ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ১৬ আগস্ট ২০২২, ১ ভাদ্র ১৪২৯

পরীক্ষামূলক

এনামুল হক

ডিএনএর ত্রুটি সারাতে এক ধাপ অগ্রগতি

প্রকাশিত: ০৬:১৯, ১৮ আগস্ট ২০১৭

ডিএনএর ত্রুটি সারাতে এক ধাপ অগ্রগতি

জেনোম এডিটিং বা জিন সম্পাদনার ক্ষেত্রে সম্প্রতি উদ্ভাবিত নতুন এক কৌশল নিয়ে বিজ্ঞান জগতে বেশ আলোড়ন সৃষ্টি হয়েছে। কৌশলটির নাম ক্রিসপার-কাস ৯। ডিএনএ সম্পাদনার আগের কৌশলগুলোর তুলনায় এই কৌশল দ্রুতগতির, কম খরচের ও অধিকতর নির্ভুল। নানাবিধ কাজে এটি প্রয়োগের প্রভূত সম্ভাবনা রয়েছে। প্রাণীদেহের জেনেটিক উপাদান অতি সহজে পরিবর্তনের এ এক শক্তিশালী কৌশল। জীববিজ্ঞানীরা ক্রিসপার কাস-৯ এর দিকে প্রবল আগ্রহ নিয়ে ঝুঁকে পড়েছেন। প্রথমে তারা প্রাণীদেহে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছেন। এখন করছেন মানবদেহে। গত মার্চ মাসে চীনের গবেষকরা মানবভ্রƒণে রোগ সৃষ্টিকারী একটি জিনের সাফল্যের সঙ্গে রূপান্তর ঘটিয়ে ইতিহাস সৃষ্টি করেন। তবে তাদের পরীক্ষার ফল ছিল মিশ্র। ক্যাভিজম নামে এক ধরনের এনিমিয়ার জন্য যে ত্রুটিপূর্ণ জিনটি দায়ী সেটি সংশোধনে তারা শতভাগ সফল হলেও কৌশলটি মাত্র দুটো ত্রুটিপূর্ণ ভ্রƒণের ক্ষেত্রে প্রয়োগ করা হয়েছিল। থ্যালাসেমিয়া রোগের জন্য দায়ী যে জিন মিউটেশন সেটির বাহক অপর চারটি ভ্রƒণের মধ্যে মাত্র একটি ভ্রƒণের ডিএনএ সাফল্যের সঙ্গে সম্পাদনা করা হয়েছে। নেচার পত্রিকায় প্রকাশিত এক গবেষণা রিপোর্টে দেখা গেছে যেÑ আমেরিকা, চীন ও দক্ষিণ কোরিয়ার একদল গবেষক আরও অনেক কয়টি ভ্রƒণের মধ্যে একই ধরনের কৌশল প্রয়োগ করেছেন যেগুলোর মধ্যে লক্ষণীয় মিল রয়েছে। কৌশলটি প্রয়োগের ক্ষেত্রে তারা আগের গবেষণাগুলোর বেশকিছু ঘাটতি বা ত্রুটিবিচ্যুতি পরিহার করতে বা যথাসম্ভব কমিয়ে আনতে পেরেছেন। তাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা থেকেই বোঝা যাচ্ছে যে, আরও খানিকটা ঘষামাজা করে নেয়া হলে ক্রিসপার-কাস ৯ কৌশলটি শীঘ্র থেকে আরও বিলম্বে হোক ল্যাবরেটরি থেকে ক্লিনিকে চলে আসার উজ্জ্বল সম্ভাবনা আছে। ক্রিসপার-কাস ৯ কি? এটি এক অনন্য প্রযুক্তি যার দ্বারা জিনবিজ্ঞানী ও চিকিৎসা গবেষকরা ডিএনএ পরম্পরার অংশবিশেষ অপসারণ করে কোন কিছু যোগ করে বা বদলিয়ে জেনোমের একাংশ সম্পাদনা করতে পারেন। ক্রিসপা-কাস ৯ ব্যবস্থায় দুটি মৌলিক মলিকুল থাকে যা ডিএনএর ভেতরে মিউটেশন বা পরিবর্তন আনে। এ দুটির একটি হলো একটা এনজাইম যার নাম কাস ৯। এটা মলিকুলার কাঁচি হিসেবে কাজ করে যা জেনোমের একটা নির্দিষ্ট জায়গায় ডিএনএর দুটি তন্তুকে কেটে দেয় যাতে করে ডিএনএর টুকরোগুলোকে যোগ করা বা অপসারণ করা সম্ভব হয়। দ্বিতীয়টি হলো এক টুকরো আরএনএ যাকে বলা হয় পথ প্রদর্শক (গাইড) আরএনএ (জিআরএনএ)। এতে থাকে দীর্ঘতর আরএনএন স্ক্যাফোল্ডের মধ্যে অবস্থিত ছোট এক টুকরো পূর্ব নির্ধারিত আরএনএ সিকোয়েন্স। কাস ৯ ডিএনএ সিকোয়েন্সের একই জায়গায় গাইড আরএনএকে অনুসরণ করে এবং ডিএনএর উভয় তন্তুকে কেটে দেয়। এই