১৮ নভেম্বর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

চ্যারিটি এক লাভজনক ব্যবসা


একদা সমাজে দান-দাক্ষিণ্যের বেশ চল ছিল। বিত্তবানরা দীন দরিদ্রদের কিছু দান খয়রাত করত। এই দেয়ার পিছনে কখনও ধর্মীয় তাগিদ, কখনও পাপবোধের তাড়না কাজ করত। তবে এই দান-দাক্ষিণ্যের ব্যাপারটা যত না ছিল গ্রহীতার কল্যাণ বা অধিকার বা মর্যাদার প্রশ্ন তার চেয়ে বেশি ছিল দাতার আত্মা বা হৃদয়ের বিষয়। সে কারণেই সমান পক্ষগুলোর মধ্যে কিংবা বন্ধুদের মধ্যে কোন দান-দাক্ষিণ্য হতে পারে না। এসব কারণেই দান-দাক্ষিণ্য দীর্ঘদিন ধরেই ছিল এমন এক কর্মকা- যার শিকড় ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় পরিম-লের মধ্যেই নিহিত।

তারপর এল জনহিতৈষণা। সেটি দান-দাক্ষিণ্যের স্থান দখল করে নিল। স্বেচ্ছায় কিছু দান করার বিষয়টি মূলত সমাজ পরিবর্তনের হাতিয়ার হিসেবে নতুন ধারণাগত ব্যঞ্জনা লাভ করার ফলেই এমনটি হলো। এর মধ্যে দিয়ে আরেকটা ব্যাপারও ঘটল। দান-দাক্ষিণ্যের কাজটা ধর্মীয় কাঠামো থেকে সেকুলার কাঠামোয় স্থানান্তরিত হয়ে গেল।

আর আজ আগমন ঘটেছে জনহিতৈষী পুঁজিবাদের। ২০০৬ সালে দি ইকনোমিস্ট পত্রিকায় ‘দি বার্থ অব ফিলানথ্রোক্যাপিটালিজম’ শীর্ষক একটি রিপোর্ট পরিবেশিত হবার পর এই শব্দটি চালু হয়ে যায়। জনহিতৈষীদের বরং বিনিয়োগকারীদের মতোই কেন আচরণ করা প্রয়োজন সেটার ব্যাখ্যা করে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয় যে, জনহিতৈষণার কাজটা এখন মুনাফামুখী মূলধন বাজারের মতোই হওয়া দরকার এই ভাবনাটি নতুন জনহিতৈষীদের এক অভিন্ন বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয়েছে।

দু’বছর পর বের হলো ম্যাথু বিশপ ও মাইকেল গ্রীন রচিত গ্রন্থ ‘ফিলানথ্রোক্যাপিটালিজম ॥ হাউ দ্য রিচ ক্যান সেভ দ্য ওয়ার্ল্ড’। বইটির মূল বক্তব্য হলো ধনাঢ্য ব্যক্তিবর্গ ও দরিদ্র রাষ্ট্রসমূহের এই বিশ্বে গরিবদের রক্ষা করার কাজটা ধনীরা নিজেরা ছাড়া আর ভালভাবে কে করতে পারে?

ফিলানথ্রোক্যাপিটালিজমের অভ্যুদয়ের মধ্য দিয়ে অবশেষে হয়ত সামনে চলে এসেছে সেই বিষয়টি যা এতদিন নীরবে নিঃশব্দে অনুধাবন করা হতো অথচ কদাচিতই সুস্পষ্টভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। আর সেটা হলো পুঁজিবাদী অমিতাচার এবং জনহিতৈষী প্রতিবিধানের মধ্যেকার মিথোজীবী সম্পর্ক।

জনহিতৈষণা কখন বর্জন করা হলো

এটা কোন অপ্রত্যাশিত ব্যাপার নয় যে, প্রথম দিকের বড় বড় জনহিতৈষী ব্যক্তি একই সঙ্গে তাদের যুগের সবচেয়ে বড় পুঁজিপতিও ছিলেন। এটাও কোন কাকতালীয় ব্যাপার নয় যে, নিজেদের জনহিতকর ঐতিহ্যের জন্য আজও যাদের স্মরণ করা হয় যেমন জন ডি রকফেলার, এন্ড্রু কার্নেগী, এন্ড্রু মেলন, সীল্যান্ড স্ট্যানফোর্ড, জেমস বুকানন ডিউক এদের অনেকের নাম উইকিপিডিয়ায় ‘ডাকাত ব্যারন হিসেবে চিহ্নিত ব্যবসায়ীদের’ তালিকায় সন্নিবেশিত আছে।

