২৯ মার্চ ২০২০, ১৫ চৈত্র ১৪২৬, রবিবার, ঢাকা, বাংলাদেশ
 
সর্বশেষ

করোনাভাইরাস প্রতিরোধ সম্ভব

প্রকাশিত : ২৩ মার্চ ২০২০
  • মতি লাল দেব রায়

করোনাভাইরাস নামক অচেনা ভাইরাসের শিকার হয়ে এ পর্যন্ত পৃথিবীর প্রায় ৩ লাখ ৭ হাজার ২৭৮ জন আক্রান্ত হয়েছেন এবং মারা গিয়েছেন প্রায় ১৩ হাজার ৪৯ জন যা আধুনিক বিশ্বে এক মর্মান্তিক ঘটনা। তাছাড়া প্রায় ৭৯ হাজার ৯১৬ সুস্থ হয়েছেন। এই ভাইরাসটি বাদুর জাতীয় কোন পশু পাখি থেকে মানব দেহে প্রবেশ করেছে এবং প্রথম চীনের হুয়াং নামক প্রদেশের এক বাসিন্দা এই ভাইরাসে আক্রান্ত হন এবং পরবর্তীতে তা ছড়িয়ে পড়ে। অনেকেই চীনের মানুষের খাদ্যাভাস এর জন্য দায়ী বলে মনে করে থাকেন। বাদুর, কুকুর, বিরাল, শামুক, সাপ, টিকটিকি, তেলাপোকা, সব ধরনের পাখি, ব্যাঙসহ অনেক ধরনের পশু পাখি, জীবজন্তু চীনারা খেয়ে থাকে তাই জীবজন্তুর দেহ থেকেই এ ভাইরাসটি মানব দেহে ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশ খুব ঘনবসতিপূর্ণ, গ্রামের চেয়ে শহরের ঘন বসতির হার একটু বেশি। তাই বিভিন্ন কারণে শহরের মানুষরাই এই ভাইরাসে আক্রান্তের সম্ভাবনা বেশি। তাছাড়া বাংলাদেশের লাখ লাখ মানুষ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে স্থায়ী অথবা অস্থায়ী বসবাস করেন এবং অধিকাংশ প্রবাসী দেশে আসা-যাওয়া করেন। তাই প্রবাসীর মাধ্যমে এই ভাইরাসটি বাংলাদেশের মানুষের মধ্যে ছড়াতে পারে। যদি একবার এই মহামারী জনবহুল শহরগুলোতে ছড়িয়ে পড়ে তাহলে পরিস্থিতি যে কত ভয়াবহ হয়ে উঠবে তা ভাবতেও ভয় লাগে। এরই মধ্যে প্রতিবেশী দেশ ভারতে প্রায় ৩৩২ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগী ধরা পড়েছে। বাংলাদেশে মোট ২৪ জন এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। তারা সবাই বিদেশ ফেরত বলে জানা যায়। ভাইরাসটি সকল জেলাতে ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে। খালি চোখে না দেখা করোনাভাইরাসটি ইলেক্ট্রন মাইক্রোস্কোপের মাধ্যমে দেখতে হয়। ভাইরাসটি শক্তিশালী হলেও সেটিকে প্রতিরোধ করা সম্ভব বলে জানিয়েছে জাতিসংঘ শিশু তহবিল (ইউনিসেফ)। করোনা থেকে বাঁচতে সংগঠনটি আটটি পরামর্শ দিয়েছে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে মাস্ক পাওয়া যাচ্ছে। মাস্ক ভাইরাসটিকে প্রতিরোধ করতে পারে। তাই মাস্ক ব্যবহার করুন। তবে সতর্ক থাকতে হবে, স্টেইনলেস ইস্পাত, ৭২ ঘণ্টা, কার্ডবোর্ড ২৪ ঘণ্টা, তামার তৈরি বস্তুতে ৪ ঘণ্টা, অন্যান্য ধাতব প্লাস্টিক ও কাঁচের ওপর ৫ দিন বেঁচে থাকতে পারে বলে বিজ্ঞানীরা বলছেন। সিল্ক সিনথেটিক কাপড়ের চেয়ে কটন ও উলের কাপড়ে এই ভাইরাস বেশি পরিমাণ ধারণ করে। সাবান দিয়ে ধুলেই যথেষ্ট হবে। হাত বা ত্বকে ১০ মিনিটের মতো জীবিত থাকতে পারে। তাই ৬০% এ্যালকোহল মিশ্রিত জীবাণুনাশক হাতে মেখে নিলে ভাইরাসটি মারা যাবে। আংটি, ঘড়ি, সোনা ও রুপার তৈরি গয়না আপাতত ব্যবহার করে বাইরে যাওয়া ঠিক হবে না।

