ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২০ মে ২০২৪, ৬ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩১

বই ॥ জীবনের দোলাচল

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ০১:২১, ২৪ মার্চ ২০২৩

বই ॥ জীবনের দোলাচল

ইয়াজমিন রুমানা ২০২৩ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশ করেছেন

ইয়াজমিন রুমানা ২০২৩ সালের অমর একুশে বইমেলায় প্রকাশ করেছেন উপন্যাস ‘দ্বৈরথ’। লেখকের জবানিতে উঠে এসেছে স্বাধীনচেতা ও রুচিশীল ব্যক্তি হিসেবে তার সৃজনকল্পের অভিষেক। অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী এই গ্রন্থের রূপকার হলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষার্থী। আর লেখালেখির অভ্যেস ভেতরের অন্তর্নিহিত বোধ থেকেই। আরও বেশি করে বললে আনন্দস্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়ে।

পাঠকের ভালো লাগা তৈরিতে সচেতন থাকলেও সব সময় সবাইকে আকর্ষণ করাও যায় না। তবে চেষ্টা থাকে গ্রন্থের কলেবরে নিবেদিত পাঠকের নজরকাড়া। ‘দ্বৈরথ’ এর শাব্দিক অর্থ বুঝিয়ে বলার প্রয়োজন হয় না। তবুও মনে হয় জীবনযাত্রার নানামাত্রিক চলাচলের দ্বৈত সত্তার অনুভব যেন মানুষের চিরায়তসঙ্গী। সঙ্গত কারণে যাপিত জীবনের অতি সাধারণ ঘটনা গল্প লেখকের সৃজন দ্যোতনায় যে দ্যুতি ছড়ায় তাও পাঠকদের আলোড়িত করবে নিঃসন্দেহে। কাহিনীর শুরুটা বাংলাদেশের যে কোনো পরিবারের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনাপঞ্জির স্বাভাবিক এবং সহজবোধ্য অনুরণন।

মফস্বলের একজন চাকরিজীবী জীবনের নানামাত্রিক স্বপ্ন বুননের আকাক্সক্ষায় শহরে পাড়ি জমানো যেন এই দেশের স্বাভাবিক জীবন পরিক্রমা। এছাড়া প্রত্যাশায় থাকে সন্তানদের ভালো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ার সুযোগ করে দেওয়াও। শৈশব অতিক্রম করা বালক রজন মফস্বলে হতে পঞ্চম শ্রেণির পাঠ সমাপ্ত করে শহরে চলে আসে। পিতা তাকে ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি করিয়ে যতই আনন্দিত হোক না কেন শৈশবের স্মৃতি মন্থনে কাতর রজন দুঃখ ভারাক্রান্ত হৃদয়ে সেটা মেনে নিলেও কষ্ট হয় ভীষণ।

কোনো এক সময় তেমন পিছুটান ক্রমান্বয়ে দূর অতীত হয়ে যায়। অর্থাৎ পরিবেশ, পরিস্থিতিকে মেনে নেওয়ার জোরালো ইচ্ছের কারণে এক সময় নতুন সহপাঠী ও প্রতিবেশীর সঙ্গে মিলে মিশে যায়। এটাই বোধহয় পরিবর্তিত জীবন কাহিনীর স্বাভাবিক নিয়ম। এক সময় আমাদের যৌথ পরিবারই ছিল সামাজিক ঐতিহ্য। তাই লেখন শক্তিতে উদ্ভাসিত হয় রজনের ফুফুর মহাসাড়ম্বরে বিয়ে অনুষ্ঠানটি।

প্রসঙ্গক্রমে নতুন বন্ধু জয়ও কাহিনীতে জায়গা করে নেয়। সাবলীল গতিতে এগিয়ে যাওয়া পুরো উপন্যাস জুড়ে চলে যাপিত জীবনের সামাজিক, পারিবারিক ঘটনাক্রম। চাওয়া-পাওয়ার আকাক্সক্ষা আর বিরোধ। মনের নিভৃতে গেঁথে থাকা আবেগ, অনুভূতি মনোজাগতিক ও শারীরিক আবেদন-নিবেদন। এমনকি আলোড়নও বটে। সবকিছু স্পষ্টভাবে বুঝতে গেলে পাঠককে অবশ্যই গ্রন্থটি পড়ে দেখা জরুরি। শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণে রজন আর জয়কে  বয়োসন্ধিকালের বিস্ময় আর তাড়নায় মোহিতও করে রাখে। আবার মোহভঙ্গ হতেও সময় নেয় না।

সেখানে কোনো মেয়েকে ভালো লাগার অনন্য শিহরণ হৃদয়ের মাঝে ঝড়ও তোলে। ভালোবাসার নির্মোহ আবেগে দোলায়িত হতে থাকা কাহিনীর গতিময়তা আরও সাবলীল করে দেয়। মূলত দ্বৈরথ সামাজিক সম্পর্ক, পারিবারিক বন্ধন এমনকি ব্যক্তিক স্পর্শকাতর আলোড়নও যাপিত জীবনকে হরেক মাত্রায় শুধু আনন্দময়ই নয় বরং বিষাদগ্রস্ত করতেও যেন সময় নেয় না। অনেক পাওয়ার মূর্ছনায় বিভোর হলেও আর যা ধরাছোঁয়া যাচ্ছে না তেমন গ্লানিও বেদনাময় হয়ে তাড়িয়ে বেড়ায়।

জীবনের নিয়ম পরিধিতে প্রতিদিনের ঘটনা কেমন যেন আটকানো। সব সময় নীতি নৈতিকতাকে আমলে নিতেও ভেতরের বোধ মানতে চায় না। মনোজাগতিক, পারিবারিক, সাংসারিক ও শারীরিক টানাপোড়েনে গল্পের মূল সারবত্তা পাঠককে উদ্বেলিতও করে। নিত্যদিনের ঘটনা, অঘটন, সুখ, দুঃখ, চাওয়া-পাওয়ার দ্বন্দ্ব সবই যেন এক অবিচ্ছিন্ন সুতোয় বাঁধা। গল্পের শুরু, গতি পাওয়া এবং সর্বশেষ পরিণতিও রূপকার অত্যন্ত স্বাচ্ছন্দ্যভাবে পাঠককে আকর্ষণ করতে তাঁর শৈল্পিক দ্যোতনাকে যেভাবে নিরন্তর করেছেন সেটাও উপভোগ্য এবং সুখপাঠ্য। গ্রন্থটির বহুল প্রচার এবং পাঠকপ্রিয়তা কামনা করছি।

×