সেকালের ঈদ ছিল এক অনাবিল, সহজ-সরল আনন্দের প্রতিচিত্র। আর একালের ঈদ অনেকটাই ভার্চুয়াল আনন্দের প্রতিফলন। একসময় ঈদ মানেই ছিল এক আবেগঘন প্রতীক্ষার নাম। চাঁদ দেখার সেই মুহূর্তে পুরো পাড়া যেন একসঙ্গে উচ্ছ্বাসে ফেটে পড়ত। ঈদের আগের রাত, অর্থাৎ চাঁদ রাত ছিল এক রোমাঞ্চকর অনুভূতির নাম। ঈদের দিন সকালে নতুন পোশাক পরে, আতর মেখে, খেজুর খেয়ে সবাই ঈদগাহের দিকে রওনা দিত। ছোট-বড় সবাই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঈদের নামাজ আদায় করত, তারপর কোলাকুলি করে একে অপরকে শুভেচ্ছা জানাত। আত্মীয়স্বজনের বাসায় দাওয়াত থাকত, একে অপরের বাড়ি যাওয়া, একসঙ্গে বসে খাওয়া, গল্প করা এসব ছিল ঈদের অপরিহার্য অংশ। ঈদের দিনে এক প্লেট সেমাই নিয়ে প্রতিবেশীর বাড়িতে যাওয়া ছিল সৌহার্দ্যরে প্রতীক। শহর থেকে মানুষ ছুটে যেত গ্রামে, আপনজনের সান্নিধ্যে ঈদের আনন্দ উপভোগ করতে।তখন গ্রামের প্রতিটি ঘর মেহমানের আগমনে উৎসবমুখর হয়ে উঠত। এই ঈদ ছিল আত্মার ঈদ, ভালোবাসার ঈদ, সবার ঈদ।
সময় বদলেছে, সঙ্গে বদলেছে ঈদ উদযাপনের ধরনও। ঈদের চাঁদ দেখার জন্য এখন আর ছোট-বড় কেউ আকাশের দিকে অধীর আগ্রহে তাকিয়ে থাকে না। চাঁদ রাতের সেই বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস এখন সোশ্যাল মিডিয়ার স্ট্যাটাসের মাঝে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে। সম্পর্কগুলোও ধীরে ধীরে ভার্চুয়াল হয়ে যাচ্ছে ঈদ মোবারকের মেসেজগুলো এখন হৃদয়ের উষ্ণতা ছুঁতে পারে না, বরং কপি-পেস্ট করা টেক্সটের মতো নিস্তেজ লাগে।
ঈদের পোশাকের ক্ষেত্রেও এসেছে বড় পরিবর্তন। আগে দর্জির দোকানে গিয়ে নকশা করিয়ে জামা বানানোর যে আনন্দ ছিল, তা এখন ব্র্যান্ডের দখলে। ইন্টারনেটের এক ক্লিকেই চলে আসে দামি পোশাক, কিন্তু সেই অপেক্ষার রোমাঞ্চ আর খুশির উচ্ছ্বাস এখন আর আগের মতো নেই।
শহুরে জীবনে ঈদের আনন্দ এখন অনেকটাই ডিজিটাল। সকালবেলার ঈদগাহের ভিড় শেষে সেলফি তারপর সেই ছবি সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট করার হিড়িক পড়ে যায়। কে কার আগে ছবি পোস্ট করবে, কার ছবি কতটুকু সুন্দর হয়েছে, পোস্টে কতগুলো লাইক ও কমেন্ট পড়েছে, এগুলো করতে করতেই তাদের দিন চলে যায়।
নামাজের পর অনেকেই ঘরে বসে টেলিভিশন দেখে কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যস্ত থাকে। ঈদের পর আত্মীয়স্বজনের বাড়ি যাওয়ার বদলে এখন বেশি গুরুত্ব পায় ঈদের ছবি পোস্ট করা, রিল তৈরি, কিংবা অভিজাত রেস্টুরেন্টের বুফে পার্টি। ফেসবুক-ইন্টারনেট ঈদের আনন্দকে বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু সেই সঙ্গে যেন পারিবারিক ঘনিষ্ঠতাও খানিকটা কমিয়ে দিয়েছে।
আগেকার আমলের মানুষ ঈদকে উপভোগ করত, কিন্তু এখনকার যুগে মানুষ উপভোগ করার থেকে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অন্যকে উপভোগ করানোর পেছনে বেশি ছুটছে।
সময়ের সঙ্গে ঈদের রং বদলালেও, তার হৃদস্পন্দন আজও একটাই ‘ভালোবাসা, সংযোগ, আর আনন্দ ভাগাভাগি করা।’ সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে তাল মিলিয়ে আমাদেরও দরকার ঈদের চিরায়ত উষ্ণতাকে ধরে রাখা, প্রযুক্তির মাঝে হারিয়ে না গিয়ে পরিবারের সঙ্গে ঈদের আসল আনন্দ উপভোগ করা। একালের আধুনিকতার সঙ্গে সেকালের আন্তরিকতা মিশে যাক। ঈদ হোক সত্যিকার অর্থেই সবার জন্য আনন্দময়, মধুর এবং ভালোবাসায় পূর্ণ।
গোপালগঞ্জ থেকে
প্যানেল/মো.