পর্যায়ে কোষ বুঝতে পারে যে ডিএনএটি ক্ষতিগ্রস্ত এবং সেটি তখন ওই ক্ষতিগ্রস্ত ডিএনএকে মেরামত করার চেষ্টা করে। বিজ্ঞানীরা এখন ডিএনএ মেরামতের এই কৌশল কাজে লাগিয়ে সংশ্লিষ্ট কোষের জেনোমে এক বা একাধিক জিনে পরিবর্তন আনতে পারেন। পূর্বোল্লিখিত গবেষণায় বিজ্ঞানীরা এমওয়াইবিপিসি নামের একটি ত্রুটিপূর্ণ জিন বহনকারী জনৈক ব্যক্তির কাছ থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করেন। ত্রুটিপূর্ণ ওই জিনটির কারণে হাইপারট্রোফিক কার্ডিওমায়োপ্যাথি (এইচসিএম) হয়ে থাকে। এইচসিএম হলো এমন এক অবস্থা যেখানে হৃৎপি-ের দেয়াল খুব বেশি পুরো হয়ে ওঠে। থ্যালাসেমিয়া ও ক্যাভিজমের ক্ষেত্রে যেমন হয় তেমনি কেউ যদি উত্তরাধিকার সূত্রে এই ত্রুটিপূর্ণ জিনের একটি মাত্র কপিও পেয়ে থাকে তাহলে সেটা তার এইচসিএম ঘটানোর জন্য যথেষ্ট। লোকটির কাছ থেকে নেয়া শুক্রাণুগুলো এরপর ওই জিনের স্বাভাবিক কপি ধারণকারী ডিম্বাণুগুলো নিষিক্ত করার কাজে ব্যবহার করা হয়। বলাবাহুল্য তার শুক্রাণুগুলোর অর্ধেক ত্রুটিপূর্ণ এমওয়াইবিপিসিও জিন বহন করছিল। নিষিক্ত করার পর যেসব ভ্রƒণ তৈরি হয় সেগুলোর সেই ত্রুটিপূর্ণ জিনের একটি কপি লাভ করার সম্ভাবনা থাকে অর্ধেক অর্ধেক। এ অবস্থায় ডিএনএ এডিটিং যদি না করা হয় এবং ভ্রƒণকে পরিণত রূপ পেতে দেয়া হয় তাহলে এ থেকে যে নর-নারীর আবির্ভাব ঘটবে তার এই এইচসিএম রোগটি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ক্রিসপার-কাস ৯ সম্পাদনা কৌশলটি একটা জীবাণু প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা থেকে উদ্ভাবিত হয়েছে যা হানাদার ভাইরাসের ডিএনএকে কেটে দেয়। ক্রিসপার শব্দটা হচ্ছে ‘ক্লাস্টার্ড রেগুলারলি ইন্টারস্পেসড শর্ট স্ট্রিংগস অব আরএনএ’ কথাগুলোর সংক্ষিপ্ত রূপ। এগুলো হচ্ছে ডিএনএর অনুরূপ একটি মলিকুল আরএনএর ছোট ছোট তন্তু যেগুলো তৈরিই হয়েছে একটি ভাইরাসের ডিএনএর নির্দিষ্ট অংশের ওপর এটে থাকার জন্য। কাস ৯ হলো একটা এনজাইম যা ক্রিসপারের দ্বারা চালিত হয়ে একটি নির্দিষ্ট বিন্দুতে ডিএনএকে কেটে দেয়। জিন প্রকৌশলের উদ্দেশ্য সাধনে এই ব্যবস্থাকে সংশোধন করা সহজ। অন্তত তত্ত্বগতভাবে যেহেতু ডিএনএ ও আরএনএ সকল প্রাণীদেহে মূলত একইভাবে কাজ করে তাই যথাযথভাবে পরিবর্তন করা ক্রিসপার নিয়ন্ত্রিত মলিকুলগুলো পরিকল্পনাকারী যেখানে চান সেখানে কোষের যে কোন ডিএনএ কেটে দিতে কাস ৯কে প্রণোদিত করতে পারে এবং এভাবে জেনেটিক বর্ণমালার শিকলের মধ্যকার অবাঞ্ছিত সিকোয়েন্সগুলো দূর করতে পারে। কোষগুলো এরপর যেহেতু এ ধরনের ক্ষয়ক্ষতি মেরামত করার চেষ্টা করবে তাই জিন প্রকৌশলীরা ডিএনএর সংশোধিত সংস্করণ যোগাতে পারে এবং কোষ সেটাকে কপি করে নিয়ে সমস্যাটা দূর করে দিতে পারে। এখানেই ছিল আশার কথা। ত্রুটিপূর্ণ ডিএনএকে সংশোধন করে সেটিকে ভ্রƒণের মধ্য দিয়ে দেয়া হলে ভ্রƒণ যে জিনেটিক ব্যাধির সম্ভাবনা ধারণ করেছিল তা থেকে মুক্ত হতে পারে। সেই আশা অন্তত আংশিকভাবে হলেও পূরণ হয়েছে। যে গবেষণার কথা এর আগে উল্লেখ করা হয়েছে সেই গবেষণা শেষে দেখা যায় যে, ৭২ শতাংশ ভ্রƒণ ত্রুটিপূর্ণ জিন এমওয়াইবিপিসি ৩ থেকে মুক্ত হয়েছে। এটা এক বড় ধরনের অগ্রগতি এবং ডিএনএ এডিটিংয়ের কারণেই এটা সম্ভব হয়েছে। এ ব্যাপারে অগ্রণী ভূমিকা রেখেছেন যুক্তরাষ্ট্রের অরিগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. হংমা ও তার সহকর্মীরা। লক্ষ্যটি অর্জনের পথে হংমা ও তার দল দুটো সমস্যা কাটিয়ে ওঠেন যা ক্রিসপার কাস ৯ এডিটিং করতে গিয়ে আগে প্রায়শই সমস্যায় পড়তে হয়েছে। একটা হচ্ছে গাইডেন্স ব্যবস্থা ভুলপথে গিয়ে ডিএনএর একই চেহারার অন্য অংশকে টার্গেট করতে পারবে। তবে সুখের কথা ড. মা ও তার দল এ ধরনের ভুল টার্গেট নির্ধারণের কোন প্রমাণ পাননি। দ্বিতীয় সমস্যাটি হচ্ছে এডিটিংয়ের কাজটা সঠিক জায়গায় হলেও সেটা প্রতিটি কোষের ক্ষেত্রে নাও পৌঁছতে পারে। আগের অনেক পরীক্ষায় এমনটি ঘটতে দেখা গেছে। ড. মা ও তার সহকর্মীরা ভাবলেন যে ক্রিসপার-কাস ৯ মলিকুলকে শুক্রাণুর সঙ্গে যুগপৎভাবে ডিম্বাণুর ভেতর প্রবেশ করে দেয়া হলে এ সমস্যা হয়ত কাটিয়ে ওঠা যাবে। বাস্তবেও ঘটেছে তাই। প্রক্রিয়াটি সম্পন্ন করতে যতটা সম্ভব সময়ও দিতে হয়েছে এবং সেটা দিতে হয়েছে নিষিক্ত ডিম্বাণুর প্রথম দফা কোষ বিভাজন হওয়ার আগে। ৪২টি ভ্রƒণের ক্ষেত্রে এই কৌশলটি প্রয়োগ করা হয়েছিল। তিন দিন পর দেখা গেল যে একটি বাদে আর সমস্ত ভ্রƒণের প্রতিটি কোষের ক্ষেত্রে একই রূপান্তর ঘটেছে। বলা বাহুল্য, ওই তিন দিনের মধ্যে মূল নিষিক্ত ডিম্বাণুর বেশ কয়েকগুণ বিভাজন ঘটে গেছে। এ পর্যন্ত ভালই চলেছে। কিন্তু তৃতীয় একটা সমস্যা দেখা দিয়েছে। সেটা হলো ত্রুটিপূর্ণ বা ক্ষতিগ্রস্ত কোষ মেরামতের গুণগত মান নিয়ে। কোষগুলোর ডিএনএর ত্রুটি বা ক্ষতি মেরামত করার অন্তত দুটি উপায় আছে। একটি হচ্ছে জেনেটিক বর্ণমালার ত্রুটিপূণ বর্ণটি বাদ দিয়ে বা নতুন বর্ণ যোগ করে ছিন্ন ডিএনএর তন্তুগুলো আবার একত্রে জুড়িয়ে দেয়া। তবে যেহেতু এতে জিনটির নিজস্ব রূপান্তরও চলে আসে তাই এই প্রক্রিয়াটি চিকিৎসার কাজে ডিএনএর ত্রুটি সংশোধনের উপযোগী নয়। অবশ্যই ফসলের জিনগত ত্রুটি সংশোধনের কাজে এটি ব্যবহৃত হতে পারে। অন্য উপায়টি হচ্ছে টেমপ্লেটের কাছ থেকে পথনির্দেশনা নিয়ে ছিন্ন তন্তু জোড়া লাগিয়ে দেয়া। এতে বাড়তি কোন ত্রুটি সংযুক্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। দক্ষিণ কোরিয়ার গবেষক জিন সু কিম মনে করেন যে, আরও খানিকটা গবেষণা চালালে জিন প্রকৌশলীরা এ সমস্যার হয়ত সমাধান দিতে পারবেন। তিনি উল্লেখ করেন যে, ইঁদুরের ভ্রƒণের ক্ষেত্রে বাইরের জিনেটিক টেমপ্লেট ব্যবহারে কোন অসুবিধা হয় না। হতে পারে যে একটা কোষ কিভাবে ডিএনএর মেরামতকে প্রভাবিত করে সে সংক্রান্ত সূত্রটা জৈবরাসায়নিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার মধ্যেই রয়ে গেছে যা অনুকরণ করে কাজে লাগানো যায়। সূত্র : দি ইকোনমিস্ট
ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২
ডিজিটাল বাংলাদেশ পুরস্কার ২০২২