জনহিতৈষণার কাজে অর্থ ছড়িয়ে দেয়ার পরিমাণ সম্প্রতি বেশ বেড়ে গেছে। ২০১৫ সালের ইন্ডিয়ান ফিলানথ্রোপি রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়েছে যে, জনহিতকর কাজে ভারতে বৈদেশিক অর্থায়ন ২০০৪ থেকে ২০০৯ সাল পর্যন্ত সময়ের মধ্যে দ্বিগুণেরও বেশি হয়েছে। অর্থাৎ ২০০৪ সালের ৮০ কোটি ডলার থেকে লাফ মেরে ২০০৯ সালে দাঁড়িয়েছে ১৯০ কোটি ডলার। কেউ যদি এই ব্যাপক পরিসরে বৃদ্ধির অর্থোদ্ধারের চেষ্টা করে তবে তাঁকে এসব পরিসংখ্যানের উর্ধে উঠে কর্পোরেটগুলোর জনহিতকর উদ্যোগের অর্থনৈতিক তাৎপর্যের সন্ধান করতে হবে। গত মাসে প্রকাশিত ‘নো সাচ থিং এ্যাজ এ ফ্রি গিফট : দি গেটস ফাউন্ডেশন এ্যান্ড দি প্রাইস অব ফিলানথ্রোপি’ গ্রন্থে সমাজবিজ্ঞানী লিন্ডসে ম্যাকগোয়ে ঠিক এ কাজটাই করার চেষ্টা করেছেন।

জনহিতকর কর্মকা-ের ছায়াছন্ন রহস্যময় উৎপত্তির কথা স্মরণ করলেই দ্রুত এই উপসংহার টানতে হয় যে, বিনে পয়সার দান বলে কিছু নেই। বেশিদিনের কথা নয়, যখন জনমত (এবং সরকারী মত) সামগ্রিকভাবে জনহিতকর কর্মকা-ের এবং বিশেষভাবে কর্পোরেট জগতের জনহিতকর কর্মকা-ের বিরুদ্ধে ছিল। দৃষ্টান্ত হিসেবে একথা আমরা ক’জনই বা জানি।

বিংশ শতাব্দীর গোড়ার দিকে জনহিতৈষী ফাউ-েশনগুলোকে স্রেফ মুনাফা সন্ধানী সাম্রাজ্যগুলোর চৌকি হিসেবে দেখা হতো। কর্পোরেশনগুলো থেকে এগুলো শুধু রূপচর্চাগতভাবেই আলাদা ছিল। ধনবান ব্যবসায়ীদের জন্য এসব ফাউন্ডেশন ছিল অভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক জনগোষ্ঠীর কাছে তাদের আওতা প্রসারিত করার সুবিধাজনক কৌশল। সমাজবিজ্ঞানী ম্যাকগোয়ে এ প্রসঙ্গে মার্কিন এ্যাটর্নি জেনারেল জর্জ উইকারশ্যামের উদ্ধৃতি দিয়েছেন। এই উইকারশ্যাম মন্তব্য করেছিলেন যে, এসব জনহিতকর ফাউন্ডেশন ছিল বিপুল সম্পদের মালিকানা পাকাপোক্ত করার কৌশল বিশেষ এবং তা ‘জনস্বার্থের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে অসঙ্গতিপূর্ণ।’

তথাপি ১৯১০ সালে যা ছিল সাধারণ জ্ঞানবোধের ব্যাপার ২০১৫ সালে সেটাই অর্ধর্মের মতো নিন্দনীয় বিষয় বলে মনে হবে। অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে জঘন্য ধরনের অসাম্য আমাদের যুগের একটা বৈশিষ্ট্য। আজকের আত্মমর্যাদাসম্পন্ন কোন অর্থনীতিবিদ এই সত্যাটি অস্বীকার করতে না পারলেও তাদের সংখ্যা বেশি নয় যারা স্বেচ্ছায় স্বীকার করবেন যে সম্পদের কেন্দ্রীভবন এবং জনহিতকর ক্রিয়াকলাপ এই দুইয়ের মধ্যে এক যোগসূত্র আছে।

চরম অসাম্যের এই যুগে জনহিতকর কর্মকা-ের যদি প্রসার ঘটতে থাকে তাহলে বুঝতে হবে এই কর্মকা- দ্বিবিধ উদ্দেশ্য সিদ্ধির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে। একটা হলো অসাম্যকে আদর্শিক ও নৈতিক এই উভয় দিক দিয়ে অধিকতর গ্রহণযোগ্য করে তোলা এবং দ্বিতীয়টি হলো দারিদ্র্যকে অসাম্যের সমস্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত না করে অপ্রতুলতা বা দুষ্প্রাপ্যতার সমস্যা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা। কাজেই অন্য সব যুক্তি ধোপে না টিকলেও জনহিতৈষণার পক্ষে চূড়ান্তভাবে যে যুক্তিটা প্রয়োগ করা হয় তা এই দুষ্প্রাপ্যতার তত্ত্বে¡র ওপর প্রতিষ্ঠিত। আর সেটা হলো এই যে “(সরকারের কাছ থেকে) কিছু না পাওয়ার চাইতে (একটা ফাউন্ডেশনের কাছ থেকে) কিছু পাওয়াও ভাল।”

জনহিতৈষণা হলো একটা উপশমমূলক ব্যবস্থা। পুঁজিবাদের যন্ত্রণা সহ্য করা যাদের নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে তাদের কাছে এই যন্ত্রণাকে সহনীয় করে তোলাই এই ব্যবস্থার কাজ। অন্যদিকে জনহিতৈষী পুঁজিবাদের (ক্ষিলানথ্রোক্যাপিটালিজম) কাজ হলো পুঁজিবাদের এই যন্ত্রণা উপশমের দায়িত্বকে অতিক্রম করে খোদ পুঁজিবাদকে একটা জনহিতকর প্রতিষ্ঠান হিসেবে তুলে ধরা।

জনহিতৈষী পুঁজিবাদ ‘ভেনচার ফিলানথ্রোপি’,

‘সোশ্যাল এন্টারপ্রিনিয়ারশিপ’ ‘ইমপ্যাক্ট ইনভেস্টিং’ ইত্যাদি নামেও পরিচিত। বিশপ ও গ্রীনের সূত্র অনুযায়ী জনহিতৈষী পুঁজিবাদ তাঁর উদ্ভাবনী ক্ষমতাকে এমনভাবে চালিত করবে যাতে শীঘ্র হোক বিলম্বে হোক প্রত্যেকেই নতুন নতুন পণ্য উন্নততর গুণগতমান ও কম দামে প্রাপ্তির বদৌলতে লাভবান হয়।

ম্যাকগোয়ে তার গ্রন্থে বলেছেন, বিল গেটসের চেয়ে ভালভাবে ও বৃহত্তর পরিসরে ফিলানথ্রোক্যাপিটালিজমের চর্চা কেউ করেন না বিশ্বের সর্র্ববৃহৎ ফিলানথ্রোপিক বা জনহিতৈষী ফাউন্ডেশন “দি বিল এন্ড মেলিন্ডা গেটস্ ফাউন্ডেশন”-এর তিনিই হলেন কর্ণধার। এই ফাউন্ডেশনের দানস্বত্বে¡র পরিমাণ ৪২৩০ কোটি ডলার। একারণেই জনহিতৈষী ফাউন্ডেশনগুলোর সামাজিক প্রভাব অনুধাবন করার জন্য গেটস্ ফাউন্ডেশনকে একটা আদর্শ দৃষ্টান্ত হিসাবে গণ্য করা যেতে পারে।

জনহিতৈষী পুঁজিবাদের সমস্যা

ম্যাকগোয়ে জনহিতৈষী পুঁজিবাদের তিনটি সহজাত সমস্যার উল্লেখ করেছেন এবং প্রতিটি সমস্যার ক্ষেত্রে গেটস্ ফাউন্ডেশনকে প্রসঙ্গ হিসেবে টেনে এনেছেন।

প্রথম সমস্যা হলো জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতার অভাব। ম্যাকগোয়ে দেখিয়েছেন যে, গেটস ফাউন্ডেশন হলো বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার (হু) একক বৃহত্তম দাতা প্রতিষ্ঠান। এমনকি মার্কিন সরকার হু’কে যত অর্থ দেয় তার চেয়েও বেশি অর্থ দান করে গেটস্ ফাউন্ডেশন। হু তার সদস্য সরকারের কাছে দায়বদ্ধ থাকলেও গেটস ফাউন্ডেশনের দায়বদ্ধতা রয়েছে মাত্র তিনজন ট্রাস্টির কাছে। তারা হলেন বিল, মেলিন্ডা ও ওয়ারেন বাফেট। হু’র শতকরা ১০ ভাগ অর্থ এমন একটি একক প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে আসে বিধায় স্বভাবতই জাতিসংঘের এই সংস্থার অর্থ ঠিক কোথায় কিভাবে ব্যয় হবে তা নির্ধারণ করার ক্ষমতা সেই প্রতিষ্ঠানের থাকে। এ অবস্থায় হু তার স্বাধীনতা খানিকটা বিসর্জন দিয়ে বসবে না এমন মনে করার যৌক্তিকতা নেই।

দ্বিতীয়ত ব্যক্তিগত বা বেসরকারী তহবিলকে জনসেবা ব্যবস্থার দিকে চালিত করে জনহিতৈষী প্রতিষ্ঠান স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে সরকারী ব্যয়ের প্রতি সমর্থন খর্ব করে দেয়। সরকারগুলো সর্বত্রই যেখানে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য পরিচর্যার মতো সরকারী পণ্য ও সেবার জন্য তাদের বাজেট কমিয়ে ফেলছে সেখানে আর্থিক ক্ষেত্রে উদ্ভূত ঘাটতিটুকু এনজিওগুলোর দানের অর্থ দিয়ে পূরণ করার চেষ্টা করা হয়। তবে এ ক্ষেত্রে একটা গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য বিদ্যমান। সেটা হলো সরকারী অর্থে পরিচালিত সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার উপর নাগরিকদের যেখানে অধিকারভিত্তিক দাবি থাকে সেখানে জনহিতৈষী কোন দাতা প্রতিষ্ঠান বা ব্যক্তি কোন কল্যাণমূলক প্রকল্পে অর্থায়ন বন্ধের সিদ্ধান্ত নিলে তাদের কিছুই করার থাকে না। বিশ্বের বহু দেশেই এমন ঘটনা বারংবার ঘটেছে।

একই সময় জনহিতকর প্রতিষ্ঠানের অর্থদানের কারণে সামাজিক পণ্যের বিধিব্যবস্থা করার দায়িত্ব থেকে সরকারের সরে পড়ার পথটা সুগম হয়ে গেলেও একই জায়গায় বেসকারী কুশীলবদের প্রবেশের পথও পরিষ্কার হয়ে গেছে। আমেরিকার শিক্ষা খাতে এই কাজটা গেটস্ ফাউন্ডেশন কি অসাধারণ কৃতিত্বের সঙ্গে করেছে তার বিস্তারিত বিবরণ দিয়েছেন ম্যাকগোয়ে। তিনি দেখিয়েছেন যে এই খাতে গেটস্ ফাউন্ডেশন বেসরকারী বিনিয়োগের সম্পূর্ণ নতুন বাজার সৃষ্টি করেছে যেখানে মাধ্যমিক ও প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো মুনাফার ভিত্তিতে পরিচালিত হচ্ছে।

