১৮ অক্টোবর ২০১৭,   ঢাকা, বাংলাদেশ   শেষ আপডেট এই মাত্র  
Login   Register        
ADS

বঞ্চিত মানুষের আশ্রয়


জন্ম : ১ জানুয়ারি ১৯১১

মৃত্যু : ৬ সেপ্টেম্বর ১৯৮৯

শেখ আবু মোহাম্মদ ইব্রাহিম। দেশের মানুষের কাছে যিনি ডাক্তার ইব্রাহিম নামেই সমধিক পরিচিতি। তাঁর পরিচয়ের গন্ডি এখন দেশ পেরিয়ে বহির্বিশ্বে ছড়িয়ে পড়েছে। তাঁর নামের সঙ্গে ডায়াবেটিক শব্দটি অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িয়ে আছে। তাঁর হাত ধরে লাখ লাখ ডায়াবেটিক রোগী পেয়েছেন জীবনের নতুন স্বাদ। দেশের স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত মানুষের কাছে তিনি এক পরম আশ্রয়। তিনি বাংলাদেশ ডায়াবেটিক সমিতির প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতীয় অধ্যাপক। ১৯৬৫ সালে ডাক্তার ইব্রাহিম ডায়াবেটিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা করেন, যা বর্তমান বারডেম হাসপাতাল নামে পরিচিত।

ডাক্তার ইব্রাহিমের জন্ম ১৯১১ সালের ১ জানুয়ারি পশ্চিমবঙ্গের মুর্শিদাবাদ জেলার ভরতপুর ইউনিয়নের খাড়েরা গ্রামে। তাঁর পিতা শেখ মৌলভী মুহম্মদ কিসমতুল্লাহ। মায়ের নাম আজিম-উন-নিসা বিবি। দুই ভাই, দুই বোনের মধ্যে ইব্রাহিম সবার বড়। তিনি সালার এডওয়ার্ড ইংলিশ হাইস্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে পাস করেন। এরপর কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে ইন্টারমিডিয়েট পাস করেন। ১৯৩৩ সালে তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে ভর্তি হন এবং ১৯৩৮ সালে সফলতার সঙ্গে চিকিৎসক হিসাবে বের হয়ে আসেন। মানবতাবোধ দ্বারা তাড়িত গতিশীল জীবনের অধিকারী ছিলেন ডাঃ মোহাম্মদ ইব্রাহিম। তার মধ্যে ছিল বহুমুখী মানবিক গুণ। তিনি আজীবন নিজেকে মানব কল্যাণমূলক বিভিন্ন সামাজিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত রেখেছিলেন। তাঁর এসব কর্মকাণ্ড ব্যক্তি ও সমাজ থেকে শুরু করে জাতীয় পর্যায়ে তাঁর একটি মর্যাদাশীল আসনে অধিষ্ঠিত যা অন্য অনেকের পক্ষেই সম্ভব হয়নি। তিনি চিকিৎসা শাস্ত্রে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ করে চিকিৎসা সেবাকেই জীবনের প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছিলন। একজন সমাজসেবক, জনকল্যাণে নিবেদিত ও সহানুভূতিপ্রবণ প্রাজ্ঞ চিকিৎসক, অপ্রতিদ্বন্দ্বী সংগঠক এবং সুদক্ষ ব্যবস্থাপক হিসেবে দেশ ও জাতির সেবায় উৎসর্গ করেছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতেই কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে প্রফেসর অব মেডিসিনের ওয়ার্ডে হাউস ফিজিশিয়ান হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। ১৯৩৮ সাল থেকে ১৯৪৭ সাল পর্যন্ত তিনি কলকাতা মেডিক্যাল কলেজে কাজ করেন। দেশভাগের পর পূর্ব পাকিস্তানে চলে আসেন এবং চট্টগ্রামের সিভিল সার্জন হিসাবে যোগদান করেন। ১৯৪৮ সালে অধ্যাপক মোহাম্মদ ইব্রাহিম যুক্তরাজ্য থেকে এমআরসিপি ডিগ্রী অর্জন করেন। তাঁর পরের বছর আমেরিকান কলেজ অব চেস্ট ফিজিশিয়ানস থেকে এফসিসিপি ডিগ্রী লাভ করেন। ১৯৫০ সালে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে মেডিসিনের অধ্যাপক নিযুক্ত হন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে থাকাকালীন ১৯৫৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি কয়েক চিকিৎসক ও সমাজসেবীর সহযোগিতায় ঢাকার সেগুনবাগিচায় পাকিস্তান ডায়াবেটিক সমিতি প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯৫৮ সালে তিনি আমেরিকান কলেজ অব চেস্ট ফিজিশিয়ানস, পাকিস্তান চ্যাপ্টারের গবর্নরের দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৬২ থেকে ১৯৬৪ সাল পর্যন্ত তিনি স্যার সলিমুল্লাহ মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিনের অধ্যাপক ও অধ্যক্ষ হিসেবে কাজ করেন। ডাঃ ইব্রাহিম কঠোর পরিশ্রমী, নিয়মানুবর্তী, উচ্চাকাক্সক্ষী, সৎব্যক্তি এবং কর্তব্যপরায়ণ ছিলেন। মানবিক মূল্যবোধে উজ্জীবিত এ মহানুভব মানুষটি মানবতার মহান উচ্চ আদর্শের প্রতি ছিলেন আজীবন শ্রদ্ধাশীল। তিনি মানব সেবার যে উচ্চ আদর্শ তাঁর সহকর্মীদের মধ্যে প্রতিনিয়ত সঞ্চারিত করতে সচেষ্ট ছিলেন, তা ছিল বাস্তবতার সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত।

ডাঃ ইব্রাহিম মন্ত্রীর পদমর্যাদায় স্বাস্থ্য, পরিবার পরিকল্পনা ও সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের রাষ্ট্রপতির উপদেষ্টা, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিনেট সদস্য, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার এশিয়া অঞ্চলের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য, আন্তর্জাতিক ডায়াবেটিক ম্যানেজমেন্ট বোর্ডের সদস্য পদে দায়িত্ব পালন করেছেন। কর্মময় জীবনে সাফল্যের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি বিভিন্ন সম্মানে ভূষিত হন। ১৯৮৯ সালের ৬ সেপ্টেম্বর তিনি ইন্তেকাল করেন।