২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৫ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

নারী-পুরুষ সমতাভিত্তিক প্রতিবেদন বাংলাদেশ বিশ্বের ৪৭তম


নাজনীন বেগম

অর্ধাংশ নারী জাতি পিছিয়ে পড়া বলতে যা বোঝায় বাংলাদেশ সেখান থেকে অনেক ওপরে উঠে এসেছে। গৎবাধা, রক্ষণশীল সমাজের মূল শেকড়ে গ্রথিত বিভিন্ন অপসংস্কার, অপকৌশল কিংবা অশুভ তৎপরতাকে সহজ-স্বাভাবিকভাবে অতিক্রম করা দুঃসাধ্য। আধুনিক যান্ত্রিক পদ্ধতি মানুষ যত তাড়াতাড়ি নিতে পারে ঠিক ততখানিই পিছিয়ে থাকে লালন করা চিরায়ত চেতনায়। ফলে নতুন তথ্যপ্রযুক্তির সঙ্গে নীরব লড়াই জিইয়ে থাকে যুগ যুগ ধরে গড়ে ওঠা বিশ্বাস আর মূল্যবোধের সঙ্গে। যা সমাজের দুর্বল আর অসহায় শ্রেণীর জন্য হয় এগিয়ে যাওয়ার পর্বতপ্রমাণ প্রতিবন্ধকতা। মানস-চৈতন্যের আধুনিকীকরণ সবচেয়ে কঠিন এবং অনধিগম্য। এটা শুধু বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই নয় সারা বিশ্বের সমাজ বিবর্তনের ধারায় এই চিরায়ত সত্যটি প্রমাণিত এবং উদ্ভাসিত। ফলে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে মানবসভ্যতা সেভাবে দ্রুতগতিতে এগিয়ে যেতে পারেনি মানসিক স্থবিরতার কারণে। সেই অসাড় চৈতন্যে সাড়া জাগতে অসভ্য, বন্য আর বর্বর মানুষকে আরও অনেক অপেক্ষা করতে হয়েছে তাদের মানস চেতনাকে যুগোপযোগী করতে। এক সময় সভ্য মানুষের মনমানসিকতায় নতুন চিন্তা আর সময়ের আধুনিক বোধ জাগতে থাকে। এক বিশিষ্ট পর্যায়ে বিজ্ঞানের অগ্রযাত্রা আর চেতনার উত্তরণ সভ্য মানুষকে নতুন মাত্রায় নিয়ে যায়। এটা শুধু মানবসভ্যতার ঐতিহাসিক পর্যায়ই নয় নারী-পুরুষের সমতার ক্ষেত্রেও এর প্রভাব সুদূরপ্রসারী। একসময় নারীই ছিল পরিবার এবং সমাজ ব্যবস্থার একচ্ছত্র কর্ণধার। বংশপঞ্জি এবং সম্পদের মালিকানা সবই মায়ের দিক থেকে বিবেচনায় আনা হতো। সভ্যতার উত্থান-পতনের ক্রমবির্বতনের অস্থির সময়গুলোতে নারীর একাধিপত্যে ফাটল ধরে। সেটাও আসতে মানব সমাজের অপেক্ষা দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়েছে। কিন্তু আধুনিক প্রযুক্তি সমৃদ্ধ শিল্পোন্নত দেশগুলোতে নারী-পুরুষের বৈষম্য এখনও দৃশ্যমান। নারীরা একসময় যে ক্ষমতা হারিয়ে বসে সেটা তারা আর কখনও ফিরে পায়নি। সুতরাং সামগ্রিক অর্থে লিঙ্গ সমতা অর্জনও সেভাবে হয়নি। তার মানে এই নয় যে উন্নয়নের বিভিন্ন সূচকে নারীরা কোনভাবেই পিছিয়ে আছে। প্রগতির সমৃদ্ধ জোয়ারে নারীদের সম্পৃক্তকরণ টেকসই উন্নয়নের অপরিহার্য শর্ত। বাংলাদেশ আজ বিশ্বে সামগ্রিক উন্নয়নের যথার্থ রোল মডেল। এটা ইতোমধ্যে স্বীকৃত এবং চিহ্নিত। এর মধ্যে আবার নতুন চমক এসেছে লিঙ্গ সমতায়ও কিছু জায়গায় বাংলাদেশ একেবারে প্রথম স্থানে। বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের এক প্রতিবেদনে প্রকাশ পায় উন্নয়নের ১৪টি সূচকের মধ্যে বাংলাদেশ ৪টি সূচকে বিশ্বের অগ্রগণ্য হিসেবে বিবেচিত হয়েছে। ‘দ্য গ্লোবাল জেন্ডার গ্যাপ-রিপোর্টে’ বিশ্বের ১৪৪টি দেশের ওপর সমীক্ষা চালানো হয়। সামগ্রিক উন্নয়নে নারী-পুরুষ সমতায় বাংলাদেশের জায়গা ৪৭-এ। আর দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে এই সমতার মাপকাঠি একেবারে শ্রেষ্ঠ আসনে বাংলাদেশ। ২০০৬ সাল থেকে এই বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরাম লিঙ্গ সমতার ওপর তাদের প্রতিবেদন প্রকাশ করে আসছে। ২০১৫ সাল থেকে বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে শীর্ষস্থান দখল করলেও ২০১৫-১৬ সালে বৈশ্বিক অবস্থানে একটু পিছিয়ে ছিল। ২০১৬ সালে যেখানে বাংলাদেশের জায়গা ছিল ৭২তম সেখানে মাত্র ১ বছরে ২৫টি দেশকে অতিক্রমে করে ৪৭তম পর্যায়ে স্বীয় স্থান মজবুত করে লিঙ্গ সমতার যে চারটি সূচকে বাংলাদেশ বিশ্বে প্রথম হওয়ার গৌরব অর্জন করে সেটা ইতোমধ্যে অভ্যন্তরীণভাবেও প্রমাণিত হয়েছে। শিক্ষায় মেয়েদের অংশগ্রহণ ছেলেদের তুলনায় কোনভাবেই কম নয়। বিশেষ করে প্রাইমারী এবং মাধ্যমিক শিক্ষায় সমতাভিত্তিক অনুপাতে নারী-পুরুষ একেবারে সমানই শুধু নয় সারাবিশ্বে অগ্রণী অবস্থানেও বটে। গত কয়েক বছরের সরকারপ্রধানের সূচকেও নারী-পুরুষের সমতায় বাংলাদেশ শীর্ষ স্থানে প্রতিবেদনটির তথ্য অনুসারে। আর জন্মহারেও নারী-পুরুষের কোন পার্থক্য বাংলাদেশে নেই বলে প্রতিবেদনটি জানায়। এটা সত্যি যে বাংলাদেশে সামগ্রিক শিক্ষা ব্যবস্থার মানোন্নয়নের সঙ্গে নারী যে পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে নেই তার জরিপ উঠে আসে এই বিশ্ব প্রতিবেদনে। স্বাস্থ্যসেবা, শ্রমবাজার, উচ্চতর শিক্ষা কিংবা মন্ত্রী-উপমন্ত্রীর পদে নারীরা এখনও পুরুষের তুলনায় পিছিয়ে। তবে আইনী পর্যায়ে নারী-পুরুষের অনুপাত, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, ব্যবস্থাপকসহ অন্যান্য পেশাজীবীতেও নারী-পুরুষের সমান অংশীদারিত্ব উল্লেখ করার মতো যা এই লিঙ্গ সমতা প্রতিবেদনে স্পষ্ট হয়। যা সমৃদ্ধ বাংলাদেশকে বিশ্বের বিশিষ্টতম অবস্থানে অভিষিক্ত করে। আর দক্ষিণ এশিয়ায় তো বাংলাদেশ একেবার রাজসিক মর্যাদায়। কারণ এই অঞ্চলের অন্যান্য দেশ বাংলাদেশ থেকে এত পেছানো যা বর্ণনায়ও আসে না।

বিশ্ব প্রতিবেদনে বাংলাদেশের এই সম্মানজনক গৌরবের সঙ্গে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে নারীদের এগিয়ে যাওয়ার বিষয়টি দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরা যেতে পারে। জনসংযোগ মন্ত্রণালয়ের এক তথ্যে উঠে আসে উপজেলা পর্যায়ে প্রশাসনে নারীর ক্ষমতায়নের এক উজ্জ্বল চিত্র। সেখানে সচিবের মতো সর্বোচ্চ আমলাতান্ত্রিক অবস্থানে ১০ জন নারী সফলতার সঙ্গে এই শীর্ষে নিজের জায়গা মজবুত করেন। শুধু তাই নয়, ছয়জন নারী জেলা প্রশাসকের দায়িত্বে থেকে নারীর ক্ষমতায়নকে মহিমান্বিত করেছেন। ১৬ জন নারী অতিরিক্ত জেল প্রশাসকের পদে সফলভাবে অধিষ্ঠিত আছেন। যা বাংলাদেশের নারীর প্রগতি এবং ক্ষমতায়নকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান করে। বর্তমানে সংখ্যায় কম হলেও সময়ের দাবিতে সেটা আরও বাড়তে থাকবে।