ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ০৫ অক্টোবর ২০২২, ২০ আশ্বিন ১৪২৯

পরিবেশবান্ধব শালিক

ঘোরে জুটিবদ্ধ হয়ে কণ্ঠ অনুকরণ করতে পারে

সমুদ্র হক

প্রকাশিত: ২৩:১৫, ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২২

ঘোরে জুটিবদ্ধ হয়ে কণ্ঠ অনুকরণ করতে পারে

শালিক পাখির ঝাঁক

‘পাখি সব করে রব রাতি পোহাইল, কাননে কুসুম কলি সকলি ফুটিল’ মদন মোহন তর্কালঙ্কারের শিশু শিক্ষা পুস্তকের শেষের এই কবিতাটি প্রজন্মের শিশুরা এখন আর পাঠ করে না। এই পাখির কিচির মিচির কলতানে ঘুম ভাঙ্গে। গোধূলি বেলায় নীড়ে ফেরার সময় ঝাঁক বেঁধে উড়ে সন্ধ্যা নামায়। এরা এখন শহরমুখী হয়েছে। বগুড়া শহরে সকাল-সন্ধ্যা এদের ঝাঁক বেঁধে উড়তে দেখা যায়। শালিক পাখিকে নিয়ে কতই না কথা! আজ যারা মধ্যবয়সী ও প্রবীণ তাদের কিশোর বেলায় শালিককে নিয়ে ইংরেজী ছন্দ আজও মনে পড়ে ‘ওয়ান ফর স্যরি, টু ফর জয়, থ্রি ফর লেটার, ফোর ফর গেস্ট’। (বাংলা ভাবার্থ- এক শালিক দেখলে বিষণœতা, দুই শালিকে আনন্দ, তিন শালিকে চিঠি আসবে আর চার শালিকে বাড়িতে অতিথি আসবে)।
ভোর বেলা ফাঁকা মাঠে শালিকের মিলন মেলা কে না দেখেছে। এতটাই কিচির মিচির শব্দ যে প্রকৃতিও কান পেতে শোনে ওদের কথা।

এই সময় এরা ভাব করে আবার ঝগড়া করে। তারপর শালিকেরা খাবার সন্ধানে উড়ে বেড়ায় এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে। শালিক এমনই এক পাখি মানুষের কাছাকাছি থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করে। এই সময়ে এই শালিককেই দেখা যাচ্ছে ঝাঁকে ঝাঁকে উড়তে। সাধারণত ধান মাড়াই-কাটার সময়টাতে এরা খেতে ওড়াউড়ি করে। বগুড়া শহরে দেখা গেল শালিকের পাল ফাঁকা সড়কে কিচির মিচির করছে। আবার খাবার সন্ধানে কোন হোটেলের ভেতরে রান্না ঘরে প্রবেশ করছে। খাবার মুখে নিয়েই এই উড়ছে। শহরের বাড়িতে জানালার গ্রিল দিয়ে ঢুকে পড়ছে ডায়নিং টেবিলে। খাবার নিয়ে উড়ে পালাচ্ছে। অত্যাচার করে না। গোধূলি বেলায় এদের দেখা যায় বিদ্যুতের পোলের তারে সারিবদ্ধ হয়ে বসে আছে। কখনও ঝাঁকে ঝাঁকে উড়েউড়ে খেলা করছে।     
শালিক উপকারি পাখি হয়ে ক্ষতিকর পোকা দমনে বড় ভূমিকা রাখে। পরিবেশের সকল ক্ষতিকারক পোকাই এদের প্রধান খাবার। উন্নত দেশে শালিক পরিবেশবান্ধব পাখি হিসেবেও পরিচিতি পাচ্ছে। সারা বিশ্বে শালিকের প্রজাতি আছে ১শ’ ১৫টি। যার মাত্র ১২ প্রজাতির দেখা মেলে দেশে। শালিকের ইংরেজী নাম ‘কমন ময়না’। বৈজ্ঞানিক নাম ‘এক্রিডোথারিসট্রিসটস’। শালিক পাখির ব্যক্তিত্ব ভয়ঙ্কর। এরা জুটিবদ্ধ হয়ে ঘোরে। দেশে গাঙ শালিক, ভাত শালিক, ধান শালিক, ঝুঁটি শালিকের জাত খুঁজে পাওয়া যায়। তবে সকল শালিকেরই গোত্র একই। নাম স্টার্নিড। এশিয়া ইউরোপ অস্ট্রেলিয়া বিষুবীয় অঞ্চলের প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপগুলোতে এদের দেখা যায় বেশি। এশিয়া ও ইউরোপের প্রজাতিকে উত্তর আমেরিকা হাওয়াই দ্বীপ ও নিউজিল্যান্ডে অবমুক্ত করা হয়েছে।  
শালিকের হাঁটা চলা দেখে মনে হবে রাজা হেলে দুলে যাচ্ছে। একমাত্র শালিক পাখিই আট রকম শব্দে কিচির মিচির করে। এদের স্বরতন্ত্রী আলাদা। মানুষের কণ্ঠ (কথা নয়) অনুকরণ এবং একটি শালিক আরেকটি শালিকের স্বর অনুকরণ করতে পারে। এই স্বরে নির্দিষ্ট কাউকে চিনতেও পারে। শালিক পাখি বর্তমানে মানব ভাষা বিষয়ক গবেষণার বিষয়বস্তু হয়েছে। কিচির মিচিরের সুরে সঙ্গীরা বুঝে নেয় ভাষা। মানুষ যেমন চোখের পলক তুলে কথা বলে বা চোখ দিয়ে ইশারা করে, কাঁধ নেড়ে সম্মতি বা অসম্মতি প্রকাশ করে, শালিকও তেমনি এমন ভঙ্গিতে মাথা নাড়ায় যেন মনে হবে কিই না ইশারা দিচ্ছে। যে কারণে পাখিদের মধ্যে একমাত্র শালিকের প্রণয় মধুর ভূমিকাটি মধুময়তায় ভরে থাকে।
কোনটি ছেলে শালিক আর কোনটি মেয়ে তা সহজে বোঝা যায় না। এদের মাথা, গলা ও বুক ডানার কিছু অংশ ও লেজ কালো। বাকি পালকগুলো চকোলেট রঙের। ঠোঁট হলুদ বরণ। জোড়ায় জোড়ায় ঘুরলেও চেনার উপায় নেই। সূক্ষ্মভাবে তাকালে ও কিচির মিচির শব্দ শুনে কেবল আঁচ করা যায়। মেয়ে শালিকের শব্দ ছেলে শালিকের চেয়ে চিকন। মাটি থেকে ওড়ার সময় মেয়ে শালিক আগে শব্দ করে। পুরুষ শালিক কিছুটা উড়ে শব্দ করে। শালিক অগোছানো পাখি। আচরণে বাবুইয়ের উল্টো।

গাছের শাখা প্রশাখায়, গ্রামের ঘরের চালায়, বাসা বাড়ির ছাদে জানালার কার্নিসেও থাকে। পুরনো বট পাকুড় কড়ি গাছে এরা থাকে স্বাচ্ছন্দ্যে। পাখি প্রেমীগণ এই পাখির নাম দিয়েছে যাযাবর। অগোছানো হলেও এরা খাবার সংসার বিশ্রাম সবই করে রুটিন অনুযায়ী। অতিথি পাখির সঙ্গে এরা দ্রুত মিশতে পারে।
এদের প্রজননকাল বর্ষায়। বাচ্চা দিতে পারে বছরে দুবার। এক সঙ্গে তিন থেকে সাতটি ডিম দেয়। তিন সপ্তাহে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হয়। এরপর চার সপ্তাহে উড়তে শেখে। শিশু শালিক উড়তে শেখার পর ডানার ওপর বিশ্বাস এনে এগিয়ে যায় নিজের পথে। শালিক প্রমাণ করে দেখায় পাখি যখন উড়তে শেখে তখন ডানাই তার একমাত্র ভরসা।