সোমবার ৩ কার্তিক ১৪২৮, ১৮ অক্টোবর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা

সমালোচক ও প্রাবন্ধিক আবদুল মান্নান সৈয়দ

  • আবু আফজাল মোহা. সালেহ

আবদুল মান্নান সৈয়দ বা সৈয়দ আবদুল মান্নান (৩ আগস্ট ১৯৪৩-৫ সেপ্টেম্বর ২০১০) বাংলাদেশের একজন আধুনিক কবি, সাহিত্যিক, গবেষক ও সাহিত্য-স¤পাদক। কবিতা ছাড়াও তিনি গল্প, উপন্যাস, সমালোচনা, নাটক ইত্যাদি সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় অবদান রেখেছেন। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। রবীন্দ্রোত্তরকালে বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যে তাঁর রয়েছে দারুণ অবদান। কবি জীবনানন্দ দাশ এবং কবি কাজী নজরুল ইসলামের উপরও তাঁর রয়েছে গবেষণা। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় দেড় শতাধিক। বাংলাদেশের সাহিত্যমহলে তিনি ‘মান্নান সৈয়দ’ নামেই পরিচিত।

আবদুল মান্নান সৈয়দ কবিতা বা কথাসাহিত্যের চেয়েও সাহিত্য-সমালোচক ও প্রাবন্ধিক হিসেবে অধিকতর খ্যাতিমান। পঞ্চাশ বছর তিনি সাহিত্য-সমালোচনার ক্ষেত্রে নিরলসভাবে কাজ করে বাংলা সমালোচনা-সাহিত্যকে একটি দৃঢ় ভিত্তির ওপর দাঁড় করিয়েছেন। তাঁর সমালোচনা নিবিড় গবেষণার ওপর প্রতিষ্ঠিত। সমালোচনার জন্য তিনি আবিষ্কার করেছেন একটি নিজস্ব ভাষা। সাহিত্য প্রবন্ধে তিনি বিশুদ্ধ শিল্পলোক-বিচরণে প্রতিশ্রতিবদ্ধ ছিলেন। তিনি সমালোচনায় নির্মোহ এবং বিবেকী। তিনি আধুনিক বাংলা কবিতার পথিকৃৎ এবং প্রধানতম কবি জীবনানন্দ দাশের ওপর আলোচনার জন্য সুবিখ্যাত। তাঁর শুদ্ধতম কবি জীবনানন্দ বিষয়ে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য আলোচনা গ্রন্থ। তিনি জীবনানন্দ দাশের কবিতা, গল্প, পত্রাবলী ইত্যাদি সংগ্রন্থিত করে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। তাঁর জীবনানন্দ পাঠ সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য বিবেচিত। জীবনানন্দ বিষয়ক গ্রন্থাবলি হচ্ছে- শুদ্ধতম কবি (১৯৭২), জীবনানন্দ দাশ (১৯৯৩), জীবনানন্দ (১৯৮৪), জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ কবিতা (১৯৮৬), জীবনানন্দ দাশের পত্রাবলী (১৯৮৭), জীবনানন্দ দাশের শ্রেষ্ঠ গল্প (১৯৮৯) প্রভৃতি গ্রন্থের রচয়িতা আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রবন্ধ ষাটের কাব্য-লক্ষণ গদ্যভাষার সবচেয়ে উজ্জ্বল উদাহরণ।

জীবনানন্দের পর মান্নান সৈয়দ আর যাঁকে নিয়ে সবচেয়ে বেশি গবেষণা করেছেন তিনি কাজী নজরুল ইসলাম। তাঁর নজরুল ইসলাম : কবি ও কবিতা (১৯৭৭), নজরুল ইসলাম : কালজ কালোত্তর (১৯৮৭) এবং নজরুল ইসলামের কবিতা (২০০৩) গ্রন্থ তিনটি নজরুল ইসলামের লেখালেখির নানা দিক অনুসন্ধানে বাংলাসাহিত্যে ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে বলে গবেষকেরা মনে করেন। তাঁর উদ্ভাবনী শক্তি ও ব্যঞ্জনা সৃষ্টি তাঁর ভাষাকে করে তুলেছে ব্যতিক্রমী। মহাসমর পরর্তীকালে দুই বাংলাতেই তাঁর মতো সাহিত্যসমালোচক খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। বিশ্বসাহিত্য স¤পর্কে ছিল তাঁর অগাধ ধারণা। মান্নান সৈয়দ ছিলেন বাংলাদেশের কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম ‘পোয়েট ইন রেসিডেন্স’। তাঁকে স্কলার-ইন-রেসিডেন্স পদমর্যাদায় নিয়োগ করে জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের সংগ্রামী জীবনকে গ্রোথিত করে পূর্ণাঙ্গ নজরুল-জীবনী রচনার দায়িত্ব দেয়া হয়। বাংলা একাডেমির আহ্বানে তিনি আটজন খ্যাতিমান ব্যক্তির জীবনী রচনা করেছিলেন।

বিভিন্ন লেখক-সাহিত্যিকের রচনাসমগ্র সংকলন ও স¤পাদনায় মান্নান সৈয়দ অতুলনীয় ধৈর্য ও পরিশ্রমের স্বাক্ষর রেখে গেছেন। এ সবের মধ্যে কয়েকটি হলো: জীবনানন্দ দাশের কবিতা, ফররুখ আহমদের শ্রেষ্ঠ কবিতা, ফররুখ রচনাবলী (প্রথম খ-), বাংলাদেশের কবিতা, বাংলাদেশের ছড়া, সমর সেনের নির্বাচিত কবিতা, মোহিতলাল মজুমদারের নির্বাচিত কবিতা, বুদ্ধদেব বসুর সুনির্বাচিত কবিতা প্রভৃতি। এছাড়া তাঁর ব্যতিক্রমী কাজের মধ্যে রয়েছে কবি শাহাদাত হোসেনের ইসলামী কবিতা এবং কমরেড মোজাফফর আহমদের পত্রাবলী স¤পাদনা ও সংগ্রন্থনা। কবি আবিদ আজাদ স¤পাদিত সাহিত্যসাময়িকী শিল্পতরুর উপদেষ্টা স¤পাদক হিসেবে মান্নান সৈয়দ দীর্ঘকাল দায়িত্ব পালন করেছেন। এ সময় তিনি নবীন-প্রবীণ সকল কবি-সাহিত্যিকের রচনা সমান গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করেছেন। তাঁর স¤পাদনার মাধ্যমে শিল্পতরু আশীর দশকের শেষভাগে একটি মর্যাদাবান সাহিত্যপত্রে পরিণত হয়েছিল।

আবদুল মান্নান সৈয়দ এর উল্লেখযোগ্য প্রবন্ধগ্রন্থ হচ্ছে- বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা, দশ দিগন্তের দ্রষ্টা, নির্বাচিত প্রবন্ধ, করতলে মহাদেশ, আমার বিশ্বাস, ছন্দ ইত্যাদি। ছন্দ বইটি ছন্দ শেখার অনেকের হাতেখড়ি। তাঁর স্মৃতিকথা হচ্ছে, ভেসেছিলাম ভাঙা ভেলায়, প্রণীত জীবন। কালান্তরের যাত্রী উন্নতমানের গবেষণা গ্রন্থ। তাঁর জীবনীগ্রন্থ হচ্ছে- নজরুল ইসলাম: কবি ও কবিতা, বেগম রোকেয়া, সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ, সৈয়দ মুর্তাজা আলী, ফররুখ আহমদ, শাহাদাত হোসেন, জীবনানন্দ দাশ, প্রবোধচন্দ্র সেন, আবদুল গণি হাজারী, সৈয়দ মুর্তাজা আলী। সুধীন্দ্রনাথ দত্তের সুনির্বাচিত কবিতা তাঁর অন্যতম আলোচনা গ্রন্থ।

তিনি ১৯৮১ সালে বাংলা একাডেমি সাহিত্য পুরস্কার পান। এছাড়া আলওল সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮১), নজরুল পুরস্কার, (পশ্চিম বঙ্গ, ১৯৯৮), নজরুল পদক (২০০১), কবি তালিম হোসেন পুরস্কার (২০০০) ইত্যাদি মর্যাদাপূর্ণ সাহিত্য পদক/পুরুস্কার পান।

শীর্ষ সংবাদ: