জাতীয় কবি নজরুলের ‘মানুষ’ কবিতার কয়েকটি পঙ্ক্তি নিবন্ধের সূচনায় উপস্থাপন করতে চাই। ‘গাহি সাম্যের গান- মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান!/নাই দেশ-কাল-পাত্রের ভেদ, অভেদ ধর্মজাতি,/ সব দেশে, সব কালে, ঘরে-ঘরে তিনি মানুষের জ্ঞাতি।’ বস্তুতপক্ষে পবিত্র ইসলামের সংযম-আত্মশুদ্ধির মাহে রমজান শেষে ঈদুল ফিতর উদযাপন আনন্দধারার নিরন্তর আবহ। বিরোধ-বিচ্ছেদ-বিভাজন-ব্যবধান সংহার করে মানুষকে মানুষের মর্যাদায় সমাসীন করার মধ্যেই নিহিত রয়েছে এর প্রণত উদ্দেশ্য। অসাম্প্রদায়িক-মানবিক সমাজের মৌলিক দর্শন বৈষম্যমুক্ত সাম্যের সমাজ প্রতিষ্ঠাকল্পে প্রকৃত শিক্ষা ও যথার্থ পরিচর্যা অনুশীলনে এই মাস অতি তাৎপর্যপূর্ণ। এটি সর্বজনবিদিত যে, ‘ঈদ’ শব্দটির উৎপত্তি আরবি ‘আওদ’ থেকে। যার অর্থ ঘুরে আসা-প্রত্যাবর্তন করা। আরবিতে বিশেষ দিবস বা উৎসবের দিনকে ঈদ বলা হয়। ফিতর অর্থ রোজা ভাঙা বা ইফতার করা। ইসলামী পরিভাষায় ঈদুল ফিতর রোজা ভাঙার উৎসব হিসেবে উদযাপিত। প্রতিটি ধার্মিক মুসলমান পবিত্র ইসলামের বিধান মোতাবেক পুরো রমজান মাসে প্রতিদিন সূর্যাস্তের সময় ইফতারের মাধ্যমে রোজা বা উপবাস ভাঙলেও; ঈদের দিনই এক মাসের নিয়মিত উপবাস ভাঙা হয়। যদিও রোজাদারদের জন্য প্রত্যেক দিনের ইফতারের মুহূর্তেই আনন্দের, তথাপি ঈদুল ফিতরের দিন বিশেষ আনন্দ ও উৎসবের।
ঈদুল ফিতরের একটি ওয়াজিব বা আবশ্যিক আমল হলো নামাজ। সাধারণত ঈদ উৎসব শুরু হয় এই সালাতের মাধ্যমে। ঈদের নামাজে ধনী-গরিব-আমির-ফকির নির্বিশেষে সকল ধর্মপ্রাণ মুসলমান এক কাতারে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহত্ব ঘোষণা করে থাকে। প্রিয় রাসুল (সা.) নারী-পুরুষ-নির্বিশেষে সবাইকে ঈদগাহের জমায়েতে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত রাসুলুল্লাহ (সা.) এর মহান বাণী ছিল, ‘ঈদের দিন আল্লাহ তায়ালা ফেরেশতাদের বলেন, তারা আমার ফরজ আদায় করে প্রার্থনার জন্য বের হয়েছে। আমার মর্যাদা, বড়ত্ব ও সম্মানের কসম! আমি অবশ্যই তাদের প্রার্থনা কবুল করব।’ মাহে রমজান মাসে আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের অভিনব পন্থা অবলম্বনে সিয়াম সাধনা পবিত্র ইসলামের বিধিবদ্ধ ইবাদত যা ইমানের অপরিহার্য অঙ্গ। মহান আল্লাহ্ প্রদত্ত দীর্ঘ এক মাস দেহ ও মনের পরিশুদ্ধতার যে পরীক্ষা, তার সফল পরিসমাপ্তি ঘটে ঈদের নিরন্তর আনন্দ উৎসবে। শাওয়াল মাসের প্রথম তারিখে পালিত হয় এই উৎসব যা ঈদুল ফিতর হিসেবে পরিচিত।
নামাজ, ইফতার, সেহরি, পবিত্র কুরআন পাঠ, জাকাত-ফিতরা প্রদান, নতুন কাপড় কেনা ও পরিধান করা, উপহার বিতরণ-বিনিময় ইত্যাদি সুসম্পন্ন করে মহান স্রষ্টার সন্তুষ্টিতে নিজেকে বিলীন করার আত্মতৃপ্তিতে সমৃদ্ধ ঈদুল ফিতরের এই উৎসব। কারও সঙ্গে শত্রুতা নয়, সকলের সঙ্গে বন্ধুত্বের নবতর উপযোজনে সার্থক হয়ে ওঠে এ আনন্দ উৎসব। ধনী, গরিব নির্বিশেষে এই উৎসবের মাত্রিকতা যেমন ভিন্ন; সমাজ পরিবর্তনের আধুনিক পর্যায়ে এসে এই উৎসব এক অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির বাহন হিসেবে বিকশিত। মাহে রমজানের এই অসাম্প্রদায়িক চিন্তা-চেতনার মূলে রয়েছে শাশ্বত বন্ধুত্ব-ভ্রাতৃত্ব-সৌহার্দ্যরে যোগসূত্র যা ব্যক্তিকে মানবিকতা-নান্দনিকতার পরিপূর্ণতায় এক সুষম সমাজ ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে উদ্বুদ্ধ করে। আমাদের সকলের জানা যে, পবিত্র রমজান মাসে ধার্মিক মুসলমানগণ মানবসত্তার আত্মিক উৎকর্ষ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষার বিশিষ্ট উপাদান হিসেবে চাঁদ দেখা সাপেক্ষে ঊনত্রিশ বা ত্রিশ দিন রোজা আদায় করেন।
ইসলামী শরিয়তের পঞ্চ বুনিয়াদের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত হচ্ছে রোজা। খ্রিস্টপূর্ব ৬০০০-৫০০০ বছর কালের আদি পিতা হযরত আদম (সা.) থেকে হজরত ঈসা (সা.) পর্যন্ত সকল নবী রাসুলের শরিয়তে ও তাদের উম্মতগণের ওপর রোজা আদায় করা বিধিবদ্ধ ছিল। পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তায়ালা বলেন, হে ইমানদারগণ! তোমাদের ওপর রোজা ফরজ করা হয়েছে যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের ওপর, যেন তোমরা মুত্তাকি হতে পার। (সূরা বাকারা : আয়াত ১৮৩) রোজা বিষয়ে অপর বর্ণনায় আল্লাহ তায়ালা বলেন, ‘প্রত্যেক ইবাদতই ইবাদতকারী ব্যক্তির জন্য, পক্ষান্তরে রোজা আমার জন্য। আমি নিজেই এর প্রতিদান দেব। (সহীহ বুখারী হাদিস-১৯০৪) প্রকৃতপক্ষে নিজের ও অপরের জীবন সমৃদ্ধিতে নিবেদিত সকল কর্মেরই যোগফল হচ্ছে ধর্ম। এই অমিয় সত্যকে ধারণ করে যে কোনো ধর্মে বিশ্বাসী ব্যক্তিবর্গ ধর্মের গোঁড়ামি বা ধর্মান্ধতাকে পরিহার করে প্রকৃত ধার্মিকতার নির্যাসকে প্রাধান্য দিয়ে স্রষ্টার সন্তুষ্টির জন্য রোজা আদায় করে থাকেন।
আত্মশুদ্ধি ও আত্মসংযমের মাধ্যমে স্বীয় দেহ মনকে নিয়ন্ত্রণ এবং এর পরিপূর্ণ উপলব্ধিতে অপরের কল্যাণকে নিশ্চিত করার মধ্যেই রমজানের মৌলিক বৈশিষ্ট্য উপস্থাপিত। রোজা একমাত্র মানবজাতির জন্যই স্বতন্ত্র ইবাদত যা ইমানের অঙ্গ হিসেবে ফরজ বা অবশ্যই পালনীয়। ‘মানুষ মানুষের জন্য’ এই মানবিক বাণীকে সমৃদ্ধ করার লক্ষ্যে অন্যের পানাহারসহ নানাবিধ কষ্টের উপলব্ধি এক নতুন মাত্রায় মানবজাতিকে সুশোভিত করে যা সমাজের পারস্পরিক আপোস, ভ্রাতৃত্ব, বন্ধুত্বের অনুপম সেতুবন্ধন রূপে প্রতিভাত। আমাদের প্রিয় নবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) পবিত্র রমজান মাসকে তিন ভাগে ভাগ করে প্রথম দশ দিন ‘রহমত’, দ্বিতীয় দশ দিন ‘মাগফিরাত’ ও তৃতীয় দশ দিন ‘নাজাত’ হিসেবে অভিসিক্ত করে স্বমহিমায় এই তিনটি দশককে সমাদৃত করেছেন। রহমত ও মাগফিরাত অর্জন শেষে তৃতীয় দশকে পরকালের শাস্তি থেকে মুক্তির বিষয়ে নিশ্চয়তা প্রাপ্তির লক্ষ্যে ইবাদত বন্দেগি অধিকতর কার্যকর হিসেবে বিবেচিত।
তিনি আরও বলেন, ‘যারা পবিত্র রমজান মাসে নিজ ব্যবহার ও আচার-আচরণকে সুন্দর করবে তারা সেদিন খুব সহজেই পুলসিরাত পার হয়ে যাবে। যারা এই মাসে ভৃত্য বা অধীনস্তদের কাজ কমিয়ে দেবে মহান আল্লাহ শেষ বিচার দিবসে তার হিসাব সহজ করে দেবেন। যারা রমজান মাসে মানুষকে বিরক্ত করা বা কষ্ট দেওয়া থেকে বিরত থাকবে বা অন্যদের দোষ ঢেকে রাখবে কিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ নিজ ক্রোধ থেকে তাদের রক্ষা করবেন। যারা এতিমকে আদর-যত্ন বা সম্মান করবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদেরকে সম্মান করবেন। যারা এই মাসে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করবে ও তাদের সঙ্গে সম্পর্ক রাখবে কিয়ামতের দিন আল্লাহ তাদেরকে রহমতের ধারায় সিক্ত করবেন, আর যারা এই মাসে আত্মীয়-স্বজনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে বা তাদের সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করবে আল্লাহ শেষ বিচারের দিবসে তাদেরকে নিজ রহমত থেকে বঞ্চিত করবেন।’
এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য যে দেহ-মনের সমন্বয়ে যে মানবসত্তার বিকাশ-বিস্তার তার মূলে রয়েছে নফ্স ও রূহের পরস্পর বিরোধী কর্মযজ্ঞ। নফ্স হচ্ছে মানুষের মনস্তাত্তিক কিছু বিরূপসত্তা যেমন কাম-ক্রোধ-লোভ-মোহ এবং অপাঙ্ক্তেয় পানাহার ইত্যাদি। পাপ কর্মের প্রতি আকৃষ্ট, পাপ করে অনুতপ্ত হওয়া এবং পাপের প্রতি অনুরাগী না হয়ে পবিত্র কাজের প্রতি আকর্ষণ- এই তিন ধারায় বিভক্ত নাফ্সের উত্তম পর্যায় হচ্ছে নির্মোহ ও নির্লোভ থেকে পাপাচার মুক্ত বা নাজাত প্রাপ্তি। অন্যদিকে বলা যায় পানাহার ইত্যাদি দ্বারা নফ্স যখন শক্তিশালী হয়, রূহ তখন দুর্বল হয়ে পড়ে। আর রোজা পালনের মধ্যে অর্থাৎ পানাহার ইত্যাদি থেকে নিজেকে বিরত রেখে নফ্সকে শক্তিহীন করে আত্মার পরিশুদ্ধতা উন্নতকল্পে রূহকে শক্তিশালী করার মধ্যেই রোজা পালন হয় মহিমান্বিত। পবিত্র কুরআনে গুরুত্ব সহকারে যে মাসটি বারং বার উচ্চারিত সেটি হচ্ছে রমজান মাস। এই পবিত্র রমজান মাসেই পরিপূর্ণ জীবন ব্যবস্থা হিসেবে স্বীকৃত মহাগ্রন্থ পবিত্র কুরআন নাজিল হয়েছে এবং হাজার মাসের শ্রেষ্ঠ রজনীও এ মাসেই অন্তর্ভুক্ত।
উল্লেখ্য, এই মাসে যাকাত ও ঈদের দিন ফিতরা দেওয়ার রেওয়াজ একটি বৈষম্যহীনতার অসাধারণ উদাহরণ। প্রতিটি সামর্থ্যবান ও সচ্ছল মুসলমানদের ওপর সদকাতুল ফিতর ওয়াজিব। ঈদ উদযাপন সর্বজনীন করে ধনী-দরিদ্র-নির্বিশেষে সবার মধ্যে ঈদের আনন্দ ছড়িয়ে দিতেই সদাকাতুল ফিতরের বিধান চালু করা হয়েছে। পাশাপাশি এই সদকার মাধ্যমে রোজার ভুল-ত্রুটিও মাফ হয়। পবিত্র কুরআনে উল্লেখ আছে ‘তোমরা মানুষকে আল্লাহর হুকুম মতে সম্পদের যে অংশ অন্যদের বণ্টন করে দাও তা তোমাদের সম্পদের বৃদ্ধি ঘটায়’। অর্থাৎ জাকাত ফিতরা আদায় করে আর্থিকভাবে অসচ্ছল আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী বা সমাজের গরিব দুঃখী মানুষকে খাদ্যদ্রব্য, নতুন কাপড়-চোপড় বা নগদ অর্থ প্রদান করে তার অভাব পূরণে বা স্বাবলম্বী হওয়ার পথে উৎসাহিত করাই জাকাতের মূল লক্ষ্য।
ঈদ উৎসবের মহান শিক্ষা হচ্ছে হৃদয়ের সকল কালেমা ও পাপের গ্লানি-লোভ ও লালসাকে নিধন করে অন্ধকার-অসূচি-বিদ্বেষ-বিভেদ-কূপমণ্ডূকতা-সাম্প্রদায়িকতাসহ অশুভ ও অসুন্দর মানসিকতা থেকে পরিত্রাণ। সমৃদ্ধ-সুন্দর-উজ্জ্বল-আদর্শিক মনন ও সৃজনশীল পন্থা অবলম্বনে নিজেকে পরিশুদ্ধ ও দেশ-জাতিকে ভালোবেসে মানুষের কল্যাণে নিজেকে নিয়োজিত করার প্রতিফলনে এর নির্যাস উন্মোচিত। পরিবার ও সমাজকে আলোকিত করে অন্যকেও আলোকিত করার পথ প্রশস্তকরণে ইহ ও পরকালীন মঙ্গল কামনায় নিজের জীবনকে যথার্থ অর্থে পরিচালনা করার মধ্যেই ঈদ উৎসবের সফলতা ও সার্থকতা। মূলত সাম্যের অমিয় বার্তার নিরন্তর প্রচার-প্রসার এবং জীবন প্রবাহকে পরিশীলিত করে বিশ্বকে আলোকোজ্জ্বল করার শক্তিমানতা ঈদ উৎসবকে পরিপূর্ণতা দান করে। ঈদ উদযাপনের প্রাক্কালে পৃথিবী নামক এই গ্রহের সকল মানব সন্তানকে ঈদের শুভেচ্ছা জ্ঞাপন ও দেশ-জাতি-বিশ্বের সর্বাঙ্গীণ সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধির জন্য মহান স্রষ্টার দরবারে বিনীত প্রার্থনা নিবেদন করছি।
লেখক : শিক্ষাবিদ
প্যানেল/মো.








