ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ৩০ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১৫ আশ্বিন ১৪২৯

বিপর্যস্ত নারী শ্রমিক

প্রকাশিত: ০৫:২৭, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০১৭

বিপর্যস্ত নারী শ্রমিক

সে এক কাল ছিল পর্তুগীজ, ডাচ ও মগ জলদস্যুরা বাংলার উপকূলীয় অঞ্চলের গ্রামগুলোতে অতর্কিতে হানা দিত। নারী, পুরুষ ও শিশু নির্বিশেষে জোরপূর্বক ধরে নিয়ে নৌযানে করে বিভিন্ন বন্দরে ক্রীতদাস হিসেবে বিক্রি করে দিত। এভাবে কত সহস্র মানুষ যে দেশান্তরী হয়েছে, হয়েছে নির্মম নির্যাতনের শিকার। বিশ্বজুড়ে ছিল তখন রমরমা ক্রীতদাস ব্যবসা। সে সব আজ ধূসর স্মৃতি। এ যুগে মানুষ বিক্রি করছে তার শ্রম, মেধা ভিন দেশে। কিন্তু নিপীড়ন-নির্যাতনের মাত্রা যেন তাতে সামান্য কমেনি। পুরুষ শ্রমিকদের ভোগান্তি যেখানে চরমে, সেখানে নারী শ্রমিকদের নির্যাতনের বীভৎসতা মানবতার করুণ ক্রন্দনকেই উন্মিলিত করে। নানাভাবে নির্যাতিত হলেও তাদের দেখার কেউ নেই। মধ্যপ্রাচ্যে কর্মরত বাঙালী নারী শ্রমিকদের অবস্থা এমন যে, তাদের পক্ষে সে দেশের সরকারও দাঁড়ায় না। নির্যাতনের বহু ভয়াবহ চিত্র গণমাধ্যমে উঠে এলেও টনক নড়ে না নির্যাতনকারী দেশের সরকার ও প্রশাসনের কর্তাদের। তারা কোন বিহিত ব্যবস্থা নেয় না। আবার বাংলাদেশের দূতাবাসগুলোও এসব ব্যাপারে অধিকাংশ ক্ষেত্রে উপেক্ষা করে আসছে। পরিবারের সদস্যদের দু’বেলা দু’মুঠো খাবার যোগাড় করতে ও সংসারে সচ্ছলতা আনার জন্য গৃহকর্মী হিসেবে গত কয়েক দশক ধরে বাংলাদেশের নারীরা বিদেশে যাচ্ছেন। কিন্তু তাদের ‘ললাট লিখন’ যে কী করুণ ক্রন্দনমথিত, যাবার পরই তারা উপলব্ধি করতে পারেন। কিন্তু তখন ফেরার আর কোন পথ খোলা নেই। অনেকে মানসিক ও শারীরিক অত্যাচারের ক্ষত বয়ে নিয়ে ফিরে আসেন দেশে। কেউ কেউ পালিয়েও আসেন। গৃহকর্তা এমনকি গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনের ভয়াবহতা মধ্যযুগীয় বর্বরতার সঙ্গেই তুল্য। যা ক্রীতদাসদের জীবনে ছিল নিত্যনৈমিত্তিক বিষয়। বেতন-ভাতা চাইলেও মারধর করা হয় অনেককে। এমনকি দেশে পরিবার পরিজনের সঙ্গে ফোনালাপও করতে বাধা দেয়া হয়। কোথাও কোথাও গায়ে গরম পানি ঢালা, তপ্ত লোহা দিয়ে ছ্যাঁক দেয়া হয়। খাবার বন্ধ করে দেয়া হয়। মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়। কখনও সুযোগ পেয়ে দেশের দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও কোন সাহায্য মেলে না। শেখ হাসিনার সরকারের বিভিন্ন ইতিবাচক পদক্ষেপ এবং কর্মসূচী থাকা সত্ত্বেও অভিবাসী নারী শ্রমিকদের নানা ধরনের সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। সময়ের সঙ্গে নারীদের জন্য বিদেশে কর্মসংস্থানের নতুন নতুন সম্ভাবনা যেমন তৈরি হচ্ছে, তেমনি দেখা দিচ্ছে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ। গৃহপরিচারিকা হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত নারী কর্মীদের মধ্যে অনেকেই নিয়োগ কর্তার অত্যাচারের শিকার। বাংলাদেশের নারী শ্রমিকরা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই স্বল্প মজুরিতে কাজ করেন। বিশেষত গৃহপরিচারিকা হিসেবে সেখানে তারা প্রায়ই নানা ধরনের নির্যাতনের শিকার হয়। যৌন হয়রানি, দৈহিক নির্যাতনের পাশাপাশি কখনও কখনও নিয়োগকর্তা ও সহকর্মী পুরুষরা তাদের মৌলিক অধিকারগুলো পর্যন্ত হরণ করেন। নানা রকমের প্রবঞ্চনা, প্রতারণা তাদের বিদেশবাসকে অসহনীয় করে তোলে। আবার অদক্ষ ও স্বল্প দক্ষ নারী কর্মীরা স্বল্প বেতনে কাজ করলেও নিজেরা কষ্টে জীবনযাপন করে উপার্জনের পুরো টাকা দেশে পাঠায় পরিবার-পরিজনদের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জন্য। দেশের বৈদেশিক আয়ে যুক্ত হয় বিরাট অঙ্ক। গত জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে বাংলাদেশ হতে ৭৩ হাজার ১০ নারী অভিবাসী শ্রমিক হিসেবে বিদেশে গেছেন। ২০১৬ সালে গেছেন এক লাখ ১৮ হাজার ১৮ জন নারী। স্বল্প দক্ষতানির্ভর গৃহসেবা খাতেই সবচেয়ে বেশি নিয়োজিত। আর এরাই নির্যাতিত হচ্ছেন বেশি। নারী শ্রমিকদের সার্বিক সুরক্ষার জন্য সম্মিলিত কোন প্রয়াস নেই সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। নারী ও পুরুষ শ্রমিকের মধ্যে যে পার্থক্য নিরূপণ করা হয়েছে তাতে নারীদের অবস্থান নিচে। এসব অব্যবস্থা দূরীকরণে দূতাবাসগুলোরও সক্রিয় পদক্ষেপ নেয়া জরুরী।