ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ জুলাই ২০২৪, ৭ শ্রাবণ ১৪৩১

“হাজার হাজার খামারি ও ব্যবসায়ী সম্পৃক্ত এ খাত সিন্ডিকেট করে নিয়ন্ত্রণ সম্ভব নয়”

ডিমের উচ্চমূল্য এবং উৎপাদন ঘাটতি

প্রকাশিত: ২১:৫০, ২৩ জুন ২০২৪; আপডেট: ১১:৪৫, ২৪ জুন ২০২৪

ডিমের উচ্চমূল্য এবং উৎপাদন ঘাটতি

সারা দেশে বাণিজ্যিক লেয়ার খামারগুলোতে ডিমের উৎপাদন কমেছে

চলতি গ্রীষ্ম মৌসুমে সারা দেশে বাণিজ্যিক লেয়ার খামারগুলোতে ডিমের উৎপাদন কমেছে ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত। আর এতে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কমেছে এবং বাজারে ডিমের দাম বেড়েছে বলে মতামত ব্যক্ত করেছেন এ খাত সংশ্লিষ্টরা।
ডিম উৎপাদন কমে যাওয়ার নেপথ্য অনুসন্ধান করে জানা যায়, প্রথমতঃ সম্প্রতি দেশের দক্ষিণাঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় রোমেলের আঘাতে অগণিত মুরগির খামার বিধ্বস্ত হয়েছে এবং ডুবে গেছে। সিলেটাঞ্চলের নিচু এলাকাও প্লাবিত হয়েছে। ফলে নিরুপায় হয়ে এসব এলাকার খামারিরা ডিম দেওয়া মুরগি বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন। আর এতে স্বাভাবিকভাবেই ডিম উৎপাদন কমে গেছে। দ্বিতীয়তঃ এবারের তীব্র তাপদাহে উচ্চ তাপমাত্রাপ্রবণ জেলাগুলোর প্রায় প্রতিটি খামারে হিটস্ট্রোকে শতশত মুরগি মারা গেছে। এবং তৃতীয়তঃ অতি গরমে মুরগি স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় কম খাবার খায় বলে ডিমের উৎপাদনও কমে যায়। ডিম উৎপাদনে ঘাটতির এই তিন কারণ উল্লেখ করে পোল্ট্রি সংশ্লিষ্টরা বলেছেন, এখানে লুকোচুরির যেমন কিছু নেই, তেমনি কারো বিস্মিত হওয়ারও কিছু নেই। চাহিদার তুলনায় সরবরাহে টান পড়লে দাম বৃদ্ধি পাওয়া একটি স্বাভাবিক বিষয়।
বিভিন্ন পর্যায়ের পোল্ট্রি শিল্প সংশ্লিষ্ট ছোট বড় উদ্যোক্তা ও খামারিদের সাথে সরেজমিনে আলাপে জানা যায় যে, খামারের মুরগির খাবারের অনেক উপকরণ আমদানিনির্ভর। বিশ্ববাজারে অধিকাংশ সামগ্রীর দাম বৃদ্ধির সাথে সাথে দেশে মার্কিন ডলারের উচ্চ বিনিময় হারের কারণে বেড়েছে পোল্ট্রি ফিডের দাম। এ ছাড়া গত এক মাস আগ পর্যন্ত টানা ছয় মাস নানান কারণে খামারিদের উৎপাদন খরচের চেয়ে কমে অর্থাৎ লোকসানে ডিম বিক্রি করতে হয়েছে। সে কারণেও অনেক উদ্যোক্তা ডিম উৎপাদন ব্যবসা থেকে নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছেন।
এ প্রসঙ্গে গত ৭ জুন নরসিংদী জেলার বেলাব’র নতুন বাজার এলাকার পেশাদার খামারি শাহাদুল্লাহ ভূঁইয়া বলেন, “যখন ভালো উৎপাদন পেয়েছি তখন দাম না পেয়ে লোকসান গুনেছি। আর এখন দাম বাড়লেও গরমে উৎপাদন কমে গেছে। বাড়তি খরচের চাপ মাথায় নিয়ে সুদিনের অপেক্ষায় টানা ছয় মাসের বেশি সময় ধরে লোকসানে ডিম বিক্রি করেছি।”
১২ হাজার লেয়ার মুরগির এই খামারি বলেন, পোল্ট্রি ফিডের উচ্চমূল্যের কারণে খামার পরিচালনা ব্যয়ের মোট ৮০ ভাগই চলে যায় মুরগির খাবার বাবদ। ছয় বছরের ব্যবধানে প্রতিবস্তা মুরগির খাবারের দাম ১২৪০ টাকা থেকে বেড়ে ২৯৭০ টাকায় পৌঁছেছে। অর্থাৎ মুরগির খাবারের দাম বেড়েছে প্রায় আড়াইগুণ। কিন্তু সে হিসেবে ডিমের দাম কি বেড়েছে?-প্রশ্ন তুলে এই উদ্যোক্তা বলেন, “যে ক্রেতা ভালো দাম দেন তার কাছেই ডিম বিক্রি করি। এখানে সিন্ডিকেট কিসের-জানি না।”
একই জেলার শিবপুরের কামরাবে বাজারের এলাকায় ১০ হাজার লেয়ার মুরগির খামারের স্বত্বাধিকারী তরুন খামারি শাহ আলম বলেন, খামারির ডিম ও মুরগির দরকষাকষির জন্য কোনো সংস্থা নেই, নেই সংরক্ষণেরও ব্যবস্থা। তাই দাম যাই হোক, প্রতি তিনদিন অন্তর ডিম বিক্রি করি। এখন প্রতি ডিমে প্রায় ১১ টাকা দর পেলেও কয়েক মাস আগে বিক্রি করতে হয়েছে ৮ টাকা থেকে সাড়ে ৮ টাকার মধ্যে।
প্রায় অভিন্ন কথা বলেছেন একই থানার শিমুলতলীর অপর খামারি খন্দকার মঞ্জুর মুসা। তিনি বলেন, আমরা আমাদের খামারে উৎপাদিত ডিমের ন্যায্য মূল্য পেতে প্রতিনিয়ত হিমশিম খাচ্ছি। এতো অনিশ্চয়তা নিয়ে এই ব্যবসায় টিকে থাকা খুবই কঠিন-উল্লেখ করেন তিনি।
রাজধানীর নিকটস্থ জেলা নারায়ণগঞ্জের গাউছিয়ার পাইকারী ডিম বিক্রেতা ওমর ফারুখের সাথে আলাপচারিতায় তিনি জানান, “স্থানীয় কমিশন এজেন্টদের সহায়তায় আমি নরসিংদীর বিভিন্ন খামার থেকে নগদ দামে ডিম সংগ্রহ করে ঢাকার বিভিন্ন বাজারে ও ভ্যানে ডিম সরবরাহ করি। সরাসরি খামারিদের কাছ থেকে যখন যে দামে ডিম কিনি তার ওপর ২০ পয়সা ধরে বড় দোকান ও ভ্যানওয়ালাদের কাছে বিক্রি করি। এর মধ্যেই পরিবহন ভাড়া, ভাঙ্গা এবং ছোট-বড় ডিমের হিসাব মিলাতে হয়।”
“প্রান্তিক চাষিদের কাছ থেকে ডিম সংগ্রহ করে মজুদ করা যায় না। যখন খামারিরা ভালো দাম পান, তখন তাদের লাভ হয়। আবার যখন দাম কম থাকে তখন খামারিরা খরচের চেয়েও কম দামে ডিম বেচে দেন। যদি সিন্ডিকেট করে নিয়ন্ত্রণ করা হতো তাহলে বছরের সব সময়ই ডিমের দাম বেশি থাকতো। খামারিদেরও কখনো লোকসান গুনতে হতো না। সময় সময় অহেতুক সিন্ডিকেটের গুজব ছাড়ানো হয় বলেন এই ডিমের পাইকার।
এ প্রসঙ্গে দেশীয় প্রতিষ্ঠান কাজী ফার্মসের মহাব্যবস্থাপক (বিপণন) কৃষিবিদ আবু কাওসার মোঃ সালেহ-এর দেওয়া তথ্য ও মতামত অনুযায়ী দেশে বাণিজ্যিক লেয়ার খামারের সংখ্যা ৩৫ হাজার এবং খামার থেকে ডিম সংগ্রহকারী ব্যবসায়ীর সংখ্যা এক হাজার দুইশ’র বেশি। তিনি জানান, ব্যবসায়ীরা সব সময় খামারিদের কাছ থেকে কম দামে ডিম কেনার চেষ্টা করেন। খামারিদের মধ্যে কেউ বেশি দাম চাইলে তার কাছ থেকে ডিম নেন না। একই ভাবে এসব ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে খুচরা বিক্রেতারাও কম দামে ডিম কেনার চেষ্টা করেন। এখানেও কেউ বেশি চাইলে বিকল্প জনের কাছে চলে যান। ব্যবসায়ীদের মধ্যেই যেখানে অসংখ্যা ক্রেতা-বিক্রেতা সেখানে অহেতুক কারো পক্ষে দাম বাড়ানো সম্ভব নয়। চাহিদার তুলনায় যোগান কম হলে দাম যেমন বাড়ে , তেমনি চাহিদার চেয়ে সরবরাহ বেশি হলে দাম কমে যায়।
কৃষিবিদ কাওসার আরো জানান, সরকারী সংস্থা কৃষি বিপণন অধিদপ্তর কর্তৃক নির্ধারিত ৯ টাকা ৬১ পয়সা পাইকারি দরেই কাজী ফার্মস ডিম বিক্রি করছে। তবে বেশির ভাগ খামারিরা ওই দরের তুলনায় বেশিতে ডিম বিক্রি করতে পারছেন বলে উৎপাদন অব্যাহত রাখতে পারছেন, অন্যথায় তাঁরা খামার বন্ধ করে দিতে বাধ্য হতেন।
এ বিষয়ে কাজী ফার্মসের পরিচালক কাজী জাহিন হাসান বলেন, “ডিমের খামার, ফিড মিল এবং হ্যাচারিতে আমাদের বিপুল অংকের বিনিয়োগ রয়েছে। কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের বেঁধে দেওয়া দরে ডিম বিক্রি করার কারণে আমরা বিনিয়োগ করে লাভবান হচ্ছি না।” 
বিভিন্ন রকম রোগবালাই, মহামারি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে মুরগি মারা যাওয়ার প্রেক্ষিত তুলে ধরে এই উদ্যোক্তা বলেন, পোল্ট্রি খাতের ব্যবসা অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ। এটা জেনেও মোটা অংকের বিনিয়োগের বিপরীতে ন্যায্য লাভ না পেলে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা আগ্রহ হারিয়ে ফেলবে এবং এ ব্যবসায় নতুন বিনিয়োগ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেবে। ফলে চাহিদা ও উৎপাদনের মধ্যে বড় সঙ্কট দেখা দেবে। সে রকম পরিস্থিতি যাতে না হয় তার জন্য কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের নির্ধারিত ডিমের দর বিনিয়োগ অনুকূল হওয়া বাঞ্ছনীয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
এ প্রতিবেদককে দেওয়া ব্রিডার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি মাহবুবুর রহমানের হিসাব অনুযায়ী বর্তমানে দেশে গড়ে প্রতিদিন ডিমের চাহিদা সাড়ে ৫ কোটি। উৎপাদন হয় ৪ কোটি ৮০ লাখ। মোট উৎপাদনের মধ্যে হাঁস ও দেশীয় মুরগির ডিম বাদে বাণিজ্যিক ছোট বড় খামারগুলোতে ৪ কোটি পিস মুরগির ডিম উৎপাদন হয়। তাতে প্রতিদিন প্রায় ৭০ লাখ ডিমের ঘাটতি রয়েছে। তবে নানা কারণে এই চাহিদায়  তারতম্য ঘটে। প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন কারণে পোল্ট্রি খাত খারাপ সময় পার করছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, বর্তমানে ডিমের ঘাটতি দেখা দিয়েছে এবং সে কারণে ডিমের দাম বেড়েছে।
এই বাজার ব্যবস্থায় সিন্ডিকেটের অভিযোগ উড়িয়ে দিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ডক্টর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিন বলেন, হাজার হাজার বিক্রেতার প্রতিযোগিতামূলক বাজার ব্যবস্থায় ডিমের দাম নিয়ন্ত্রণ করার কোনো সুযোগ নেই, কেউ পারেও না। বিশ্বের প্রায় সর্বত্র পচনশীল পণ্য যথাযথ সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে। আমাদের দেশের যদি সে রকম ব্যবস্থা থাকতো তাহলে সঙ্কটের সময় বাজার স্থিতিশীল রাখা কিছুটা হলেও সম্ভব হতো। কিন্তু বাস্তবে আমাদের সে সুযোগ এখনো গড়ে না ওঠায় ডিমসহ পচনশীল অন্যান্য পণ্যের উৎপাদকরা টিকে থাকার সংগ্রাম চালিয়ে যাচ্ছেন।
প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের পরিচালক (এক্সটেনশন) ডক্টর মো. শাহীনুর আলমের মতে, ডিমের উৎপাদন ও চাহিদার সরকারী হিসাবের সাথে বেসরকারী হিসাবের অমিল রয়েছে। তাছাড়া বিভিন্ন কারণে ও মৌসুম ভেদে উৎপাদন ও চাহিদার তারতম্য ঘটে। ডিমের ব্যবসায় সিন্ডিকেটের অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করে সরকারের এই পদস্থ কর্মকর্তা বলেন, ডিমের দামে ভোক্তার সাথে সাথে খামারির ন্যায্যতা নিশ্চিত করা জরুরী। তিনি আরও বলেন, “বাজারে কোনো পণ্যের মূল্য বৃদ্ধি পেলেই তার পেছনে সিন্ডিকেটের ভুমিকা আছে বলে যে দাবী করা হয় তা বেশীর ভাগ ক্ষেত্রেই ভিত্তিহীন।”
মাঈনউদ্দীন আহমেদ
ফ্রিল্যান্স জার্নালিস্ট

×