সোমবার ২২ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৬ ডিসেম্বর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

জ্ঞানতাপস কাজী মোতাহার হোসেন

  • কাজী রওনাক হোসেন

যাদের নাম প্রাতঃস্মরণীয়, যাদের অবদান এদেশের শিক্ষা, সাহিত্য ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে চির অম্লান। তাদেরই অন্যতম জ্ঞানতাপস কাজী মোতাহার হোসেন। অত্যন্ত দুঃখজনক হলেও সত্যি এ প্রজন্মের অনেকেই এদের নামও শোনেনি। এ লেখার মধ্য দিয়ে আমরা চেষ্টা করেছি কাজী মোতাহার হোসেনের জন্ম থেকে বেড়ে ওঠা এবং শেষ দিন পর্যন্ত তাঁর যে চিন্তা ধারা সেটা তুলে ধরতে দুই টাকা বা ১৫ টাকা বৃত্তির কথা শুনলে সবাই এখন বড় বড় চোখে তাকাবে কিন্তু সে সময় এ টাকাই ছিল দুষ্প্রাপ্য। সে সময়কার আর্থসামাজিক অবস্থাও আমরা আঁচ করতে পারব। নতুন প্রজন্ম এ লেখাটি পড়লে জানতে পারবে ড. মোহাম্মদ শহীদুল্লাহ, ড. কাজী মোতাহার হোসেন, প্রফেসর রাজ্জাক প্রমুখ কতটা মুক্তপ্রাণ ছিলেন।

জন্ম : বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলনের অগ্রপথিক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিক, জাতীয় অধ্যাপক, দাবাগুরু, জ্ঞানতাপস কাজী মোতাহার হোসেন ১৮৯৭ সালের ৩০ জুলাই (১৩০৪ বঙ্গাব্দের ১৪ শ্রাবণ) শুক্রবার তৎকালীন নদীয়া (বর্তমান কুষ্টিয়া) জেলার ভালুকা (বর্তমান কুমারখালী) থানার অন্তর্গত লক্ষ্মীপুর গ্রামে তাঁর মামার বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈতৃক নিবাস ফরিদপুর জেলার পাংশা থানার বাগমারা গ্রামে। তাঁর পিতা কাজী গওহরউদ্দীন ও মাতা তসিরুন্নেসা। চার পুত্র ও চার কন্যার মধ্যে তিনি পিতামাতার জ্যেষ্ঠ সন্তান। পিতা গওহরউদ্দীন প্রথম সেটেলমেন্টের আমীন ছিলেন। পরে হেড আমীন, আরও পরে আমীনদের ইন্সপেক্টর ছিলেন।

পূর্ব পুরুষ : কাজী মোতাহার হোসেনের পূর্ব পুরুষ মুগল সম্রাট জাহাঙ্গীরের শাসনামলে দিল্লী দরবারের ধর্মীয় উপদেষ্টা ও বিচারক (কাজী) পদে নিযুক্ত ছিলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর জৌনপুরে এসে বসবাস শুরু করেন। প্রখ্যাত আলেম, ধর্ম ও সমাজ সংস্কারকদের সঙ্গে তাদের সুসম্পর্ক ছিল। এরপর মির্জাপুর, বাগেরহাট (খুলনা) হয়ে প্রায় দুই শতাব্দী পূর্বে তাঁর এক পূর্বপুরুষ কাজী আতাউল্লাহ নিকটবর্তী বাগমারা গ্রামে এসে স্থায়ীভাবে বসতি স্থাপন করেন।

শিক্ষা : কাজী মোতাহার হোসেন লেখাপড়ার হাতেখড়ি হয় বাগমারা গ্রামে তাদেরই পারিবারিক খানকার মক্তবে। এরপর তিনি মামাবাড়ি লক্ষ্মীপুরের নিকটবর্তী যদুবয়রা নিম্ন প্রাইমারি স্কুলে ১৯০৬ সাল পর্যন্ত পড়াশোনা করে আবার বাগমারার নিম্ন প্রাইমারি স্কুলে গিয়ে ভর্তি হন এবং ১৯০৭ সালে মাসিক দুই টাকা বৃত্তিসহ নিম্ন প্রাইমারি পাস করেন। ১৯০৯ সালে তিনি কুষ্টিয়ার উকিল রাইচরণ দাস প্রতিষ্ঠিত সেনগ্রাম মাইনর স্কুল থেকে বৃত্তিসহ উচ্চ প্রাইমারি পাস করেন। ১৯১১ সালে তিনি কুষ্টিয়া এইচ, ই, স্কুলে (১৮৬১ সালে স্থাপিত) ফোর্থ ক্লাসে (বর্তমান সপ্তম শ্রেণী) ভর্তি হন। তিনি ১৯১৫ সালে এই স্কুল থেকে প্রথম বিভাগে ম্যাট্রিকুলেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে মাসিক পনেরো টাকা হারে প্রাদেশিক বৃত্তি লাভ করেন। তিনি এই পরীক্ষায় রাজশাহী ডিভিশনে সর্বমোট নম্বরে প্রথম স্থান অধিকার করেন। কুষ্টিয়া হাইস্কুলে পাঠ গ্রহণ তার ভবিষ্যত জীবন, মানস-গঠন ও কর্মের একটি বিরাট প্রেরণা। ১৯১৫ সালে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে আইএসসি, ক্লাসে ভর্তি হন। কিন্তু অনাকাক্সিক্ষত কারণে তাকে দ্বিতীয় বর্ষে রাজশাহী কলেজে চলে আসতে হয়। ১৯১৭ সালে তিনি চতুর্দশ স্থান অধিকার করে প্রথম বিভাগে আইএসসি পাস করেন এবং মাসিক কুড়ি টাকা বৃত্তিলাভ করেন। ১৯১৯ সালে তিনি ঢাকা কলেজ থেকে পদার্থ বিজ্ঞানে অনার্সসহ বিএ পাস করেন। বিএ পরীক্ষাতে তিনি পূর্ববঙ্গ ও আসাম জোনে প্রথম স্থান দখল করে মাসিক ত্রিশ টাকা বৃত্তিলাভ করেন। ১৯২১ সালে তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পদার্থবিজ্ঞানে দ্বিতীয় শ্রেণীতে প্রথম স্থান দখল করে এমএ পাস করেন। উল্লেখ্য, এই বছর কেউ প্রথম স্থান পায়নি।

বিবাহ : কাজী মোতাহার হোসেন ১৯২০ সালের ১০ অক্টোবর কলকাতার মোহাম্মদ ফয়েজুর রহমান ও মুসলিমা খাতুনের কন্যা সাজেদা খাতুনের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। কাজী দম্পতির ৪ পুত্র ও ৭ কন্যার মধ্যে বর্তমানে তিন কন্যা ও এক পুত্র জীবিত। পুত্র-কন্যাদের সকলেই জীবনের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত ছিলেন। এদের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক ও ছায়ানটের সভাপতি ড. সনজীদা খাতুন ও ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপিকা ফাহমিদা খাতুন, রবীন্দ্র সঙ্গীতের দুই খ্যাতনাম শিল্পী। সবচেয়ে ছোট মেয়ে মাহমুদা খাতুনও একজন জনপ্রিয় রবীন্দ্রসঙ্গীত শিল্পী এবং পেশায় চিত্রশিল্পী ছিলেন। কাজী আনোয়ার হোসেন জনপ্রিয় গোয়েন্দা সিরিজ ‘মাসুদ রানা’ রচয়িতা।

এমএ ক্লাসের থাকাকালীন কাজী মোতাহার হোসেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চাকরিতে নিযুক্ত হন। ১৯২১ সালের জুন মাসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপিত হওয়ার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের তৎকালীন অধ্যক্ষ ড. জেনকিংসের সুপারিশে তিনি ঐ বিভাগের ডেমোনেস্ট্রেটর হিসেবে নিয়োগ পান। এমএ পাস করার পর তিনি পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের লেকচারার নিযুক্ত হন।

১৯৩৮ সালে তিনি তৎকালীন বিভাগীয় প্রধান প্রখ্যাত বিজ্ঞান সাধক প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর আগ্রহ ও পরামর্শে কলকাতায় এই উপমহাদেশের সংখ্যাতত্ত্ব (স্টাটিস্টিকস) বিষয়ের জনক ড. প্রশান্তচন্দ্র মহলনবীশের অধীনে ‘ইন্ডিয়ান স্টাটিস্টিক্যাল ইনস্টিটিউটে সংখ্যাতত্ত্ব পড়তে যান। ফিরে এসে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সংখ্যাতত্ত্ব পড়ানোর ভার নেন। শুরুতে গণিত ও সংখ্যাতত্ত্ব, নামে একটি সম্মিলিত বিভাগ ছিল যা ১৯৫০-৫১ সালে বিভক্ত হয়। এদেশে সংখ্যাতত্ত্ব পঠন-পাঠনের ক্ষেত্রে তিনিই পথিকৃত। ১৯৫০ সালে ‘ডিজাইন অব এক্সপেরিমেন্টস, বিষয়ে গবেষণার জন্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তাকে ডক্টরেট (পিএইচডি) ডিগ্রী দেয়া হয়। তার এই অভিসন্দর্ভের পরীক্ষক ছিলেন বিশ্ববিশ্রুত সংখ্যাতত্ত্ববিদ স্যার রোনাল্ড ফিশার, অধ্যাপক রাজচন্দ্র বোস ও ড. মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন। প্রফেসর ফিশার এই গবেষণাপত্রের উচ্চ প্রশংসা করেছিলেন।

কাজী মোতাহার হোসেন উদ্ভাবিত পদ্ধতি সংখ্যাতত্ত্ব শাস্ত্রে পরবর্তীকালে ‘হুসাইন চেইন রুল’ নামে অভিহিত হয়েছে। ১৯৫৪ সালে তিনি ‘প্রফেসর’ পদ লাভ করেন। ১৯৫৫ থেকে ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান অনুষদের ‘ডিন’ ছিলেন। ১৯৬৪ সালে তিনি সংখ্যাতত্ত্ব বিভাগ থেকে অবসরগ্রহণ করেন। পরে তাকে ‘সুপারনিউমের‌্যারি প্রফেসর অব স্টাটিস্টিকস’ পদে নিযুক্ত করা হয়। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইনস্টিটিউট অব স্ট্যাটিস্টিক্যাল রিসার্চ এ্যান্ড ট্রেনিং (আইএসআরটি) নামে একটি গবেষণা-প্রতিষ্ঠান স্থাপন করেছিলেন এবং ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত তিনি এই ইনস্টিটিউটের ডিরেক্টর ছিলেন। ১৯৬৯ সালে তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘প্রফেসর এমিরিটাস’ পদে নিযুক্ত করা হয়। ১৯৭৪ সালে ৯ ডিসেম্বর তাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সায়েন্স (ডিএসসি) ডিগ্রী প্রদান করা হয়। ১৯৭৫ সালে তাকে বাংলাদেশের জাতীয় অধ্যাপকের (ন্যাশনাল প্রফেসর) মর্যাদা দেয়া হয়।

সাহিত্য চর্চা : কুষ্টিয়া হাইস্কুলে ছাত্রাবস্থাতেই শিক্ষক জ্যোতিন্দ্রমোহন রায়ের উৎসাহ ও প্রেরণাতেই তাঁর লেখায় হাতেখড়ি হয়। তাঁর প্রথম প্রকাশিত রচনার নাম ‘ঘ্যালিলিও’। এটি ‘সওগাত’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল। ১৯৩৮ সালে প্রকাশিত তার একমাত্র প্রবন্ধ-গ্রন্থ ‘সঞ্চরণ’ সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ, প্রমথ চৌধুরী. উপেন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায় প্রমুখ সাহিত্যিকগণ ভূয়সী প্রশংসা করেছিলেন। রবীন্দ্রনাথ বাংলা ১৩৪৪ সালের ২ ভাদ্র কাজী মোতাহার হোসেনকে লিখিত এক পত্রে সঞ্চরণ গ্রন্থে লেখকের স্বচ্ছ ও প্রাঞ্জল ভাষায় বিচিত্র ভাব ও নানা আলোচনার বিষয় উপস্থাপনের স্বকীয়তা, সাহস ও অধ্যবসায়ের উচ্চ প্রশংসা করেছেন।

