ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৮ মার্চ ২০২৬, ৪ চৈত্র ১৪৩২

নদী-খাল খননে সম্ভাবনা

প্রকাশিত: ১৯:১৩, ১৮ মার্চ ২০২৬

নদী-খাল খননে সম্ভাবনা

সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান দিনাজপুরের কাহারোল উপজেলার সাহাপাড়ায় নিজ হাতে কোদাল দিয়ে মাটি কেটে খাল খনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। প্রধানমন্ত্রীর খাল খনন কর্মসূচিকে সাধুবাদ জানিয়েছেন সংসদে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামির আমির ডা. শফিকুর রহমান এমপি। তিনি এক বার্তায় বলেন, বাংলাদেশ একসময় কার্যত নদীমাতৃক দেশ হিসেবে পরিচিত ছিল। নদীগুলো সচল ছিল, নদীপথে যাতায়াত, পণ্য পরিবহন এবং কৃষিক্ষেত্রে নদী ছিল বিশাল নিয়ামক শক্তি। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে একদিকে ফারাক্কা বাঁধের অভিশাপ অন্যদিকে প্রধান নদীগুলোসহ গুরুত্বপূর্ণ সকল নদ-নদী, খাল এবং বিল ভরাট হওয়ার ফলে একসময়ের স্রোতস্বিনী নদীগুলো এখন ভরা মৌসুমে পানি ধারণ করতে পারে না। দেশ বাঁচাতে হলে প্রধান নদীগুলোতে পর্যাপ্ত ড্রেজিং সম্পন্ন করে নাব্য ফিরিয়ে আনা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকার হয়ে দাঁড়িয়েছে। সরকারের উচিত হবে দেশ বাঁচানোর স্বার্থে নদ-নদীগুলোর জীবন ফিরিয়ে আনার কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ করা। সংসদীয় গণতন্ত্রের নিকট ইতিহাসে আমরা এমনটি খুব কমই দেখেছি প্রধানমন্ত্রীর কোনো পদক্ষেপকে বিরোধীদলীয় প্রধান সাধুবাদ জানিয়েছেন। জাতির জন্য এটি আশা জাগানিয়া সংবাদ।  নদী-খাল খনন ও পুনঃখননের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক, তবে অতীত অভিজ্ঞতা আমাদের নতুন কিছু বিষয় নিয়ে ভাবতে শেখায়।
প্রথমত, নদী-খাল খননের আগে সঠিক জরিপ ও সীমানা নির্ধারণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বহু ক্ষেত্রে দেখা গেছে, প্রকৃত প্রস্থ বিবেচনা না করে একই মাপ ধরে খনন করা হয়েছে। ফলে নদী সংকুচিত হয়েছে এবং দখলদারদের সুযোগ তৈরি হয়েছে। সিএস, এসএসহ বিদ্যমান রেকর্ড যাচাই করে নদীর প্রকৃত সীমা নির্ধারণ করতে হবে এবং প্রয়োজনে নতুন ডিজিটাল জরিপের মাধ্যমে নদী পুনঃঘোষণা নিশ্চিত করতে হবে। দ্বিতীয়ত, খননকৃত মাটির সঠিক ব্যবস্থাপনা অপরিহার্য। বাস্তবে অনেক প্রকল্পে নদীর পাড়েই মাটি ফেলা হয়, যা বর্ষায় পুনরায় নদীতে ভরাট হয়ে যায়। এতে সরকারি অর্থের অপচয় যেমন ঘটে, তেমনি নদীর স্বাভাবিক প্রবাহও ব্যাহত হয়। তাই খনন প্রকল্প গ্রহণের সময় থেকেই মাটি অপসারণ ও ব্যবহারের সুস্পষ্ট পরিকল্পনা থাকতে হবে। তৃতীয়ত, নদীকে খাল হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে। একটি নদীর স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য ও পরিচয় অক্ষুণ্ন রাখা জরুরি। জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের সংজ্ঞা অনুযায়ী যেসব প্রবাহ নদী হিসেবে স্বীকৃত, সেগুলোকে নদী হিসেবেই বিবেচনা করতে হবে। এতে নিশ্চিত হবে নদীর আইনি সুরক্ষা।
চতুর্থত, খনন পদ্ধতিতে বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গি জরুরি। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, এলোমেলোভাবে খননের ফলে নদীকে বিভক্ত করে একাধিক প্রবাহ তৈরি করা হয়। যা নদীর স্বাভাবিক গতিপথ নষ্ট করে। নদী কখনো সমান প্রস্থে প্রবাহিত হয় না- এ বাস্তবতা মাথায় রেখে খনন পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। একই সঙ্গে আধুনিক প্রযুক্তি ও পরিবেশবান্ধব পদ্ধতির ব্যবহার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পঞ্চমত, বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয়ের অভাব দূর করতে হবে। উপজেলা থেকে জাতীয় পর্যায়ে সমন্বিত কমিটি গঠন করে একীভূত পরিকল্পনার ভিত্তিতে কাজ করতে হবে। সরকারের সদিচ্ছা ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহি নিশ্চিত করা গেলে নদী-খাল খনন কার্যক্রম সত্যিকার অর্থেই দেশের জন্য মঙ্গলজনক হতে পারে।

প্যানেল/মো.

×