ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২৪ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১১ ফাল্গুন ১৪৩০

নেত্রকোনা জেলা

তিন আসনে স্বতন্ত্র থাকায় নৌকার প্রার্থীরা অস্বস্তিতে

সঞ্জয় সরকার/আবুল কাশেম আজাদ, নেত্রকোনা

প্রকাশিত: ০০:৩৫, ১০ ডিসেম্বর ২০২৩

তিন আসনে স্বতন্ত্র থাকায় নৌকার প্রার্থীরা অস্বস্তিতে

দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার তুঙ্গে

জেলার পাঁচটি সংসদীয় আসনের সবকটিতে দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের প্রচার তুঙ্গে। বাছাইপর্বের পর অনানুষ্ঠানিক প্রচারে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন ২৩ প্রার্থী। ওই ২৩ জনের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের প্রার্থী ১৯ জন। বাকি চারজন আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত ও স্বতন্ত্র প্রার্থী। তিনটি আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী থাকায় সেসব নির্বাচনী এলাকার নৌকার প্রার্থীরা বেশ অস্বস্তিতে রয়েছেন। কিন্তু আবার একই দলের দুই পক্ষের পাল্টাপাল্টি প্রচারে জমে উঠেছে আসন তিনটির নির্বাচন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের প্রার্থীর বিপরীতে জুতসই প্রতিদ্বন্দ্বী না থাকায় অপর দুটি আসনের নির্বাচনী পরিবেশ অনেকটাই ঢিলেঢালা।
নেত্রকোনা-১ (কলমাকান্দা-দুর্গাপুর) ॥ গারো পাহাড় ও আদিবাসী অধ্যুষিত এ নির্বাচনী আসনে ছয়জন প্রার্থী মনোনয়নপত্র জমা দিলেও বাছাইপর্বের পর টিকে আছেন চারজন। তারা হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত সাবেক এমপি মোশতাক আহমেদ রুহী, একই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী জান্নাতুল ফেরদৌস আরা (ঝুমা তালুকদার), জাতীয় পার্টির (জাপা) সাবেক এমপি গোলাম রব্বানী ও সাংস্কৃতিক মুক্তি জোটের আহমদ শফী। তাদের মধ্যে আলোচনায় আছেন সাবেক এমপি রুহী ও দুর্গাপুর উপজেলা পরিষদের সদ্য বিদায়ী চেয়ারম্যান ঝুমা। আনন্দমোহন কলেজের সাবেক ভিপি রুহী নবম সংসদে এমপি নির্বাচিত হলেও পরবর্তী দুই নির্বাচনে মনোনয়ন পাননি। তখন বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে নির্বাচন করেন।

অন্যদিকে সাবেক এমপি জালাল উদ্দিন তালুকদারের মেয়ে ঝুমাও উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছিলেন বিদ্রোহী প্রার্থী হয়ে। রুহীর পক্ষে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিভিন্ন কেন্দ্র কমিটি গঠন, সভা-সংযোগ করলেও ঝুমা এখনো ততটা সরব হননি। ভোটারদের ধারণা, ঝুমা সরব হলে এখানকার নির্বাচন কিছুটা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে।
নেত্রকোনা-২ (সদর-বারহাট্টা) ॥ জেলা সদরের আসন হিসেবে পরিচিত এ আসনে মনোনয়ন ফরম জমা দিয়েছিলেন ৯ জন। বাছাইয়ের পর টিকে আছেন ছয়জন। তারা হলেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বর্তমান এমপি ও সমাজকল্যাণ প্রতিমন্ত্রী বীর মুক্তিযোদ্ধা আশরাফ আলী খান খসরু, স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক উপমন্ত্রী আরিফ খান জয়, জাপার রহিমা আক্তার (আসমা সুলতানা), বিএনএমের এবিএম রফিকুল ইসলাম তালুকদার, জাকের পার্টির মানিক চন্দ্র সরকার ও ইসলামী ঐক্যজোটের মো. ইলিয়াস। জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আশরাফ আলী খান খসরু নবম সংসদেও এমপি ছিলেন।

অন্যদিকে সাবেক কৃতী ফুটবলার আরিফ খান জয় ছিলেন দশম সংসদের এমপি। দুজনই ভোটারদের পরিচিত মুখ। দুজনের সমর্থকরাই প্রতিদিন এলাকায় সভা-সমাবেশ, মিছিল ও গণসংযোগ করছেন। ভোটারদের ধারণা, এখানে খসরু এবং জয়ের মধ্যে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে একই দলের দুই প্রার্থীকে নিয়ে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়েছেন আওয়ামী লীগের কিছু নেতাকর্মী। সুনির্দিষ্টভাবে কারও পক্ষে অবস্থান না নিয়ে অনেকে চুপটি মেরে আছেন। অপেক্ষা করছেন কেন্দ্রের নির্দেশনা বা সময়ের। অন্য প্রার্থীদের নিয়ে তেমন আলোচনা নেই।
নেত্রকোনা-৩ (কেন্দুয়া-আটপাড়া) ॥ এ আসনে মনোনয়নপত্র জমা দিয়েছিলেন ১০ জন। বাছাইয়ের পর টিকে আছেন সাতজন। তারা হলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান এমপি ও আওয়ামী লীগের সাংস্কৃতিক সম্পাদক অসীম কুমার উকিল, একই দলের স্বতন্ত্র প্রার্থী সাবেক দুই এমপি মঞ্জুর কাদের কোরাইশী ও ইফতিকার উদ্দিন তালুকদার পিন্টু, জাপার জসীম উদ্দিন ভুঁইয়া, ইসলামী ঐক্যজোটের এহতেশাম সারোয়ার, জাকের পার্টির সুরুজ আলী ও তৃণমূল বিএনপির মিজানুর রহমান খান।

অন্যদের সঙ্গে ভোটারদের ততটা সংযোগ না থাকলেও বর্তমান ও সাবেক তিন এমপি এখানকার দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। প্রত্যেকের নিজস্ব কর্মী-সমর্থক রয়েছেন। তাই এখানে একই দলের তিন প্রার্থীর মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ের সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। তবে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আছেন অসীম কুমার উকিল ও ইফতিকার উদ্দিন তালুকদার পিন্টু।

নেত্রকোনা-৪ (মদন-মোহনগঞ্জ-খালিয়াজুরী) ॥ হাওড়ের তিন উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনটিতে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন পাঁচজন। যাচাই-বাছাইয়ের পর টিকে আছেন মাত্র তিনজন। তারা হলেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী বর্তমান এমপি সাজ্জাদুল হাসান (সাবেক সচিব), জাপার লিয়াকত আলী খান ও জাসদের মুশফিকুর রহমান। নব্বইয়ের গণআন্দোলন ও কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের নেতা শফী আহমেদ স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়নপত্র দাখিল করলেও যাচাই-বাছাইয়ে তা বাতিল হয়। এ কারণে হেভিওয়েট প্রার্থী সাজ্জাদুল হাসানের অবস্থা আপাতত নির্ভার।

তা ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সিনিয়র সচিব থাকাকালে এলাকার উন্নয়নে ব্যাপক অবদান রাখায় তিনি আগে থেকেই ভোটারদের কাছে আলোচিত ও জনপ্রিয়। কাজেই এখানে তার সঙ্গে অন্য দুই প্রার্থীর প্রতিদ্বন্দ্বিতা হওয়ার কোনো সম্ভাবনাই নেই। তবু সাজ্জাদুল গণসংযোগ করে যাচ্ছেন। কেন্দ্র কমিটি গঠনসহ নেতাকর্মীদের সুসংগঠিত করে নির্বাচনের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত তার দলের নেতাকর্মীরাও।

এদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী শফী আহমেদ তার মনোনয়নপত্র বাতিল ঘোষণার বিরুদ্ধে নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছেন বলে জানিয়েছেন। তিনি আপিলে টিকে গেলে সাজ্জাদুলের সঙ্গে লড়াইয়ে অবতীর্ণ হবেন, তাতে সন্দেহ নেই। নির্বাচনী এলাকায় তারও নিজস্ব কর্মী-সমর্থক আছে। তিনিও ভোটারদের পরিচিত মুখ। কাজেই আসনটির নির্বাচন পরিস্থিতি নির্ভর করছে শফীর আপিলের রায় ঘোষণার ওপর। 
নেত্রকোনা-৫ (পূর্বধলা) ॥ এ আসনে মনোনয়নপত্র দাখিল করেছিলেন ছয়জন। বাছাইয়ের পর টিকে আছেন তিনজন। তারা হলেন আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন, জাপার ওয়াহিদুজ্জামান আজাদ ও তৃণমূল বিএনপির আব্দুল ওয়াহাব হামিদী। এখানে জাবির সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক আনোয়ার হোসেন, মিছবাহুজ্জামান ও মাজহারুল ইসলাম ওরফে সোহেল ফকির আওয়ামী লীগের মনোনয়নবঞ্চিত হয়ে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মনোনয়ন দাখিল করলেও বাছাইয়ে বাতিল হয়।

অন্যদিকে অসুস্থতাজনিত কারণে বর্তমান এমপি বীর মুক্তিযোদ্ধা ওয়ারেসাত হোসেন বেলাল বীরপ্রতীক নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় নৌকার প্রার্থী আহমদ হোসেন অনেকটাই নির্ভার। দীর্ঘদিন চেষ্টার পর এবারই প্রথম মনোনয়ন পেয়েছেন এই হেভিওয়েট প্রার্থী। এখানে তার অনুসারীদের সঙ্গে বেলালের অনুসারীদের বিরোধ চলছিল সুদীর্ঘকাল ধরে। তবে বেলাল নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করায় অনেকেই আহমদের পাশে ভিড়তে শুরু করেছেন। অন্য দুই প্রার্থীর অবস্থান ততটা সুদৃঢ় না থাকায় আহমদের জয় মোটামুটি নিশ্চিত বলেই মনে করছেন তার সমর্থকরা।

×