সাহিত্য সম্পৃক্ত গ্রন্থ ছাড়াও তার বেশ কয়েকটি পাঠ্যপুস্তকও আছে। তবে তিনি মৌলিক চিন্তাশ্রয়ী প্রাবন্ধিক হিসেবেই অধিক খ্যাত। কাজী মোতাহার হোসেনের গদ্যশৈলীর স্বাতন্ত্র্য ও বৈশিষ্ট্য সহজেই ও মুসলিম সাহিত্য-সমাজের সাহিত্যাসারের জন্য রচিত হয়েছিল। মৌলিক, অনুবাদ, পাঠ্যপুস্তক, তিন ধরনের গ্রন্থ রয়েছে তার। সাহিত্য-সমালোচক হিসেবে খ্যাত মোতাহার হোসেনের বিভিন্ন সময়ের বিভিন্ন লেখা সমকালীন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

সাহিত্য ও শিক্ষা-সংক্রান্ত সম্মেলনে তৎকালীন পাকিস্তানের প্রতিনিধি হিসেবে তিনি পৃথিবীর অনেক দেশ সফর করেন। ১৯৫৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত সাহিত্যমেলায় তিনি যোগদান করেছিলেন। এই সাহিত্যমেলায় প্রদত্ত তার বক্তৃতা পশ্চিমবঙ্গের সুধী ও সাহিত্যমহলে বিপুলভাবে আদৃত হয়েছিল। কাজী মোতাহার হোসেনের সাহিত্য সঙ্গীদের মধ্যে শরৎচন্দ্র, নজরুল, কাজী আবদুল ওদুদ প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে তিনি একজন মানবতাবাদী এবং সুন্দরের পূজারী।

ক্রীড়া ও সঙ্গীতচর্চা : ছেলেবেলা থেকেই খেলাধুলার প্রতি কাজী মোতাহার হোসেনের বিশেষ অনুরাগ লক্ষ্য করা যায়। ছাত্রজীবনেই তিনি ফুটবল, টেনিস, ব্যাডমিন্টন, দাবা ও সাঁতার এ বিশেষ পারদর্শিতা অর্জন করেন। তাঁর দাবা খেলা সম্পর্কে অনকে গল্প প্রচলিত আছে। তাঁর দাবা খেলার স্ঙ্গীদের মধ্যে কথাশিল্পী শরৎচন্দ্র, কবি নজরুল, সতীশচন্দ্র, কিষাণলাল প্রমুখের নাম উল্লেখযোগ্য। কাজী মোতাহার হোসেন। ১৯২৫ সালে স্টেটসম্যান পত্রিকার মাধ্যমে ‘অল ইন্ডিয়া ড্রেস ব্রিলিয়েন্স প্রতিযোগিতায় মোট ১০৩ নম্বরের মধ্যে ১০১ নম্বর পেয়ে প্রথম হন। সেই সময় তিনি ভারতীয় দশজন প্রথম শ্রেণীর দাবা খেলোয়াড়ের মধ্যে অন্যতম বিবেচিত হন। তিনি ১৯২১ থেকে ১৯৬০ সাল পর্যন্ত একনাগাড়ে ৪০ বছর অভিভক্ত বাংলা ও পূর্ব পাকিস্তানের একক চ্যাম্পিয়ন ছিলেন। তিনি সাতবার অল ইন্ডিয়া এ্যান্ড সাউথ আফ্রিকা করেস পন্ডেস চেস কম্পিটিশন-এ চ্যাম্পিয়ন হন। তিনি বাংলাদেশ দাবা ফেডারেশনের সভাপতি ছিলেন। ১৯৫১ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত লন টেনিস প্রতিযোগিতায় চ্যাম্পিয়ন হবার গৌরব অর্জন করেন।

সঙ্গীতেও মোতাহার হোসেন আকৈশোর অনুরাগী। কুষ্টিয়া স্কুলে পাঠকালীনই পরোক্ষভাবে সঙ্গীতচর্চায় তাঁর হাতেখড়ি। পরে ১৯১৭-১৮ সালে তিনি তিনি বিশিষ্ট সঙ্গীতজ্ঞ ওস্তাদ হাকিম মোহাম্মদ হোসেন সাহেবের কাছে দুই বছর টপ্পা, ঠুংরী ও খেয়াল এবং সেতারের তালিম নিয়ে ছিলেন। নজরুলের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ও বন্ধুত্বের ব্যাপারে সঙ্গীত ছিল একটি বড় মাধ্যম। সঙ্গীতবিদ্বেষী রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের পরিপ্রেক্ষিতে তাঁর পদক্ষেপ সাহস ও মুক্তবুদ্ধির পরিচায়ক।

সাহিত্যসঙ্গী নজরুল : মোতাহার হোসেনের সাহিত্যসঙ্গী ও বন্ধুদের মধ্যে কাজী নজরুল ইসলামের নাম সর্বাগ্রে উল্লেখযোগ্য। নজরুল-জীবনের স্মৃতির সঙ্গে মোতাহার হোসেন ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯২১ সালে কলকাতায় তাঁদের প্রথম পরিচয়। ১৯২৫ সালে নিখিল ভারত দাবা প্রতিযোগিতার ব্যাপারে দু’জনের সম্পর্ক নিবিড় হয়। সম্পর্ক ও বন্ধুত্ব পুরোপুরি পাকা হলো ১৯২৭ সালে মুসলিম সাহিত্য সমাজের বার্ষিক সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে যোগদানের জন্য ঢাকায় এলে নজরুল দীর্ঘদিন কাজী মোতাহার হোসেনের বর্ধমান হাউসের (বর্তমানে বাংলা একাডেমি) নিচের তলার বাসাতেই অবস্থান করতেন। মোতাহার হোসেনকে লেখা নজরুলের চিঠিপত্র তাদের দু’জনের গভীর সৌহার্দ্যরে পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর দাড়িকাটা উপলক্ষে নজরুল ‘দাঁড়ি-বিলাপ’ নামে একটি দীর্ঘ কৌতুক কবিতা লিখেছিলেন। তাঁর ‘নজরুল-কাব্য পরিচিতি’ গ্রন্থটি (১৯৫৫) তৎকালীন পূর্ব-পাকিস্তানে নজরুল চর্চার প্রারম্ভিক প্রচেষ্টা হিসেবে বিশেষ মূল্যবহ।

বিজ্ঞান চিন্তা : মোতাহার-মানস, সাহিত্য ও বিজ্ঞান, এই উভয়দিকেই সমান মনোযোগে ধাবিত হয়েছে। বিজ্ঞান শুধু তাঁর পেশাগত বিদ্যার অঙ্গ নয়, একে তিনি সৃজনশীল শিল্পের মর্যাদা দিয়েছেন। ভারত উপমহাদেশের কয়েকজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানীর সাহচর্য তিনি পেয়েছিলেনÑবন্ধু, শিক্ষক ও সহকর্মীরূপে। প্রখ্যাত বৈজ্ঞানিক আচার্য পিসি রায় ও প্রখ্যাত সংখ্যাতত্ত্ববিদ ড. প্রশান্ত চন্দ্র মহলানবিসের তিনি ছিলেন প্রত্যক্ষ ছাত্র। বোস-আইনস্টাইন থিওরির সুবিখ্যাত প্রফেসর সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সহকর্মী হিসেবে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে করেছেন। স্কুলজীবনে বন্ধুরূপে পেয়েছিলেন বিশিষ্ট রসায়নবিদ ড. হরগোপাল বিশ্বাসকে। এদের সহৃদয় ভালোবাসা ও ঋণ তিনি বিস্মৃত হননি কখনো। প্রফেসর সত্যেন বোসের সঙ্গেও তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ও সৌহার্দ্য ছিল। বাংলাভাষায় বিজ্ঞান শিক্ষা ও চর্চার একনিষ্ঠ সম্পর্ক ও পৃষ্ঠপোষক হলেন কাজী মোতাহার হোসেন। প্রফেসর সত্যেন বোসের বিখ্যাত ‘কোয়ান্টাম থিওরি’-সম্পর্কিত প্রবন্ধের বঙ্গানুবাদ তিনি করেছিলেন এবং তা ‘প্রবাসী’ পত্রিকায় ছাপা হয়। সে সময় তিনি বেশ কয়েকটি আন্তর্জাতিক বিজ্ঞান-সেমিনারে যোগ দিয়েছিলেন। তিনি ১৯৬৮ সালে ঢাকায় অনুষ্ঠিত পাকিস্তান সায়েন্স কনফারেন্সের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন : ১৯২৬ সালের ১৮ জানুয়ারি কাজী আবদুল ওদুদ, সৈয়দ আবুল হোসেন, কাজী মোতাহার হোসেন, কবি আবদুলকাদির প্রমুখের আগ্রহ ও প্রচেষ্টায় ঢাকায় মুসলিম সাহিত্য-সমাজ নামে একটি প্রগতিশীল সাহিত্য-সংগঠন গড়ে ওঠে। বুদ্ধিবৃত্তির স্বাধীন চর্চা ও বুদ্ধির মুক্তিই ছিল তাদের কাম্য ও লক্ষ্য। মুসলিম সাহিত্যসমাজের বার্ষিক মুখপাত্র ছিল ‘শিখা’। দ্বিতীয় ও তৃতীয় বর্ষে কাজী মোতাহার হোসেন ‘শিখা’ পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন। এই দল ‘শিক্ষাগোষ্ঠী’ নামে পরিচিত। এদের সেøাগান ছিল, ‘জ্ঞান যেখানে সীমাবদ্ধ, বুদ্ধি যেখানে আড়ষ্ট-মুক্তি সেখানে অসম্ভব’।

শিখাগোষ্ঠীর আদর্শ-উদ্দেশ্যে লক্ষ্য সম্পর্কে সাহিত্য সমাজের দ্বিতীয় বর্ষের কার্যবিবরণীতে কাজী মোতাহার হোসেন লিখেছিলেন : ‘আমরা চক্ষু বুজিয়া পরের কথা শুনিতে চাই না, বা শুনিয়াই মানিয়া লইতে চাই না, আমরা চাই চোখ মেলিয়া দেখিতে, সত্যকে জীবনে প্রকৃতভাবে অনুভব করতে। আমরা কল্পনা ও ভক্তির মোহ-আবরণের সত্যকে ঢাকিয়া রাখিতে চাই না। আমরা চাই জ্ঞান-শিক্ষাবস্থায় অসার সংস্কারকে ভস্মীভূত করিতে এবং সত্যকে কুহেলিকা মুক্ত করে, ভাস্বর ও দীপ্তমান করতে। আমরা ইসলামের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করতে চাই নাÑ আমরা চাই কর্মস্রোতে ঝাঁপ দিয়া ইসলামের ভবিষ্যতকে মহিমান্বিত করিতে।’

(শিখা : ২য় বর্ষ, ১৩৩৫)।

বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন সেই সময়ে ঢাকাকেন্দ্রিক মুসলিম সমাজে বিশেষ আলোড়ন তুলেছিল। রক্ষণশীল মুসলিম সমাজের প্রতিক্রিয়া এতদূর পর্যন্ত গড়িয়েছিল যে শিখা গোষ্ঠীর সদস্যদের বক্তব্য নিন্দিত ও সমালোচিত হয়েছি প্রবলভাবে। তবে সাহিত্যসমাজের উপায় বর্ণিত উদ্দেশ্য পুরোপুরি সফল হয়নি, সামগ্রিকভাবে লক্ষ্যও অর্জিত হয়নি। সীমাবদ্ধতা ও স্ববিরোধিতা থাকা সত্ত্বেও শিখা গোষ্ঠীর এই বুদ্ধির মুক্তি আন্দোলন নানা কারণে বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।

ভাষা প্রসঙ্গ ও প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলন : স্বাধীনচেতা এবং সংস্কারমুক্ত দৃঢ়তায় বলিষ্ঠ কাজী মোতাহার হোসেন এ দেশের প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সঙ্গে বরাবরই যুক্ত ছিলেন। সকল প্রকার সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অন্যায়-অবিচার, সাম্প্রদায়িক, রক্ষণশীলতা ও প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে তিনি প্রতিবাদ জানিয়ে এসেছেন। রাষ্ট্রভাষা, ভাষা-সংস্কার, হরফ পরিবর্তন, রবীন্দ্র বিরোধিতা প্রভৃতি প্রসঙ্গে তিনি তাঁর সুস্পষ্ট বক্তব্য প্রকাশ করেছেন বরাবর। রাষ্ট্রভাষা প্রসঙ্গে কাজী মোতাহার হোসেনের বক্তব্য ছিল সর্বপেক্ষা বৈপ্লবিক, স্পষ্ট ও নির্ভীক। ১৯৪৭ সালের ১৫ সেপ্টেম্বর প্রকাশিত তাঁর স্পষ্টভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা সমস্যায় তিনি বলেছিলেন : ‘...পূর্ব পাকিস্তানের রাজভাষা বা রাষ্ট্রভাষা বাংলাই হওয়া স্বাভাবিক এবং সমীচীন। কোনও কোনও পরমুখাপেক্ষী বাঙালীর মুখেই ইতোমধ্যে উর্দুর ঝংকার শোনা যাচ্ছে। কিন্তু এদের বিচারবুদ্ধিকে প্রশংসা করা যায় না।’

ভাষা-সংস্কার প্রসঙ্গেও তিনি প্রণিধানযোগ্য বক্তব্য পেশ করেছিলেন। চল্লিশের দশকে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনেও তাঁর ভূমিকা ছিল অগ্রগণ্য। ১৯৬৭ সালে বেতার ও টেলিভিশনে রবীন্দ্রসঙ্গীত প্রচার নিষিদ্ধ করার সরকারী সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে বাতিলকৃত সংবাদপত্র পুনঃপ্রকাশের আহ্বান জানিয়ে তিনি বিবৃতি দিয়েছিলেন (দৈনিক সংবাদ : ২ এপ্রিল, ১৯৭৮)।

১৯৫৩ সালের ২৭-২৮ ফেব্রুয়ারি ও ১ মার্চ শান্তিনিকেতনে অনুষ্ঠিত সাহিত্য-মেলায় মোতাহার হোসেনের মুক্তবুদ্ধি প্রসঙ্গে বক্তব্য পশ্চিমবঙ্গের পত্রপত্রিকায় বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়।

তাঁর হুঁশিয়ার ছিল সাহিত্য হিন্দুকরণ বা ইসলামীকরণের বিরুদ্ধে। তিনি বললেন, ‘জলকে পানি বলে উল্লেখ করলে সাহিত্যের জাত যাবে নাÑ জাত যাবে যদি জল চৌকিকে পানি চৌকি, পানি পথকে জলপথ; জলযোগকে পানি যোগ, জল পানিকে পানি পানি বা পানি প্রার্থীকে যদি জলপ্রার্থী করা হয়। (পৃঃ ৫৮;৩য় বর্ষ ১২শ সংখ্যা)।