তৃতীয়ত: যে সকল ব্যবসায়ী অসাধু ক্রিয়াকলাপের মাধ্যমে অর্থবিত্ত কথায়ত্ত করেছে এবং অর্থনৈতিক অসাম্য আরও বহুলাংশে বাড়িয়ে তুলেছে সেই একই ব্যবসায়ীরা এখন জনহিতকর কাজের ক্ষেত্রে অবতারের ভূমিকায় আবির্ভূত হয়ে নিজেদের সৃষ্ট অসাম্য প্রতিকার করার ভান করছে। গেটস ফাউন্ডেশনের ক্ষেত্রে মাইক্রোসফটের বেআইনী ব্যবসায় কার্যকলাপের তথ্যপ্রমাণ মার্কিন বিচারবিভাগে এই কোম্পানির বিরুদ্ধে আনীত এন্টি-ট্রাস্ট মামলায় ভালভাবে সংরক্ষিত আছে। ম্যাকগোয়ে লিখেছেন, যে অর্থসম্পদ আজ গেটস ফাউন্ডেশনের হাত দিয়ে পরিচালিত হচ্ছে তার কতকাংশ অসৎ পন্থায় অর্জিত।

অবশ্য জনহিতৈষী প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু কিছু ভাল কাজও করেছে যা অনস্বীকার্য। উপরোক্ত দৃষ্টান্তের কারণে সেই ভাল কাজগুলোর মর্যাদা ক্ষুণœœ হওয়া উচিতও নয়। গেটস্ ফাউন্ডেশন রোগ প্রতিরোধে কর্মসূচী ও অন্যান্য প্রকল্পে অর্থায়নের মাধ্যমে নানাদেশে বিশেষত আফ্রিকায় অসংখ্য মানুষের জীবন রক্ষা করেছে। এর কিছু অর্জন স্বভাবতই কৃতিত্ব পাওয়ার যোগ্য। তথাপি প্রতিষ্ঠানটির উপর সাধুবাদ অকাতরে ও ঢালাওভাবে বর্ষণ করা হলেও সে তুলনায় এর ক্রিয়াকলাপ সমালোচনাধর্মী দৃষ্টিকোণ থেকে মোটেই তেমন পরীক্ষা নিরীক্ষা করে দেখা হয় না। এমনকি জনহিতৈষী কর্মকা-ের যে তিনটি সমস্যা নিয়ে উপরে আলোচনা করা হয়েছে সেই সমস্যাগুলোও কদাচিতই গেটস্ ফাউন্ডেশনের গায়ে কলঙ্কলের দাগ ফেলতে পারে।

ম্যাকগোয়ে আরও কিছু প্রসঙ্গের অবতারণা করেছেন। যেমন তিনি দেখিয়েছেন কিভাবে বৈশ্বিক স্বাস্থ্য খাতে গেটস ফাউন্ডেশনের হস্তক্ষেপের সঙ্গে সঙ্গতি রক্ষা করে বিল গেটস্ পেটেন্ট ব্যবস্থা শিথিল করার তীব্র বিরোধিতা করেছেন। গেটস ফাউন্ডেশন এইডস, যক্ষ্মা, ম্যালেরিয়া দমনের আন্তর্জাতিক তহবিলে সবচেয়ে বড় বেসরকারী সাহায্যদাতা প্রতিষ্ঠান আবার একই সঙ্গে এই ফাউন্ডেশন এইচআরভিসহ অন্যান্য রোগের ওষুধের দাম কমানোর বিরুদ্ধে নিরবচ্ছিন্নভাবে লবিং করে চলেছে। তাদের এই ভূমিকায় ক্ষেপে গেছে সেইসব কর্র্র্র্র্র্র্র্র্মীরা যারা অধিকতর সুষম বৈশ্বিক পেটেন্ট ব্যবস্থা দাবি করে এবং খয়রাতি ভিক্ষা চায় না।

ম্যাকগোয়ে কোকাকোলার সঙ্গে গেটস্ ফাউন্ডেশনের অংশীদারিত্ব পরীক্ষা করে দেখছেন। বলাবাহুল্য, জনস্বার্র্র্থ্যরে বিষয়টিকে যারা গুরুত্ব দিয়ে থাকেন তাদের কাছে কোকাকোলা মোটেও জনপ্রিয় নয়। বিশ্বব্যাপী বুভুক্ষা মোকাবিলায় সাহায্য করতে ফাউন্ডেশন যেসব কাজ করছে তার প্রেক্ষাপটে তিনি প্রকাশ করেছেন কিভাবে মনসানটোর সঙ্গে ফাউন্ডেশনের আর্থিক সম্পর্ক এবং গোল্ডম্যান শ্যাসেতে এই প্রতিষ্ঠানের বিনিয়োগ খাদ্য নিরাপত্তহীনতাকে লাঘব করার পরিবর্তে আরও বাড়িয়ে তুলতে পারে। তিনি দেখিয়েছেন যে, বিশ্ব স্বাস্থ্য খাতে গেটস ফাউন্ডেশনের দেয়া ৬৫৯টি অনুদানের মধ্যে ৫৬০টি অনুদানই দেয়া হয়েছে অধিক আয়ের দেশগুলোর সংগঠনসমূহকেÑ যদিও টার্গেট করা স্বাস্থ্য সমস্যাগুলো ছিল নিম্ন আয়ের দেশগুলোর। ম্যাকগোয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, সমস্যা বোুঝার জন্য যারা সবেচেয়ে উপযুক্ত জায়গায় রয়েছেন সেইসব স্থানীয় বিজ্ঞানী ও প্রোগ্রাম ম্যানেজারদের বাদ দিয়ে কিভাবে সমস্যা মোকাবিলা সম্ভব?

মোটামুটিভাবে যেখানে এটা স্বতঃসিদ্ধ বলেই ধরে নেয়া যায় যে, জনহিতৈষী সংস্থা শুধুমাত্র অলাভজনক প্রতিষ্ঠানকেই অনুদান দিয়ে থাকে সেখানে ম্যাকগোয়ে দেখিয়েছেন যে গেটস ফাউন্ডেশন ভোডাফোনের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান ভোডাকমকে ৪৮ লাখ ডলারের অফেরতযোগ্য অনুদান দিয়েছে। ২০১৪ সালে গেটস্ ফাউন্ডেশন নাইবোরীতে একটি আর্থিক প্রকল্প নেয়ার জন্য ‘মাস্টারকার্ড’কে ১ কোটি ১০ লাখ ডলার অনুদান দেয়ার কথাও ঘোষণা করে। বুভুক্ষা, রোগব্যাধি, যুদ্ধ ও অপুষ্টিতে বিপর্যস্ত বিশ্বে জনহিতৈষণার কাজটি কিভাবে এমন পরিসরে বিকশিত হয়েছে যে তাদের দৃষ্টিতে যে দুটি প্রতিষ্ঠানের সাহায্য পাওয়া সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন তার মধ্যে আছে একটি বহুজাতিক ক্রেডিটকার্ড নেটওয়ার্ক এবং একটি বহুজাতিক মোবাইল সার্ভিস প্রোভাইডার। এটাই হলো কৌতূহলোদ্দীপক ব্যাপার। পরিশেষে, জনহৈতিষী ফাউন্ডেশনগুলো করের ক্ষেত্রে যেসব রেয়াত ভোগ করে সেগুলো ভুলে যাওয়া চলবে না। সমালোচকরা উল্লেখ করেছেন যে, জনহিতৈষী ফাউন্ডেশনগুলোর হাতে যে শত শত কোটি ডলারের তহবিল আছে তার প্রায় অর্ধেক পরিমাণ অর্থের মালিক প্রকৃত পক্ষে জনগণ। কারণ এই অর্থ হলো কর অব্যহতির মাধ্যমে রাষ্ট্রের ছেড়ে দেয়া অর্থ।

ইতিহাস প্রমাণ বহন করে যে, যার যত বেশি অর্থ তাঁর তত বেশি কর দেয়ার ব্যবস্থাটিই হলো সম্পদ পুনর্বণ্টনের সবচেয়ে কার্যকর উপায় অথচ জনহিতৈষণার পক্ষে জোরালো অবস্থান গ্রহণ ধনীদের কর হ্রাসের পক্ষে জোরালো যুক্তি তুলে ধরার আরেক কৌশল হিসেবে কাজ করে। কেননা তখন বলা যায় যে, ধনীদের কর কমানো হলে তাদের হাতে গরিবের ভাগ্যোন্নয়নে ব্যয় করার মতো অধিক অর্থ থাকে। তাই অবাক হবার কিছু নেই যে, জনহিতকর কাজের ব্যাপারে সবচেয়ে উৎসাহী ব্যক্তিরা হলেন রাজনৈতিক রক্ষণশীলরা।

[দি হিন্দু পত্রিকায় প্রকাশিত নিবন্ধ থেকে ঈষৎ সংক্ষেপিত।]