ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২২, ১০ আশ্বিন ১৪২৯

দুর্গার স্বরূপ ও প্রতিমায় আরাধনা

প্রকাশিত: ২১:১৪, ২৪ অক্টোবর ২০২০

দুর্গার স্বরূপ ও প্রতিমায় আরাধনা

আয় দেখে যা শরদাকাশে সাদা মেঘের ভেলা, / দশভুজার চরণতলে সিংহ করছে খেলা। সৃষ্টি রক্ষায় ত্রিশূল দিয়ে মা অসুর নিধন করে, / জীব সন্তান রক্ষা পায় মায়ের শক্তিধরে। এসো শারদীয় দুর্গোৎসবে প্রাণে প্রাণে মিলি, / আনন্দ-খুশির বার্তা দিতে শুভ শারদীয় বলি। বিশ্বব্যাপী করোনা দুর্যোগের মধ্যে একটি বছর পর সবুজ-শ্যামল বাংলায় দুর্গা মায়ের আগমন। এমন বৈশ্বিক মহামারীতে দুর্গতিনাশিনী দুর্গাদেবীর কাছে আমাদের প্রার্থনা, বিশ্ব যেন দুর্যোগমুক্ত হয়, মানুষ যেন শান্তি ও সমৃদ্ধময় জীবন লাভ করে। দুর্গাপূজা সনাতন ধর্মাবলম্বী জনগণের ধর্মীয় গণউৎসব। তাদের প্রাণের উৎসব। আশ্বিনের শুক্লপক্ষের ষষ্ঠী তিথি থেকে দশমী তিথি পর্যন্ত একটানা পাঁচদিন উৎসবের অনুষ্ঠান বাঙালীর মনে সৃষ্টি করে ব্যাপক আলোড়ন। আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অনুভূতি উদ্বেলিত হয়ে প্রাণে প্রাণে আনন্দের দোলা দেয়। মহাশক্তি আনন্দময়ীর জাগরণে ও আগমনে মহানন্দ শক্তির বিশ্বব্যাপী মহালীলা অনুভব করার শুভক্ষণ আসে আমাদের জীবন ও সমাজে। সে কারণেই সব বিপদ থেকে রক্ষার জন্য মহাদেবীর রণরঙ্গিনী রূপের আরাধনায় আমরা মেতে থাকি। আকাশে-বাতাসে দেবীর আগমনী বার্তা যেমন প্রকাশ পায়, তেমনি এ পৃথিবীতে তাঁর অবস্থান আপামর বাঙালী হৃদয়ে সাহস ও শক্তির উচ্ছ্বাস জাগায়। শরৎকালে আশ্বিনের শুক্লা প্রতিপদ থেকে আরম্ভ করে নবমী পর্যন্ত যে মহাদেবীর আরাধনা করা হয়, তাকে দুর্গোৎসব বা মহাপূজা বলে। এই পূজাকে বলে শারদোৎসব। ভারতের কোন কোন অঞ্চলে একে নবরাত্র পূজাও বলে। শরৎ ও বসন্তে দু’বার এই নবরাত্র বিধানে দেবী ভগবতীর পূজা অনুষ্ঠিত হয়। একটি শারদীয়, অন্যটি বাসন্তী-দুর্গাপূজা। কালিকাপুরাণ মতে, মহিষাসুর বধের জন্য দেবতাদের প্রার্থনায় দেবী হিমালয়ে কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে দেবতাদের সমষ্টিভূত তেজ থেকে আবির্ভূত হন শরৎকালে দশভুজা দুর্গারূপে। শ্রাবণ থেকে পৌষ মাস এই ছয় মাস হচ্ছে দক্ষিণায়ন- এই সময়ে দেবতারা নিদ্রিত থাকেন। আর মাঘ থেকে আষাঢ় এই ছয় মাস উত্তরায়ণ- দেবতাদের জাগরণের মাস। দুর্গাপূজা যেটি হয়- শরৎকালে তখন দেবী নিদ্রিতা। তাই পূজার জন্য তাঁকে বোধন অর্থাৎ, জাগাতে হয়। শরৎকালে পূজা অকালে। আর বসন্তকালে তাঁরা জাগ্রত। তাই এটি কালের পূজা। এখন শরৎকালের পূজার বিষয়ে কতক কাহিনী প্রচলিত আছে পুরাণাদিতে। কালিকাপুরাণে আছে-দেবী-মহামায়া আদ্যাশক্তি দেবতাদের প্রার্থনায় প্রবুদ্ধা হয়ে আশ্বিন মাসের কৃষ্ণপক্ষের চতুর্দশী তিথিতে, মহালয়ার আগের দিন আবির্ভূতা হন কাত্যায়ন ঋষির আশ্রমে। এর পরে শুক্লা সপ্তমীতে দেবতাদের তেজে দেবীমূর্তি পরিগ্রহ করেন। অষ্টমীতে দেবতারা নানা অস্ত্রাদি ও অলঙ্কারে দেবীকে সাজিয়ে দেন। নবমীতে দেবী দেবতাদের দ্বারা নানা উপাচারে পূজিতা হয়ে মহিষাসুর বধ করেন। দশমীতে দেবগণের আনন্দোৎসব ও পূজার পরে দেবী বিসর্জিতা হন ও অন্তর্ধান করেন। দেবীভাগবতে আছে- দক্ষযজ্ঞে সতীর দেহত্যাগের পর ভগবতী আশ্বিনের শুক্লা অষ্টমীতে মহাভয়ঙ্করী ভদ্রকালীরূপে আবির্ভূতা হন, সঙ্গে কোটি যোগিনীদের নিয়ে দক্ষযজ্ঞ বিনাশ করেন। এ জন্য দুর্গাপূজার মহাঅষ্টমী তিথিতে দেবীকে তাঁর বহু শক্তিমূর্তি ও কোটি যোগিনী সমন্বিতা হয়ে গন্ধ-পুষ্প-চন্দন-পরমান্ন ও সামিষ নৈবেদ্যাদি সহযোগে বিশেষ পূজা করতে হয়। আর দক্ষযজ্ঞ বিনাশের জন্য তাঁর এই আবির্ভাব উপলক্ষে ওই পূজায় তাঁকে বলা হয় তিনি দক্ষযজ্ঞবিনাশিনী। ঘোরাসুরকে বধ করার জন্য তিনি মহাঘোরা ও ভদ্রকালী নামে অভিহিত। দেবীর এই আবির্ভাবই শরৎকালে হয়েছিল। তাই মহাদেবীর পূজার প্রশস্ত কাল শরৎকাল। দুর্গা নামের পেছনে আরও একটি কাহিনী আছে। প্রাচীনকালে দুর্গম নামের এক অসুরকে বিন্ধ্যাচলের কাছে দেবী বধ করেন। সে থেকেই তাঁর নাম দুর্গা। তবে ওই দুর্গম অসুরকে বধ করার আগে দেবী প্রথমে হন শতাক্ষী, তারপরে হন শাকম্ভরী। তারপরে দুর্গমাসুরকে বধ করেন। দ্বাপরযুগে দুর্গাদেবী পরমেশ্বর ভগবান শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে গোকুলে যশোদার কন্যারূপে জন্মগ্রহণ করেন ও কংসের হাত থেকে পিছলে গিয়ে আকাশে অষ্টভুজা দুর্গামূর্তিতে প্রকাশিত হন। জন্মাষ্টমীতেই তাঁর জন্ম হয় শ্রীকৃষ্ণের সঙ্গে একই দিনে, নন্দ-যশোদার বাড়িতে। এখানে দেবী মহামায়া। যিনি মায়ার প্রভাবে কংসের কারাগারের সকল রক্ষী ও সৈন্যদের গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন করেছিলেন। দেবী দুর্গা আদিশক্তি-সর্বশক্তির অধিকারী, জীবের দুর্বলতা কাপুরুষতা দূর করার জন্য আবির্ভূতা। সন্তানের প্রতিপালন পরিপোষণের জন্য সর্বদাই তাঁর অন্তর ও বাইরে যুদ্ধ করছেন। যে অসুরকে বধ করে তাঁর দুর্গা নাম, সেই অসুর আমাদের মধ্যেই আছে। সেই অসুরের দুটি কাজ। সংসারে স্বার্থান্ধতা-আর আধ্যাত্মিক পথে অবিদ্যা। দুর্গম স্বার্থান্ধকারে ডুবে জীব অশেষ দুর্গতি ভোগ করে। জীবের এই অহিতকারী বুদ্ধি দূর করে তাকে লোককল্যাণকর নিঃস্বার্থ বুদ্ধিদান করে রক্ষা করেন বলেই তিনি দুর্গা। আবার অজ্ঞান অবিদ্যা অধীন হয়ে জীব মায়ার বাঁধনে বাঁধা পড়ে সংসারচক্রে ঘুরপাক খায়। জ্ঞান অসি দিয়ে ত্রিতাপ ও রজো-তমোগুণ জাত অবিদ্যার বন্ধন ছেদন করে মা দুর্গা জীবের মোহভ্রান্তি নাশ করেন বলেই তিনি দুর্গা। এই দুরধিগম্যা মাতৃরহস্য শক্তিতত্ত্ব মায়ের কৃপা ছাড়া উপলব্ধি হয় না। যে সাধক বা জীব সন্তান নিজের সাধনাবলে মায়ের প্রসন্নতা অর্জন করেছেন তার চিত্তপটে-হৃদয়াকাশে মা ধরা দেন। দশভুজা মহামায়া তখন আর্ত জীবের কল্যাণে তাকে রক্ষার জন্য মাতৃমূর্তিতে প্রকাশিত হয়ে জীবের মুক্তির দ্বার প্রসারিত করেন। সনাতন ধর্মের আরাধনা তত্ত্বে প্রতিমা হচ্ছে উপাস্য দেবতা বা দেবশক্তির প্রতীক। সাকার প্রতিমাকে অবলম্বন করে সাধক ক্রমে সূক্ষ্মতর থেকে সূক্ষ্মতম ব্রহ্মতত্ত্ব প্রত্যক্ষ করতে পারেন। নিরাকার নয় এমন বস্তুতে শাস্ত্রীয় রীতিতে ব্রহ্মের উপাসনাকে প্রতীকোপাসনা বলে। প্রতীক উপাসনায় ব্রহ্মই উপাস্য- প্রতিমা তাঁর প্রতিনিধি বা উদ্দীপক মাত্র। সাধনার প্রথম স্তরে এই প্রতীক বা প্রতিমা উপাসনা অনিবার্যভাবে প্রয়োজনীয়। ক্রমে যোগ্যতা অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে গুণাতীত নিরাকার সত্তায় মন যুক্ত হয়। এই পূজা বৈদিক ও তান্ত্রিক-দুই রকমেই হয়ে থাকে। বিশ্বব্যাপী পরব্রহ্ম সর্বত্র অধিষ্ঠিত হলেও প্রতিমাতেই তাঁকে সহজে ধরা যায়। তাঁর আবির্ভাব, সাধকের ভক্তি-আন্তরিকতা-নিষ্ঠাই প্রতিমাকে প্রাণবতী করে জাগ্রত জীবন্ত করে সাধকের বাঞ্ছা পূর্ণ করে। সাধকের বিশ্বাসই দেবতাকে প্রতিমায় প্রকাশিত করে তার সাধনা সম্পূর্ণ করে। দুর্বলের প্রয়োজন শক্তির, তেমনি শক্তিকে আরাধনার জন্য চাই অবলম্বন। দুর্গা মায়ের প্রতিমা তেমনি আমাদের কাছে শক্তির অবলম্বন। সমাজ থেকে অসুর তাড়াতে আদ্যাশক্তিকে হৃদয়ে ধারণ করতে হবে। আবার মানবদেহে ষড়রিপুর তাড়না থেকে নিজেকে রক্ষা করে স্রষ্টার কাছে মুক্তি প্রার্থনার জন্যও মহাশক্তির আরাধনা দরকার। জাগতিক মোহ কাটিয়ে ভববন্ধন থেকে মুক্তি পেতেও মহামায়ার শক্তির প্রয়োজন। মায়ার বাঁধন ছিন্ন করে শুদ্ধ সাত্ত্বিক স্তরে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্যও দশভুজার শক্তি দরকার। সামাজিক বন্ধন সুদৃঢ় করতে, ভ্রাতৃত্ববোধ জাগরণের মাধ্যমে সকলের মধ্যে ঐক্যবদ্ধ মনোভাব সৃষ্টিতে মানসিক ও শারীরিক শক্তির প্রয়োজন বলেই আমরা আদ্যাশক্তি মহাদেবীর আরাধনায় নিয়োজিত থাকব। অসুর চেতনা বিনাশ করে ন্যায়-সত্য ও সুন্দরের আবাহনে এ পৃথিবী হয়ে উঠুক শান্তি ও সুখময়। লেখক : সিনিয়র শিক্ষক, সেন্ট গ্রেগরী হাই স্কুল এ্যান্ড কলেজ