১৯৩৮ সালে কলকাতা মুসলিম ইনস্টিটিউট হলে অনুষ্ঠিত বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য-সম্মেলনের ষষ্ঠ অধিবেশনে মনশাখার সভাপতি ছিলেন কাজী মোতাহার হোসেন। ১৯৬১ সালে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার মোতাহার হোসেনকে ‘সিতারায়ে ইমতিয়াজ’ খেতাবে ভূষিত করেন। ১৯৬৬ সালে প্রবন্ধ সাহিত্যের জন্য তিনি বাংলা একাডেমি পুরস্কার লাভ করেন। ১৯৬৮ সালে ঢাকা অনুষ্ঠিত ‘পাকিস্তান সায়েন্স কনফারেন্সর সভাপতি নির্বাচিত হন। ১৯৭৪ সালের ৯ ডিসেম্বর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক বিশেষ সমাবর্তন উৎসবে তাঁকে সম্মানসূচক ডক্টরেট (ডি, এসসি) ডিগ্রী প্রদান করা হয়। ১৯৭৫ সালে কুমিল্লার একটি সংস্থা তাঁকে ‘বিদ্যাসাগর’ উপাধিতে ভূষিত করে। মুক্তবুদ্ধি ও স্বাধীনচিন্তা নিয়ে সাহিত্যক্ষেত্রের অগ্রগামী ও অন্যতম প্রতিভা কাজী মোতাহার হোসেনকে ১৯৭৭ সালে ‘নাসিরউদ্দীন স্বর্ণ পদক’ প্রদান করা হয়। তিনি নজরুল একাডেমির আজীবন সদস্য ও কলেজ অব মিউজিকের সভাপতি ছিলেন। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সাহিত্য পত্রিকা ও বাংলা একাডেমি পত্রিকা উপদেষ্টাম-লীর সদস্য ছিলেন। ১৯৭৮ সালের ১৫ জুলাই তাকে ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যালামনাই এ্যাসোসিয়েশনের সম্মানীয় আজীবন সদস্যপদ প্রদান করা হয়।

ব্যক্তিগত জীবনে তিনি ধর্মপ্রাণ; কিন্তু তাঁর মধ্যে ধর্মের কোনো ভান বা গোঁড়ামী ছিল না; তাঁর দৃষ্টিভঙ্গি সাম্প্রদায়িকতামুক্ত ও সর্বমানবিক। ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহ যথাযর্থই মন্তব্য করেছেন : ‘কাজী মোতাহার হোসেন, আপনবোলা নিরহঙ্কার মানুষ, বিদ্বান ও গুণী। এই নিরলস বাণীসাধক জ্ঞানানুশীলনের ক্ষেত্রে আমাদের বিদ্বান সমাজে আদর্শ স্থানীয় ব্যক্তিত্ব।

ধর্মের সাম্প্রদায়িকতা বিষয়ে তিনি বলেন, ধর্মের মূল মাটিতে প্রোথিত হলে আর মস্তক, আকাশে বিস্তারিত হলে সব ধর্মের প্রকৃতিই সাদৃশ্যপূর্ণ। বাংলা ভাষা বিজ্ঞান সাধনার উপযোগী নয় তিনি ছিলেন এ ধারণার ঘোরতর বিরোধী। তাঁর পাঠদানের মাধ্যমও ছিল বাংলাই। জ্ঞানতাপস এই মহাপুুষের সম্পর্কে স্বল্প পরিসরে কিছু বলতে পারা যায় প্রায় অসম্ভব। ১৯৮১ সালের ৯ অক্টোবর এ পরিসংখ্যানবিদ আমাদের ছেড়ে চলে যান। কিন্তু যে আদর্শ তিনি আমাদের সামনে দাঁড় করিয়ে রেখে গেছেন, তা শুধু এ যুগের নয়, সর্বকালের অনুস্মরণীয়, অনুকরণীয় হিসেবে সমাদৃত। আগামী ৩০ জুলাই ২০১৮ এ কাজী মোতাহার হোসেনের ১২১তম জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য এ লেখা। বেঁচে থাক তাঁর আদর্শ, চিরায়ত হোক তাঁর বাণী।

শীর্ষ সংবাদ: