ঢাকা, বাংলাদেশ   মঙ্গলবার ২৫ জুন ২০২৪, ১১ আষাঢ় ১৪৩১

বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় যুক্ত হোক প্রযুক্তি

ড. এম. মেসবাহউদ্দিন সরকার

প্রকাশিত: ২০:৫২, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৩

বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় যুক্ত হোক প্রযুক্তি

‘যিনি রক্ষক তিনি ভক্ষক’-কথাটি বারে বারে প্রমাণিত হচ্ছে বাংলাদেশ বিমানের ক্ষেত্রে

‘যিনি রক্ষক তিনি ভক্ষক’-কথাটি বারে বারে প্রমাণিত হচ্ছে বাংলাদেশ বিমানের ক্ষেত্রে। বিমানবন্দরের ১৪ স্তরের নিরাপত্তা পেরিয়ে পাসপোর্ট, টিকিট, বোর্ডিং পাস ছাড়াই একটি শিশু কিভাবে কুয়েত এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে ওঠে  নিশ্চিন্তে বসে থাকতে পারে, তা কিছুতেই বোধগম্য নয়। এমন ভুতুড়ে ঘটনা ঘটেছে ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৩। এ ঘটনায় ফ্লাইটের পাইলট, ক্রুসহ হতভম্ব দেশবাসী। এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর বিমানবন্দরের কাস্টম হাউসের গুদাম থেকে ৫৫ কেজি স্বর্ণ চুরির ঘটনায় ৪ সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা ও ৪ সিপাহীকে আটক করা হয়েছে। এভাবে স্বর্ণ চুরি, লাগেজ লাপাত্তা, যাত্রী হয়রানি, পাসপোর্ট ছাড়া বিমানে ওঠা এমনকি বিমান ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটেছে এই বিমান বন্দরে।

২০১৯ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম হয়ে দুবাইগামী উড়োজাহাজ ময়ূরপঙ্খী (বোয়িং-৭৩৭) অস্ত্র ও বোমার ভয় দেখিয়ে ছিনতাইয়ের চেষ্টা করা হয়। অভিনেতা ইলিয়াস কাঞ্চন লাইসেন্স করা অস্ত্র নিয়ে প্রথম ধাপের নিরাপত্তা পার হয়ে গেলেও দ্বিতীয় ধাপে তিনি নিজেই অস্ত্র থাকার ঘোষণা দেন। একই বছরের ১১ মার্চ অস্ত্র নিয়ে বিমানবন্দরে প্রবেশ করে যশোরের একজন নেতা। এত সিসি ক্যামেরা, একাধিক স্ক্যানিং মেশিন ও গোয়েন্দা নজরদারি ফাঁকি দিয়ে অস্ত্র নিয়ে কিভাবে পার হয়Ñএই প্রশ্ন সকলের।
একইভাবে ২০১৮ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি ছেলেকে এগিয়ে দিতে কাস্টমসের একজন রাজস্ব কর্মকর্তা নিরাপত্তা বলয় ভেদ করে বোর্ডিং ব্রিজ এলাকায় ঢুকে পড়েন? আবার রানওয়েতে ঝুঁকিপূর্ণ কিছু ধাতব বস্তু পড়ে থাকায় আকাশে আধা ঘণ্টা চক্কর দিতে বাধ্য হয় প্রধানমন্ত্রীকে বহনকারী বিমানের একটি ফ্লাইট? ঘটনা ২০১৬ সালের ৮ জুনের। একই বছরের নভেম্বরে এক বহিরাগতের ছুরিকাঘাতে বিমানবন্দরে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা এক আনসার সদস্য প্রাণ হারান? ইউএস বাংলা এয়ারলাইন্সের একটি বিমান ২০১৫ সালের ৮ অক্টোবর ঢাকা থেকে চট্টগ্রামের উদ্দেশে উড্ডয়নের কয়েক মিনিট আগে কেবিন ক্রুরা টের পান যে, কর্তৃপক্ষ ৭১টি বোর্ডিং কার্ড ইস্যু করলেও বিমানটিতে মোট যাত্রী ছিলেন ৭২ জন? ২০১৮ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পাসপোর্ট-ভিসা বা টিকেট ছাড়াই পুলিশের এসআই আশিকুর রহমান থাই এয়ারওয়েজের একটি বিমানে উঠে পড়েন।

এই ঘটনার রেশ কাটতে না কাটতেই কাস্টমসের এক নারী কর্মকর্তা তোহরা বেগম পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই আন্তর্জাতিক উড়োজাহাজের একটি ফ্লাইটে ওঠার চেষ্টাকালে গ্রেফতার হন। এসব ঘটনায় বহির্বিশ্বে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণœ হচ্ছে, নেতিবাচক প্রভাবও ফেলছে। ২০১৫-১৬ সালে নিরাপত্তা ব্যবস্থার অপ্রতুলতা দেখিয়ে বাংলাদেশের সঙ্গে সরাসরি কার্গো ফ্লাইট বন্ধ করে দিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য ও জার্মানি? অতঃপর তাদের সহযোগিতায় নিরাপত্তা ব্যবস্থা কাক্সিক্ষত মানে উন্নীত হলে প্রায় দুই বছর পর সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয় তারা। 
সার্বিকভাবে অনিয়ম, দুর্নীতি, চুরি ও স্বেচ্ছাচারিতা যেন চলছে হাতে হাত ধরে। কখনো নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, কখনো বিমান বন্দরের শুল্ক বিভাগের লকার থেকে সোনাসহ মূল্যবান মালপত্র চুরি, আবার কখনো আমদানি করা মালামাল লুট ইত্যাদি। পরপর দুটি নিয়োগ পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা দেশবাসীকে হতাশ করেছে।

গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য মতে এসব যাদের দেখভাল করার কথা, তারাই জড়াচ্ছেন অনিয়ম আর লুটপাটে। এভাবে অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা ও লাগামহীন দুর্নীতির কারণে বাংলাদেশ বিমান অপ্রত্যাশিতভাবে একটি লোকসানি খাতে পরিণত হয়েছে। ২০২২ সালের নভেম্বর পর্যন্ত সংস্থাটি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), পদ্মা অয়েল এবং সোনালী ব্যাংকÑ এই তিনটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ১৮ হাজার ১৭১ কোটি টাকা দেনা হয়েছে। দুর্নীতি ও অপচয়ের পাশাপাশি লাভজনক গন্তব্য সম্প্রসারণ এবং উড়োজাহাজের পূর্ণ সক্ষমতা ব্যবহার করতে না পারাকে এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী করছেন বিশ্লেষকরা। বিমানকে দায়দেনা থেকে বের করতে কমাতে হবে অপ্রয়োজনীয় ব্যয়, নিতে হবে দূরদর্শী ব্যবসায়িক পরিকল্পনা। লাগাম টানতে হবে দুর্নীতির।

এসব অপব্যয় ও দুর্নীতি কমানোর জন্য বসানো হয়েছে আধুনিক যন্ত্রপাতি। সেগুলো হলো- ডুয়েল ভিউ এক্সরে স্ক্যানিং মেশিন, ডুয়েল ভিউ স্ক্যানিং মেশিন, লিকুয়েড এক্সপ্লোসিভ ডিটাকশন সিস্টেম (এলইডিএস), আন্ডার ভেহিকল স্ক্যানিং সিস্টেম (ইউভিএসএস), ফ্যাপ বেরিয়ার গেট উইথ কার্ড রিডার, বেরিয়ার গেট উইথ আরএফআইডি কার্ড রিডার, এক্সপ্লোসিভ ডিটেকশন সিস্টেম (ইডিএস), এক্সপ্লোসিভ ট্রেস ডিটেকশন (ইটিডি) যন্ত্র ইত্যাদি। এসব সত্ত্বেও  দুর্নীতি  ও অপচয় রোধ করা যায়নি।
অত্যাধুনিক ডিজিটাল প্রযুক্তি সমৃদ্ধ নবনির্মিত ৩নং টার্মিনালটি আগামী ৭ অক্টোবর আন্তর্জাতিক ফ্লাইটের জন্য উন্মুক্ত হতে যাচ্ছে। পাঁচ লাখ ৪২ হাজার বর্গমিটার আয়তনের এ টার্মিনালে একসঙ্গে ৩৭টি উড়োজাহাজ রাখা যাবে। থাকছে ২৬টি বোর্ডিং ব্রিজের ব্যবস্থা। বহির্গমনের জন্য চেক-ইন কাউন্টার থাকছে ১১৫টি। তন্মধ্যে ১৫টি সেলফ সার্ভিস চেক-ইন কাউন্টার। আছে ১০টি স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট নিয়ন্ত্রণ কাউন্টার, বহির্গমন ইমিগ্রেশন কাউন্টার ৬৬টি। আগমনীর ক্ষেত্রে পাঁচটি স্বয়ংক্রিয় চেক-ইন কাউন্টারসহ মোট ৫৯টি কাউন্টার, ১৬টি লাগেজ বেল্ট, অতিরিক্ত ওজনের ব্যাগেজের জন্য থাকছে চারটি আলাদা বেল্ট।

নিচতলায় ব্যাগেজ হ্যান্ডলিং সিস্টেম, দ্বিতীয় তলায় বহির্গমন লাউঞ্জ, ক্যান্টিন ও বোর্ডিং ব্রিজ। এছাড়াও থাকছে ১৪টি সুপরিসর ডিউটি ফ্রি শপ, বহির্গমন লাউঞ্জ এবং ১,০৪৪টি গাড়ি পার্কিং। টার্মিনাল ভবনের আয়তন ২,৩০,০০০ বর্গমিটার, যার ধারণ ক্ষমতা প্রতি বছরে ১২ মিলিয়ন যাত্রী। টানেলসহ বহুতলবিশিষ্ট কার পার্কিং ৫৪,০০০ বর্গমিটার। ফায়ার ফাইটিং স্টেশন ইকুইপমেন্টসহ ৪,০০০ বর্গমিটার। আমদানি কার্গো টার্মিনাল ২৭,০০০ বর্গমিটার, রপ্তানি কার্গো টার্মিনাল ৩৬,০০০ বর্গমিটার এবং কানেকটিং ট্যাক্সিওয়ে ৬৬,৫০০ বর্গমিটার। দুটি র‌্যাপিড এক্সিট ট্যাক্সিওয়ে ৪১,৫০০ বর্গমিটার। পাশাপাশি থাকছে বিমানবন্দরসংলগ্ন সড়ক (হাইওয়ে), এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে সংযোগ, যাত্রী ও কার্গো হ্যান্ডলিংয়ের জন্য প্রয়োজনীয় ইকুয়েপমেন্ট (অটোমেটেড ওয়ার)। 
টার্মিনাল ভবনের বহির্গমন পথে ১০টি স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট কন্ট্রোল বা ই-গেট থাকছে, যেখানে যাত্রীরা নিজেরাই ইমিগ্রেশন করাতে পারবেন। তাদের আর ইমিগ্রেশন পুলিশের মুখোমুখি হতে হবে না। থাকছে বেশ কয়েকটি স্ট্রেট এসকেলেটর, যারা বিমানবন্দরের দীর্ঘপথ হাঁটতে পারবেন নাÑ তাদের জন্য এ ব্যবস্থা। থাকছে বেবি কেয়ার লাউঞ্জ, মায়েদের ব্রেস্ট ফিডিং বুথ, ডায়াপার পরিবর্তনের জায়গা এবং ফ্যামিলি বাথরুম। এছাড়াও বাচ্চাদের স্লিপার- দোলনাসহ একটি চিলড্রেন প্লে এরিয়াও থাকছে। সময় কাটানোর জন্য থাকছে মুভি লাউঞ্জ, এয়ারলাইন্স লাউঞ্জ, ডে-রুম।

টার্মিনালের বাইরে ও ভেতরে থাকছে ফুড কোর্ট, ফুড গ্যালারি, ওয়াই-ফাই এবং মোবাইল চার্জিংয়ের সুবিধা। নারী ও পুরুষের জন্য থাকছে পৃথক নামাজের ব্যবস্থা। যাত্রীদের নিতে আসা দর্শনার্থীদের জন্য মিটার্স অ্যান্ড গ্রিটার্স প্লাজাও থাকছে। বহির্গমন পথে ১০টি স্বয়ংক্রিয় পাসপোর্ট কন্ট্রোল বা ই-গেট থাকছে। এতে করে যাত্রীরা ইমিগ্রেশন পুলিশের মুখোমুখি না হয়ে সরাসরি নিজেই নিজের ইমিগ্রেশন সেরে ফেলতে পারবেন। নিরাপত্তা নিশ্চিতে থাকছে ২৭টি ব্যাগেজ স্ক্যানিং মেশিন, ১১টি বডি স্ক্যানার। টার্মিনালে প্রবেশ করা একজন যাত্রীকে বিমানে ওঠা পর্যন্ত হাতের স্পর্শ ছাড়া স্বয়ংক্রিয়ভাবেই তল্লাশি করা যাবে। সেক্ষেত্রে যাত্রীকে বডি স্ক্যানার মেশিনের ভেতর দুহাত তুলে দাঁড়াতে হবে। এর ফলে যাত্রী ও বিমানবন্দরের নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের সময় বাঁচবে। স্ক্যানিংও হবে নির্ভুল ও স্বচ্ছ। ফলে নিরাপত্তা জোরদার হবে, কাজে আসবে স্বচ্ছতা, দূর হবে দুর্নীতি। 
২৭ হাজার কোটি ব্যয়ে নির্মিত টার্মিনাল এবং গোটা বিমানবন্দরের নিরাপত্তায় বড় ধরনের হুমকি হয়ে দেখা দিয়েছে বিমানবন্দরসংলগ্ন ২টি বেসরকারি তারকা হোটেল ও ১টি শপিং কমপ্লেক্সসহ ৫টি বহুতল ভবন। বিমানবন্দরে আসা দেশী-বিদেশী ভিআইপিদের চলাচলে মারাত্মক হুমকি হতে পারে এই স্থাপনাগুলো। ভবনগুলো থেকে বিমানবন্দরের প্রতিটি স্পর্শকাতর স্থান দেখা যায়। বহুতল ৫টি ভবনের ছাদ ব্যবহার করে যে কোনো ধরনের নাশকতা হতে পারে। হতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনাও। অভিযোগ উঠেছে, বেবিচক কোনো ধরনের নিয়মনীতি অনুসরণ না করেই এ রকম একটি স্পর্শকাতর এলাকায় বেসরকারি মালিকানার ৫টি বহুতল ভবন করার অনুমতি দিয়েছে।

বিষয়গুলো এখনই জরুরি বিবেচনায় আনা উচিত। এখন বিশ্বমানের আধুনিক সব প্রযুক্তি থাকছে শাহজালাল বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনালে। যাত্রী থেকে ব্যাগ সবকিছু- পরীক্ষায় থাকবে অটোমেটিক স্ক্যানিং সিস্টেম। তরল দ্রব্যসহ যে কোনো অবৈধ সবকিছুই ধরা পড়বে এ ব্যবস্থায়। এতে অল্প সময়েই মিলবে অধিক সেবা। ভোগান্তির অবসান হবে নিমেষেই। অত্যাধুনিক এসব ব্যবস্থা বিশ্ব পরিম-লে দেশের এভিয়েশন সেবাকে নতুনভাবে তুলে ধরবে। বিদেশী এয়ারলাইন্স বা বিশ্বের সামনে একটি আস্থা অর্জনের জায়গায় পরিণত হবে। দেশবাসী আশা করছে, নবনির্বিত দৃষ্টিনন্দন এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন  নতুন বিমানবন্দরটির কর্তব্যরত কর্মকর্তা, যাত্রী এবং সার্বিক পরিচালনায় একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি পাবে অচিরেই। 
লেখক : অধ্যাপক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×