গরম আবহাওয়ায় করোনাভাইরাস বাঁচে না। ৭০ ডিগ্রী সেলসিয়াসের তাপমাত্রাই ভাইরাসটিকে মারতে পারে। কাজেই ভাল না লাগলেও বেশি বেশি গরম পানি পান করুন। আইসক্রিম থেকে দূরে থাকুন। লবণ মিশ্রিত গরম পানি দিয়ে গরগলা করলে গলা পরিষ্কার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টনসিলের জীবাণুসহ করোনাভাইরাস দূর হবে। করোনাভাইরাস প্রতিরোধে নাকে, মুখে আঙ্গুল বা হাত দেয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ, মানব শরীরে জীবাণু ঢোকার সদর দরজা হলো নাক-মুখ-চোখ।

হাই ব্লাড প্রেশার ও ডায়াবেটিস থাকলে করোনা সাংঘাতিক হতে পারে। বিভিন্ন দেশের রোগীর অবস্থা বিশ্লেষণ করে জানা গেছে যে, যাঁরা দীর্ঘদিন ধরে হাই ব্লাড প্রেশার ও ডায়াবেটিসে ভুগছেন তাদের জন্য এই ভাইরাসের সংক্রমণ মারাত্মক হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। বিশেষ করে রোগীর বয়স যদি ৬০ বছরের বেশি হয় এবং তিনি যদি ধূমপায়ী হন, তা হলে সংক্রমণ মারাত্মক হয়ে জীবনহানির সম্ভাবনা অনেক বেশি। ‘ল্যানসেট‘ নামক এক মেডিক্যাল জার্নালে প্রকাশিত একটি গবেষণাপত্রে জানা গেছে, ৬৫ উত্তীর্ণ পুরুষ যাঁরা ধূমপায়ী এবং অনিয়ন্ত্রিত ডায়াবেটিস ও হাই ব্লাড প্রেশারের রোগী করোনাভাইরাসের সংক্রমণে তাদের মৃত্যুহার সব চেয়ে বেশি। চীনের উহানের এক হাসপাতালে ভর্তি থাকা ১৯১ জন আক্রান্তের ওপর এক সমীক্ষায় দেখা গেছে এঁদের মধ্যে ১৩৭ জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন এবং ৫৪ জন মারা গেছেন। মৃতদের অধিকাংশেরই বয়স ৭০ বছরের বেশি, এবং এদের হাই ব্লাড প্রেশার ও ডায়াবেটিস ছিল। করোনাভাইরাসে সংক্রমণে মৃতদের শরীরে ভাইরাস থেকে যায় আমৃত্যু। এটাা খুব ছোঁয়াচে এবং এই জীবাণু হাঁচি, কাশি, লালা ও সর্দির সাহায্যে বাতাস বাহিত হয়ে ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্তের ৬ ফিটের মধ্যে থাকলে সুস্থ মানুষের আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। বিশেষ করে আক্রান্ত মানুষটির হাঁচি, কাশি, নাক ঝাড়া থেকে বা তিনি নাকে মুখে হাত দিয়ে সুস্থ মানুষের সংস্পর্শে এলে অন্যজনের শরীরে এই ভাইরাস প্রবেশ করে দ্রুত বংশ বিস্তার করে। শ্বাসনালী আক্রান্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এই ভাইরাসটি ফুসফুস এবং ক্ষুদ্রান্ত্রকেও আক্রমণ করে লাইনিং নষ্ট করে দেয়। তারপর অন্যান্য অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের কাজ করার ক্ষমতাও কমিয়ে দেয়। সাধারণ জ্বর ও সর্দি কাশির মতো উপসর্গ নিয়ে সূত্রপাত হলেও অনেক ক্ষেত্রেই অসুখটা দ্রুত মারাত্মক আকার ধারণ করতে পারে। কিছুক্ষণের মধ্যে রোগীকে ক্রমশ মাল্টি অরগ্যান ফেইলিওরের দিকে নিয়ে যায়। এ্যান্টিবায়োটিকে কোন কাজ হয় না। কিছু কিছু এ্যান্টিভাইরাল দিয়ে চিকিৎসা হলেও সব সময় তা ফলপ্রসূ হয় না। তাই চিকিৎসা বিজ্ঞানীরা এই ভাইরাসের চিকিৎসার চেয়ে প্রতিরোধ করাই জরুরী মনে করছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ করোনাভাইরাস প্রতিরোধ করার জন্য বিভিন্ন রকম প্রাথমিক কর্মসূচী নিয়েছে। বাংলাদেশে প্রাথমিক অবস্থায় যে সকল প্রতিরোধ ব্যবস্থা নেয়া দরকার তা হচ্ছে ভাইরাস শনাক্ত করার জন্য প্রয়োজনীয় টেস্টিং কিট এবং প্রয়োজনীয় মেডিক্যাল সরঞ্জাম সরবরাহ দেশের সকল হাসপাতালে আছে কিনা, না থাকলে বিদেশ থেকে জরুরী ভিত্তিতে আনার ব্যবস্থা করা এবং হাসপাতালে সরবরাহ নিশ্চিত করা। এই ভাইরাস শনাক্তকরণের জন্য টেকনিশিয়ান টিম জরুরী ভিত্তিতে তৈরি করা, সন্দেহজনক রোগীকে সঙ্গ রোধ করা, নিজে নিজে বিচ্ছিন্ন থাকা, হাসপাতালে আলাদা ইউনিট খোলা, অতিরিক্ত বেডের ব্যবস্থা রাখা, সরকারী বেসরকারী অফিস যে যে কাজ বাড়িতে থেকে করা যায় সে সকল কর্মকর্তাদের বাড়িতে বসে কাজ করতে দেওয়া, সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধ ঘোষণা করা, ছেলেমেয়েরা যাতে বাড়ির বাইরে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা, সামাজিকতা বন্ধ রাখা। অবস্থার যদি আরও অবনতি হয় তাহলে দ্বিতীয় ধাপে প্রতিরোধ ব্যবস্থা হিসেবে সকল চিড়িয়াখানা, সকল জাতীয় পার্ক, শিশুপার্ক, দর্শনার্থীদের জন্য বন্ধ ঘোষণা করা। সকল জেলখানাতে দর্শনার্থী আসা যাওয়া সীমিত করা, সকল হাসপাতালে রোগীর এটেনডেনট ছাড়া কোন দর্শনার্থীর প্রবেশ বন্ধ করা, সিনেমাহল বন্ধ রাখা, ট্রেন বা বাসের টিকেট কাউন্টারে ৬ ফিট দুরত্বে দাঁড়িয়ে টিকেট ক্রয় করা, গ্রোচারি দোকানে গ্রাহককে ৬ ফিট দুরত্বে বাহিরে লাইন দিয়ে ভিতর থেকে গ্রাহককে মালামাল সরবরাহ করা, ঢাকা শহরে গণপরিবহনে সীমিত সংখ্যক যাত্রী পরিবহন করা, সভা সমিতি বন্ধ রাখা, হ্যান্ডসেক বন্ধ রাখা, কোলাকুলি না করা ইত্যাদি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতৃবৃন্দ কর্তৃক দেশবাসীকে পরামর্শ দেওয়া খুব জরুরী। যদি পরিস্থিতি আরও অবনতি হয় তা হলে তৃতীয় ধাপে, ঢাকা থেকে সকল জেলার সঙ্গে চলাচল বন্ধ করা, প্রয়োজনে প্রত্যেক জেলা থেকে অন্য জেলায় যাতায়াত বন্ধ রাখা, বাস চলাচল বন্ধ রাখা, সকল খেলা সাময়িক স্থগিত করা, দেশের আদালতের কার্যক্রম সীমিত করা, বাস টার্মিনাল, লঞ্চ টার্মিনালে লোকসমাগম নিয়ন্ত্রণ করা, দেশের সকল ডাক্তারকে এই ভাইরাস সম্পর্কে ধারণা দেওয়া, এবং প্রতিটি হাসপাতালে প্রতিদিন সকলকে পরিস্থিতি সম্পর্কে ব্রিফ করা এবং দিকনির্দেশনা দেওয়া। সব কথার বটম লাইন হচ্ছে, প্রতিটা মুহূর্তে প্রতিটি কাজে একজন আরেকজন থেকে ৬ ফিট দূরে অবস্থান করুন এবং এই তথ্যটি অপরের সঙ্গে শেয়ার করুন, নিজে বাঁচুন এবং একজনকে বাঁচতে সাহায্য করুন, যা আপনার আমার সকলের মানবিক ও নাগরিক দায়িত্ব। পৃথিবীর ইতিহাসে এক বৈশ্বিক মহামারী মোকাবেলার জন্য দক্ষ চিকিৎসক, টেকনিশিয়ান টিম তৈরি করে এবং একটি বিশেষ তহবিলের অনুমোদন করে অগ্রিম সকল পরিকল্পনা নিয়ে প্রস্তুত থাকা এখন খুব জরুরী।

লেখক : নিউইয়র্ক প্রবাসী

প্রকাশিত : ২৩ মার্চ ২০২০

২৩/০৩/২০২০ তারিখের খবরের জন্য এখানে ক্লিক করুন


শীর্ষ সংবাদ: