ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৩ মে ২০২৪, ৮ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

স্মৃতির মধ্যে সুখ

রাকিবুল রকি

প্রকাশিত: ২২:২৭, ২৬ জানুয়ারি ২০২৩

স্মৃতির মধ্যে সুখ

সুব্রত বড়ুয়া

কৌতুহলবশত কবিতার বইটি হাতে নিয়েই রেখে দিচ্ছিলাম। তবে বইয়ের প্রথম কবিতার প্রথম লাইনে চোখ পড়তেই চমকে উঠলাম। কৌতূহল এবং চমকের কারণ নিয়ে একে একে একটু বলছি।
কৌতূহলের কারণ?
কারণ সুব্রত বড়ুয়া গদ্যশিল্পী হিসেবেই সমধিক পরিচিত। বইয়ের ফ্ল্যাপেও লেখা আছে, ‘কথাসাহিত্যিক, অনুবাদক ও জনপ্রিয় বিজ্ঞানগ্রন্থের লেখক। তবে উদ্ধৃত পদগুচ্ছের সঙ্গে আরও কিছু পদ যুক্ত হয়ে বাক্যটি সমাপ্ত হয়েছে। সেখানে আরেকটি তথ্য পাই- ‘সাহিত্য জীবনের সূচনায় কবিতাই ছিল সুব্রত বড়ুয়ার আরাধ্য।’
কবিতা যৌবনে অনেকেই লেখে, তবে চর্চাটা দীর্ঘস্থায়ী হয় না। অনেকেরই তা কবিতার বই অব্দি পৌঁছোয় না। সুব্রত বড়ুয়া কবিতা লিখেছেন, কবিতার বই আছে- অনেক অজ্ঞাত তথ্যের মতো এটিও ছিল অজ্ঞাত। তাই নিশ্চিত হওয়ার জন্যেই বইটি হাতে নেওয়া যে, বইটি সত্যিই কথাসাহিত্যিক সুব্রত বড়ুয়ার কি না? না কি নিছক নামের মিল?
এবার চমকের কারণটা বলি। প্রথম কবিতার প্রথম লাইনটি ছিল, ‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও।’
যারা এখনো বিষয়টি ধরতে পারেননি, তাদের জ্ঞাতার্থে বলি, ঠিক একই লাইন দিয়ে শুরু হয়েছে একটি গান। যা ভারতীয় বাংলা সিনেমার কল্যাণে খুবই জনপ্রিয় এবং পরিচিত।
কবিতার এবং গানের পরের লাইনগুলো অবশ্য সম্পূর্ণ আলাদা। তবুও এখনকার কোনো তরুণ যদি এই লাইনটি ব্যবহার করে কোনো কবিতা বা গান লেখা শুরু করত তাহলে নিশ্চয় তাকে গান থেকে হাত পেতে নেওয়ার কথাটি সবাই চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিত।

যাই হোক, প্রাথমিক চমক ভেঙে কবিতাটি পাঠ করতে শুরু করি।
‘আমাকে আমার মতো থাকতে দাও
হে চিরগৌরব
আমি খুব দীনবেশে একজন বিফল মানুষ
হয়ে থাকতে চাই
একা একা আমার সময়
যেতে দাও দূর গ্রামবাসিনী নদীর
বিষণœ স্রোতের মতো।’
(বিষণœ স্রোতের মতো)
প্রথম স্তবক পাঠ করার পরই অদ্ভুত এক বিষণœতায় আচ্ছন্ন হই। কর্মব্যস্ত কোলাহল মুখর দুপুরে আমিও একা উঠি কোনো গ্রামীণ নদীর পাড়ে। জানি না, কবি কোন নদীর বিষণœ ¯্রােতের মতো নিজের সময়কে একা একা বইয়ে দিতে চেয়েছেন, তবু স্তবকটুকু পাঠ করার সঙ্গে সঙ্গেই অভিজ্ঞতার সুপ্ত কোনো নদীতে ঢেউ ওঠে। অদৃশ্য এক ছবির সামনে আবিষ্কার করি নিজেকে। সাহিত্যের এই এক আনন্দ। মজা। করুণ রস যে বেদনাও দেয়, সাহিত্য না থাকলে কি জানা যেত? সাহিত্যের অন্যান্য শাখার মধ্যে কবিতা আরও বেশি ইঙ্গিতময়। ছোট্ট একটু ইশারায় অনেক কিছু বুঝিয়ে দেয়। জানিয়ে দেয়। সুব্রত বড়ুয়ার ‘কবিতা সংগ্রহ’ আর হাত ছাড়া করি না। সঙ্গী করে নিয়ে আসি। 
০২.
সুব্রত বড়ুয়া ১৯৪৬ সালের ১ জানুয়ারি চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি থানার ছিলোনীয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। নিজ গ্রামের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষাজীবন শুরু। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের পদার্থ বিজ্ঞানে ¯œাতকোত্তর ডিগ্রি লাভের মাধ্যমে সমাপ্ত হয় প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাজীবনের। 
কলেজ জীবনে লেখালেখি শুরু। কবিতার মোহময় হাতছানিতেই শুরু হয় সেই যাত্রা। পরবর্তী সময়ে গল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, অনুবাদ, জীবনী রচনায় হাত দেন। লিখেছেন বিজ্ঞান বিষয়ক বই। ছোটগল্পের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন ১৯৮৩ সালে। ২০১৮ সালে লাভ করেন একুশে পদক। এছাড়া অনুবাদ, বিজ্ঞান ও উপন্যাস- এর জন্য তিন বার অগ্রণী ব্যাংক শিশুসাহিত্য পুরস্কার লাভ করেন। 
বোঝাই যাচ্ছে, কলেজ-জীবনে কবিতার যে স্রোতধারা গতি লাভ করেছিল, গদ্য এসে সেই স্রোতকে স্তিমিত করে দিয়েছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় কোনো এক লেখায় বলেছিলেন, যার ভাবার্থ হলো গদ্য লেখা নাকি পায়ের তলায় সর্ষে পড়া। একবার শুরু করলে আর থামা যায় না। গদ্যের আহ্বানের প্রচ-তার কারণেই ১৯৮৫ সালে সুব্রত বড়ুয়ার কবিতার বই ‘হলুদ বিকেলের গান’ প্রকাশের পর অন্যকোনো কবিতার বই বেরুতে দেখি না। ২০০৭ সালে এসে প্রকাশিত হয় ‘কবিতা সংগ্রহ’।
‘হলুদ বিকেলের গান’ নামের মধ্যেই শেষ হয়ে আসা দিনের ইঙ্গিত পাই। বিকেল বলতেই দিনের শেষ বোঝায়, কিন্তু যখন ‘বিকেলের’ আগে কবি ‘হলুদ’ বিশেষণ প্রযুক্ত করেন, তখন বোঝা যায়, এই বিকেল নিস্ফলা। মনে পড়ে এলিয়টের ‘ওয়েস্টল্যান্ডে’র কথা। তবে কবির জন্মভূমি এই শ্যামল বাংলায়। বাংলার প্রকৃতি কবির মানসপটে আঁকা। তাই কবি যতই একা হোক না কেন, বাংলা সব সময় কবির সঙ্গে ছায়া হয়ে থাকে। কবি বলেন,
‘যেখানেই যাই যত দূরেই সেখানে এই নদী
পাখির পালক, চরের বালি, গোধূলি নিরবধি
হলুদ ধান, পাখির বাসা, চাষির ছোট ঘর
খেয়ার নৌকো, বাতাবি লেবু, আমের গাছের পর
ভিটির মাটি, চালের নিচে নক্শা-কাটা শিকা
সকলই যেন পেছন থেকে আমাকে ডেকে ফেরে
ওদের সঙ্গে আমার কভু ঘটেনি মনান্তর।’
(যেখানে যাই)

ফলে কবি বিষণœ হলেও পোড়ো জমির হাহাকার নিয়ে তাকে থাকতে হয় না। স্মৃতির সরোবরে ডুব দিয়ে তুলে আনতে পারেন সুখ।
‘যেখানে যাই সেখানে এই বাংলাদেশের মুখ
যেখানে যাই সেখানে এই স্মৃতির মধ্যে সুখ॥’
(যেখানে যাই)

কবির স্মৃতি-সত্তাজুড়ে রয়েছে এই বাংলা। জন্মভূমির ঋণ।
তাই তো কবি বলেন,
‘ঋণ করেছি হাওয়ার কাছে
ঋণ করেছি নদীর কাছে
ঋণ করেছি বোশেখ মাসের 
বুড়ো বটের ছায়ার কাছে।’
(ঋণ)

এই ঋণ অপরিশোধ্য। মা-মাতৃভূমির ঋণ কখনো পরিশোধ হয় না। হওয়া সম্ভব নয়। সুব্রত বড়ুয়া তাই বলেন,
‘ঋণের দায়েই জীবন বাঁধা
সকাল-সন্ধ্যা হাঁটাহাঁটি
ঋণ ছাড়া আর পুঁজি তো নেই
আমার আমি কেবল মাটি।’
(ঋণ)
সুব্রত বড়ুয়ার কবিতার ডালপালা বিকশিত, পরিপুষ্ট হয়েছে এই বাংলার জমিনে। ফলে স্বভাবতই তার কবিতায় উঠে এসেছে মহান মুক্তিযুদ্ধের কথা। সত্যি, কী ভীষণভাবে জেগে উঠেছিল সেদিন বাংলাদেশ, বাংলাদেশের মানুষ। ‘এক দশকের হালখাতা’ কবিতায় আমরা দেখতে পাই সেই চিত্র। কবিতার প্রথম স্তবকে কবি লিখেছেন,
‘বঙ্গোপসাগরের কোল ঘেঁষে দাঁড়ানো,
পাহাড় ও নদীর ভালোবাসায় ডুবে-থাকা
শহরটায় একদিন শুরু হলো প্রতিরোধের উৎসব।
কোনো কিছুই নির্ধারিত ছকে শুরু হয়নি,
তবু হাতে হাতে ফিরতে থাকে বারুদের গন্ধ,
বুকের নিভৃতে জেগে ওঠে সাহজের ঝড়।’
আমরা জানি যে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী অতর্কিত হামলা চালায় ঘুমন্ত বাঙালির ওপর। তারা হয়তো ভেবেছিল ঘুমন্ত অবস্থায় শেষ করে দেবে সমস্ত বাঙ্গালি। তা হয়নি। জেগে ওঠে মানুষ। প্রতিরোধ করে। যে হাতে লেগে ছিল মাটির ঘ্রাণ, সেই হাত হয়ে ওঠে বারুদের গন্ধময়। বাংলার প্রকৃতির মতোই বাঙালি। সহজ, সরল, শান্ত। কিন্তু ঝড়ের সময় হয়ে ওঠে ধ্বংসাত্মক। সেদিন বাংলাদেশের মানুষেরা বিচার করেনি, কী হবে? শুধু স্বপ্ন নিয়ে একসঙ্গে জড়ো হয়েছিল সমস্ত স্বাধীনতাকামী মানুষ। দাঁড়ায় প্রচ- শক্তিশালী, আধুনিক যুদ্ধাস্ত্রে সজ্জিত হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে। হালখাতায় যেভাবে বাঙালি ব্যবসায়ীগণ নতুন করে বেচাকেনা, দেনা-পাওনার হিসেব তুলে রাখে, ঠিক তেমনিভাবে সময়ের হালখাতায় সেদিন জমা হচ্ছিল বাঙালির জীবন-মৃত্যুর হিসেব। তারপর একদিন আসে সেই মাহেন্দ্রক্ষণÑ স্বাধীনতা। আসে ঘরহারা বাঙালির ঘরে ফেরার দিন। কিন্তু স্বাধীনতা কি ফিরিয়ে দিয়েছে আমাদের সব দুঃখের জবাব? না। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তির পাশাপাশি স্বাধীন বাংলার বুকে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে লোভী, চতুর, ঠক, প্রবঞ্চক, স্বার্থবাদী। তাদের কাছে অসহায় হয়ে পড়ে প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা সেইসব সাধারণ মানুষ, যারা জীবনবাজি রেখেছিল একদিন। এখন এই অপশক্তির বিরুদ্ধে কে বা কারা দাঁড়াবে? কেউ কি দাঁড়াবে? কবি তাই প্রশ্ন তুলেছেন
‘লোভের বিষাক্ত নিঃশ^াসে শুকিয়ে যায়
নতুন ফুলের কোমল কলি, কালো হাতের স্পর্শে
শ্যামল বৃক্ষের পাতায় নেচে ওঠে সময়ের পচন।
এবার তাহলে কোথায় শুরু হবে প্রতিরোধ?
কেউ কি নিজের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে এশবার
এ জিজ্ঞাসার জবাব খুঁজতে উন্মুখ হবে না?’
শুধু ‘এক দশকের হালখাতা’ কবিতায় নয়, আরও অনেক কবিতায় কবি এই প্রশ্ন তুলেছেন। সত্যি তো আমরা যে বাংলাদেশ চেয়েছিলাম, তা কি পেয়েছি? এর সহজ, সরল উত্তর পাইনি। এর কারণ হাজারো। তাই সেদিকে না গিয়ে আমরা সুব্রত বড়ুয়ার মৃত্যু বিষয়ক একটি কবিতাংশ পড়তে পড়তে এই গদ্যের সমাপ্তির দিকে এগিয়ে যাব।
‘মহাভিনিষ্ক্রমণ’ কবিতার শেষ স্তবকে তিনি লিখেছেন,
‘কাউকে না কাউকে তো যেতে হয়, নিয়তি-নির্দিষ্ট এই পথ,
ফেরার উপায় নেই, যতই সে সংসারের সুখ, লোভ,
মোহ পিছু ডাকে, তবুও যেতেই হয়, হয়, যাওযা ছাড়া তার
আর কোনো পথ নেই, ভবদুঃখ পারাবার থেকে
উদ্ধারের পথ তাকে খুঁজে নিতে হয়। এবং সে আলো
চিরন্তন দ্যুতি নিয়ে চিরকাল আলোকিত করে সব পথ।’

×