ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ০৯ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৫ অগ্রাহায়ণ ১৪৩০

ছাব্বিশে মার্চ বাঙালি জাতিসত্তার শ্রেষ্ঠ দিন

অনুপম সেন

প্রকাশিত: ০১:২০, ২৬ মার্চ ২০২৩; আপডেট: ০১:২৫, ২৬ মার্চ ২০২৩

ছাব্বিশে মার্চ বাঙালি জাতিসত্তার শ্রেষ্ঠ দিন

বাংলা ভাষাভাষি বাঙালি জাতিসত্তার প্রথম রাষ্ট্র বাংলাদেশ

বাংলা ভাষাভাষি বাঙালি জাতিসত্তার প্রথম রাষ্ট্র বাংলাদেশ। এই রাষ্ট্রের জন্মদিন ২৬ মার্চ। আজ থেকে কয়েক সহস্র বছর আগে অস্ট্রিক, মঙ্গোলয়েড, ককেশীয় প্রভৃতি বর্ণের সংমিশ্রণে বাঙালি জাতিসত্তার সৃষ্টি হয়। এই জাতি এক সময় বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর পরিচয়ে পরিচিত ছিল।  যেমন- বরেন্দ্র, হরিকেল, রাঢ়, সুহ্ম এবং বঙ্গ। এই বিভিন্ন নৃ-গোষ্ঠীর নামই এক সময় স্থানের নাম হিসেবে পরিচিতি পায়। কালক্রমে এদের সমন্বয়েই গড়ে ওঠে বঙ্গভূমি।

এরই বৃহত্তর অংশ আজকের বাংলাদেশ, বাংলা ভাষাভাষি বাঙালির জন্মভূমি। আজ থেকে হাজার বছর আগে চর্যাপদ ও দোহার মধ্য দিয়ে বাংলা ভাষার  সূচনা হলেও তা আজকের বাংলা ভাষা হিসেবে গড়ে ওঠে মুখ্যত সুলতানি আমলে। এক সময় এই বঙ্গভূমি বা বাংলা অঞ্চলে পাল, সেন এবং পরবর্তীকালে পাঠান, মুঘলরা রাজত্ব করেছে। এ সময় বঙ্গভূমিতে কয়েকটি স্বাধীন রাজত্বের সৃষ্টি হলেও, এসব রাজ্যের শাসকরা স্বাধীন হলেও, জনগণ ছিল তাদের প্রজা। তাদের কোনো স্বাধীনতা ছিল না।

রাজা বা নবাব এবং তাদের অমাত্যদের পরম স্বেচ্ছাচারিতায় প্রজাদের জীবন-সংশয়ও ঘটতে পারত। অবশ্য এ কথাও স্মর্তব্য, গ্রামগুলো ছিল প্রায় স্বশাসিত, পঞ্চায়েতের মাধ্যমে। রাষ্ট্রের শাসন গ্রামীণ জনগণের জীবনে প্রায় অনুভূতই হতো না, কেবল খাজনা প্রদান করা ছাড়া। কিন্তু গ্রামীণ জনগণের কোনো রাজনৈতিক অধিকারই ছিল না। ১৭৫৭ সালে এই বঙ্গভূমি ব্রিটিশ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বা ব্রিটিশ শাসনের অধিকারে এলে তারা ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের জালে বদ্ধ হয়। 
১৯৪৭ সালে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের অবসানের মাধ্যমে পাকিস্তান নামে একটি রাষ্ট্র গড়ে উঠলেও বঙ্গভূমির বৃহদাংশ প্রথমে পূর্ব বাংলা, পরে পূর্ব পাকিস্তান  হিসেবে নামাঙ্কিত হয়। কিন্তু পাকিস্তানে বাঙালিরা স্বাধীনতা পেল না। তারা এক ঔপনিবেশিক শাসন থেকে আরও নিষ্ঠুরতর ঔপনিবেশিক শাসন ও শোষণের শিকারে পরিণত হয়।
আমাদের নতুন প্রজন্মের এক বিরাট অংশ এবং পুরনো প্রজন্মেরও অনেকে ভালোভাবে জানে না পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটির অস্তিত্বের ২৩ বছরে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশ কী নির্মমভাবে পশ্চিম পাকিস্তান বা পাকিস্তানের শাসনের এবং শোষণের শৃঙ্খলজালে নিষ্পেষিত হয়েছিল। এই শোষণজাল থেকে যিনি আমাদের মুক্তি দিলেন, তিনি আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৪৭ সালে যখন পাকিস্তান সৃষ্টি হয়, তখন তিনি একজন ছাত্র।

অধ্যয়নরত ছিলেন কলকাতার ইসলামিয়া কলেজে। পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর ঢাকা শহরে এসে তিনি ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। এ সময় তিনি উপলব্ধি করেন, এই অঞ্চলের জনগণের সার্বিক অধিকারের জন্য তিনি পাকিস্তান আন্দোলনে যুক্ত থাকলেও পাকিস্তানে বাঙালিরা অধিকারবঞ্চিতই রইল। এমনকি তাদের ভাষার অধিকারও হরণ করার চেষ্টা হলো। পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত আগে আলীগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর জিয়াউদ্দিন ঘোষণা করেছিলেন পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা হবে উর্দু। এর বিরুদ্ধে ড. শহীদুল্লাহ, কাজী মোতাহের হোসেন প্রমুখ পণ্ডিতরা তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছিলেন।

কিন্তু এই প্রতিবাদ ফলপ্রসূ হবে না বুঝতে পেরে তরুণ শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৪৮ সালের জানুয়ারি মাসে পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগ এবং ভাষা সংগ্রাম পরিষদ গঠন করেন। তিনি ছিলেন পূর্ব পাকিস্তান মুসলিম ছাত্রলীগের মুখ্য সংগঠক। এই সংগঠন ১৯৪৮ সালের ১১ মার্চ দেশজুড়ে বাংলা ভাষাকে পাকিস্তানের অন্যতম রাষ্ট্রভাষা করার দাবিতে ধর্মঘট আহ্বান করে। ১১ মার্চ এই ধর্মঘটের জন্য যখন পিকেটিং করছিলেন, সে সময় বঙ্গবন্ধু প্রায় ৭০ জন সহকর্মীসহ গ্রেপ্তার হন। এই গ্রেপ্তারের মধ্য (এরপর ১৮ পৃষ্ঠায়) 
দিয়ে তিনি পাকিস্তানের অস্তিত্বের ২৩ বছরে যে ১৩ বছর কারান্তরালে ছিলেন তার সূচনা ঘটে। এরপর তিনি বারবার বাঙালির অধিকারের জন্য জেলে গেছেন। জেলে বসে ১৯৫৩ সালে তিনি আত্মজীবনী (অসমাপ্ত আত্মজীবনী) লেখা শুরু করেন। এই আত্মজীবনীতেই ১৯৫৩ সালে তিনি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, পশ্চিম পাকিস্তানিরা কীভাবে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশকে শোষণ করছে।

তিনি লিখেছেন, ‘অন্যদিকে পূর্ব বাংলার বৈদেশিক মুদ্রা থেকে প্ল্যান-প্রোগ্রাম করেই পশ্চিম-পাকিস্তানে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতে সাহায্য করতে লাগল। ফলে একদল শিল্পপতি গড়ে তুলতে শুরু করল, যারা লাগামছাড়া অবস্থায় যত ইচ্ছা মুনাফা আদায় করতে লাগল জনসাধারণের কাছ থেকে এবং রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেল। করাচি বসে ইমপোর্ট ও এক্সপোর্ট ব্যবসার নাম করে লাইসেন্স বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করে আস্তে আস্তে অনেকে শিল্পপতি হয়ে পড়ছেন। এটাও মুসলিম লীগ সরকারের কীর্তি...।

বাঙালির তথাকথিত নেতারা কেন্দ্রীয় রাজধানী, মিলিটারি হেডকোয়ার্টারগুলো, সমস্ত বড়সড়ো সরকারি পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য পাঞ্জাবি ভাইদের হাতে দিয়েও গোলাম মোহাম্মদ ও চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে খুশি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন। গণপরিষদে বাঙালিরা ছয়টা সিট পশ্চিম-পাকিস্তানের ‘ভাইদের’ দিয়েও সংখ্যাগুরু ছিলেন। তারা ইচ্ছা করলে পূর্ব বাংলার জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে পারতেন। তারা তা না করে তাদের গদি রক্ষা করার জন্য এক এক করে সবকিছু তাদের পায়ে সমর্পণ করেও গদি রাখতে পারলেন না’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)।
তিনি ১৯৪৮ সালেই পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের স্বরূপ উপলব্ধি করেছিলেন। পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ বাঙালি হলেও বাংলাদেশে পাকিস্তানের রাজধানী হলো না। তা হলো প্রথমে করাচি, পরে তা স্থানান্তরিত হলো রাওয়ালপিন্ডিতে, সবশেষে ইসলামাবাদে (এখনো রয়েছে ইসলামাবাদে)। তিনটিই পশ্চিম পাকিস্তানে। কেবল রাজধানীই নয়, সামরিক কেন্দ্রের অর্থাৎ সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর প্রতিটি কেন্দ্র স্থাপিত হলো পশ্চিম পাকিস্তানে।

পাকিস্তানের প্রতি বছরের বাজেটের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় করা হতো সামরিক খাতে। পুরো ব্যয়টাই হতো পশ্চিম পাকিস্তানে। কেন্দ্রীয় শাসনের ব্যয় ও সামরিক ব্যয়ের বিরাট অংশই বহন করতে হতো পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশকে। কিন্তু এর কোনো ফল ভোগীই হতো না বাংলাদেশের জনগণ। পাকিস্তানের বেসামরিক আমলাতন্ত্রের বা অফিসারদের প্রায় ৮০ ভাগ ও সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রায় ৯৫ ভাগ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসী, মুখ্যত পাঞ্জাবি। 
১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু, ভাসানী প্রমুখ নেতারা পাকিস্তানি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বাঙালি জনগণকে সংগঠিত করে প্রতিবাদ শুরু করলে পাকিস্তানি প্রশাসনের অত্যাচারের খড়গ তাদের ওপর আরও তীব্রভাবে নেমে আসে। শেখ মুজিব বারবার জেলে আবদ্ধ হতে থাকেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে মুখ্যত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট ২১ দফার দাবিতে জয়ী হলেও যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ৯২ ‘ক’ ধারার মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়।

এরপর পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকার বারবার পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের খেলার ক্রীড়নকে পরিণত হয়। ১৯৪৮ সালে জিন্নাহ সাহেবের মৃত্যু ও ১৯৫১ সালে লিয়াকত আলী নিহত হওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকার নিয়েও পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র একই খেলা চালাতে থাকে। এই ক্রীড়ার মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে চলমান থাকে পূর্ব পাকিস্তানকে নির্মমভাবে শোষণ। এই ক্রীড়ার কথাই ব্যক্ত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে আগের উদ্ধৃতিতে।
কেবল কেন্দ্রীয় শাসন এবং সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, পাকিস্তানের শোষণ জাল ছিল আরও অনেকক্ষেত্রেই বিস্তৃত; পশ্চিম পাকিস্তানে গড়ে তোলা হয়েছিল বিশাল ভৌত অবকাঠামো। এই ভৌত অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত ছিল বিরাটভাবে সম্প্রসারিত বিদ্যুৎব্যবস্থা, রাস্তা-ঘাট, সেচব্যবস্থা ইত্যাদি। এই ভৌত অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে তোলা হয়েছিল পাকিস্তানের বিশাল শিল্প খাত। এই শিল্প খাত ছিল মুখ্যত ভোগ্যপণ্যের শিল্প। এ

ই ভোগ্যপণ্যের বাজার ছিল পূর্ব পাকিস্তান; বস্তুত তা ছিল একটি ক্যাপটিভ মার্কেট। কেবল শিল্প খাতই নয়, কৃষি ও সেবা খাতকেও বিপুলভাবে গড়ে তোলা হয়। ’৫০ ও ’৬০-এর দশকে পশ্চিম পাকিস্তানের এই অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল। কিন্তু এই উন্নয়নের ভিত্তি ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে নির্মমভাবে শোষণ। পূর্ব পাকিস্তানের কৃষকদের রক্ত জল-করা শ্রম থেকেই এসেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নের আদি পুঁজি। এই আদি পুঁজির উৎস ছিল পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও পাটজাত শিল্প।

পূর্ব পাকিস্তানে পাটশিল্প ছাড়া আর কোনো শিল্পই গড়ে তুলতে দেওয়া হয়নি; চন্দ্রঘোনায় বিনির্মিত একটি কাগজের কারখানা ও দু’-একটি ছোট টেক্সটাইল মিল ব্যতিরেকে। পূর্ব পাকিস্তানে আদমজী, আমিন ইত্যাদি অনেক বড় পাটশিল্প বা পাট কারখানা গড়ে তোলা হয়েছিল, তার প্রায় অধিকাংশেরই মালিক ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা। কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের যেসব চাষি এই পাটচাষ করত তাদের শোষণের মাত্রা কী নিষ্ঠুর ছিল তা বোঝা যাবে, যখন আমরা দেখি, সে সময় এক ডলারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্য ছিল ৪.৭৫ টাকা। কিন্তু তা মুক্তবাজারে বা কার্ব মার্কেটে বিক্রি হতো ৮ টাকায়; অর্থাৎ প্রতি ডলারে পাট চাষির শোষণ ছিল ৩.২৫ টাকা।

এই পাটই ছিল পাকিস্তানের উন্নয়নের পুঁজির উৎস। প্রায় প্রতি বছর পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি আয় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের আমদানি আয় থেকে অনেক বেশি; যেখানে, পশ্চিম পাকিস্তানের আমদানি ব্যয় ছিল তার রপ্তানি আয় থেকে অনেক বেশি। প্রায় প্রতি বছর পশ্চিম পাকিস্তানের যে বিশাল বাণিজ্য-ঘাটতি ঘটত তার ব্যয় মেটানো হতো পূর্ব পাকিস্তানের বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থেকে।

পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দিয়েই তার শিল্প-কলকারখানার জন্য যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি করত। তার ভৌত অবকাঠামোর এবং সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের ব্যয় মেটাত। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের এই চরম শোষণের ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের জিডিপি, যা ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপি  থেকে সামান্য কম ছিল, তাই ১৯৬৯-৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপি থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের এই চরম অর্থনৈতিক শোষণের অবসান ঘটানোর জন্যই বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণা করেন। তার এই ছয় দফা ঘোষণার ফলেই আজ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।
ছয় দফার মধ্যে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অবয়ব মূর্ত হয়েছিল। এই ছয় দফার মূলে ছিল পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য দুটি আলাদা মুদ্রা বা দুটো কেন্দ্রীয় হিসাব; দুই অঞ্চলের স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করার অধিকার; কেবল স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র বিষয়ক ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে দুটি অঞ্চলের স্বাধিকার; পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নিজস্ব মিলিশিয়া। মূলত এই ছয় দফার মধ্যেই নিহিত ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার পন্থা বা পথ যা পাকিস্তানের শাসকবর্গের- সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের- পক্ষে কোনোভাবেই গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না।

তাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, যিনি এই ছয় দফা দিয়েছিলেন, তাকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে তারা উদ্যত হয়েছিল। আইয়ুব খান বলেছিলেন, শেখ মুজিব যদি যুক্তির ভাষা না বোঝে অর্থাৎ ছয় দফা প্রত্যাহার না করে, তা হলে তাকে অস্ত্রের ভাষা দিয়ে বোঝানো হবে। যেহেতু বঙ্গবন্ধু এই ছয় দফা অর্থাৎ বাঙালির বাঁচার অধিকার কোনো কিছুর বিনিময়েই প্রত্যাহার করতে রাজি হননি, তাই তাঁকে প্রথমে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়’ জড়ানো হয়েছিল এবং পরে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে গণহত্যার মধ্য দিয়ে এই ‘অস্ত্রের ভাষা’ নেমে এসেছিল সমগ্র বাঙালি জাতির ওপর।

বঙ্গবন্ধু এই অস্ত্রের ভাষাকে রুখে দিলেন ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাঙালি ‘জাতিসত্তার জাতীয়তাবাদ’ পূর্ণতা পেল; বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির প্রথম রাষ্ট্র সৃষ্টি হলো।
আজ বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রটির উন্নয়নগাথা আজ বিশ্বকে চমকিত করছে। এই উন্নয়নগাথার অসাধারণ শিল্পী জাতির জনকের কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনা। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের খাদ্যশস্য-উৎপাদন ছিল মাত্র এক কোটি টন। ১৯৫০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশকে প্রায় প্রতি বছর তার খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য, দুর্ভিক্ষ রোধ করার জন্য দশ থেকে বিশ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতো।

আজ বাংলাদেশের কৃষি-উৎপাদনের পরিমাণ ৩ কোটি ৮৫ লাখ টন। বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ম্ভরই নয়, খাদ্য রপ্তানিকারক দেশও। সবজি ও স্বাদু জলের মাছ উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে প্রায় কোনো শিল্পই ছিল না, কেবল পাটশিল্প ছাড়া, তাও ষাটের দশকের শেষদিক ¤্রয়িমান হয়ে উঠেছিল সিনথেটিক ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুজাত শিল্পের আবিষ্কারের ফলে। আজ বাংলাদেশ একটি শিল্পসমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে। বস্ত্র, প্লাস্টিক, ওষুধ, সিরামিক, ছোট জাহাজ, ইস্পাত ইত্যাদি অনেক প্রয়োজনীয় শিল্পসামগ্রীই আজ বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশ আজ সেবা খাতের ক্ষেত্রেও বিপুলভাবে এগিয়ে গেছে।
১৯৭১ সালে যেখানে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি, আজ সেই পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ কম। মানবিক উন্নয়নের সূচকেও আজ বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে। যেখানে আজ বাংলাদেশের গড় আয়ু ৭৪.৪, সেখানে পাকিস্তানের গড় আয়ু ৬৬.৪।
ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ফূরণ ঘটেছিল, তাই ১৯৭১ সালে ছয় দফার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। এই জাতীয়তাবাদই আজ বাঙালি জাতিসত্তাকে তার নিজের রাষ্ট্র দিয়েছে। ২৬ মার্চ তাই আজ কেবল স্বাধীনতা দিবস নয়, বাঙালির মুক্তির স্বপ্নকে পূর্ণতা দেওয়ার অঙ্গীকারেরও দিন, যে মুক্তির কথা জাতির জনক ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘোষণা করেছিলেন।

বিশ্ব ইতিহাসের স্বাধীনতার সেই শ্রেষ্ঠ ভাষণটির, যা তিনি দশ লাখ জনতার সামনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারণ করেছিলেন, সেই মহাকাব্যিক ভাষণের শেষ বাক্যটি ছিল- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই উক্তিটি একটি জাতির হাজার বছরের স্বপ্নকে মূর্ত করেছিল। এই স্বপ্ন হলো, এই বাংলাদেশ একদিন জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, ঐশ্বর্যে এবং সর্বোপরি মানবিকতায় ঋদ্ধ একটি দেশ হবে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হবে।

বাংলাদেশ আজ এই সোনার বাংলার স্বর্ণসোপানের কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করলেও তাকে আরও অনেক ধাপ অতিক্রম করতে হবে, এই দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের। দিয়ে তিনি পাকিস্তানের অস্তিত্বের ২৩ বছরে যে ১৩ বছর কারান্তরালে ছিলেন তার সূচনা ঘটে। এরপর তিনি বারবার বাঙালির অধিকারের জন্য জেলে গেছেন। জেলে বসে ১৯৫৩ সালে তিনি আত্মজীবনী (অসমাপ্ত আত্মজীবনী) লেখা শুরু করেন। এই আত্মজীবনীতেই ১৯৫৩ সালে তিনি স্পষ্ট করে উল্লেখ করেছেন, পশ্চিম পাকিস্তানিরা কীভাবে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশকে শোষণ করছে। তিনি লিখেছেন, ‘অন্যদিকে পূর্ব বাংলার বৈদেশিক মুদ্রা থেকে প্ল্যান-প্রোগ্রাম করেই পশ্চিম-পাকিস্তানে শিল্প-কারখানা গড়ে উঠতে সাহায্য করতে লাগল।

ফলে একদল শিল্পপতি গড়ে তুলতে শুরু করল, যারা লাগামছাড়া অবস্থায় যত ইচ্ছা মুনাফা আদায় করতে লাগল জনসাধারণের কাছ থেকে এবং রাতারাতি কোটি কোটি টাকার মালিক বনে গেল। করাচি বসে ইমপোর্ট ও এক্সপোর্ট ব্যবসার নাম করে লাইসেন্স বিক্রি করে বিপুল অর্থ উপার্জন করে আস্তে আস্তে অনেকে শিল্পপতি হয়ে পড়ছেন। এটাও মুসলিম লীগ সরকারের কীর্তি...। বাঙালির তথাকথিত নেতারা কেন্দ্রীয় রাজধানী, মিলিটারি হেডকোয়ার্টারগুলো, সমস্ত বড়সড়ো সরকারি পদ, ব্যবসা-বাণিজ্য পাঞ্জাবি ভাইদের হাতে দিয়েও গোলাম মোহাম্মদ ও চৌধুরী মোহাম্মদ আলীকে খুশি করতে ব্যর্থ হয়েছিলেন।

গণপরিষদে বাঙালিরা ছয়টা সিট পশ্চিম-পাকিস্তানের ‘ভাইদের’ দিয়েও সংখ্যাগুরু ছিলেন। তারা ইচ্ছা করলে পূর্ব বাংলার জনগণের স্বার্থ রক্ষা করতে পারতেন। তারা তা না করে তাদের গদি রক্ষা করার জন্য এক এক করে সবকিছু তাদের পায়ে সমর্পণ করেও গদি রাখতে পারলেন না’ (অসমাপ্ত আত্মজীবনী)।
তিনি ১৯৪৮ সালেই পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের ঔপনিবেশিক শাসনের স্বরূপ উপলব্ধি করেছিলেন। পাকিস্তানের জনসংখ্যার ৫৬ শতাংশ বাঙালি হলেও বাংলাদেশে পাকিস্তানের রাজধানী হলো না। তা হলো প্রথমে করাচি, পরে তা স্থানান্তরিত হলো রাওয়ালপিন্ডিতে, সবশেষে ইসলামাবাদে (এখনো রয়েছে ইসলামাবাদে)। তিনটিই পশ্চিম পাকিস্তানে। কেবল রাজধানীই নয়, সামরিক কেন্দ্রের অর্থাৎ সেনা-নৌ-বিমান বাহিনীর প্রতিটি কেন্দ্র স্থাপিত হলো পশ্চিম পাকিস্তানে। পাকিস্তানের প্রতি বছরের বাজেটের প্রায় ৫০ শতাংশ ব্যয় করা হতো সামরিক খাতে। পুরো ব্যয়টাই হতো পশ্চিম পাকিস্তানে।

কেন্দ্রীয় শাসনের ব্যয় ও সামরিক ব্যয়ের বিরাট অংশই বহন করতে হতো পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশকে। কিন্তু এর কোনো ফল ভোগীই হতো না বাংলাদেশের জনগণ। পাকিস্তানের বেসামরিক আমলাতন্ত্রের বা অফিসারদের প্রায় ৮০ ভাগ ও সামরিক আমলাতন্ত্রের প্রায় ৯৫ ভাগ ছিল পশ্চিম পাকিস্তানের অধিবাসী, মুখ্যত পাঞ্জাবি। 
১৯৪৯ সালে আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু, ভাসানী প্রমুখ নেতারা পাকিস্তানি স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে বাঙালি জনগণকে সংগঠিত করে প্রতিবাদ শুরু করলে পাকিস্তানি প্রশাসনের অত্যাচারের খড়গ তাদের ওপর আরও তীব্রভাবে নেমে আসে। শেখ মুজিব বারবার জেলে আবদ্ধ হতে থাকেন। ১৯৫৪ সালে পূর্ব বাংলার প্রাদেশিক নির্বাচনে মুখ্যত আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট ২১ দফার দাবিতে জয়ী হলেও যুক্তফ্রন্ট সরকারকে ৯২ ‘ক’ ধারার মাধ্যমে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়। এরপর পূর্ব পাকিস্তান প্রাদেশিক সরকার বারবার পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকারের খেলার ক্রীড়নকে পরিণত হয়।

১৯৪৮ সালে জিন্নাহ সাহেবের মৃত্যু ও ১৯৫১ সালে লিয়াকত আলী নিহত হওয়ার পর কেন্দ্রীয় সরকার নিয়েও পাকিস্তানের আমলাতন্ত্র একই খেলা চালাতে থাকে। এই ক্রীড়ার মধ্য দিয়ে একই সঙ্গে চলমান থাকে পূর্ব পাকিস্তানকে নির্মমভাবে শোষণ। এই ক্রীড়ার কথাই ব্যক্ত হয়েছে বঙ্গবন্ধুর ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ থেকে আগের উদ্ধৃতিতে।
কেবল কেন্দ্রীয় শাসন এবং সামরিক ক্ষেত্রেই নয়, পাকিস্তানের শোষণ জাল ছিল আরও অনেকক্ষেত্রেই বিস্তৃত; পশ্চিম পাকিস্তানে গড়ে তোলা হয়েছিল বিশাল ভৌত অবকাঠামো। এই ভৌত অবকাঠামোর অন্তর্ভুক্ত ছিল বিরাটভাবে সম্প্রসারিত বিদ্যুৎব্যবস্থা, রাস্তা-ঘাট, সেচব্যবস্থা ইত্যাদি। এই ভৌত অবকাঠামোর ওপর ভিত্তি করেই গড়ে তোলা হয়েছিল পাকিস্তানের বিশাল শিল্প খাত। এই শিল্প খাত ছিল মুখ্যত ভোগ্যপণ্যের শিল্প। এই ভোগ্যপণ্যের বাজার ছিল পূর্ব পাকিস্তান; বস্তুত তা ছিল একটি ক্যাপটিভ মার্কেট। কেবল শিল্প খাতই নয়, কৃষি ও সেবা খাতকেও বিপুলভাবে গড়ে তোলা হয়। ’৫০ ও ’৬০-এর দশকে পশ্চিম পাকিস্তানের এই অর্থনৈতিক অগ্রগতি বিশ্ববাসীর নজর কেড়েছিল।

কিন্তু এই উন্নয়নের ভিত্তি ছিল পূর্ব পাকিস্তানকে নির্মমভাবে শোষণ। পূর্ব পাকিস্তানের কৃষকদের রক্ত জল-করা শ্রম থেকেই এসেছিল পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নের আদি পুঁজি। এই আদি পুঁজির উৎস ছিল পূর্ব পাকিস্তানের পাট ও পাটজাত শিল্প। পূর্ব পাকিস্তানে পাটশিল্প ছাড়া আর কোনো শিল্পই গড়ে তুলতে দেওয়া হয়নি; চন্দ্রঘোনায় বিনির্মিত একটি কাগজের কারখানা ও দু’-একটি ছোট টেক্সটাইল মিল ব্যতিরেকে। পূর্ব পাকিস্তানে আদমজী, আমিন ইত্যাদি অনেক বড় পাটশিল্প বা পাট কারখানা গড়ে তোলা হয়েছিল, তার প্রায় অধিকাংশেরই মালিক ছিল পশ্চিম পাকিস্তানিরা।

কিন্তু পূর্ব পাকিস্তানের যেসব চাষি এই পাটচাষ করত তাদের শোষণের মাত্রা কী নিষ্ঠুর ছিল তা বোঝা যাবে, যখন আমরা দেখি, সে সময় এক ডলারের কেন্দ্রীয় ব্যাংক মূল্য ছিল ৪.৭৫ টাকা। কিন্তু তা মুক্তবাজারে বা কার্ব মার্কেটে বিক্রি হতো ৮ টাকায়; অর্থাৎ প্রতি ডলারে পাট চাষির শোষণ ছিল ৩.২৫ টাকা। এই পাটই ছিল পাকিস্তানের উন্নয়নের পুঁজির উৎস। প্রায় প্রতি বছর পূর্ব পাকিস্তানের রপ্তানি আয় ছিল পূর্ব পাকিস্তানের আমদানি আয় থেকে অনেক বেশি; যেখানে, পশ্চিম পাকিস্তানের আমদানি ব্যয় ছিল তার রপ্তানি আয় থেকে অনেক বেশি। প্রায় প্রতি বছর পশ্চিম পাকিস্তানের যে বিশাল বাণিজ্য-ঘাটতি ঘটত তার ব্যয় মেটানো হতো পূর্ব পাকিস্তানের বিশাল বাণিজ্য উদ্বৃত্ত থেকে।

পশ্চিম পাকিস্তান পূর্ব পাকিস্তানের বাণিজ্য উদ্বৃত্ত দিয়েই তার শিল্প-কলকারখানার জন্য যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানি করত। তার ভৌত অবকাঠামোর এবং সামরিক-বেসামরিক প্রশাসনের ব্যয় মেটাত। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের এই চরম শোষণের ফলে পশ্চিম পাকিস্তানের জিডিপি, যা ১৯৪৭ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপি  থেকে সামান্য কম ছিল, তাই ১৯৬৯-৭০ সালে পূর্ব পাকিস্তানের জিডিপি থেকে প্রায় ৪০ শতাংশ বেড়ে যায়। পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের এই চরম অর্থনৈতিক শোষণের অবসান ঘটানোর জন্যই বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালে ছয় দফা ঘোষণা করেন। তার এই ছয় দফা ঘোষণার ফলেই আজ বাংলাদেশ একটি স্বাধীন রাষ্ট্র।
ছয় দফার মধ্যে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের অবয়ব মূর্ত হয়েছিল। এই ছয় দফার মূলে ছিল পাকিস্তানের দুই অংশের জন্য দুটি আলাদা মুদ্রা বা দুটো কেন্দ্রীয় হিসাব; দুই অঞ্চলের স্বাধীনভাবে বাণিজ্য করার অধিকার; কেবল স্বরাষ্ট্র ও পররাষ্ট্র বিষয়ক ক্ষেত্র ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে দুটি অঞ্চলের স্বাধিকার; পূর্ব পাকিস্তানের জন্য নিজস্ব মিলিশিয়া। মূলত এই ছয় দফার মধ্যেই নিহিত ছিল পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তানের শোষণ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করার পন্থা বা পথ যা পাকিস্তানের শাসকবর্গেরÑ সামরিক-বেসামরিক আমলাতন্ত্রের- পক্ষে কোনোভাবেই গ্রহণ করা সম্ভব ছিল না।

তাই জাতির জনক বঙ্গবন্ধু, যিনি এই ছয় দফা দিয়েছিলেন, তাকে এই পৃথিবী থেকে সরিয়ে দিতে তারা উদ্যত হয়েছিল। আইয়ুব খান বলেছিলেন, শেখ মুজিব যদি যুক্তির ভাষা না বোঝে অর্থাৎ ছয় দফা প্রত্যাহার না করে, তা হলে তাকে অস্ত্রের ভাষা দিয়ে বোঝানো হবে। যেহেতু বঙ্গবন্ধু এই ছয় দফা অর্থাৎ বাঙালির বাঁচার অধিকার কোনো কিছুর বিনিময়েই প্রত্যাহার করতে রাজি হননি, তাই তাঁকে প্রথমে ‘আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায়’ জড়ানো হয়েছিল এবং পরে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ কালরাত্রিতে গণহত্যার মধ্য দিয়ে এই ‘অস্ত্রের ভাষা’ নেমে এসেছিল সমগ্র বাঙালি জাতির ওপর। বঙ্গবন্ধু এই অস্ত্রের ভাষাকে রুখে দিলেন ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করে। এই ঘোষণার মধ্য দিয়ে বাঙালি ‘জাতিসত্তার জাতীয়তাবাদ’ পূর্ণতা পেল; বাংলা ভাষাভাষী বাঙালির প্রথম রাষ্ট্র সৃষ্টি হলো।
আজ বাংলাদেশ বিশ্বের বুকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র। এই রাষ্ট্রটির উন্নয়নগাথা আজ বিশ্বকে চমকিত করছে। এই উন্নয়নগাথার অসাধারণ শিল্পী জাতির জনকের কন্যা দেশরতœ শেখ হাসিনা। ১৯৭১ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশের খাদ্যশস্য-উৎপাদন ছিল মাত্র এক কোটি টন। ১৯৫০ এর দশকের মাঝামাঝি থেকে পূর্ব পাকিস্তান বা বাংলাদেশকে প্রায় প্রতি বছর তার খাদ্য ঘাটতি পূরণের জন্য, দুর্ভিক্ষ রোধ করার জন্য দশ থেকে বিশ লাখ টন খাদ্যশস্য আমদানি করতে হতো। আজ বাংলাদেশের কৃষি-উৎপাদনের পরিমাণ ৩ কোটি ৮৫ লাখ টন।

বাংলাদেশ আজ খাদ্যে স্বয়ম্ভরই নয়, খাদ্য রপ্তানিকারক দেশও। সবজি ও স্বাদু জলের মাছ উৎপাদনে বিশ্বে তৃতীয়। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে প্রায় কোনো শিল্পই ছিল না, কেবল পাটশিল্প ছাড়া, তাও ষাটের দশকের শেষদিক ¤্রয়িমান হয়ে উঠেছিল সিনথেটিক ফাইবার বা কৃত্রিম তন্তুজাত শিল্পের আবিষ্কারের ফলে। আজ বাংলাদেশ একটি শিল্পসমৃদ্ধ দেশে রূপান্তরিত হচ্ছে। বস্ত্র, প্লাস্টিক, ওষুধ, সিরামিক, ছোট জাহাজ, ইস্পাত ইত্যাদি অনেক প্রয়োজনীয় শিল্পসামগ্রীই আজ বাংলাদেশে উৎপাদিত হচ্ছে। বাংলাদেশ আজ সেবা খাতের ক্ষেত্রেও বিপুলভাবে এগিয়ে গেছে।
১৯৭১ সালে যেখানে বাংলাদেশ থেকে পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় ছিল প্রায় ৭০ শতাংশ বেশি, আজ সেই পশ্চিম পাকিস্তানের মাথাপিছু আয় বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৮০ শতাংশ কম। মানবিক উন্নয়নের সূচকেও আজ বাংলাদেশ পাকিস্তান থেকে অনেক এগিয়ে। যেখানে আজ বাংলাদেশের গড় আয়ু ৭৪.৪, সেখানে পাকিস্তানের গড় আয়ু ৬৬.৪।
ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যে বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ফূরণ ঘটেছিল, তাই ১৯৭১ সালে ছয় দফার মধ্য দিয়ে পূর্ণতা পায়। এই জাতীয়তাবাদই আজ বাঙালি জাতিসত্তাকে তার নিজের রাষ্ট্র দিয়েছে। ২৬ মার্চ তাই আজ কেবল স্বাধীনতা দিবস নয়, বাঙালির মুক্তির স্বপ্নকে পূর্ণতা দেওয়ার অঙ্গীকারেরও দিন, যে মুক্তির কথা জাতির জনক ৭ মার্চ সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ঘোষণা করেছিলেন। বিশ্ব ইতিহাসের স্বাধীনতার সেই শ্রেষ্ঠ ভাষণটির, যা তিনি দশ লাখ জনতার সামনে স্বতঃস্ফূর্তভাবে উচ্চারণ করেছিলেন, সেই মহাকাব্যিক ভাষণের শেষ বাক্যটি ছিল- ‘এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম, এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।’ এই উক্তিটি একটি জাতির হাজার বছরের স্বপ্নকে মূর্ত করেছিল। এই স্বপ্ন হলো, এই বাংলাদেশ একদিন জ্ঞানে-বিজ্ঞানে, ঐশ্বর্যে এবং সর্বোপরি মানবিকতায় ঋদ্ধ একটি দেশ হবে, বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা হবে। বাংলাদেশ আজ এই সোনার বাংলার স্বর্ণসোপানের কয়েকটি ধাপ অতিক্রম করলেও তাকে আরও অনেক ধাপ অতিক্রম করতে হবে, এই দায়িত্ব তরুণ প্রজন্মের।
 লেখক : শিক্ষাবিদ