ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১

ইতিহাস ঐতিহ্যে ভালোবাসা

মো. জোবায়ের আলী জুয়েল

প্রকাশিত: ২২:৫১, ২২ ফেব্রুয়ারি ২০২৪

ইতিহাস ঐতিহ্যে ভালোবাসা

ভালোবাসা শব্দটার গভীরতা সমূদ্রের চেয়ে অতল

ভালোবাসা শব্দটার গভীরতা সমূদ্রের চেয়ে অতল। আকাশের চেয়েও সীমাহীন। মহাভারত হোক বা ট্রয় নগরী হোক ষোল কলাই কিন্তু পূর্ণ ভালবাসা। এই ভালবাসা শুরুটা নিয়ে রয়েছে অনেক চিত্তাকর্ষক কাহিণী। 
কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের ধারণা, রোমাণ সেন্টভ্যালেন্টাইন খ্রিষ্টধর্ম ত্যাগ না করায় তাকে নির্মম ভাবে হত্যার ঘটনা থেকেই এর উৎপত্তি। ২৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি তার আত্মত্যাগের ওই দিনটি ভালবাসার প্রতিক হিসেবে পালিত হয়। কিছু বিশেষজ্ঞ অবশ্য বলে থাকেন, সেন্টভ্যালেন্টাইন কারাগারে বন্দী থাকার সময় কারারক্ষীর মেয়েকে তার স্বাক্ষরিত একটি চিঠি দেন, যাতে লেখা ছিল “লাভ ফ্রম ইওর- ভ্যালেন্টাইন”। অপর এক ধারনা, রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের সময় সেন্ট ভ্যালেন্টাইন গির্জার ধর্মযাজক ছিলেন।

ক্লডিয়াস তার সঙ্গে বিরোধ এর জন্য প্রথমে তাকে কারাবন্দী করেন। পরে তার মৃত্যুদন্ড কার্যকর করেন। ৪৬৯ খ্রিষ্টাব্দে পোপ জেলাসিয়াস সেন্টভ্যালেন্টাইনের সম্মানে ১৪ ফেব্রুয়ারি দিনটি নির্ধারিত করেন এবং পরবর্তীকালে তার নামানুসারেই পালিত হতে থাকে এই অনুষ্ঠান। 
সবচেয়ে বহুল ব্যবহৃত কাহিনী হলো এই ক্লডিয়াসের সেনাবাহিনীকে নিয়ে। তৃতীয় শতাব্দীর শুরুর দিকে রোমান সম্রাট ক্লডিয়াসের শখ হলো বিশাল সেনাবাহিনীর সৃষ্টি করা। তরুনদের বিয়েকে তিনি আইন বহির্ভূত বলে ঘোষণা করলেন তাঁর সেনাবাহিনীকে শক্তিশালী হিসেবে গড়ে তোলার জন্য। কিন্তু জনগণ পরিবার পরিজনের প্রতি দুর্বলতার কারণে যোগ দিতে যেতোনা সেনাবাহিনীতে। সম্রাট ঘোষণা করলেন নতুন নিয়ম, আইন জারি করলেন বিয়ের ওপর। তরুণ প্রজন্মের কাছে নির্মম হয়ে উঠলো এ প্রথা।

সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন রোমে তৃতীয় শতাব্দীর সময় ধর্মযাজক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তখন এই বর্বর প্রথার বিরুদ্ধে এগিয়ে এলেন সম্রাটের পাদ্রি সেইন্ট ভ্যালেন্টাইন। গোপনে তরুণ-তরুণীদের বিয়ের বন্ধনে আবদ্ধ করতে লাগলেন তিনি। সম্রাট খবর পেয়ে ক্রুদ্ধ হয়ে ভ্যালেন্টাইনকে গ্রেফতার  করে জেলে পুরলেন। অসংখ্য মানুষ জেলের সামনে ভিড় করতে লাগলো। জেলের জানালা দিয়ে সবাই ফুল ছুড়ে দিতে লাগলো। কারাগারে বন্দী থাকার সময় ভ্যালেন্টাইন এক তরুণীর প্রেমে পড়েন বলে ধারণা করা হয়, তরুণীটি ছিল জেলারের কন্যা। সে কারাভ্যান্তরেই ভ্যালেন্টইনের সাথে দেখা করতো।

