ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ৩০ জানুয়ারি ২০২৩, ১৬ মাঘ ১৪২৯

monarchmart
monarchmart

‘তুমার ট্রেনিং ট্রুনিং আছেনি, বন্দুক চালাইতে ফারবানি’

যুদ্ধদিনের স্মৃতি 

সৈয়দ হুমায়েদ শাহীন, মৌলভীবাজার

প্রকাশিত: ২৩:৩০, ২৪ জানুয়ারি ২০২৩

যুদ্ধদিনের স্মৃতি 

আব্দুল মুহিত টিট

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হওয়ার পর পাক হানাদারদের বিরুদ্ধে বীরত্বের সঙ্গে লড়াই করেছেন দেশের সর্বস্তরের মানুষ। অস্ত্র হাতে মুক্তিযোদ্ধারা পাকবাহিনীর বিরুদ্ধে মরণপণ লড়াই করে ছিনিয়ে আনেন স্বাধীনতা। হানাদারদের বিরুদ্ধে এ দেশের যারা জীবনবাজি রেখে লড়াই করেছেন তাদেরই একজন মৌলভীবাজারের বীর মুক্তিযোদ্ধা মোহাম্মদ আব্দুল মুহিত টিটু। দৈনিক জনকণ্ঠের কাছে ’৭১-এর সেই লড়াইয়ের দিনগুলোর স্মৃতিচারণ করেছেন তিনি।
টিটিু বলেন, ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ শমসেরনগরে পাক হানাদার বাহিনী তৎকালীন ইপিআর বাহিনীর প্রতিরোধে কয়েকজন পাকসেনা নিহত হলে তারা ভয়ে মৌলভীবাজার থেকে পালিয়ে শেরপুরে কুশিয়ারা নদীর উত্তর পাড়ে অবস্থান নেয়। মৌলভীবাজার শহরে এই সংবাদ ব্যাপকভাবে চারিদকে ছড়িয়ে পড়ে। তৎকালীন মেজর সিআর দত্ত ও হবিগঞ্জের এমএলও (পরবর্তীতে কমাণ্ডার) মানিক চৌধুরী পিটিআই রেস্টহাউসে আসেন। আমি তখন মৌলভীবাজার কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র এবং ছাত্রলীগ রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলাম। আমি মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলাম যুদ্ধে যাব। খবর পেলাম মুক্তিযোদ্ধারা পিটিআই রেস্টহাউসে অবস্থান করছে।
বাসার কাউকে না জানিয়ে আমি পিটিআই রেস্টহাউসে যাই। সেখানে গিয়ে দেখলাম একজন লোক বসে আছেন, নেতা টাইপের। আমার মনে হলো তিনিই মানিক চৌধুধী। আমি তার কাছে গেলাম এবং বললাম আমি আপনাদের সঙ্গে যুদ্ধে যাব। তিনি হবিগঞ্জের আঞ্চলিক ভাষায় বলে উঠলেন ‘তুমি যুদ্ধে যাইতা চাউ, তুমিত পুলা মানুষ। তুমার ট্রেনিং ট্রুনিং আছেনি? তুমি বন্দুক চালাইতে ফারবানি?’ বললাম, আমি বন্দুক চালাইতে পারি। আমি তখন রাইফেল ক্লাবের সদস্য ছিলাম।

স্কুলজীবন থেকেই আমি স্কাউটিং করতাম। তৎসময়ে মুজাহিদদের আনসার মাঠে বন্দুক চালাতে ট্রেনিং দেওয়া হতো। আমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখতাম, কীভাবে বন্দুক চালাতে হয়। মাঝে মধ্যে তারা আমাকে বলত, এই আস দেখি, তুমি গুলি চালাতে পারনি। আমি তাদের কথামতো বন্দুক নিয়ে গুলি চালাতাম। এভাবে আমি পুরোদমে গুলি চালানো শিখে ফেলি।
এরপর মানিক চৌধুরী আমাকে নিয়ে মেজর সিআর দত্তের কাছে গেলেন এবং বললেন, সে আমাদের সঙ্গে যুদ্ধে যেতে চায়। মেজর সিআর দত্ত আমাকে বললেন, তুমি বাচ্চা ছেলে, যুদ্ধে যেতে চাও। তুমি কি বন্দুক চালাতে পার, তোমার কোনো ট্রেনিং জানা আছে? বললাম, আমার কিছুটা ট্রেনিং জানা আছে এবং আমি বন্দুক চালাতে পারি। আমি আরও বললাম, আমি (তৎসময়ের) ক্যাপ্টেন মন্নানের ছোট ভাই। ও, তুমি মন্নানের ছোট ভাই, যুদ্ধে যেতে চাও? তোমরাইতো যুদ্ধে যাবা। যাও রেডি হও।

আমিই ছিলাম মৌলভীবাজারের যুদ্ধে অংশগ্রহণ করা প্রথম ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা। আমি তাড়াতাড়ি বাসায় এসে আমার স্কাউটের ড্রেস কাগজে মুড়িয়ে কাউকে না বলে পিটিআইয়ের উদ্দেশ্যে রওয়ানা দেই। মেজর সিআর দত্ত আমাকে সমজিয়ে দিলেন কোম্পানি কমা-ার আব্দুল হালিমের কাছে। দিলেন একটি ৩০৩ রাইফেল ও ১০ রাউ- গুলি। 
আমরা সবাই গাড়িতে উঠে রওয়ানা দিলাম শেরপুরের উদ্দেশ্যে। পথিমধ্যে গাড়িতে তেল ভরতে রশিদ মিয়ার বিওসি পাম্পে গাড়ি থামল। এ সময় আমার এক দুলাভাই এদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি আমাকে দেখে গাড়ি থেকে নামিয়ে বাসায় যাওয়ার জন্য বললেন। আমি গাড়ি থেকে নেমে বাসার উদ্দেশে হাঁটতে থাকি এবং একটু সামনে গিয়ে দেখি দুলাভাইকে আর দেখা যায় না। তাই আমি উল্টা দৌড়ে আবার ফিরে এসে গাড়িতে উঠি। গাড়ি করে আমরা কাজীর বাজারে আসি।

সেখান থেকে গ্রামের মেঠো পথ দিয়ে পায়ে হেঁটে শেরপুরের ব্রাহ্মণগাঁও পৌঁছাই। গ্রামবাসীরা আমাদের যার যার সাধ্যমতো চিড়া, গুড়, মুড়ি ও ভাত খাওয়ায়। আমরা খাওয়া-দাওয়া করে কিছুটা বিশ্রাম নিয়ে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হই।
এপ্রিল মাসের ৩ তারিখ, আমরা আমাদের সোর্সের মাধ্যমে নিশ্চিত হই যে, নদীর উত্তর পাড়ে সিলেট অংশে পাক সেনারা অবস্থান করছে। সিন্ধান্ত নেওয়া হয় মধ্য রাতে আমরা তাদের ওপর আক্রমণ করব। রাত আনুমানিক ৩টা হবে, আমরা পাকবাহিনীর ওপর আক্রমণ চালাই। উভয় পক্ষে মুহুর্মুহু প্রায় ৫-৬ ঘণ্টা গোলাগুলি হয়। ফজরের আজানের পর আর অপর দিক থেকে কোনো গুলির শব্দ না পেয়ে আমরা ধরে নেই পাকবাহিনী পালিয়ে গেছে।

ভোরের সূর্যের আলোয় যখন চারিদিক আলোকিত হয়, তখন আর একটি গুলিও অপর দিক থেকে আসেনি। আমরা ধরে নেই পাকবাহিনী পিছু হটে পালিয়েছে। আমরা নৌকাযোগে আমাদের সোর্সকে নদীর অপর প্রান্তে পাঠাই। সোর্স আমাদের জানায় পাক হানাদার বাহিনী পালিয়ে সাদীপুরে নদীর অপর প্রান্তে অবস্থান করছে।
আমরা নৌকাযোগে নদী পার হয়ে অপর প্রান্তে আসি। তখন দুপুর আনুমানিক ১২টা হবে। আমরা আসলে স্থানীয় লোকজন আমাদের জানায়, আমাদের অতর্কিত আক্রমণে পাকবাহিনী এদিক সেদিক ছুটাছুটি করতে থাকে এবং তাদের তিন প্লাটুন সৈন্যের মধ্যে বেশ হতাহত হয়। চার-পাঁচজন সৈনিক দলচ্যুত হয়ে আত্মরক্ষার জন্য গ্রামের বিভিন্ন বাড়ির ঝোপ-জঙ্গলে আশ্রয় নিলে গ্রামবাসী একত্রিত হয়ে দা, খন্তি ও বাঁশ দিয়ে পিটিয়ে তাদের হত্যা করে।

যে স্থানে পাকবাহিনীর বাঙ্কার ছিল, সে স্থানে বেশ কিছু গোলাবারুদ ও অস্ত্র পড়ে থাকে। দেখি, রাস্তার বিভিন্ন স্থানে পাক সৈন্যদের রক্ত জমাট বেঁধে আছে। আহত ও নিহত সৈন্যদের পাকবাহিনী সিলেটের দিকে নিয়ে গেছে। এ ঘটনার পর আমাদের মনোবল অনেক বৃদ্ধি পায়। 
নিজস্ব সোর্সের মাধ্যমে আমারা খবর পেলাম পাকবাহিনী সাদীপুরে নদীর অপর প্রান্তে অবস্থান করছে। আমরা সেখানে পাকবাহিনীকে আক্রমণের জন্য প্রস্তুত হই। আমরা তাদের ওপর গুলি চালালে তারাও পাল্টা আমাদের দিকে গুলি ছুড়ে। উভয় পক্ষের মধ্যে গোলাগুলি চলে। আমরা হালকা অস্ত্র দিয়ে পাকবাহিনীর ওপর গুলি চালালে অপর প্রান্ত থেকে মর্টার ও মেশিনগানের গুলি চালায়।

এ সময় আমার ডান পাশে একজন মুক্তিযোদ্ধার বুকের নিচে বাম দিকে গুলি লাগলে তিনি একটি চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়েন। আমি তাকিয়ে দেখি একটি গুলি ওই মুক্তিযোদ্ধার বুকের নিচ দিয়ে প্রবেশ করে পেছনের দিকে বেশ বড় ছিদ্র হয়ে বেরিয়ে গেছে। তিনি মাটিতে পড়ে কাতরাতে থাকেন। 
আমি তাঁকে সাহায্যের জন্য এগোবো এমন সময় আরেকটি গুলি এসে আমার বাম হাতের বাহুতে লাগে। প্রচ- ব্যথা ও প্রচুর রক্তক্ষরণ হতে থাকে। আমিও যন্ত্রণায় কাতরাতে থাকি। আমার পকেটে সবসময় একটি রুমাল থাকত। আমি পকেট থেকে রুমাল বের করে বাহুতে বাঁধলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে দেখি, আমার পাশের সেই মুক্তিযোদ্ধার শরীর নিস্তেজ হয়ে পড়ে রয়েছে। এরপর আমাকে আহত অবস্থায় মৌলভীবাজার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

সেখানে চার-পাঁচদিন চিকিৎসা নেওয়ার পর নিরাপত্তার কারণে হাসপাতাল থেকে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় যাই। সেখানে কয়েকদিন অবস্থানের পর কমলগঞ্জের ধলই সীমান্ত দিয়ে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের কমলপুর হাসপাতালে চিকিৎসা নেই। সুস্থ হওয়ার পর আমি আবার ক্যাম্পে যোগ দেই এবং আ স ম আব্দুর রবের নেতৃত্বে কমলপুরে ভারতের ক্যাম্পে মুক্তিযোদ্ধা সংগ্রহের কাজ করি।

monarchmart
monarchmart