রবিবার ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৮, ০৫ ডিসেম্বর ২০২১ ঢাকা, বাংলাদেশ
প্রচ্ছদ
অনলাইন
আজকের পত্রিকা
সর্বশেষ

মুক্ত থাক কিশোরীর আকাশ

  • মিলু শামস

সেকালের প্রথা মেনে ‘সমাপ্তি’র মৃন্ময়ীকে কৈশরেই বিয়ে দিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। সমবয়সী ছেলেদের সঙ্গে মাঠে, নদীর ঘাটে ঘুরে বেড়ানো মৃন্মময়ীকে বিয়ে-বন্ধনের সাত পাঁচ বোঝালে ‘সে দুষ্ট পনি ঘোড়ার মতো ঘাড় বাঁকাইয়া পিছু হটিয়া বলিয়া বসিল, আমি বিবাহ করিব না।’ কিন্তু বিয়ে তার হয়েছিল এবং কাহিনী পরম্পরায় তার সুখী দাম্পত্যের ইঙ্গিত লেখক দিয়েছেন।

শিল্প সৃষ্টিতে এমন বিয়ে ‘সফল’ হলেও বাস্তবতা বড় তেতো। সে খবর আমরা পাই আঠার শ’ আটষট্টি সালে প্রকাশিত বাংলা সাহিত্যের প্রথম আত্মজীবনী লেখক (নারী-পুরুষ মিলে) রাস সুন্দরী দেবীর জবানীতে-’আমার বয়ঃক্রম যখন ১৮ বছর, তখন আমার একটি পুত্রসন্তান হয়, তাহার নাম বিপিন বিহারী। যখন আমার ২১ বছর বয়ঃক্রম, তখন আর একটি পুত্র সন্তান হয়, তাহার নাম পুলিন বিহারী। আমার তেইশ বছরের সময় আর একটি কন্যা সন্তান হয়, তাহার নাম রাম সুন্দরী। ২৫ বছরের সময় আর একটি পুত্র সন্তান হয়, তাহার নাম প্যারীলাল। ২৮ বছরের সময় আর একটি পুত্র সন্তান হয়, তাহার নাম রাধা নাথ। যখন আমি ৩০ বছরের, তখন আর একটি পুত্র সন্তান হয়, তাহার নাম দ্বারকানাথ। যখন আমি ৩২ বছরের তখন আর একটি পুত্র সন্তান হয়, তাহার নাম চন্দ্রনাথ।’ কিশোরীলাল, প্রতাপচন্দ্র, শ্যামসুন্দরী, মুকুন্দলাল নামে তার আরও চারটি সন্তান জন্মেছিল। ভ্রƒণে মারা গিয়েছিল একাধিক। রাম সুন্দরী বেঁচে ছিলেন ঊনষাট বছর।

জন্ম নিয়ন্ত্রণের সহজলভ্যতার এ যুগে এত সন্তানের আগমন বন্ধ করা গেলেও বাল্য বিবাহ নারীর জন্য কোনভাবেই সুফল বয়ে আনে না। অথচ পত্রিকায় প্রকাশিত খবর বলছেÑ সরকারী হিসেবে দেশে শতকরা চৌষট্টি ভাগ মেয়ের বিয়ে হচ্ছে আঠারো বছর বয়সের আগে। এবং এদিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে দ্বিতীয় শীর্ষে। রাস সুন্দরী দেবী কিংবা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সময়ের সমাজ বাস্তবতার সঙ্গে আজকের বাস্তবতার আকাশ-পাতাল পার্থক্য হলেও সমাজে অর্থনৈতিক বৈষম্য রয়েছে আগের মতোই। তাই খোঁজ নিলে দেখা যাবে ওই চৌষট্টি শতাংশ বিয়ে হচ্ছে অর্থনৈতিকভাবে যারা অসচ্ছল মূলতঃ তাদের মধ্যে। প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল ও আইসিসিডিডিআরবির গবেষণাও তেমনটাই বলছে। দারিদ্র্য, নিরাপত্তাহীনতা, বয়স বাড়লে যৌতুকের পরিমাণ বাড়ার দুশ্চিন্তা ইত্যাদি থেকে অভিভাবকরা কম বয়সে মেয়ের বিয়ে দিচ্ছেন। বাল্যবিবাহ রোধ করার জন্য জন্ম নিবন্ধনের প্রতি সরকারীভাবে জোর দেয়া হয়েছে। এ নিয়ে যারা কাজ করছেন তারা দেখেছেন, যেসব এলাকায় জন্ম নিবন্ধনের হার কম সেখানে বাল্যবিবাহের হার বেশি। আবার জন্ম নিবন্ধন সনদ নিয়েও রয়েছে কারচুপি।

দেখা যায় জন্ম সনদের ভিত্তিতেই বিয়ে হচ্ছে কিন্তু ঘাপলা রয়েছে ওই জন্ম সনদেই। জনপ্রতিনিধিদের দেয়া জন্ম সনদে অনেক সময়েই নাম এদিক সেদিক করে একই মেয়ের একাধিক জন্ম সনদের কার্ড তৈরির মতো ঘটনাও ঘটে। জন্ম সনদ থাকলে কাজি এবং বিয়ে সংশ্লিষ্ট অন্যরা বিয়ে পড়ানো নিয়ে প্রশ্ন তোলেন না। আর এ সুযোগের ফাঁক গলে অসচেতন অভিভাবকরা মেয়েকে বিয়ের পিঁড়িতে বসান। কোন কাজী বিয়ে নিবন্ধন করতে রাজি না হলে অভিভাবক ছোটেন নোটারি পাবলিকের কাছে। নোটারি পাবলিকের সনদ নিয়ে বিয়ে সম্পন্ন হয়।

রাস সুন্দরী দেবীর সময়ে বাল্য বিবাহের জন্য এত কসরত করতে হতো না। বরং সামাজিক প্রথা বাল্য বিবাহ কে বাধ্যতামূলক করেছিলো শ্রেনী নির্বিশেষে। জোড়া সাঁকোর ঠাকুর পরিবারের পুরুষরা শৈশব কৈশরের সীমান্তবর্তী মেয়েদেরই বিয়ে করেছেন। রবীন্দ্রনাথের মেজ দাদা সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুর জ্ঞানদা নন্দিনীকে বিয়ে করলেও দীর্ঘদিন একসঙ্গে বাস করেননি স্ত্রীর বয়স স্বল্পতার কারনে। স্ত্রীকে চিঠি লিখে জানিয়েছিলেন, ‘তুমি যে পর্যন্ত বয়স্ক শিক্ষিত ও সকল বিষয়ে উন্নত না হইবে, সে পর্যন্ত আমরা স্বামী স্ত্রী সম্পর্কে প্রবেশ করিব না’। সত্যেন্দ্রনাথের শিক্ষা ও সচেতনতাই তাকে দিয়ে এ কথা বলিয়েছে। বোঝা যায়, পারিবারিক প্রথা মেনে বালিকা বিয়ে করলেও তার শিক্ষিত মন একে মেনে নিতে পারিনি। স্ত্রীকে তাই শিক্ষা দীক্ষায় নিজের যোগ্য করে নিয়েছিলেন।

বাল্য বিবাহ রোধে প্রয়োজন সচেতনতা। তবে সচেতনতা তো আকাশ থেকে পড়ে না, সমাজ কাঠামো সমান্তরাল ভাবে স্বচ্ছ হতে হবে। সমাজ যারা নিয়ন্ত্রণ করেন তাদের মধ্যে সততা থাকতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদ থেকে ভূয়া জন্মসনদ দেয়া, নোটারী পাবলিকের হলফ নামা দেয়া বন্ধ করলে বাল্য বিবাহের হার অনেক কমবে। শোনা যায় কোন এক জেলা শহরের স্কুল কমিটির সভাপতি পঞ্চম শ্রেনীর এক ছাত্রীকে জোর করে বিয়ে করেছিলেন। ঘটনা দু’হাজার চোদ্দর। পরে স্থানীয় প্রশাসন বিয়ে ভেঙ্গে দিয়েছে। কিন্তু মেয়েটি প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনী পরীক্ষায় পাশ করলেও নিরাপত্তার অভাবে এরপর আর স্কুলে যেতে পারেনি। ধরে নেয়া যায় ওর শিক্ষা ও ভবিষ্যত সম্ভাবনাময় জীবনের ওখানেই অবসান ঘটেছে।

কৈশরে বিয়ে হওয়া প্রায় সব মেয়ের জীবনের পরিনতি এরকমই। সবাই তো আর রাস সুন্দরী দেবী নন যে বার বছর বয়সে বিয়ে এবং তের-চোদ্দটি সন্তানের মা হয়েও বাংলা সাহিত্যে প্রথম আত্মজীবনিকার হিসেবে ইতিহাস সৃষ্টি করবেন।

শীর্ষ সংবাদ:
গত ২৪ ঘণ্টায় সারা বিশ্বে করোনায় মৃত্যু কমেছে প্রায় দেড় হাজার         অবিশ্বাস্য অর্জন ॥ বাংলাদেশ এখন উন্নয়নের রোল মডেল         বাসযোগ্য পৃথিবী গড়তে ঐক্য চাই         বঙ্গবন্ধুর শাসনব্যবস্থা নিয়ে গবেষণা করুন         ছাত্রলীগ নেতাসহ ৯ শিক্ষার্থী সাময়িক বহিষ্কার         শক্তি হারিয়ে জাওয়াদ গভীর নিম্নচাপে পরিণত         সড়কে অনিয়মের বিরুদ্ধে লাল কার্ড প্রদর্শন শিক্ষার্থীদের         এলডিসি উত্তরণে ১০ বছরের মাস্টারপ্ল্যান         উন্নয়নে পাকিস্তান আমাদের ধারে কাছেও নেই         আমদানির জ্বালানি তেল আর লাইটারিং করতে হবে না         পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা রাজধানীর ৮০ ভাগ ভবনে নেই         চট্টগ্রামে অটোরিক্সা-ডেমু ট্রেন-বাস সংঘর্ষে পুলিশসহ হত ৩         খালেদাকে বিদেশ নিতে কূটনৈতিক পাড়ায় বিএনপির দৌড়ঝাঁপ         আন্দোলনেই খালেদার বিদেশে চিকিৎসা নিশ্চিত করা হবে         বিশ্ব শান্তি প্রতিষ্ঠায় ঐক্যের বিকল্প নেই ॥ রাষ্ট্রপতি         করোনা ভাইরাসে আরও ৬ জনের মৃত্যু, নতুন শনাক্ত ১৭৬         ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ ॥ সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর সতর্ক সংকেত         বৈধ সরকারের পতন ঘটানো যাবে না: কৃষিমন্ত্রী         ঘূর্ণিঝড় জাওয়াদ ॥ সেন্টমার্টিন রুটে পর্যটকবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ ঘোষণা         কুয়েটের শিক্ষকের মৃত্যু ॥ ৯ শিক্ষার্থী সাময়িক বহিষ্কার