সে মাঝে মধ্যে জেলের ভেতরে  বসে গল্প করতো ঘন্টার পর ঘন্টা, এভাবে তাকে সে আরো উৎসাহিত করতে লাগলো। মেয়েটি তাঁকে ভালোবাসতো। ভালোবাসতো ভ্যালেন্টাইনও। কিন্তু তাদের এই ভালোবাসা বেশি দিন এভাবে চললোনা। মৃত্যুর আগে তিনি তরুনীটির কাছে চিঠি লেখেন যার শেষ স্বাক্ষর ছিল “ফ্রম ইওর ভ্যালেন্টাইন” এটি এমন এক অভিব্যক্তি যা’ এখনও ব্যবহৃত হয়। শাস্তি স্বরূপ এর মধ্যেই সেইন্ট ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুদন্ড কার্যকর হয়। ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যুর দিনটিই ভালোবাসা দিবস হিসেবে গণ্য করা হয়। দিনটি ছিল ইতিহাসের পাতায় ২৬৯ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি। মধ্যযুগে ভ্যালেন্টাইন ইংল্যান্ড ও ফ্রান্সে সর্বাধিক জন প্রিয় সেইন্টদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন। 
আরেক প্রাপ্ত তথ্যাদি থেকে জানতে পারা যায় রোমান বন্দি শালার নির্যাতিত খ্রিষ্টানদের মুক্তি পাওয়ার প্রচেষ্টা চালাতে গিয়ে ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু হয়। অন্য একটি লোক কাহিনীর মতে, ভ্যালেন্টাইন নিজেই মূলতঃ নিজেকে “ভ্যালেন্টাইন” শুভেচ্ছা জ্ঞাপন করেন। কেউ কেউ মনে করেন “ভ্যালেন্টইনস উদযাপিত হয় ফেব্রুয়ারির মাঝা মাঝি সময়ে।

ভ্যালেন্টাইনের মৃত্যু বার্ষিকী স্মরণে সম্ভবত সেটা সংঘটিত হয়েছিল ২৭০ খ্রিষ্টাব্দের দিকে। 
প্রাচীন রোমে বসন্ত কালের শুরু ছিল ফেব্রুয়ারি মাস। পবিত্রতার সময় হিসেবে এটিকে বিবেচনা করা হতো। ৪৯৮ খ্রিষ্টাব্দের দিকে পোপ জেলাসিয়াস ১৪ ফেব্রুয়ারিকে “ভ্যালেন্টাইনস ডে” হিসেবে ঘোষণা দেন। মধ্য যুগে ফ্রান্সে এবং ইংল্যান্ডে বিশ্বাস জন্মে যে, ১৪ ফেব্রুয়ারি পাখীদের প্রেম-বন্ধনের ঋতু, আর সেখান থেকেই চালু হয় ফেব্রুয়ারির মাঝা মাঝি  সময়ে “ভ্যালেন্টাইন’স ডে”। আজও এটি রোমান্সের দিবস হিসেবে পালিত হচ্ছে। 
ব্রিটিশ রাজা সপ্তম হেনরি প্রথম ১৪ ফেব্রুয়ারি সেন্ট ভ্যালেন্টাইনস ডে হিসেবে ঘোষণা করেন ১৫৩৭ খ্রিষ্টাব্দে। এর পর থেকে দিনটি ঘিরে বিশ্বব্যাপী শুরু হয় নানা আয়োজন। ধীরে ধীরে  সময়ের ব্যবধানে সেটা এসে শুরু হয় কার্ড আদান-প্রদানের রীতির মাধ্যমে। ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে এই রীতিটি শুরু হয় ১৭০০ খ্রিষ্টাব্দে।
সপ্তদশ শতাব্দীর দিকে গ্রেট ব্রিটেনে “ভ্যালেন্টইন্স ডে” পালন করা অত্যন্ত জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। হাতে তৈরী ভ্যালেন্টাইন’স উপহার প্রদান আমেরিকানদের মধ্যে শুরু হয় সপ্তদশ শতকের শুরুতে। তবে বাণিজ্যিকভাবে এর প্রচলন ঘটে ১৮৪০ খ্রিষ্টাব্দে। ইসথার এ হওল্যান্ড নামক এক খ্রিষ্টান ব্যক্তি ভ্যালেন্টাইস উপহার বিক্রয় শুরু করেন আমেরিকাতে।

গ্রিটিং কার্ড এসোসিয়েশনের পরিসংখ্যান থেকে জানা যায় প্রতি বছর ভালোবাসা দিবসে কার্ড বিলি হয় এক বিলিয়নের মতো। ফুল বিক্রয় হয় ১১০ মিলিয়ন। সংখ্যাটি আসলেই বিশাল বড়। আসলে ভালোবাসা মানে, প্রতিশ্রুতি, মূল্যাবান এক স্মরক। এটি হৃদয় থেকে মুছে যাবার নয়। বর্তমানে “ভ্যালেন্টাইন’স ডে” এখন “ক্রিসমাস ডে”র  পরেই বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম কার্ড বিনিময়ে উৎসবে পরিনত হয়েছে। আনুষ্ঠানিক ভাবে “ভ্যালেন্টাইন’স ডে” বর্তমানে উদযাপিত হয় মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সহ কানাডা, ম্যাক্সিকো, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স এবং অষ্ট্রেলিয়ায়। 
পৃথিবীর সবচেয়ে প্রাচীন “ভ্যালেন্টাইনস” কার্ডটি সংরক্ষিত আছে ব্রিটিশ মিউজিয়ামে। নরম্যান্ডির ডিউক চার্লস টাওয়ার অব লন্ডনে বন্দি থাকা অবস্থায় ১৪১৫ খ্রিষ্টাব্দে তাঁর স্ত্রীকে “ভ্যালেন্টাইন” শিরোনামে একটি কবিতা লিখে পাঠান, ধারনা করা হয় পৃথিবীর মধ্যে এটাই প্রথম “ভ্যালেন্টাইনস” কার্ড। 
লোক কাহিনী বা মিথলোজি যা থেকেই সে আমলে ভালোবাসা দিবসের পত্তন হয়ে থাকুক না কেন এটা এখন বিশ্ব ব্যাপি আদৃত একদিন। একে আরও মহিমান্বিত করতে উঠে পড়ে লেগেছেন বণিক শ্রেনী। এদিন উপলক্ষে হাজারও রকম উপহার সামগ্রী প্রস্তুত ও বিপণন এখন এক বিশাল বাণিজ্য। প্রতিবছর অন্তত ১ বিলিয়ন কার্ড আদান প্রদান করা হয় এদিনে। যার শতকরা ৮৫ ভাগ মহিলারা কিনে থাকেন।

উনবিংশ শতাব্দিতে ব্রিটিশ উপনিবেশ স্থাপনকারীরা “ভ্যালেন্টাইনস ডে” পোষ্ট কার্ড উত্তর আমেরিকায় আমদানী করেছিল। ১৯৮০ খ্রিষ্টাব্দে ডায়মন্ড ইন্ডাষ্ট্রি “ভ্যালেন্টাইনস ডে” উপলক্ষে জুয়েলারী উপহার প্রদান শুরু করে। জাপান এবং কোরিয়াতে “ভ্যালেন্টাইনস ডে” জাঁক জঁমকপূর্ণ ভাবে প্রতিবছর পালিত হতে দেখা যায়। মেক্সিকোতে একই ভাবে উদযাপিত হয় ১৪ ফেব্রুয়ারি । ফিনল্যান্ড, রুমানিয়া, নরওয়ে, ভারত বর্ষে প্রেমের দিবস হিসেবে “ভ্যালেন্টাইনস ডে” উদযাপিত হয়ে থাকে। ১৯৯৩ খ্রিষ্টাব্দের ১৪ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশে দিবসটি প্রবর্তন করেন বিশিষ্ট সাংবাদিক ও পত্রিকা সম্পাদক শফিক রেহমান। 
রোমান ভালোবাসার দেবী ভেনাসের প্রিয় ফুল গোলাপ বলেই ভালোবাসা দিবসে লাল গোলাপের চল শুরু হয় ইউরোপে। এর পর থেকে ভালোবাসা দিবসে গোলাপ দেয়া নেওয়ারও একটি প্রচলিত হয়। ফলে ভালোবাসা দিবসে থাকে গোলাপের বিশেষ চাহিদা। এই দিনে বিশ্বের কোটি কোটি মানুষ প্রিয়জনকে দেয়ার জন্য গোলাপ কিনে থাকে।

শুধু ভালোবাসা দিবসকে কেন্দ্র করে ঢাকার রাজধানী সবচেয়ে বড় পাইকারী ফুলের বাজার আগারগাঁওয়ে গত বছর প্রায় বিশ (২০) কোটি টাকার ফুল বিক্রির লক্ষ্যমাত্রা স্থির করেছিল সেখানকার মালিক সমিতি। শুধু ফুল নয় ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে ঢাকার রাজধানীসহ সব জেলাতেই রঙ-বেরঙের উপহার সামগ্রীর পসর সাজিয়ে বসেন দোকানীরা। রেস্টুরেন্ট গুলোয় থাকে এই দিন উপলক্ষে নানা ছাড়ের ব্যবস্থা।

এযুগের রিচার্ড বাটন- এলিজাবেথ টেলর, অ্যান্টনি- ক্লিওপেট্রা, শাহজাহান- মমতাজ, ভিক্টোরিয়া-আলকট, এডওয়ার্ড- সিম্পসনের প্রেম কাহিনীর নজির একালে কম। এডওয়ার্ড- সিম্পসনের জন্য বার্কিং হাম প্রাসাদ ছেড়ে দেয়া, শাহাজাহানের তাজমহল তৈরী আমাদের আসলেই অবাক করে। অনেকে বলে ভালোবাসার অমরত্বে নিদর্শন আছে এখনো ঢের, কিন্তু স্বরূপ বদলে গেছে। হয়তো বা’ তাই।

×