ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

গাছভর্তি প্রিয় ফুলে

কাঠগোলাপেরা খোঁজে ভালোবাসা...

মোরসালিন মিজান

প্রকাশিত: ২৩:০৮, ১১ জুন ২০২৪

কাঠগোলাপেরা খোঁজে ভালোবাসা...

রাজধানীর একটি বাগানে ফুটেছে লাল পাপড়ির কাঠগোলাপ

কয়েকদিন আগের কথা। বেইলি রোডের একটি কফিশপ থেকে বের হয়েছি। রাত তখন প্রায় ৯টা। বেশিরভাগ সড়কবাতি বিকল হয়ে পড়ে আছে। তবে মাথার ওপর মায়াবি চাঁদ ছিল। সেই চাঁদের মিষ্টি আলোয় সব সময় যেমনটি দেখি তার চেয়েও অপরূপ হয়ে ধরা দিল কাঠগোলাপ। ভিকারুন নিসা নূন স্কুল এন্ড কলেজের সীমানা প্রাচীর টপকে বের হয়ে আসা কাঠগোলাপ আগেও দেখেছি অনেক।

কিন্তু চাঁদের আলোয় দেখা এই প্রথম। আলোটা সরাসরি এসে ফুলের ওপর পড়ছিল। ফুলগুলোও যেন দারুণ উচ্ছ্বাসে পাপড়ি মেলে দিয়েছিল। গায়ে মাখছিল সে আলো। দশ বিষটি নয়, গাছভর্তি ছিল কাঠগোলাপ। সাদা পাপড়ির কাঠগোলাপ, রুপালি চাঁদের আলো মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। আমার সঙ্গে থাকা বন্ধুটি তৎক্ষণাৎ চাঁদসমেত কাঠগোলাপের ছবি তুলে নিল মোবাইল ফোনে। আর আমি? মনের ক্যামেরায় ধরে রাখলাম অপার্থিব সেই দৃশ্য।

এমন দৃশ্য দেখেই হয়তো কবি লিখেছিলেন : ঠিক সন্ধে নামে যখন/নীল পথের পাড়ে, নীল কমলের সুঘ্রাণ/ছড়ালে বালিকা; চলে যেতে গিয়েও/থমকে দাঁড়ায় বিকেলের রং,/আর আমার হাতের কাঠগোলাপেরা/খোঁজে ভালোবাসা...। 
না, এখন আপাতত চাঁদ নেই আকাশে। তবে ভালোবাসার সন্ধান করে চলেছে কাঠগোলাপ। রাজধানী শহরের বিভিন্ন সড়কের ধারে, বাসা-বাড়ি বা অফিস আদালতের সীমানা প্রাচীর ঘেঁষে সুন্দর ফুটে আছে ফুলটি। পার্ক উদ্যান বা ঝিলের ধারেও দেখতে পাবেন। কারণ এখন ভরা মৌসুম। সৌন্দর্যের পাশাপাশি কাঠগোলাপের মিষ্টি ঘ্রাণ কী যে উপভোগ্য হয়ে উঠেছে! অবশ্য গাছটা বেশ উঁচু হয়।

হাত বাড়ালেই ফুল পাওয়া যায় না। তবে পথিকের ভালোবাসার টানেই হয়তো মাটিতে লুটিয়ে পড়ে কাঠগোলাপ। নিচে পড়লেও, ফুলের গায়ে এতটুকু ময়লা লাগে না। কোমল মোটা পাপড়ি। ভাঙেও না সহজে। ফুলপ্রেমীরা দেখামাত্রই হাতে তুলে নেন। নাকের কাছে চেপে ধরেন।

শুধু তাই নয়, পবিত্র জ্ঞান করে একসময় দেবমন্দিরে বেশি লাগানো হতো গাছটি। আর বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বীরা কাঠগোলাপকে দেখেন মৃত্যুহীন প্রাণের প্রতীক হিসেবে। অভিন্ন বিবেচনায় কাঠগোলাপকে প্যাগোডাট্রি বলা হয়ে থাকে। 
উদ্ভিদবিদ দ্বিজেন শর্মার বর্ণনা মতে, বাংলাদেশসহ পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে কাঠগোলাপ ফুটলেও এর আদি নিবাস গুয়াতেমালা ও মেক্সিকো। গাছের উচ্চতা ১২ থেকে ৩০ ফুট পর্যন্ত হয়ে থাকে। পাপড়ির ঊর্ধ্বাংশ প্রশস্ত। ফুলের ব্যাস প্রায় ২ ইঞ্চি। কাঠগোলাপের কিছু প্রজাতির কথাও উল্লেখ করেছিলেন তিনি। এই যেমন : প্লুমেরিয়ারুবরা ফরমা অ্যাকুইটিফলিয়া, প্লুমেরিয়ারুবরা, প্লুমেরিয়া অ্যালবা, প্লুমেরিয়া ও টিউবার কুলেটা। 
শীতের শেষে এই গাছের পাতা ঝরতে শুরু করে। দেখতে দেখতে নিষ্পত্র হয়ে যায়। তখন একে জলের ফোয়ারায় ব্যবহার করা সরু পাইপের মতো মনে হয়। প্রায় মৃত দেখালেও গ্রীষ্মে, মানে এই সময়ে নতুন প্রাণ পায়। গাছে বেশ লম্বা পাতা হয়। শাখার শেষ অংশে ঘন বিন্যস্ত গুচ্ছ গুচ্ছ পাতা থাকে। খাঁজকাটা পাতার সৌন্দর্যও চোখে পড়ার মতো। আর ফুল হয় শাখা-প্রশাখার অগ্রভাগে।

থোকা থোকা ফুল। কাঠগোলাপ কাঠচাম্পা, গৌরচাম্পা, চালতা গোলাপ, গুলাচি, গোলকচাঁপা নামেও পরিচিত। একাধিক রঙের ফুল হয়। লাল কাঠগোলাপ একটু বিরল। কম দেখা যায়। তবে খুব আকর্ষণীয়। অন্যদিকে, সাদা কাঠগোলাপ থাকে আশপাশেই। পাঁচ পাপড়ির ফুলের কেন্দ্রে গাঢ় হলুদ রঙের ছোঁয়া। দুই রঙের এমন মিশেলে দেখতে ভীষণ ভালো লাগে। 
শেষ করা যাক জনপ্রিয় গায়ক অর্ণবের গানটি দিয়ে, শিল্পী গেয়েছেন : কাঠগোলাপের সাদার মায়া মিশিয়ে দিয়ে ভাবি/আবছা নীল তোমার লাগে ভালো...। আপনার কোন রং ভালো লাগে? আর ফুল? নিশ্চয়ই কাঠগোলাপ!

×