২৫ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৬ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

বঙ্গবন্ধুর জীবন ও রাজনীতি এবং বাংলাদেশের সৃষ্টি


(গতকালের পর)

মুজিব ভাইয়ের পথ ধরো-বাংলাদেশ স্বাধীন কর।” এমন পরিস্থিতিতে কোন প্রকার কাগজি সহায়তা ছাড়া স্বভাবসূলভ, সহজ ও সকলের বোধগম্য চলতি ভাষায় আঠারো মিনিটের যে বক্তৃতা তিনি করলেন, তা কেবল রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা নয়, রীতিমতো যুদ্ধের অপারেশন অর্ডার। যেন আজ তিনি এক গেরিলা যুদ্ধের অভিজ্ঞ সেনাপতি হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। বক্তৃতার প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি বাক্য, কন্ঠের উত্থান-পতন সবই ছিল চুম্বকের ন্যায় আকর্ষণীয়, মন্ত্রমুগ্ধকর এবং সর্বোপরি সময়োপযোগী। আর তাই তো শাসকগোষ্ঠীর ষড়যন্ত্র নিয়ে শঙ্কিত সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতা উল্লেখ করেন “প্রত্যেক ঘরে ঘরে দুর্গ গড়ে তোল... আমি যদি হুকুম দেবার নাও পারি, রাস্তাঘাট যা কিছু আছে তোমরা সব বন্ধ করে দেবে... এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম। এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম। জয় বাংলা।” মাত্র আঠার মিনিট শুধুমাত্র সমবেত লাখ লাখ মানুষের সম্মুখে নয়, সমগ্র জাতির উদ্দেশে তিনি দিকনির্দেশনা দিচ্ছিলেন। অত্যন্ত শ্রুতিমধুর অথচ বন্দুকের নল থেকে এইমাত্র বেরিয়ে যাওয়া বুলেটের মতো তপ্ত ভাষণ, যা শুনলে পঁয়তাল্লিশ বছর পরেও আজ বৃদ্ধের রক্তে আগুনের উত্তাপ ছড়ায়। এমন ভাষণ আগামী হাজার বছরেও কেন, আর কখনোই হওয়ার সম্ভাবনা ও কারণ নেই।

বঙ্গবন্ধু তাঁর এই বক্তব্যের মাধ্যমে সাড়ে সাত কোটি মানুষকে সবুজ সঙ্কেত দিয়ে দিলেন। একটি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দলের, সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগণের ভোটে নির্বাচিত নেতার পক্ষে কৌশলে অথচ এর চেয়ে প্রকাশ্যে আর কিভাবে স্বাধীনতার ডাক দেয়া সম্ভব? ৮ মার্চ ১৯৭১ থেকে ২৫ মার্চ পর্যন্ত তাঁর নির্দেশ বাঙালীরা অক্ষরে অক্ষরে পালন করেছে। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে শান্তিপূর্ণভাবে একদিকে চলেছে অসহযোগ আন্দোলন, অন্যদিকে প্রতিটি জেলা, মহকুমা, থানা ও গ্রামে গ্রামে প্রকাশ্যে চলেছে গেরিলা যুদ্ধের প্রস্তুতি। মাত্র ১৫/১৬ দিনেই সারাদেশে কয়েক লাখ কিশোর, তরুণ, যুবা, এমনকি ষাট বছরের বৃদ্ধও স্বতঃস্ফূর্তভাবে এই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়ে লড়াইয়ের জন্য মোটামুটি প্রস্তুত হয়ে যায়। ১৬ মার্চ ক্ষমতা হস্তান্তর ও সাংবিধানিক খুঁটিনাটি বিষয় নিয়ে ভাবি প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের সঙ্গে প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান আলোচনা শুরু করলেন। কণ্টকাকীর্ণ দীর্ঘ রাজনৈতিক পথ পাড়ি দেয়া মুজিব প্রতিপক্ষের মুখচ্ছবি দেখে মনের সম্পূর্ণ চিত্রই পড়তে পারছিলেন। তিনি বুঝতে পারছিলেন যে, আলোচনার নামে এরা সময়ক্ষেপণ করছে। কিন্তু তাঁর পক্ষ থেকে আলোচনার দরজা বন্ধ করে দেয়ার মতো হঠকারী সিদ্ধান্ত তিনি নিতে পারেন না। ইতিহাসের কাঠগড়ায় তাহলে তাঁকে ভবিষ্যতে দাঁড়াতে হতে পারে। এভাবেই ঘটনাবহুল ১৬ থেকে ২৪ মার্চ অতিক্রম করে।

২৫ মার্চ সন্ধ্যার কিছু পরই বঙ্গবন্ধু জানতে পারেন যে, প্রেসিডেন্ট গোপনে ঢাকা ছেড়েছেন। এমন সংবাদে তিনি নিশ্চিত হন যে, তাঁর অনুমান সত্য হলো। আলোচনার নামে এতদিন ইয়াহিয়া-ভুট্টো সময়ক্ষেপণ ও রাজনৈতিক ভাঁওতাবাজি চালিয়েছেন। তিনি দ্রুত তাঁর সহকর্মীদের নিরাপদ আশ্রয়ে যাওয়া, আক্রান্ত হলে তাদেরকে সীমান্ত অতিক্রম এবং ভারত সরকারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে একটি সরকার গঠন ও মুক্তিযুদ্ধ সংগঠিত করার বিস্তারিত দিকনির্দেশনা দিয়ে বিদায় করেন। কিন্তু নিজে বিভিন্ন যুক্তি দেখিয়ে ৩২ নম্বরেই থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। তাঁর এই একগুঁয়ে সিদ্ধান্তের পেছনে যে যুক্তিগুলো ছিল তা হলোÑ

