২২ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট ৮ ঘন্টা পূর্বে  
Login   Register        
ADS

অভিমত ॥ জনতার মঞ্চ নিয়ে এত আতঙ্ক কেন?


বিএনপি মহাসচিবের ভাষ্য অনুযায়ী নবনিযুক্ত সিইসি নাকি বিতর্কিত ব্যক্তি। তিনি নাকি জনতার মঞ্চের একজন সংগঠক ছিলেন। যতটুকু জানি বর্তমান সিইসি নূরুল হুদা তখন কুমিল্লার জেলা প্রশাসক। আর জনতার মঞ্চ গড়ে উঠে ঢাকায় জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে। কি করে তিনি মঞ্চে এলেন বিএনপিই ভাল বলতে পারবে। তবে সিইসি তো নিজেই বলেছেন তিনি জনতার মঞ্চের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন না। তিনি তো বিএনপির সময় কুমিল্লা, ফরিদপুর দু-দুটি জেলায় ডিসি ছিলেন। তবে বোঝা গেল না বিএনপি তাকে কেন ২০০১-এ ক্ষমতায় এসে চাকরিচ্যুত করেছিল।

২০০১ এবং তৎপরবর্তী সময়ে যাদের চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল এরা সবাই মুক্তিযোদ্ধা। জনতার মঞ্চ- এখনও যদি কোন রাজনৈতিক দলকে তাড়া করে থাকে তা হলো বিএনপি। কেন? ৯৬-এর ১৫ ফেব্রুয়ারির কলঙ্কজনক ভোটারবিহীন নির্বাচনের পর সৃষ্ট গণআন্দোলনের পরিসমাপ্তি ঘটে ‘জনতার মঞ্চ’-এর মাধ্যমে। মেয়র হানিফ এ মঞ্চ গঠন করেন ৯ মার্চ। মনে পড়ে ২৪ মার্চ বাংলাদেশ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অফিস বন্ধ করে মিছিলসহকারে মঞ্চে গিয়ে জনগণের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে।

রাজনীতিবিদদের মনে রখতে হবে সব রাজনৈতিক দল যদি ‘গোস্বা’ করে নির্বাচন বয়কট করে বসে দেশের সবকিছু থেমে যাবে না। বিদ্যুত চলবে, পানি প্রবাহিত হবে, রাস্তায় গাড়ি চলবে। কারণ রাষ্ট্রের রহযবৎবহঃ শক্তি তার প্রজাতন্ত্রের অবকাঠামো। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা তাদের সাংবিধানিক দায়ভার অনুযায়ীই রাষ্ট্র কাঠামো সচল রাখে, রাজনীতিবিদরা যেটা করেন না, করতে পারেন না। ১৫ আগস্ট ৭৫-এর ট্র্যাজেডির পর রাজনৈতিক শক্তির অবক্ষয় ঘটে, ৩ নবেম্বর থেকে ৭ নবেম্বর কোন রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ ছিল না, রাষ্ট্র তখনও চলছিল। রাজনৈতিক কর্তৃপক্ষ ১৫ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের পর ছিল পলায়ন পর। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরাই রাষ্ট্র ব্যবস্থাকে তখন সচল রাখে।

এই জনতার মঞ্চের কারণেই তখন ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত বিএনপি সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়। ২০০১-এ ক্ষমতায় এসে বিএনপি প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে জনতার মঞ্চে অংশগ্রহণের কারণে ৭৩ ব্যাচের অনেক মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করে। অক্টোবরে ক্ষমতা গ্রহণ করে নবেম্বর থেকেই মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা শুরু হয়। বিশেষ করে বিসিএস (পুলিশ) ও বিসিএস (প্রশাসন)-এর মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের অনেককেই চাকরিচ্যুত করা হয়। কোন কারণ দর্শানোর সুযোগ না দিয়েই ২৫ বছর চাকরি পূরণ হওয়ার (যেন ২৫ বছর চাকরি করা অপরাধ) শর্তে বাধ্যতামূলক অবসর প্রদান করা হয়।

২০০৮ পরবর্তী সরকার, যারা মূলত জনতার মঞ্চের সুবিধাভোগী, তারাও এর কোন প্রতিকার করেনি। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি অবিচারের কোন সুরাহা করেনি। তাদের আদালতের শরণাপন্ন হতে হয়। আদালতের রায়ে তাদের ন্যায্য পদোন্নতি দিতে সরকার বাধ্য হয়। কিন্তু তাদের চাকরিজীবন থেকে যে ৪ হতে ৫ বছর হারিয়ে যায় তা তারা কোনদিন ফিরে পাননি। ’৯৬ পরবর্তী সরকার তাদের যথাসময়ে যোগ্যতা অনুযায়ী পদোন্নতি দিলে এদের মধ্য থেকেই প্রশাসন ও পুলিশের সব উচ্চতর পদ পূরণ হতো। ২০০১-এ হয়ত স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির নির্বাচনে বিপর্যয় ঘটত না।

জনতার মঞ্চে যোগদান ছিল ’৯৬ সালে। তারপরও জনতার মঞ্চে যোগদান আইন বা সংবিধান পরিপন্থী হলে ২০০১ সালে ১৭ লাখেরও বেশি কর্মচারীর বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা সরকার নিতে পারত আইনের বিধান অনুযায়ী। তা না করে শুধু মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করা হয় কেন?

জনতার মঞ্চ পরিশেষে রূপ নেয় ১৫ ফেব্রুয়ারি ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকার উৎখাতের আন্দোলনে। সারাদেশ আন্দোলনে টালমাটাল, প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরাও তখন বসে থাকতে পারেনি। অবৈধ সরকার উৎখাতে তারাও ভূমিকা রাখে। ১৭ লাখের উপরে কর্মকর্তা-কর্মচারী আন্দোলনে সক্রিয় ভূমিকা পালন করে। ২০০১-এ বিএনপি সরকার এর প্রতিশোধ নেয় মুক্তিযোদ্ধা কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করার মাধ্যমে।

মুক্তিযোদ্ধারা বা সরকারী কর্মচারীরা জনতার মঞ্চ তৈরি করেনি। মঞ্চ তৈরি করেছিলেন ঢাকার নির্বাচিত মেয়র মোঃ হানিফ। প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা একাত্মতা প্রকাশ করেছিল জনতার সঙ্গে প্রতীকী হিসেবে মঞ্চে যোগদান করে। বাংলাদেশ প্রজন্মের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা এরকম একটি কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত হতে পারায় এখনও গর্ববোধ করে। তাদের ওপর অর্পিত সাংবিধানিক দায়িত্ব তারা সেদিন পালন করেছিল।

জনতার মঞ্চের সংগঠক ছিলেন ঢাকার তৎকালীন মেয়র মোঃ হানিফ। ১৫ ফেব্রুয়ারির ভোটারবিহীন নির্বাচন সারাদেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন তীব্রতর করে তোলে। জনগণ রাস্তায় নেমে আসে। ঐ নির্বাচনে বঙ্গবন্ধুর খুনীদেরও সংসদে বসার সুযোগ করে দেয়া হয়। নির্বাচনের নামে প্রহসন দেশে-বিদেশে কোথাও গ্রহণযোগ্যতা পেল না। মন্ত্রিপরিষদ গঠিত হলো; কিন্তু কর্মচারীদের বাধার মুখে মন্ত্রীরা সচিবালয়ে ঢুকতে পারলেন না। এরই মধ্যে ৯ মার্চ মেয়র মোঃ হানিফের নেতৃত্বে প্রেসক্লাবর সামনে আন্দোলনের মঞ্চ প্রস্তুত করা হয়। শেখ হাসিনা তার ভাষায় অবৈধ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দিলে আন্দোলন নতুন মাত্রা পায়। সরকার পুলিশ দিয়ে মঞ্চ ভাংতে গিয়ে ব্যর্থ হয়। বেগম মতিয়া চৌধুরী (বর্তমানে কৃষিমন্ত্রী ) ভাঙ্গা মঞ্চ আঁকড়ে পড়ে থাকেন। পুলিশ তাকে সরিয়ে দিতে ব্যর্থ হয়। মনে পড়ে পুলিশের কবীর আহমদ চৌধুরী বাংলাদেশের বিরাট পতাকা হাতে তার তিন ছেলেকে নিয়ে বেগম মতিয়া চৌধুরীকে ঘিরে দাঁড়ায়। চাকরিচ্যুত পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবে সে আন্দোলনের মাঠে ছিল সক্রিয়। পুলিশরা তাকে সমীহ করত। ২৪ মার্চ সচিবালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সচিবালয় ছেড়ে মঞ্চে এসে আন্দোলনের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে।

জনতার মঞ্চের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশের সাংগঠনিক কাঠামো গঠিত হয়েছিল প্রশাসনসহ ২৮ ক্যাডারের সমন্বয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী সমন্বয় পরিষদ গঠনের মাধ্যমে। ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীর প্রধান সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেন। জনতার কাতারে যখন প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীরা যোগ দেয় তখন সরকারের পদত্যাগ সময়ের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। ৩০ মার্চ বিএনপি সরকারকে পদত্যাগ করতে হয়। হয়ত বিএনপি ’৯৬-এর দুঃসহ স্মৃতি এখনও ভুলতে পারেনি, তাই ‘জনতার মঞ্চ’ নিয়ে তাদের এত উৎকণ্ঠা।

লেখক : সাবেক যুগ্মসচিব ও জনতার মঞ্চের একজন সংগঠক