ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

রায়গঞ্জে ফুলজোড় নদীর পানি দূষণ, মহাসড়ক অবরোধ: লং মার্চ অনুষ্ঠিত

এইচ এম মোনায়েম খান, রায়গঞ্জ, সিরাজগঞ্জ

প্রকাশিত: ১২:০৬, ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

রায়গঞ্জে ফুলজোড় নদীর পানি দূষণ, মহাসড়ক অবরোধ: লং মার্চ অনুষ্ঠিত

ছবি: জনকণ্ঠ

সিরাজগঞ্জের রায়গঞ্জে শিল্পকারখানার রাসায়নিক বর্জ্য মিশ্রণে ফুলজোড় নদীর বাস্তুতন্ত্র ও জনস্বাস্থ্যের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। এদিকে নদীতে রাসায়নিক বর্জ্য ফেলে পানি দুষন করায় এলাকাবাসী ক্ষুব্দ হয়ে উঠছে। সরকারের দৃষ্টি আকর্ষন ও দাবী আদায়ে আন্দোলন চাঙ্গা করে তুলছে। দফায় দফায় মানববন্ধন বিক্ষোভ কর্মসূচি চলমান রয়েছে। দাবি নিয়ে বুধবার (২৫ফেব্রুয়ারি) সকালে ঢাকা-বগুড়া মহাসড়কের চান্দাইকোনা বাসস্ট্যান্ডে মানববন্ধন বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ ও দূষণকারী কারখানার উদ্দেশ্যে লং মার্চ যাত্রা করে।

জার্মান বিএনপি নেতা ইঞ্জিনিয়ার সাব্বির আহমেদের সভাপতিতে কর্মসূচিতে বক্তব্য রাখেন, ফয়সাল বিশ্বাস, সাংবাদিক বিপক্ষ কুমার কর, এনজিও কর্মী রত্না রানী, যুবদল নেতা শামীম খন্দকার, শিপার আল হাসান সহ আরো অনেকে।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, বগুড়ার শেরপুর উপজেলার রাজাপুর ছোনকা এলাকায় এসআর কেমিক্যাল পাইপযোগে বিষাক্ত বর্জ্য ফেলে ফুলজোড় নদীতে। এতে করে নদীর মাছ মরে ভেসে উঠছে। উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ভেসে ওঠা এসব মাছ ধরতে নানা বয়সী নারী-পুরুষরা ভিড় জমাতে দেখা গেছে নদীর দুই পাড়ে। শিল্পকারখানার বর্জ্য নদীতে ফেলায় পানি দূষিত হয়ে পড়েছে। এ কারণে ফুলজোড় নদীতে বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, সাপ, ব্যাঙ, কাঁকড়া, শামুকসহ জলজ প্রাণী মরে যাচ্ছে। গত চার দিন ধরে এ অবস্থা চলছে। তাই বিষাক্ত বর্জ্য না ফেলে দূষণের হাত থেকে নদীটি রক্ষার দাবি জানান বক্তারা।

মানববন্ধন ও কর্মসূচি শেষে সরেজমিন অনুসন্ধান ও অভিজ্ঞরা দিয়েছেন ভয়াবহ তথ্য। বিশিষ্ট প্রাণিবিদ্যা বিদ আব্দুল খালেক বলেন, নদীর জলজ বাস্তুতন্ত্রের বিনাশ করা হচ্ছে।নদীতে রাসায়নিক বর্জ্য ফেলার ফলে পানির স্বাভাবিক গুণাগুণ নষ্ট করা হচ্ছে।। এর ফলে জলজ প্রাণীর ওপর সরাসরি প্রভাব পড়তে শুরু করেছে। ইতিমধ্যে জলজ মাছের মড়ক দেখা গেছে। বিষাক্ত বর্জ্য ফেলার কারনে পানিতে ভারি ধাতুর সৃষ্টি হচ্ছে। একারনে মাছের ফুলকা ও অভ্যন্তরীণ অঙ্গ নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শুধু তাই নয় অক্সিজেনের সংকট দেখা দিয়ে  পানিতে দ্রবীভূত অক্সিজেন  কমিয়ে দেওয়ার ফলে জলজ প্রাণী শ্বাসরোধ হয়ে মারা যেতে শুরু করেছে।

পরিবেশবাদী সংগঠন স্বাধীন জীবনের নির্বাহী পরিচালক  মোঃ আব্দুর রাজ্জাক নাসিম বলেন, বিষক্রিয়া মাছের শরীরে প্রবেশ করে।  এই বিষ গ্রহণ করে ক্রমান্বয়ে বড় মাছ এবং পরিশেষে মানুষের শরীরে প্রবেশ করে মানব স্বাস্থ্যের ওপর ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। নদীর পানি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে ব্যবহারের ফলে মানুষের শরীরে দীর্ঘমেয়াদী রোগ দেখা দিতে পারে।  বিষাক্ত পানি ব্যবহারের ফলে ত্বকের বিভিন্ন সংক্রমণ ও ঘা দেখা দেবে যেমন চর্মরোগ ও অ্যালার্জি সৃষ্টি হবে। সিসা বা আর্সেনিকযুক্ত পানি পানে কিডনি নষ্ট হওয়া, লিভারের ক্ষতি এবং ক্যান্সারের মতো মরণব্যাধি হতে পারে। গর্ভবতী মায়েরা এই দূষিত পানি বা সেই পানির মাছ গ্রহণ করলে জন্মগত ত্রুটিসহ শিশু জন্ম নেওয়ার ঝুঁকি থাকে।

কৃষিবিদ মোঃ এনামুল হক বলেন, পরিবেশ ও মাটির উর্বরতা হ্রাস পাবে। নদীর পানি সেচ কাজে ব্যবহৃত হলে রাসায়নিক উপাদানগুলো কৃষিজমিতে ছড়িয়ে পড়ে ফসলের উৎপাদন ক্ষমতা কমে যায় এবং উৎপাদিত খাদ্যশস্যে বিষাক্ত উপাদান পাওয়া যায়। বর্জ্যের কারণে মাটির উর্বরতা পরিবর্তিত হয়, যা উপকারী ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করে মাটির উর্বরতা চিরতরে নষ্ট করে দিতে পারে। নদী দূষণের ফলে পর্যটন শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং মৎস্যজীবীরা তাদের জীবিকা হারান। একটি মৃত নদী মানে একটি অঞ্চলের পুরো অর্থনৈতিক কাঠামোর বিপর্যয় দেখা দেওয়া।

সাংবাদিক দীপক কুমার কর বলেন, নদীতে সরাসরি বর্জ্য ফেলা বন্ধ করতে ইটিপি  বা বর্জ্য শোধনাগার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। কঠোর আইন প্রয়োগ এবং জনসচেতনতাই পারে আমাদের নদীগুলোকে রক্ষা করতে।

রায়গঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোঃ আব্দুল খালেক বলেন, শিল্পকারখানাগুলো স্থাপন করা হয়েছে বগুড়া জেলার মধ্যে।কারখানা থেকে বগুড়ার মানুষ শুফল ভোগ করলেও রায়গঞ্জের মানুষের উপর কুফল সৃষ্টি হয়েছে। আমি একটি লিখিত অভিযোগ পেয়েছি। এটি একটি স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন। এজন্য স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্থদের সাথে আলাপ আলোচনা চলছে। তদন্ত পূর্বক সমস্যা সমাধানে চেষ্টা করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, স্থায়ী সমস্যা সমাধানে উর্ধতন কর্তৃপক্ষকে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষথেকে অবহিত করা হবে।

এ.এইচ

×