শুক্রবার ১০ বৈশাখ ১৪২৮, ২৩ এপ্রিল ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

শব্দের সরল ব্যঞ্জনা

  • মনসুর হেলাল

কথাসাহিত্যিক অরূপ তালুকদার, কবিতাতেও সিদ্ধহস্ত। প্রকাশিত হয়েছে কাব্যগ্রন্থ : সেই নির্বাসন চাই (১৯৭৪), দূরের হরিণী (১৯৮২), অন্ধকারে আলোর ম্যাজিক (১৯৮৬)। সম্প্রতি প্রকাশিত হয়েছে বাছাই কবিতার সংকলন ‘নির্বাচিত কবিতা’। গ্লোব লাইব্রেরি (প্রাঃ) লিমিটেড থেকে প্রকাশিত এই নির্বাচিত কাব্যসমগ্রটিতে রয়েছে সর্বমোট চৌষট্টিটি কবিতা। যদিও ‘বেশকিছু পছন্দের বা ভাললাগার কবিতা নির্বাচনের বাইরে রাখতে হয়েছে অনেকটা দোদুল্যমান মানসিকতা এবং সময়াভাবের কারণে। এই ত্রুটি আমার।’ এটি কবির সরল স্বীকারোক্তি।

তবে বয়সের ভারে ন্যুব্জ-নত নয়, বরং ধাবমান সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে নিরন্তর ছুটে চলেছেন কবি। জীবনের দেখা না দেখার অনেক জটিল সমীকরণকে তিনি লিপিবব্ধ করছেন নানা মাত্রিকতায় কি গল্পে, কি উপন্যাসে, কি কবিতায়; তবে শব্দের সরল ব্যঞ্জনা অরূপ তালুকদারের কবিতা।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই শব্দসৈনিক নিবিড়ভাবে প্রত্যক্ষ করেছেন মুক্তিযুদ্ধ ও পরবর্তী কালকে। যা তিনি অবলীলায় ধারণ করেছেন তার কবিতায়। ফলে দেশাত্মবোধ হয়ে ওঠেছে তার কবিতার মৌল প্রেরণা। তাই নিজ বাসভূমি, স্বজনদের মধ্যে ফিরে আসার আকুতি তার প্রবল। অনিশ্চিত যাত্রায় কিছুতেই ভাবতে পারেন না কবি- ‘আবার কোনদিন ফিরে আসব, ভাবিনি।/ভাবিনি, আবার কোনদিন দেখা হবে/আপনাদের সঙ্গে, আমার যারা প্রিয়জন/একান্ত আপন বন্ধুবান্ধব তাদেরকে/কোনদিন দেখব, দেখতে পাব আমার/সেই প্রিয়তমার মুখ ম্লান নক্ষত্রবীথিতলে...’। (যুদ্ধোত্তর প্রত্যাবর্তন/নির্বাচিত কবিতা)

মুক্তিযুদ্ধ অরূপ তালুকদারের কবিতার অন্যতম প্রধান অনুষঙ্গ। তার কবিতার ব্যাপক আয়তনজুড়ে মুক্তিযুদ্ধের বিস্তার। মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহ বিক্ষত সময় তার কবিতায় বিধৃত হয়েছে- ‘স্বাধীনতা আমার জীবন, আমার রক্ত, রক্তবীজের ঋণ/স্বাধীনতা আমার চিরদুঃখিনী মায়ের দুফোঁটা অশ্রুজল/স্বাধীনতা আমার প্রিয়তমার মুখ, দোয়েল পাখির গান/স্বাধীনতা আমার স্বপ্নের ধন, এই দীপ্ত প্রাণের ফসল।’ (ন্বাধীনতা/নির্বাচিত কবিতা)। এমনকি মুক্তিযুদ্ধের মহান স্থপতি জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানও তার কবিতার হৃৎস্পন্দন ও ধ্বনিত হয় উজ্জ্বল মহিমায়- ‘তুমি নেই, হে অমৃতের পুত্র, আমাদের মধ্য থেকে/অকস্মাৎ একদিন তুমি চলে গেলে, যেন/এক ঝংকৃত দুর্বার ঝড়ের মতো তোমার/তোমার সেই আসা আর যাওয়া।’ (তুমি নেই, কাঁদে বাংলার মানুষ/নির্বাচিত কবিতা)

কবি অরূপ তালুকদার তার কবিতায় ব্যক্তিগত প্রেমাবেগ, স্বপ্ন ও স্বপ্নভঙ্গ, আশা ও হতাশা, স্মৃতিকাতরতা, সুখ-দুঃখ ও বেদনাকে যেমন উপস্থাপন করেছেন। তেমনি ক্রান্তিকালীন নিষ্ফলা সময়, পতনোন্মুখ সভ্যতা, মানবতার লাঞ্ছনা ও রাজনীতির চালচিত্রকে শিল্পিত বাগ্বিন্যাসে প্রতিভাসিত করেন। কবির অনুভব- ‘যদিও যেতে চাই অনির্বাণ আগুনের দিকে নিমেষেই/পেছন থেকে কে বুঝি ডেকে বলে ওঠে, ওদিকে নয়। বোধের/উৎস থেকে নিশিদিন এই ঘাতক যৌবন ফিরে আসে/সেই অবাক চৌকাঠে। আসলে কোথাও আছে কি কিছু?’ (এই ঘাতক যৌবন/ নির্বাচিত কবিতা)।

বাংলা কবিতার আবহমান ঐতিহ্যের জলস্রোতে অবগাহন করেই কবি অরূপ তালুকদারের যাত্রা শুরু। প্রধানত বড় কাগজগুলোর সাহিত্যপাতাকে আশ্রয় করেই তার আত্মপ্রকাশ ও বেড়ে ওঠা।

এক সময় তার কবিতা প্রকাশিত হয়েছে দেশ, চতুরঙ্গ, মাহেনও, পূবালী, দৈনিক বাংলা, ইত্তেফাক, যুগান্তর, কালের খেয়া (সমকাল) সহ দেশের প্রায় সব কটা বড় কাগজ, সাপ্তাহিক, পাক্ষিক, মাসিক, ত্রৈমাসিকসহ সাময়িক পত্রিকায়। আর এভাবেই তার পাঠকবৃত্তের পরিধি ক্রমেই বিস্তৃতি লাভ করেছে।

আবহমান বাংলা কবিতার প্রধান প্রবাহ রোমান্টিকতা। রোমান্টিক চেতনার স্পর্শে অরূপ তালুকদারের কবিসত্তা স্বতঃস্ফূর্তভাবে সাড়া দেয়। তার সমস্ত কবিতাজুড়েই এই কবিচারিত্র প্রাধান্য বিস্তার করেছে। তার কাব্যভাষার চিত্রলতা ও গীতিময়তা এক মোহনায় মিলনাভিসারী। কবি যখন বলেন- ‘তুই যদি ফিরে আসিস দু’চোখে যদি ধরে রাখিস/অনন্ত পিপাসা/যৌবনের/যদি দিতে পারিস অঞ্জলিভরে/রক্তিম ফুলরাশি/ভালবাসার/এবং/এই অনিদ্র রাত যদি রাখিস ধরে/আজীবন তুই ওই তোর/দীপ্ত দেহের আধারে/তবে/মুহূর্তেই বদলে যাব/এই আমি ত্রিশঙ্কু আঁধারে হব প্রজ্বলিত...।’ (ব্যূহত্রাণ/নির্বাচিত কবিতা)

বিষয়বস্তু আহরণে কবি অরূপ তালুকদার বৈচিত্র্যসন্ধানী হলেও দূরবিহারী নন; পরিপার্শ্ব থেকেই গ্রহণ করেন যাবতীয় মালমসলা। প্রেম প্রকৃতি নারী স্বদেশ সমাজ রাজনীতি পরিবেশ প্রতিবেশ সভ্যতা সময় ও সমকাল আদ্যোপান্ত তার কবিতার উপজীব্য। সৃষ্টিশীল সত্তার শেকড় দেশ-কাল-মৃত্তিকায় প্রোথিত। তার কাব্যভাষা সম্পূর্ণ আধুনিক।

ছন্দের ক্ষেত্রে অক্ষরবৃত্তই তার প্রধান অবলম্বন। শব্দের স্বাচ্ছন্দ্য, ধ্বনির দ্যোতনা ও পঙ্্ক্তির বিন্যাসে তিনি নান্দনিক ব্যঞ্জনা সৃষ্টিতে তৎপর। উপমা উৎপ্রেক্ষা রূপক প্রতীক সংকেত চিত্রকল্প-নির্মাণ ও পুরাণের যথাপ্রয়োগে সিদ্ধহস্ত। আবেগ ও মননের রসায়নে তার কবিতা পাঠক হৃদয়ে সঞ্চারিত করে গভীর সংবেদনা।

মনে রাখতে হবে, কবিতা এমন এক নান্দনিক শিল্প, যাতে জড়িয়ে থাকে রহস্যের অবগুণ্ঠন। তবে নানা রহময়তায় কবি অরূপ তালুকদার তার ছন্দিত কবিতায় দিয়েছেন অনিঃশেষ অভিঘাত। যা বাংলা কবিতার এক অভিন্ন রূপ ও ব্যাতিক্রমী সংযোজন।

শিল্প সাহিত্য সংস্কৃতির পাদপীঠ দক্ষিণ বাংলার সন্তান এই কবি ১৯৪৪ সালের ৬ জানুয়ারি বরগুনা জেলায় জন্মগ্রহণ গরেন। পেশায় সাংবাদিক কবি অরূপ তালুকদার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন।

উপন্যাস, কাব্যগ্রন্থ. গল্প সংকলন, কলাম সংকলনসহ অন্যান্য নানা ধরনের লেখা মিলিয়ে তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা বত্রিশ। দেশে-বিদেশে কবি ও লেখক হিসেবে পেয়েছেন অনেক সম্মাননা ও পুরস্কার। ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও তার প্রচুর। যদিও এ বিষয়ে লেখালেখি তিনি কমই করেছেন। বহুমাত্রিক এই লেখকের প্রতি রইল রক্তিম অভিনন্দন। আরও দীর্ঘ থেকে দীর্ঘদিন সচল থাকুক তার কলম। এটাই আমাদের প্রত্যাশা।

শীর্ষ সংবাদ:
দোকান-শপিংমল খুলবে ২৫ এপ্রিল থেকে         হেফাজতের কিছু কিছু নেতা সন্ত্রাসী তাণ্ডবে বিশ্বাস করে না ॥ সেতুমন্ত্রী         আরমানিটোলার আগুনে দগ্ধ ২০ জনের শ্বাসনালী পুড়ে গেছে         কেমিক্যাল গুদামে আগুনের ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠন         এভারেস্টে যাওয়া পর্বতারোহীর দেহে কোভিড-১৯ শনাক্ত         ৫৪১ রানে বাংলাদেশের ইনিংস ঘোষণা         আরমানিটোলায় কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন, মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৪         আরমানিটোলার কেমিক্যাল গোডাউনের অনুমোদন ছিল না         ভারতে গত ২৪ ঘন্টায় রেকর্ড ৩ লাখ ৩২ হাজার ৭৩০ করোনা রোগী শনাক্ত         ৮ দিনে ভার্চুয়াল আদালতে ১৫ হাজার আসামির জামিন         ভারতের একটি হাসপাতালে অগ্নিকাণ্ডে ১৩ করোনা রোগীর মৃত্যু         করোনাকালে দেশে খাদ্য সংকট হবে না ॥ কৃষিমন্ত্রী         সেই নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে বরিশালে বদলি         নারায়ণগঞ্জে গ্যাসের পাইপ বিস্ফোরিত হয়ে দুই পরিবারের ১১ জন দগ্ধ         রাতের আধাঁরে হালদায় অভিযান, ৫ হাজার মিটার জাল জব্দ         ঘুমধুম সীমান্তে বন্দুকযুদ্ধে মাদক কারবারি রোহিঙ্গা নিহত         টেকনাফে রোহিঙ্গার গুলিতে স্থানীয় যুবক নিহত         উখিয়ায় ইয়াবা ও জাল নোটসহ ৩ আর্মড পুলিশ আটক         দেশেই তৈরি হবে রাশিয়ার করোনার টিকা