেন ব্রোকার হাউসের কেরানি। স্কুলের শিক্ষক। ডিগ্রি পরীক্ষায় পেয়েছেন ডিস্টিংকশন নম্বর । হয়েছেন বড় লেখক। এই লেখকের মূলভিত্তি ছিলো কোলকাতা হাইকোর্ট। উৎসাহদাতা ছিলেন ব্যারিস্টার নোয়েল ফ্রেডরিক বারওয়েল। তাঁর প্রথম বই ছিল ‘কত অজানারে’। সেই মানুষটি গত ২০ ফেব্রুয়ারিতে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন আপন ঠিকানায়। রেখে গেছেন তাঁর কালজয়ী লেখা। শ্রদ্ধা হে! শংকর। বিদায়! শংকর। অমর! অজানারে! 

ভোক্তাভিত্তিক কমিউনিটি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে

ভোক্তাভিত্তিক কমিউনিটি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখবে

এবারের বইমেলা উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে স্বনামধন্য লেখক এমদাদ হোসেন মালেকের ভোক্তা অধিকার বিষয়ক ‘ক্রেতা-ভোক্তার অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ’ শীর্ষক বই। বইটি মোট ৩৩টি প্রবন্ধ-নিবন্ধ নিয়ে ২টি অধ্যায়ে গ্রন্থিত। ৩৩টি লেখা ভিন্ন ভিন্ন বিষয় নিয়ে বিভিন্ন সময়ে লেখা। কিছু লেখা যেমন একেবারে হালনাগাদ তেমনি কিছু লেখা গত সময়ের প্রাসঙ্গিক আকারে লেখা; কিন্তু এখনো এগুলো সমধিক গুরুত্ব বহন করে। আবার পুরাতন এসব লেখা বর্তমান লেখাগুলোর প্রেক্ষাপট-চিত্রও বটে।  বইটির ৪৭ নম্বর পৃষ্ঠা হতে ১০২ নম্বর পৃষ্ঠায় লিপিবদ্ধ আছে আমাদের দৈনন্দিন তালিকাভুক্ত খাদ্যে ব্যবহারযোগ্য কীটনাশকের সর্বোচ্চ সহনীয় মাত্রা। এটি ভোক্তা ও পাঠকের জন্য প্রতিদিনের অনুসরণযোগ্য। আবার পৃষ্ঠা নম্বর ১০৩ হতে ১০৬ পর্যন্ত লিপিবদ্ধ আছে বাংলাদেশের ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন ২০০৯-এর কোন ধারা ভোক্তা অধিকার হরণে কি অপরাধ এবং তার বিপরীতে দণ্ডের বিধান। আবার-১৮৩-১৮৫ পৃষ্ঠাসমূহে রয়েছে ২১ বছরের দ্রব্য মূল্যের বৃদ্ধির কারণে সাধারণ মানুষের জীবন যাত্রা মানের ক্রম হ্রাসের পরিসংখ্যান ভিত্তিক তথ্য চিত্র। এ রকম আরও কিছু মূল্যবান তুলনামূলক চিত্র লিপিবদ্ধ আছে।  লেখক এমদাদ হোসেন মালেক অনুসন্ধিৎসু মন নিয়ে সমাজের সর্বস্তরের মানুষের উপকারের লক্ষ্যে ‘ক্রেতা-ভোক্তার অধিকার ও স্বার্থ সংরক্ষণ’ বইটি রচনা করেছেন। বইটি যে কোনো দিক দিয়েই প্রশংসার দাবি রাখে। মূল্যবান এ বইটি ‘সম্প্রীতি বইঘর’ সম্প্রীতি ভবন, আফতাবনগর, ঢাকা থেকে মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়েছে। বইটি এখন অমর একুশে বইমেলা ২০২৬, সমবায় অধিদপ্তরের ৪৫৫-৪৫৬ স্টলে সহজে প্রাপ্তিযোগ্য। বইটিতে ক্রেতা-ভোক্তার অধিকার আন্দোলনের গোড়ার কথা লেখক তুলে ধরেছেন। নতুন পুরাতন সঙ্গতিপূর্ণ লেখা-তথ্য-রেকর্ড সমৃদ্ধ বইটি অসাধারণ হিসেবে বাস্তর রূপ নিয়েছে; যা লেখককে আরও অনেক দূর বয়ে নিয়ে যাবে। ক্রেতা, ভোক্তা ও পাঠক সাধারণ নিজের জন্য, সমাজের তাগিদে এবং সর্বোপরি ভোক্তাবাদ ভিত্তিক কমিউনিটি গঠনে সক্রিয় ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।  বইটিতে লেখক তার বাম ঘারানার রাজনৈতিক ব্যাকগ্রাউন্ডভিত্তিক অভিজ্ঞতা থেকে সুস্পষ্টভাবেই বুঝিয়ে দিয়েছেন যে, বাজারে উৎপাদক-ব্যবসায়ীদের দ্বারা ভোক্তা ঠকানোর কৌশলটি মূলতই পুঁজিবাদীদের বিশ^ বাজার গ্রাসের কালো হাতেরই একটি ছোঁবল মাত্র। তারা সহজেই এই কালো ছোঁবল উঠিয়ে নিবে না। গণসংগঠক এবং ভোক্তা অধিকার ও সমবায় কর্মী, একজন সুলেখক হিসেবে সমাদ্রিত এমদাদ হোসেন মালেক সহজপাঠ্য ও বোধগম্য করে বইটি লিখেছেন। তিনি কনজুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) সঙ্গে ২৬ বছরের কর্মময় জীবন অতিবাহিত করেছেন এবং ১৯৮৯ সাল থেকে সাধারণ মানুষের সমবায় সংগঠন ‘সম্প্রীতি কো-অপরেটিভ ক্রেডিট ইউনিয়ন লি:’-এর প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে সমবায় আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান এবং প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ ও গবেষক অধ্যাপক এম এম আকাশ বইটির ভূমিকা লিখেছেন। তাঁর লেখা ভূমিকাটি এ বইয়ের সমসাময়িক প্রাসঙ্গিতা ও গুরুত্বকে অনেকখানি বৃদ্ধি করেছে। বইটির কভারের শেষ পৃষ্ঠায় উৎকীর্ণ আছে জাতিসংঘ স্বীকৃত ক্রেতা-ভোক্তাদের ৮টি অধিকার এবং ৫টি দায়িত্ব। এগুলো ঘরে, বাইরে, বাজারে, অফিস ও আদালতের উপযুক্ত স্থানে প্রদর্শিত আকারে সংরক্ষণ করার গুরুত্বকে নির্দেশ করে।

বাংলা কবিতার গদ্য রীতি

বাংলা কবিতার গদ্য রীতি

বর্তমান সময়ে কবিতার নাম করে যে ধারা আমরা দেখি, তা নিয়ে অনেকেরই ক্ষোভ ও হতাশা রয়েছে। একসময় কবিতা ছিল ভাবের, অনুভূতির, ছন্দ ও রূপকের এক অনবদ্য সমন্বয়। কিন্তু আজকাল অনেক কবিতা যেন সেই নান্দনিকতার বন্ধন ছিঁড়ে এক অগোছালো বক্তব্যের স্তূপে পরিণত হয়েছে। এই কবিতাগুলোতে না আছে ছন্দের শৃঙ্খলা, না আছে উপমার সৌন্দর্য, না আছে ভাবনার গভীরতা। ফলে পাঠকের কাছে সেগুলো হয়ে উঠছে অনাকর্ষণীয় এবং অশালীন। ছন্দ ব্যবহারের ফলে অনেক সময় কবিতায় ভাব প্রকাশের পথে একটি সীমাবদ্ধতা তৈরি করতে পারে। এই সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করার তাগিদ থেকেই গদ্য কবিতার জন্ম।  গদ্য কবিতার প্রধান বৈশিষ্ট্য হলো এটি গদ্যে লেখা হলেও এতে কবিতার ছন্দ, চিত্রকল্প ও অন্যান্য অলঙ্কার ব্যবহৃত হয়, যা একে স্বতন্ত্র রূপ দিয়েছে।  কবিরা স্বাধীনভাবে মনের ভাব প্রকাশ করার সুযোগ পান।  তাই বলে এপাশ ওপাশ কিছু শব্দ ব্যবহার করে এক পাতা লিখে ফেললেই কি গদ্য কবিতা হয় আসলেই কি তাই? এতই সহজসাধ্য বিষয় গদ্য কবিতা? বাংলা কবিতা সেই যে চর্যাপদ থেকে যার যাত্রা শুরু তা এখন ঠেকেছে অতি আধুনিকতায়। আর এ আধুনিক কবিতার মূল বিবর্তন এসে স্থিতি লাভ করেছে গদ্যছন্দে। তাই বাংলা কবিতায় গদ্য কবিতা আধুনিক সংস্করণ। অনেকেই এদিক থেকে ভেবে বসেন, গদ্য কবিতায় কোনো ছন্দই নেই। এটি অবশ্যই ভুল ভাবনা; ছন্দ ব্যতীত কবিতা হতে পারে না। গদ্য কবিতার প্রতি পঙক্তি বা লাইনের অন্তরালে এক ধরনের ছন্দ নিহিত রয়েছে। কবি লেখার সময় কিংবা কবিতার ঋদ্ধ পাঠক কবিতা পাঠের সময় এ অন্তর্নিহিত ছন্দ অনুভব করেন। বর্তমান অনেকেই স্বাধীন ভাব প্রকাশের নামে এমন এক অবস্থায় পৌঁছেছে যেখানে ভাষার স্বাধীনতা ভাবের সূক্ষ্মতা কিংবা কবিতাকে শিল্প শিল্প হিসেবে আখ্যা দেওয়া যায় না। অনেক কবি মনে করেন সবকিছু খুলে বলা যেমন সরাসরি যৌনালাপ বর্ণনা করা মানে সাহসী কবিতা যেখানে নেই কোন নান্দনিক উপমা। কিন্তু আসলে প্রশ্ন হল শিল্পের মূল সত্তা হলো পরোক্ষতায়, সংযমে, ভাবনাকে জাগিয়ে তোলার ক্ষমতা।  রবীন্দ্রনাথ কাজী নজরুল ইসলাম জীবনানন্দ দাশ সবাই তাদের কবিতায় গভীর চিন্তা রূপক প্রতীক আবেগের মেলবন্ধন ঘটিয়েছেন। তাদের কবিতা পড়লে পাঠকের মনে প্রশ্ন আসে, ভাবনা জন্মায়। কিন্তু আজকের কবিতা যেন শুধু লেখক এর আত্মদর্শনের ক্ষেত্র হয়ে দাঁড়িয়েছে কবিতায় থাকে খোলামেলা নারীর দৈহিক বর্ণনা, যৌনতা, কিংবা অযৌক্তিক বাক্য বিন্যাস, নেই কোন অন্তর্নিহিত ভাব বা দার্শনিক গভীরতা। এই উলঙ্গ কবিতার ধারা সাহিত্য কে যেন বিভ্রান্ত করছে তেমনি পাঠকের এক ধরনের অনিহা তৈরি করছে।  মনে করুন, আপনি হাঁটছেন। এই যে হাঁটছেন, এর মাঝে এক ধরনের ছন্দ রয়েছে। আপনি ক্লান্ত হয়ে গন্তব্যে পৌঁছানোর পূর্বেই বসে পড়লেন। আপনার হাঁটার ছন্দে পতন ঘটলো। গদ্য কবিতার ধর্ম ঠিক এরূপ। গদ্যের সুরে পাঠক কবিতা পড়ে যাবেন, মুগ্ধ হবেন। এর মাঝে পাঠক ক্লান্ত হবেন না। পাঠক কবিতা পাঠ করতে গিয়ে যদি ক্লান্ত হয়ে পড়েন, তার মাঝে যদি বিতৃষ্ণা আসে, তবে বুঝতে হবে কবিতার ছন্দপতন ঘটেছে। প্রাচীনকালের কবিতার বিষয়বস্তু ছিল মূলত ধর্মীয়, সমাজ সংস্কৃতি ও প্রকৃতি নিয়ে। এতে নির্দিষ্ট ছন্দ, উপমা চিত্রকল্পের মাধ্যমে কবিতা অলংকরণ করা হতো। বাংলা কবিতার আদিযুগের নিদর্শন চর্যাপদের কবিতাগুলো আধ্যাত্মিক উপমা সমন্বিত। আধুনিক কবিতায় ধর্মীয় ও দেবদেবীর বিষয়বস্তুর পরিবর্তে মানবতাবাদ, মানব মনস্তত্ত্ব এবং মানুষের জীবন ও বাস্তবতাকে কবিতার প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে ওঠে।  একটি লেখা তখনই কবিতায় পরিণত হয় যখন তা নির্দিষ্ট কিছু উপাদানের মাধ্যমে আবেগ, কল্পনা ও চিন্তাকে আকর্ষণীয় ও শৈল্পিক রূপে প্রকাশ করে। এর জন্য প্রয়োজন ছন্দ, শব্দচয়ন, এবং একটি নির্দিষ্ট বিন্যাস, যেমন—গদ্যের তুলনায় ভিন্নধর্মী পঙক্তিবিন্যাস, যা পাঠককে শব্দের গভীর অর্থ ও অনুভূতি বোঝাতে সাহায্য করে।   কবিতার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল উপমা কবিতার উপমা বলতে বুঝায় দুটি বস্তুর মধ্যে রূপ, গুণ অবস্থার সাদৃশ্য রেখে উপস্থাপন করা।  উপমা হলো কবিতার শিল্প। আভাসই তার আভরণ। তাই কবিতা যা বলে তার চেয়ে যা বলতে চেয়ে বলেনি বা বলেই না তারই শিল্পগুরুত্ব অতুলনীয়।  উপমা যত বেশি পাকাপোক্ত হবে কবিতার ভাব অর্থ ততো বেশি উহ্য থাকবে প্রত্যেকটা শব্দ প্রত্যেকটা লাইন পাঠককে ভাবাবে শেষে পাঠক একটি মেসেজ অনুভব করবে যেটা পাঠককে তৃপ্তি দিবে।   উপমা কখনো ইঙ্গিতকে অধিকতর ইঙ্গিতবহ করে তোলে। তাতে কবিতার দেহে তৈরি হয় লুকোচুরি খেলা। কবিতা পড়ার সাথে সাথে পাঠকের মনে ইমেজ তৈরি হয়। ইন্দ্রীয় চেতনার দৃষ্টি, শ্রম্নতি, স্পর্শ, ঘ্রাণ, স্বাদ ইত্যাদির পাঠক অনুভব করে। ইমেজ বা চিত্রকল্প কবিতার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও উপাদেয় উপাদান বটে, কিন্তু তা কোনো অর্থেই কবিতার বহিরঙের বিষয় নয়। ইমেজ হচ্ছে কবিতার অন্তর্গত বিষয়ক। উপমা একটি কবিতার গুন ও সৌন্দর্য শতগুণে বাড়িয়ে দেয়। তবে তা যদি সঠিকভাবে প্রয়োগ করা যায়। উপমাই বাঁচিয়ে রাখে কবিতার প্রাণ। উপমাহীন কবিতা অনেকটাই ইটের খোয়া বিছানো অর্ধনির্মিত পথে হাঁটার মতোই। উপমাহীন কবিতাগুলো হয়ে উঠে প্রচারপত্রের মতো শিল্প না হয়ে অপুষ্প উদ্ভিদের মত বেড়ে ওঠে।  বর্তমান আধুনিক কবিতার নামে চলছে শুধু ছলাকলা বেশিরভাগ কবিতার মধ্যে কোন উপমা নাই ছন্দ বিন্যাস নেই কবিতা পড়তে গেলে অনিহা আসে। কবিতার মধ্যে সবকিছু খোলামেলা বর্ণনা করে গেছেন কবিতার মধ্যে ভাববার কোনো বিষয় নেই আমার কাছে এক ধরনের উলঙ্গ কবিতা মনে হয়। তবে সব আধুনিক কবিতাকে একই দোষে দোষারোপ করা যাবে না। কিছু কবি এখনো ভাষার নতুন সম্ভাবনা অনুসন্ধান করেছে। কবিতার মূল সৌন্দর্য নতুন ছন্দের খোঁজ করছেন। কবিতা শুধু নিজের অনুভূতির নগ্ন প্রকাশ নয় বরং পাঠকের মনে নতুন ভাবনা ও আলো জ্বালানোর মাধ্যম কবিতার ছন্দ থাকতেও পারে নাও থাকতে পারে কিন্তু থাকতে হবে রুচি গভীরতা ও সৌন্দর্য নইলে তা কবিতা নয় কেবল শব্দের উলঙ্গ প্রদর্শনী।