রবিবার ৪ আশ্বিন ১৪২৮, ১৯ সেপ্টেম্বর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

মুজিব ॥ ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্রের পিতা

  • মোস্তাফা জব্বার

মুজিব তোমাকে শততম জন্মদিনের শুভেচ্ছা। বিশ্বের শ্রেষ্ঠতম বাঙালী, বিশ্বের একমাত্র বাংলা ভাষার রাষ্ট্রের পিতা, বাংলা ভাষার আন্দোলনের জনক, চার দশকেরও বেশি সময় আগে বাংলার মাটিকে রক্ত দিয়ে পবিত্র করে যাকে সপরিবারে শহীদ হতে হয়েছিল, তাঁর সম্পর্কে দুটি বাক্য লিখতে আর কার কি হয় জানি না, আমার তো হাত কাঁপে। এত বড় মাপের মানুষ, তাঁকে মূল্যায়ন করার ক্ষমতা আমার মতো নগণ্য একজনের থাকতেই পারে না। সত্তর বছর বয়সেও তাঁকে নিয়ে একটি পূর্ণাঙ্গ নিবন্ধ লিখতে পারিনি। আমি তার ভক্ত-সৈনিক। তাঁকে দূর থেকে দেখেছি। তাঁর রাজনীতির সৈনিক হিসেবে যুদ্ধ করে যাচ্ছি। আমার চারপাশে, ইতিহাসের পাতায় তাঁর সঙ্গে তুলনীয় কোন রাজনীতিককে আমি দেখি না। আমার পাঠ করা গল্প-ইতিহাসের পাতাতেও নেই। বাংলাদেশ, ভারতবর্ষ, দক্ষিণ এশিয়া, এশিয়া বা সারা দুনিয়া খুঁজে একজনও শেখ মুজিব পাইনি আমি। তিনি কেবল হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী নন। তাঁকে আমি মনে করি একজনই বাঙালী, যার মাঝে বাঙালিত্বের পুরোটা আছে এবং সে জন্য তিনি সকল বাঙালীর, সকল বাংলা ভাষাভাষীর একমাত্র অনুসরণীয় নেতা। চারপাশে তাকে নিয়ে কোটি কোটি হরফ দেখি। যিনি যেভাবে চান তাঁকে সেভাবেই উপস্থাপন করছেন। কেন জানি মনে হচ্ছে তাঁর নীতি, আদর্শ বা কর্মপন্থাকে আমরা এখনও সেইভাবে মূল্যায়ন করি না, যেভাবে সেটি করা দরকার। অনেক ভাবনা থেকে তাঁর সম্পর্কে একটি অতি ক্ষুদ্র নিবন্ধ লেখার সাহসও এতদিন পাইনি। এবার যখন ৭১ বছরে পা দিলাম তখন মনে হলো এই মহামানব সম্পর্কে নিজের ভাবনাটা প্রকাশ করে যাওয়াটা নিজের কাছে জবাবদিহি করার মতো একটি বিষয়। নইলে এক সময়ে মনে হবে আমি তাঁকে যেমনটি ভাবি সেটি তো কাউকে বলা হয়নি।

আমি নিজে তাঁর নাম সরাসরি শুনেছি ও রাজনীতির সৈনিক হয়েছি ১৯৬৬ সালে, যখন ঢাকা কলেজে পড়ার সময়ে ছাত্রলীগ করা শুরু করি। সেখানেই ছয় দফা নামক একটি লিফলেট বণ্টন করতে গিয়ে প্রথম জেনেছি যে, বাঙালীরা তাদের প্রাপ্য পায় না। কেবল তাই নয়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ভেতরেও আমরা সাধারণ মানুষ বৈষম্যের শিকার। গ্রাম থেকে হাওড়ের কাদামাটি পায়ে মেখে ঢাকায় এসে অনুভব করি, কিছু নগরবাসী ছাড়া আমরা সবাই শোষিত-বঞ্চিত ও সর্বহারা। এর আগে স্কুলের লাইনে দাঁড়িয়ে পাক সার জমিন সাদ বাদ গান গেয়েছি। পাকিস্তানী জাতীয়তাবাদকে পোক্ত করার জন্য স্কুলে আমাকে উর্দু পড়তে বাধ্য করা হয়েছে। এসএসসিতে আমার ফল খারাপ হবার অন্যতম কারণ হচ্ছে বাধ্য হয়ে পড়া উর্দুতে আমি মাত্র ৩৩ নম্বর পেয়েছিলাম। ঢাকা কলেজের সেই জ্ঞানকে আরও শাণিত করতে পারি যখন ৬৮ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করি। তখন ১১ দফায় সেই ছয় দফা যুক্ত হয়, আর রাজপথে তাঁর মুক্তির দাবিতে মিছিল করা দিয়ে নিজের স্লোগান দেয়ার ক্ষমতাকে শাণিত করি। ছাত্রলীগের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নগণ্য একজন কর্মী হিসেবে তাঁর সামনে যাওয়ার কোন কারণ ছিল না। তবে যারা তাঁর কাছে থাকতেন তাদের সঙ্গে আমরা দিন-রাত কাটাতাম বলে তাঁর ব্যক্তিগত ভাবনা-জীবনাচার বা রাজনৈতিক দর্শন জানতে পারতাম। সেই মানুষটি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। স্মরণ করতে পারি ২৩ ফেব্রুয়ারি ৬৯ আজকের সোহ্রায়ার্দী উদ্যানে আমরা তাঁকে বঙ্গবন্ধু উপাধি দিয়েছিলাম, যার ৫০তম বার্ষিকী ২০১৯ সালে অতিক্রান্ত হলো।

তাঁর জীবন নিয়ে ইতিহাস লেখার কোন ইচ্ছা আমার নেই। অনেকে লিখেছেন, লিখবেন এবং সারা বিশ্ব তাঁকে নিয়ে গবেষণা করবে, বর্তমানের প্রেক্ষিতে এটাই স্বাভাবিক। গত কয়েক বছরে তাঁর কন্যা বাংলার স্বর্ণকন্যা শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে যেখানে স্থাপন করেছেন, তাতে সারা বিশ্বকে জানতেই হবে, এই দেশের জনক শেখ মুজিবুর রহমানকে। এক সময়ে মার্কিন পররাষ্ট্রমন্ত্রী হেনরি কিসিঞ্জারের তলাহীন ঝুড়ির দেশ এখন সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি, ভারতীয় অর্থনীতিবিদ অমর্ত্য সেনসহ বিশ্ব নায়কদের আদর্শ দেশ।

আমাদের এই দেশটির জনক প্রথম আমাকে আকৃষ্ট করেন তাঁর অতি সাধারণ জীবন যাপন, সহজ সরল অভিব্যক্তি এবং স্পষ্টবাদিতায়। ঢাকা কলেজ থেকেই তাঁর বড় ছেলে শেখ কামালকে চিনতাম। শেখ কামালের মাঝে তাঁর পারিবারিক জীবন ধারার প্রতিফলন ছিল। বাঙালী মধ্যবিত্তের সকল রূপের প্রতিফলন ছিল শেখ কামালের জীবনে। ’৭০ সালে সারা বাংলাদেশে শেখ মুজিব যখন অবিসংবাদিত নেতা, তখন তাঁর জ্যেষ্ঠা কন্যা শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার পরিচয় হয়। সহপাঠিনী হিসেবে তাঁকে প্রথম চিনি। তিনি তখন বিবাহিতা। তাকে দেখে আমি আরও অভিভূত হই। যার অঙ্গুলি হেলনে পাকিস্তান কেঁপে ওঠে সেই মানুষটির বড় মেয়ে দশ টাকার তাঁতের শাড়ি পরে সহপাঠীদের সঙ্গে আর দশটা সাধারণ মেয়ের মতোই মিশে, আড্ডা দেয়, গল্পগুজব করে; এটি শেখ হাসিনাকে না দেখলে বিশ্বাস করতাম না। শেখ কামালও তাই ছিল। আমাদের সঙ্গে নাটক করত। তাঁকে দেখেও কেউ ভাবতে পারত না যে, তার পিতা পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হওয়ার জন্য জনগণের রায় পেয়ে আছেন। আমি স্মরণ করতে পারি, শেখ মুজিব কেবল তাঁর রাজনৈতিক দল নয়, ছাত্র বা শ্রমিক সংগঠনের নেতাকর্মীদের ব্যক্তিগতভাবে চিনতেন। এমনকি তাদের পারিবারিক তথ্যও মনে রাখতেন। সেই মানুষটির সাধারণ মূল্যায়ন যখন আমরা করি তখন কেবল তাঁর বাংলাদেশ সৃষ্টির বিষয়টিকে প্রাধ্যান্য দিই। যে সময়ে ব্রিটিশরা মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ ও জওহরলাল নেহরুর সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, দ্বিজাতিতত্ত্ব ও ব্যক্তিগত লোভের বশে উপমহাদেশটিকে সাম্প্রদায়িকতার বিষবাষ্পে কলঙ্কিত করে দুটি অদ্ভুত সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র বানিয়ে দিয়ে গিয়েছিল এবং পুরো উপমহাদেশের তাবত বড় বড় রাজনীতিবিদ সেই সাম্প্রদায়িকতাকেই মাথায় তুলে নিয়েছিল; তখন কেবলমাত্র শেখ মুজিব সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র গঠনের বিপরীতে একটি ভাষাভিত্তিক আধুনিক জাতিরাষ্ট্র গঠনের দূরদর্শী স্বপ্ন দেখেন। ভাষাভিত্তিক আধুনিক রাষ্ট্র গঠনের ধারনা তখন ইউরোপ, জাপান, কোরিয়া বা চীনের বাইরে প্রসারিত হয়নি। এই অঞ্চলে ভাষারাষ্ট্র ধারণা তখন মোটেও গুরুত্ব পায়নি। ভারত বহুভাষিক হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে ওঠে। সঙ্গত কারণেই কাগজে কলমে ভারতের ধর্ম রাষ্ট্র হওয়ারও খুব সুযোগ ছিল না। তবে ভারতের আত্মাটা ছিল হিন্দু রাষ্ট্রের। বস্তুত ব্রিটিশরা ভারতকে হিন্দু রাষ্ট্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার ব্যবস্থা করেছিল। ভারতের নেতারাও সেটি মেনে নিয়েছিলেন ও সেই পথেই দেশটিকে গড়ে তুলেছিলেন। আজকের দিনে ভারতে কাশ্মীরসহ অন্য যেসব বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলন চলছে তার পেছনে বৈষম্য, অসাম্য, শোষণ ও নির্যাতনের ব্যাপক ভূমিকা রয়েছে। কাশ্মীরে তো সাম্প্রদায়িকতাই মূল ইস্যু। অন্যদিকে পাকিস্তান হয়ে ওঠে উগ্র সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। বঙ্গবন্ধু সেই মানুষটি যিনি বাংলাদেশের অন্তরকে অনুভব করেন এবং উগ্র সাম্প্রদায়িকতা যে এই অঞ্চলের মানুষের কাছে গ্রহণযোগ্য নয় এবং বাঙালী যে তার ভাষা-সাহিত্য-সংস্কৃতিকে সবার ওপরে ঠাঁই দেয় এবং তার এই জীবনধারায় ধর্ম যে প্রধান শক্তি নয় সেটি উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। আমি নিজে অভিভূত হই যখন দেখি যে, তিনি পাকিস্তানের কাঠামোতে থেকেও তাঁর রাজনৈতিক সংগঠনের নাম থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি উপড়ে ফেলে দিতে পারেন। যে মানুষটি নিজেকে স্পষ্ট করে দুনিয়ার কাছে তুলে ধরতে পারেন যে, তিনি বাঙালী এবং মুসলমান সেই মানুষটি পাকিস্তানের শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের চোখের সামনে পাকিস্তানের কোন রাজনৈতিক সংগঠনকে ধর্মনিরপেক্ষ করতে পারেন, এটি যেন স্বপ্নের মতো! তার শততম জন্মদিনে আমাদের ভেবে দেখা উচিত তিনি কেবল মুসলিম শব্দ বর্জন করেননি, মুসলমানদের রাষ্ট্র পাকিস্তানকে টুকরো করে সেখানে ভাষাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করে সেই রাষ্ট্রের সংবিধানকে অসাম্প্রদায়িক করে গেছেন। আমার জানা মতে, তাঁর হাতে তৈরি ’৭২ সালের সংবিধানটি হচ্ছে দুনিয়ার অন্যতম সেরা সংবিধান, যার সঙ্গে তুলনা করার মতো কোন সংবিধান অন্তত এই অঞ্চলে পাওয়া যায় না। এই সংবিধানকে ছিন্ন ভিন্ন করে জিয়া ও এরশাদ কেবল যে সাম্প্রদায়িকতা যুক্ত করে তাই নয়, এর গণতান্ত্রিক চরিত্রও বিনষ্ট করে। আমাদের জন্য দুঃখজনক, ’৭৫ থেকে ’৯৬ অবধি দেশে এমন সাম্প্রদায়িক রাজনীতি গড়ে তোলা হয় যে বঙ্গবন্ধুর কন্যার পক্ষেও এখন ’৭২-এর সংবিধানের মূল চরিত্রে ফেরত যাওয়া সহজ হচ্ছে না। এখন যদি তিনি সেই কাজটি করেন তবে রাজনীতির ছকটাকে উল্টানোর অপচেষ্টা করা হবে এবং বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতোই সাম্প্রদায়িক, জঙ্গী ও একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রে পরিণত করার রাজনীতি প্রবলভাবে জোরদার করা হবে। বঙ্গবন্ধুর বাঙালিত্ব, তার প্রতি একনিষ্ঠতা এবং জাতিসত্তা বিষয়ে অত্যন্ত স্পষ্ট নীতিমালা আমার মতো লাখ লাখ তরুণকে বাংলাদেশ নামক একটি রাষ্ট্র গঠনে জীবন দিতে উদ্বুদ্ধ করেছে। যারা এখন মনে করেন যে, পাকিস্তান আমাদের ঠকিয়েছে, ন্যায্য পাওনা দেয়নি এবং বনিবনা হয়নি বলে পাকিস্তান ভেঙ্গে বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছে, তারা বঙ্গবন্ধুর নীতি ও আদর্শকে পুরোপুরি বুঝতে পারেন না। তাঁর ’৭২ সালের সংবিধানের মূলমন্ত্র ছিল চারটি; গণতন্ত্র, সমাজতন্ত্র, ধর্মনিরপক্ষেতা ও জাতীয়তাবাদ। ধীরে ধীরে আমরা সেই চার নীতির গণতন্ত্র ছাড়া বাকি সবই এড়িয়ে চলেছি। আজকের বাংলাদেশে সমাজতন্ত্র শব্দটি কেউ উচ্চারণ করে না। কিন্তু ঐতিহাসিক বাস্তবতা হচ্ছে সমাজতন্ত্রের আদর্শগত দিকগুলোর বাস্তবায়ন ছাড়া মুক্তির কোন পথ নেই। হয়ত কার্ল মার্ক্সের সমাজতন্ত্র ডিজিটাল যুগে প্রতিষ্ঠা করা যাবে না, কিন্তু ধনী-গরিবের বৈষম্য দূর করতে ডিজিটাল যুগের সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা ছাড়া বিকল্প কোন উপায় নেই। এক সময়ে কায়িকশ্রম নির্ভর মালিক-শ্রমিক কাঠামোটি দিনে দিনে মেধাশ্রমভিত্তিক কাঠামোতে রূপান্তরিত হচ্ছে। ফলে শ্রেণিচরিত্র বা শ্রেণী সংগ্রামের সংজ্ঞা বদলাচ্ছে। কোন এক ডিজিটাল বিপ্লবী মার্ক্সকে নতুন করে সমাজতন্ত্রের কথা বর্ণনা করতে হবে, ব্যাখ্যা করতে হবে। তবে সমাজতন্ত্র যে বৈষম্যহীনতার ধারণাকে জন্ম দিয়েছে সেটি দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে না। বরং সমাজতন্ত্রের ডিজিটাল ধারাটির জন্য সারা দুনিয়ায় নতুন করে লড়াই চলবে। আমাদের দুর্ভাগ্য যে, এই দেশের মার্ক্সপন্থী (গোপনে) রাজনৈতিক দলগুলো মার্ক্সের ধারণার ডিজিটাল রূপান্তর করতে অক্ষম। অন্যদিকে ধর্মনিরপেক্ষতার জন্য বাংলাদেশকে আবার লড়াই করতে হচ্ছে। মার্ক্স শিল্পযুগের প্রথম স্তরটির বিশ্লেষণ করেছিলেন। সেই ধারাবাহিকতা তৃতীয় স্তর পর্যন্ত চলমান ছিল। কিন্তু মার্ক্সের চিন্তা-ভাবনা চতুর্থ শিল্প বিপ্লবে সমভাবে প্রযোজ্য হবে না। জিয়া-এরশাদ-খালেদা বাংলাদেশকে যেভাবে সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করার অপচেষ্টা করেছে এবং সারা দুনিয়ার ধর্ম পরিস্থিতি যেমনটা তাতে বাংলাদেশের জন্য ধর্মনিরপেক্ষেতা বজায় রাখাকেই একটি বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দাঁড় করিয়েছে। একই কারণে বাঙালীর জাতিসত্তা বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে। নতুন প্রজন্মের কাছে বঙ্গবন্ধুর জাতীয়তাবাদের মূল কথাগুলো তুলে ধরা হয়নি বলে এখন তরুণরা ইসলামী জঙ্গীতে রূপান্তরিত হয়। অথচ বঙ্গবন্ধুকেতো বটেই, পুরো বাঙালী জাতিকে পাকিস্তানীরা অমুসলিম বানাতে চেষ্টা করেও সফল হয়নি। একাত্তরে তারা স্পষ্ট করেই বলেছে যে, পূর্ব পাকিস্তানের বাসিন্দারা মুসলমান নয়। বাঙালী মুসলমানদের হত্যা বা ধর্ষণ করার পেছনে তাদের এই মানসিকতা কাজ করেছে।

বঙ্গবন্ধুর জন্য আমার চোখের পানি আসে আরও একটি বিশাল কারণে। তাঁকে ছাড়া আমি নিজেকে অসহায় মনে করছি। আমার নিজের মতে, বঙ্গবন্ধুর মতো আর কোন রাষ্ট্রনায়ক বাঙালীর মাতৃভাষাকে রাষ্ট্রযন্ত্রে প্রয়োগ করার চেষ্টা করেননি। আমি সেই মুজিবের কথা ভাবি যে, মুজিব অপটিমা মুনীর টাইপরাইটার বানিয়েছিলেন। আমি সেই মুজিবের কথা ভাবি যিনি রাষ্ট্রক্ষমতায় যাবার আগেই বলেছিলেন, ভুল হোক শুদ্ধ হোক আমরা সরকারী কাজে বাংলাই লিখব। আমি সেই মুজিবকে সালাম জানাই যিনি ১৯৭৪ সালের ২৫ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ প্রদান করেন। কালক্রমে সেই মুজিবের আদর্শ থেকে বাংলাদেশ রাষ্ট্র সরে যাচ্ছে। বাংলাদেশের বেসরকারী অফিসে বাংলা বর্ণমালা নেই। সরকারের কাজে-কর্মে ডিজিটাল করার নামে বাংলা হরফকে বিদায় করা হয়। উচ্চ আদালতে ও উচ্চ শিক্ষায় বাংলা নেই। যে মানুষটি জাতিসংঘে বাংলায় ভাষণ দিতে পেরেছিলেন, সেই মানুষটির দেশে এখন চারপাশে রোমান হরফের রাজত্ব দেখি। আমি চাই না আমার অনুমান সত্য হোক, কিন্তু মনে হচ্ছে এক সময়ে অশিক্ষিত-অর্ধশিক্ষিত বা গ্রামের মানুষ ছাড়া বাংলা হরফই আমরা দেখব না। যে ভাষা রাষ্ট্র বঙ্গবন্ধু গড়ে তুলেছিলেন সেখানে থেকে সরে গিয়ে আমরা কোন জাতি রাষ্ট্র গড়ে তুলছি, সেটি আমি মোটেই বুঝি না। আসুন না সবাই মিলে বঙ্গবন্ধুর ভাষা রাষ্ট্রটাকেই বিশ্বের সেরা রাষ্ট্রে রূপান্তরিত করি। আসুন সকল ক্ষেত্রে সেই একজন বাঙালীকেই অনুসরণ করি।

ঢাকা, ১৭ মার্চ ২০১৯ ॥

লেখক : তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, কলামিস্ট, দেশের প্রথম ডিজিটাল নিউজ সার্ভিস আবাস-এর চেয়ারম্যান-সম্পাদক, বিজয় কীবোর্ড ও সফটওয়্যার-এর জনক

করোনাভাইরাস আপডেট
বিশ্বব্যাপী
বাংলাদেশ
আক্রান্ত
২২৭৯২৩৮৮৭
আক্রান্ত
১৫৪১৩০০
সুস্থ
২০৪৬০৬২০৫
সুস্থ
১৪৯৮৬৫৪
শীর্ষ সংবাদ: