ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১২ জুলাই ২০২৪, ২৮ আষাঢ় ১৪৩১

পোড়া চরে তিনি পোড় খাওয়া সোনা 

তাহমিন হক ববী 

প্রকাশিত: ০১:৫০, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৩

পোড়া চরে তিনি পোড় খাওয়া সোনা 

একানব্বই বছর বয়স বৃদ্ধা সোনাভান

একানব্বই বছর বয়স বৃদ্ধা সোনাভান। জীবন ও জীবিকার তাগিদেই বসত বাঁধেন নদী পাড়ে। কখনো ঘরবাড়ি নদীর গর্ভে চলে যায়, আবার কখনো আবাদি জমি খেয়ে ফেল ক্ষুধার্ত নদী। প্রকৃতির সঙ্গেই যুদ্ধ করে জীবনের শেষ কিনারায় উপনীত হয়েছেন। এক সময় তিনি চরের মাটিতে জন্মেছেন, চরেই বেড়ে উঠেছেন। বিয়েও হয়েছে চরে। ৪ ছেলে ও ৩ মেয়ে তার। স্বামী মোজা মিয়াকে হারিয়েছেন ২৬ বছর আগে। মেয়েরা স্বামীর সংসারে। আর ছেলেদের আলাদা আলাদা সংসার। একেক ছেলের সংসার একেক চরে। এক চর থেকে আরেক চরে ছেলের বাড়িতে যেতে সোনাভানকে বেগ পেতে হয়। তবুও ছুটে যান তিনি। নাতি নাতনি ও পুতিদের মুখ দেখতে।

তবে তিনি আশ্রয় নিয়েছেন বড় ছেলে সিরাজুল ইসলাম (৭১) এর সংসারে। অন্যান্য ছেলেরাও বৃদ্ধা মায়ের খোঁজ খবর রাখেন। নদী, নৌকা আর চর ছাড়া কিছুই দেখেননি। রেল গাড়ি ও বাসের নাম শুনেছেন। চোখে দেখা হয়নি। সারা জীবন শুধু চরেই চলাফেরা করেছেন। সোনাভান বেওয়ার জীবনের সিনেমা তিনি নিজেই। পোড়া চরে তিনি যেন সোনা। মনে তার একটাই  কষ্ট। স্বামীর কবর বিলীন হয়েছে ব্রহ্মপুত্রে। সে কথা মনে হলে চোখের পানি ফেলেন। বাবা-মা ও আত্মীয়দের কবরেরও কোনো চিহ্ন নেই। চরে কবরের চিহ্ন না থাকা তাকে বেশি কষ্ট দেয়।
সোনাভান বলেন, ‘জীবনে ১৭-১৮ বার বসতভিটা পরিবর্তন করেছি। এক চরে কিছুদিন থাকার পর অন্য চরে বসতি গড়তে হয়েছে। এভাবে চলছে জীবন। চরে বসতভিটা, আবাদি জমি হারাতে হয়েছে। চরে অনেক কষ্ট। তবুও চরের জীবনে মায়া লেগে আছে। তাই চর ছাড়তে ইচ্ছা করে না।’
সোনাভান বেওয়া তার বড় ছেলে সিরাজুল ইসলাম (৭০) সংসারে বসবাস করেন। ছেলে বলেন, ‘চরের জীবন খুব কষ্টের। তারপরও চর আশীর্বাদের মতো। চর ছাড়া অন্য কোথাও একদিনের জন্যও থাকতে পারব না। চরে বন্যা, খরা ও নদীভাঙন লেগেই থাকে। বসতভিটা, আবাদি জমি হারাতে হয়।’
‘কিন্তু, বন্যার পর চরের জমিতে পলি জমে যে ফসল হয় তা দেখে প্রাণ জুড়ে যায়। একবারের ফসল দিয়ে সারা বছর চলতে পারি। চরের জমিতে ফসল উৎপাদন করতে খরচ কম। ফসল ফলও অনেক বেশি। চরে জীবনযাপনের খরচ কম। সারাদিন কাজের মধ্যে কাটে। মাঝেমধ্যে নদীতে মাছ ধরি।’
 এনজিও সূত্রে জানা গেছে, লালমনিরহাট ও কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র, তিস্তা, ধরলা, দুধকুমার, গঙ্গাধর নদীর বুকে ৫২০টি চর রয়েছে। এসব চরে ৬ লাখের বেশি মানুষের বসবাস। প্রতিটি চরে ১৫০-৩০০ পরিবার থাকে। কৃষি তাদের আয়ের প্রধান উৎস।
কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নে ব্রহ্মপুত্রের বুকে দুর্গম চর দৈখাওয়ার মনসুর আলী (৬০)  বলেন, ‘কৃষিকাজ ও গবাদি পশু পালন করে আয় করি। সংসার চালানোর পর কিছু টাকা সঞ্চয় করি। তা খরচ হয় বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত ঘর মেরামতের জন্য। অনেক সময় নদীভাঙনে ঘর সরিয়ে নিতে হয়। ভাঙা-গড়ার মধ্য দিয়ে চরে সংগ্রাম করে বাঁচতে হয়।’ তারপরও চরে ভালো আছি। চর ছাড়া অন্য কোথাও বসবাস আরও কষ্টের, যোগ করেন তিনি।
লালমনিরহাট সদর উপজেলার তিস্তার বুকে চর হরিণচড়ার দিনমজুর মফিদুল ইসলাম (৫২) বলেন, ‘গত দুই বছর আগে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্য পরিবার পরিজন নিয়ে শহরে গিয়েছিলাম। ঘর ভাড়া নিয়েছিলাম। রিকশা চালিয়েছিলাম ২ মাস। কিন্তু থাকতে পারিনি। সবাইকে নিয়ে আবারও চরে চলে এসেছি।’ তার মতে, ‘চরে বন্যা, খরা, ভাঙনের সঙ্গে লড়াই করে বেঁচে থাকতে অভ্যস্ত। চরের মানুষের কোনো স¤পদ নেই। কিন্তু, তারা সুখী। কারণ, তাদের তেমন কোনো অসুখ নেই। বর্তমানে চরে গবাদিপশু পালন করে অনেকেই স্বাবলম্বী হয়েছেন।’
সচেতন মহল বলছেন শিক্ষা উপযুক্ত পরিবেশ না থাকায় চরের শত শত শিশু প্রাথমিক শিক্ষা থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। হাতে গোনা কিছু চরে প্রাথমিক শিক্ষার স্বল্প পরিসরে থাকলেও বেশিরভাগ চরেই নেই। মাধ্যমিক উচ্চমাধ্যমিক পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান নেই বললেই চলে। পর্যাপ্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় চরের শিশু কিশোররা শিক্ষার আলো থেকে বঞ্চিত হয়ে শ্রমের দিকে ঝুঁকে পড়ছে। মেয়েদের কিশোরীকালেই বিবাহ দিয়ে দিচ্ছেন পরিবারের পক্ষ থেকে। এই আধুনিক বাংলাদেশে এই অঞ্চলগুলোয় এখনো বাল্যবিয়ে প্রতিনিয়তই হচ্ছে। তাদের সেভাবে সচেতনা সৃষ্টির জন্য কেউ এগিয়ে আসছে না।
আগামীর স্মার্ট বাংলাদেশ সামনের দিকে যাচ্ছে। চরবাসীকেও স্মার্ট হিসেবে গড়তে হবে। চরবাসীরা নদীর ভাঙ্গাগড়ার মাঝেই তাদের ভাগ্যের পরিবর্তনে নিজেরাই সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে। বিদ্যুৎ না থাকলেও সাম্প্রতিক সময়ে চরে সৌর বিদ্যুতের ব্যবহার হচ্ছে। পাশাপাশি সরকার ও সেবামূলক প্রতিষ্ঠান পাশে দাঁড়ালে চরবাসীর জীবনযাত্রার মান অনেক বাড়বে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার এনজিও প্রতিনিধি আহসানুল কবীর বুলু  বলেন, ‘চরের অনেক মানুষকে একাধিকবার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল মূল-ভূখ-ে বসবাসের জন্য। তাদেরকে সার্বিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু, কেউই রাজি হননি।’ ‘আসলে চরের অনেকে মূল-ভূখ-ে এসে মানিয়ে নিতে পারেন না’ উল্লেখ করে তিনি আরও বলেন, ‘তারা যে সব কাজে অভ্যস্ত মূল-ভূখ-ে সেসব কাজের সুযোগ কম। চরের মানুষকে চরে রেখেই শিক্ষা ও স্বাস্থ্য সচেতন করতে হবে। তাদেরকে সঞ্চয় করতে শেখাতে হবে। দরিদ্র মানুষের জন্য সরকারি বরাদ্দ যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।’ 

×