ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০৭ অক্টোবর ২০২২, ২২ আশ্বিন ১৪২৯

তীর্যক সমাজ বিশ্লেষক

আজহার মাহমুদ

প্রকাশিত: ০১:৪২, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২২

তীর্যক সমাজ বিশ্লেষক

আবুল মনসুর আহমদ

আবুল মনসুর আহমদকে আমরা বিভিন্ন নামে জানি এবং চিনি। তিনি একাধারে সাংবাদিক, সাহিত্যিক, রাজনীতিবিদ। প্রতিটি ক্ষেত্রে তিনি পেয়েছেন অজস্র খ্যাতি। দু-হাত ভওে কুড়িয়েছেন তার কর্মের জন্য সুনাম।
আবুল মনসুর আহমদকে মানুষ আলাদাভাবে জানে একজন সুসাহিত্যিক হিসেবে। এছাড়াও তার লেখা বই ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’-এর নামেও তাকে চিনে। কারণ বাংলা সাহিত্যে এই বইটি একটি অনন্য সাহিত্যকর্ম ও দলিল হিসেবে আছে।
সাংবাদিকতা আর সাহিত্যচর্চা এক না হলেও এই দুয়ের মাঝে কিছুটা মিল রয়েছে। আবুল মনসুর আহমদ যেন এই দুয়ের মেলবন্ধন। দীর্ঘ ২৫ বছরেরও বেশি সময় বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় চাকরিসহ সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সে সুবাধে তিনি লেখালেখি করেছেন প্রচুর। তিনি যখন সাপ্তাহিক ‘মোহাম্মদী’ পত্রিকায় চাকরি নেন তখন থেকে প্রচুর লেখালেখি করেন। লেখালেখি ও সম্পাদনার কাজ করে তিনি নানা বিষয় রপ্ত করেন। ওই সময় সপ্তাহে অন্তত ২টি করে উপসম্পাদকীয় লিখতেন তিনি। পত্রিকায় প্রকাশিত তার প্রবন্ধ-নিবন্ধ বা কলাম নিয়ে হতো দীর্ঘ আলোচনা।
আবুল মনসুর আহমদের মৃত্যুর ৪০ বছর পরও তার সাহিত্য বর্তমান সময়ের সঙ্গে বেশ প্রাসঙ্গিক। বাংলা সাহিত্যে তাঁর রচনার যে সম্ভার রেখে গিয়েছেন তা রীতিমতো বিস্ময়কর। তিনটি উপন্যাস, চারটি ছোটগল্পের (ব্যঙ্গরচনা) সংকলন, পাঁচটি স্মৃতিকথা ও প্রবন্ধগ্রন্থের পাশাপাশি শিশুকিশোর উপযোগী সাহিত্য এবং অনুবাদ সাহিত্যেও তাঁর অবদান বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। তবে তাঁর সব রচনার মধ্যে তাঁর ব্যঙ্গরচনা বাংলা সাহিত্যে ব্যাপকভাবে সমাদৃত এবং অন্য সব রচনাকে বাদ রাখলেও তাঁর এই ব্যঙ্গরচনাগুলোর জন্য তিনি বাংলাসাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন।
আবুল মনসুর আহমদ রচিত তিনটি উপন্যাস ‘সত্যমিথ্যা’ (১৯৫৩), ‘জীবনক্ষুধা’ (১৯৫৫) এবং ‘আবে হায়াতে’ (১৯৬৪) তৎকালীন সমাজের চিত্র অঙ্কন করার পাশাপাশি সেই সময়ের কুসংস্কারাচ্ছন্নতা এবং পশ্চাৎপদতার বিরুদ্ধেও জেগে ওঠার ডাক দিয়েছেন। ‘জীবনক্ষুধা’ রচনার দিক থেকে প্রথম হলেও প্রকাশের দিক থেকে তাঁর দ্বিতীয় উপন্যাস।

হালিম চরিত্রের মাধ্যমে লেখক এ উপন্যাসে বাঙালী মুসলমান সম্প্রদায়ের জীবনের উচ্চাকাক্সক্ষা এবং উচ্চাশার চিত্র ফুটিয়ে তুলেছেন। উচ্চবিত্ত হওয়ার স্বপ্নে বিভোর হয়ে এক তরুণের আদর্শচ্যুতির বর্ণনার পাশাপাশি একটা সময়ের বাঙালী মুসলমান সমাজের ধারাবাহিক গল্প এখানে বর্ণিত হয়েছে।
পাশাপাশি প্রবন্ধ ও স্মৃতিকথায়ও তিনি ছিলেন অনন্য। ‘পাক বাংলার কালচার’ (১৯৬৬) যা বর্তমানে ‘বাংলাদেশের কালচার’ নাম হয়েছে। ‘আমার দেখা রাজনীতির পঞ্চাশ বছর’ (১৯৬৮), ‘শেরে বাংলা থেকে বঙ্গবন্ধু’ (১৯৭৩), ‘আত্মকথা’ (১৯৭৮) এবং ‘বেশি দামে কেনা কমদামে বেচা আমাদের স্বাধীনতা’ (১৯৮২)। তাঁর ব্যঙ্গরচনাবলীর হলো- আয়না (১৯৩৬-১৯৩৭), ফুড কনফারেন্স (১৯৪৪), গালিভারের সফরনামা। এই বইগুলো এখনও পাঠক মনে দাগ কেটে যায়।
এছাড়াও তিনি ইংরেজীতে অনুবাদ করেছেন, ‘আল কোরআনের নসিহত’ (১৯৭৫)। শিশু-কিশোরোপযোগী গ্রন্থ, ‘ছোটদের কাসসুল আম্বিয়া’ (১৯৫০), ‘মুসলমানি কথা’ (১৯২৪), ‘নয়া পড়া’ (১৯৩৪) লিখেছেন তিনি। তার অপ্রকাশিত বইও রয়েছে দুটি। ‘মা-খাকী’ (উপন্যাস) ও ‘তিতুমীর’।
আবুল মনসুর আহমদ ছিলেন একজন গভীর চিন্তাবিদ। তিনি অনাচারের বিরুদ্ধে হাতিয়ার হিসেবে ব্যঙ্গ সাহিত্যকেই বেছে নিয়েছিলেন। বহুমুখী এই প্রতিভার কারণে নানান জায়গার নানা মানুষের সংস্পর্শে এসেছিলেন। দেখেছিলেন জীবনকে খুব কাছ থেকে। তার প্রায় লেখায় দুর্ভিক্ষের চিত্রের সঙ্গে দুর্ভিক্ষের জন্য দায়ীদের চিত্র, মৃত মানবতা ও চেতনার চিত্র যথাযথ তুলে ধরতে সমর্থ হয়েছেন। যেখানেই ধর্মান্ধতা ও উগ্রকামী মনোভাব পেয়েছেন, সেখানেই তিনি আঘাত করেছেন অবলীলায়। পীর ফকিরি, ধর্মীয় রাজনীতির ব্যাপারে তার বক্তব্য ছিল স্পষ্ট। ধর্মীয় বিরোধ, সাম্প্রদায়িকতা এসেছে তার লিখনিতে। আয়না ও ফুড কনফারেন্স গল্পগ্রন্থ সেক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় প্রমাণ।
আবুল মনসুর আহমেদ ছিলেন প্রচ- অসাম্প্রদায়িক। কিন্তু তিনি ধর্মের বিরুদ্ধে ছিলেন না। মননশীলতা ও সৃজনশীলতায় আবুল মনসুর আহমেদ সৃষ্টি করেছেন এক নবদিগন্ত। ধর্মের নামে কলুষতা ও ধর্ম ব্যবসার বিরুদ্ধে তিনি যেভাবে লিখেছেন সেটা অকল্পনীয় এবং অভাবনীয়।
কোন এক বক্তব্যে জাতীয় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান আবুল মনসুর আহমকে নিয়ে বলেন, আবুল মনসুর আহমদের প্রতিভা ছিল বহুমুখী, তাই জীবনের বহু ক্ষেত্রে তার পদার্পণ ছিল স্বাভাবিক। তার অভিজ্ঞতা ছিল বহু ও বিচিত্র, দৃষ্টিভঙ্গি ছিল তীক্ষè ও স্বতন্ত্র। সমাজ সম্পর্কে- বিশেষত বাঙালী মুসলমান সমাজ সম্পর্কে তার গভীর বেদনা বোধ ছিল এবং এ সমাজের কল্যাণ কামনা ছিল তার মর্মগত। সর্বোপরি সাহিত্যিক হিসেবে বাংলা সাহিত্যে আবুল মনসুর আহমদের আসন স্থায়ী।
সাহিত্যে অবদানের জন্য আবুল মনসুর আহমদকে বাংলা একাডেমি পুরস্কার (১৯৬০), স্বাধীনতা দিবস পদক (১৯৭৯) ও নাসিরউদ্দিন স্বর্ণপদকে ভূষিত করা হয়।
১৮৯৮ সালের ৩ সেপ্টেম্বর ময়মনসিংহ জেলার ত্রিশাল উপজেলার ধানিখোলা গ্রামে জন্ম নেয়া গুণী এই সাহিত্যিক ১৯৭৯ সালের ১৮ মার্চ চিরনিদ্রায় শায়িত হন।