তিনি পালিয়ে গেলে পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকার প্রতিটি ঘরে হানা দেবে এবং তাঁকে না পেয়ে উন্মাদের মতো মানুষ হত্যা করবে। বঙ্গবন্ধু পালিয়ে গেলে পাক সরকার বাঙালীদের কাছে তাদের নেতাকে কাপুরুষ ও স্বার্থপর হিসেবে প্রচার করবে। ফলে তাঁর প্রতি বাঙালীদের হিমালয়সম বিশ^াস ও আস্থায় ভাটা পড়বে। তাদের দেশপ্রেম ও ঐক্যে চিড় ধরবে। স্বাধীনতা আবারও বহুদিনের জন্য পিছিয়ে যাবে। শেখ মুজিবুর রহমান পালিয়ে গেলে বহির্বিশে^ তাঁকে বিচ্ছিন্নতাবাদীর অপবাদ দেয়া সহজ হবে। এতে পাকিস্তানের পক্ষে বিশে^র সহানুভূতি টানা যাবে। এমন পরিস্থিতিতে বহির্বিশে^ বাঙালী জাতির মর্যাদা ক্ষুণœ হবে এবং প্রতিবেশী ভারতও আন্তর্জাতিক চাপে সহযোগিতা করতে পারবে না। মানুষ একবারই মরে, দুইবার নয়। মৃত্যুর জন্য তিনি সর্বদা প্রস্তুত। বঙ্গবন্ধুকে গ্রেফতার কিংবা হত্যা করা হলে বাঙালীর আবেগ, ঐক্য ও দেশপ্রেম শতগুণ বৃদ্ধি পাবে। বিশ^বিবেক বাঙালীর পক্ষে যাবে। তাদের স্বাধীনতা অর্জন সহজ ও দ্রুততর হবে।

সহকর্মীরা উপস্থিত থাকাকালেই ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে সেনাবাহিনীর মুভমেন্টের এবং রাত বাড়তে থাকলে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে আক্রমণের খবর আসতে থাকে। এমন পরিস্থিতিতে শেখ সাহেব শুধু উত্তেজিতই নয়, রীতিমতো বেপরোয়া হয়ে ওঠেন। সম্ভবত তাঁর পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী উত্তেজিত বঙ্গবন্ধু উচ্চকণ্ঠে সেই রাতে পিলখানায় ইপিআর সদর দফতরের অপারেটরকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সামরিক-বেসামরিক বাঙালীদের ওপর পাক বাহিনীর আক্রমণ এবং সেই পরিপ্রেক্ষিতে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা করছেন এই মর্মে সংবাদ চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দসহ সর্বত্র ছড়িয়ে দেয়ার আহ্বান জানান। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে বাঙালী ঐ বীর অপারেটর বিলম্ব না করে তাঁর স্বাধীনতার বার্তা চট্টগ্রামে পৌঁছে দেন। অপরদিকে একদল বেতার প্রকৌশলী ঢাকার বলধা গার্ডেনের পাশের্^ অবস্থান গ্রহণ করে সহজে বহনযোগ্য, হালকা একটি ট্রান্সমিটার থেকে রেডিও পাকিস্তানের ঢাকা ফ্রিকোয়েন্সির পাশে সেটকরত টেপরেকর্ডারে বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে পূর্বে ধারণকৃত স্বাধীনতার অপর ঘোষণাটি কয়েকবার প্রচার করার পর দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন। রাত বারটার পর পাকিস্তানের সেনাবাহিনী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে যে হত্যাযজ্ঞ শুরু করে তা নয় মাস অব্যাহত থাকে। এর বিপরীতে বাঙালীরা, যারা এতদিন শাসকগোষ্ঠীর দ্বারা নিগৃহীত হয়েছিল, বঙ্গবন্ধুর নির্দেশ অনুযায়ী তারা অস্ত্র তুলে নেয়। শুরু হয় মুক্তিযুদ্ধ। ২৫ মার্চ রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব গ্রেফতার হন এবং তাঁকে পাকিস্তান নিয়ে যাওয়া হলেও নয় মাস যুদ্ধের প্রতিটি মুহূর্তে তিনি ছিলেন বাঙালীর চেতনায় উপস্থিত। তিনিই ছিলেন যুদ্ধের মূল শক্তি, অনুপ্রেরণাদাতা এবং প্রাণপুরুষ। ভয়াবহ রক্তক্ষয়, অসহনীয় দুর্ভোগের পরও ১৬ ডিসেম্বর বিজয় হয়েছে হাজার বছরের পরাধীন জাতির। বুক টান করে দাঁড়িয়েছে হাজার বছর যাবত নিগৃহীত, শোষিত ও লাঞ্ছিত বাঙালী জাতি। যুগে যুগে অসংখ্য দেশপ্রেমিক বিপ্লবী ও নেতার জন্ম হয়েছিল এই দেশে; কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানই কেবল হেমিলনের বংশীবাদকের ন্যায় এই জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করে যে মোহনায় নিয়ে এসেছিলেন, সেখানেই সাক্ষাত হয়েছিল স্বাধীনতার। অতএব সৃষ্টিকর্তাকে অসংখ্য ধন্যবাদ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বাঙালীদের মুক্ত করতে এই বাংলায় প্রেরণের জন্য। এই দেশের যে কোন কঠিন পরিস্থিতির জন্য বার বার যেন জন্ম হয় শেখ মুজিবুর রহমানের। (সমাপ্ত)

সম্পর্কিত: