ঢাকা, বাংলাদেশ   সোমবার ২২ জুলাই ২০২৪, ৬ শ্রাবণ ১৪৩১

সিডনির মেলব্যাগ

শ্রমশক্তির আচরণগত আধুনিকতা

অজয় দাশগুপ্ত

প্রকাশিত: ২১:০২, ২৪ জুন ২০২৪

শ্রমশক্তির আচরণগত আধুনিকতা

সিডনির মেলব্যাগ

বাংলাদেশের মানুষ ভালো আছেন। তারা তাদের মতো করে ভালোই আছেন। দুঃখ-কষ্ট-অভাব-অনটন নেই এ কথা বলা যাবে না। কিন্তু এখন গ্লোবাল রিসেসনের সময়। দুনিয়ার কোন্ দেশ আছে যেখানে অভাব হানা দেয়নি? অভাব না বলে বরং বলব সংকট। এই সংকটের মূল কারণ মহামারি করোনা আর যুদ্ধ। দেশে দেশে যারা যুদ্ধ বন্ধ না করে আমাদের সরকার বা দেশের মানুষকে বিপদে ফেলে, তাদের কথা কেউ বলে না।

আমরা যারা সিডনি প্রবাসী তারা জানি, একটা সময় যা ইচ্ছে কেনার সুযোগ ছিল এবং মানুষ কিনত। এখন কি আমরা তা পারি? পারি না। কারণ, দ্রব্যমূল্য হতে দেয় না। অথচ এসব দেশে সরকারবিরোধী আন্দোলন বলে মূলত কিছু নেই। আছে সমালোচনা আর গঠনমূলক বিরোধিতা। গণতন্ত্রের সংজ্ঞাই তাই। আপনি যদি বহুমত ও পথে বিশ্বাসী হন, তো আপনাকে সরকার মানতে হবে। সরকারের ভুলত্রুটি এবং সমালোচনা করবেন, সংসদে কথা বলবেন এটাই নিয়ম। আমাদের সমাজে সে রীতি নেই। গঠনমূলক বলে কিছু নেই। আছে তীব্র বিরোধিতা বা অন্ধ সমর্থন।
বলছিলাম মানুষ ভালো আছে। তাদের মতো করে তাদের এই ভালো থাকার মূল চালিকা শক্তিগুলোর একটি হচ্ছেÑ প্রবাসীদের প্রেরিত রেমিটেন্স। এই টাকা পাঠানো মানুষদের নিয়েই আজকের লেখা। সম্প্রতি জরুরি কাজে দেশে যেতে হয়েছিল। খুব অল্প সময়ের এই ঝটিকা সফরে আমার যাত্রাপথ ছিল কুয়ালালামপুর হয়ে ঢাকা। কুয়ালালামপুর বিমানবন্দরে অবতরণের পরপরই বুঝতে পারি এর পরের চার ঘণ্টা আকাশ উড়াল সহজ হবে না। একই এয়ারলাইনস এক দেশ এবং এক পরিষেবা- কিন্তু ভিন্ন যাত্রায় ভিন্ন ফল। কারণ, এবারের গন্তব্য ঢাকা। কেন এমন হয়?
শুরুতেই বলি সিকিউরিটি চেক আর তল্লাশি এখন বিমান যাত্রার বড় প্রতিবন্ধক। এতে প্রচুর সময় ব্যয় হয় এবং এ প্রক্রিয়া কষ্টকর। শরীরের জামা-কাপড় আর হাড়গোড় ছাড়া প্রায় সব খুলে দেখাতে হয়। ভিড়াভিড়ির এই পর্যায়ে কে যে কার ব্যাগ নিচ্ছে বা কার ঘড়ি কার হাতে উঠছে, বোঝা মুশকিল। এই চেকিং সব দেশে সব বিমানবন্দরে হয়। কিন্তু আপনি সিডনি থেকে মালয়েশিয়া যাওয়ার সময় এমন নিরাপত্তাহীন অবস্থায় পড়বেন না। কারণ, তখন যারা যাত্রী বা লাইনে থাকেন তারা নিয়ম মানেন। আমাদের দেশের মানুষজন নিয়ম মানে না? না, এ কথা বলা যাবে না। মানে, কিন্তু সব জায়গায় বা সব মানুষ মানে না। না মানার কারণ তাদের অজ্ঞতা।

তাদের এ বিষয়ে কোনো ধারণা নেই। আর একটা কথা স্বীকার করতেই হবে, আমাদের জাতিগত হুড়াহুড়ি সর্বজনবিদিত। আমরা বিয়েবাড়ি থেকে বাসে ওঠা- সব জায়গায় তাড়াহুড়া করতে ভালোবাসি। এই যে বিমান যাত্রাÑ যে বা যারা নিয়ম না মেনে মালয়েশিয়ার মানুষজনের মনে দেশ ও জাতি সম্পর্কে নেগেটিভ ধারণা দিয়ে চলেছেন, তারা সবাই জানেন বিমানটি তাদের ছেড়ে উড়াল দেবে না। তাদের নির্দিষ্ট আসনটিতে আর কেউ বসতে পারবেন না। তবু মাছের বাজারের মতো হুড়াহুড়ি কেন? আমার ধারণা, যারা শ্রম বিনিয়োগে দেশান্তরী হয়, তাদের এ বিষয়ে ছোটখাটো ট্রেনিং বা প্রশিক্ষণ দেওয়া জরুরি। এক-আধঘণ্টার ছোটখাটো  প্রশিক্ষণ  পেলেই এরা নিয়ম কানুন মেনে চলতে পারবেন।
এ ঝামেলা পার হওয়ার পর আপনি উড়োজাহাজে চড়ে বসলেও টের পাবেন কেবিন ক্রু বা সেবকÑসেবিকারা অন্যান্য ফ্লাইটের মতো আচরণ করছেন না। কেন করেন না? আপনি তাদের দোষারোপ করার আগে নিজেদের কথা ভাবুন। বাংলাদেশের মানুষের হাতে এখন অনেক টাকা। আজকাল প্রায়ই হিল্লি-দিল্লি ঘুরে বেড়ায় মানুষ। এমন কি দেশের ভেতরেও আকাশপথে যাতায়াত বেড়েছে। অভিজ্ঞতা বলছে, চট্টগ্রাম  থেকে ঢাকা যেতে হলে অন্তত কয়েকদিন আগে এয়ার টিকিট  না কাটলে আপনি টিকিট নাও পেতে পারেন। এত যাত্রা, এত উড়ালÑ অথচ এই মানুষগুলো বিমানে উঠলেই আরেক ধরনের অদ্ভুত হয়ে যায়। 
আকাশ পথে সামনে লাগানো ছোট টিভি আর খাবার ছাড়া বিনোদনের কোনো পথ খোলা থাকে না। মূলত এই ভ্রমণ সবচেয়ে একঘেয়ে আর অনিরাপদ ভ্রমণ। তাই তারা একটু পরপর খাবার সাধে। এখন আপনাকে বিয়ার দেওয়া হয় বলে আপনি কি একটা শেষ না হতেই আরেকটা চাইবেন? আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, দুইশ’ আড়াইশ’ যাত্রীর জন্য মাত্র কয়েকজন মানুষ নিয়োজিত থাকেন সেবা দানে। তাদের সময় দিতে হয়। ওই সময়টাই আমাদের নেই।
বাংলাদেশের ভাবমূর্তির বিষয়টা ভাবায়। ভীষণভাবে ভাবায়। কারণ, যে জাতি সাউথ ইস্ট এশিয়ায় তরতর করে এগিয়ে চলেছে, যার গায়ে উন্নয়নের হাওয়া, যার রাস্তা-ঘাট অবকাঠামো পুরো বদলে গেছে, তার ব্যবহার কেন এমন হবে? আমাদের দেশের নেতা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনিও তাঁর পরিবার ঝাঁ চকচকে আধুনিক। পুত্র সজীব ওয়াজেদ জয়, কন্যা পুতুল দারুণভাবে কথা বলেন। তাদের আধুনিকতা দেখলেই বোঝা যায়। সে দেশের মানুষ হিসেবে আমরাও কি আধুনিক হতে পারি না? যে কথা বলছিলাম, আমাদের মেধাবী শ্রমশক্তি অন্যান্য দেশে ভালো কাজ করে বলেই জায়গা পায় এবং যেতে পারে।

যে জায়গাটায় ঘাটতি তা হচ্ছে- এসব শ্রমশক্তিকে একটু আধুনিক করে তোলা। যারা সেদিন আমাদের সঙ্গে ঢাকা গিয়েছিলেন, তাদের আচার-আচরণ বা পোশাক ইত্যাদি বলে দিয়েছে যে, তারা সচ্ছল। তাদের ঘাটতির জায়গাটা ম্যানার বা ব্যবহার। একটি জাতির এ জন্য আইডল দরকার। নেতা বা সমাজপতি নামে পরিচিতদের দরকার নিজেদের সংযত করা। তাদের মানুষ ফলো করে। তাদের আচরণ ও ব্যবহার বা কায়দাকানুন যতটা চমৎকার হবে, ততটাই প্রভাব ফেলবে সাধারণ মানুষের জীবনে। তাহলেই আমরা সভ্য এবং নাগরিক হয়ে উঠতে পারব।
বাংলাদেশের পাসপোর্ট বা পরিচয়পত্র এখন আগের জায়গায় নেই। সবুজ পাসপোর্ট দেখলেই ভ্রু কুঁচকানোর দিন শেষ। তার জায়গায় ধীরে ধীরে সমীহ আর ভালোলাগা তৈরি হচ্ছে। এই জায়গাটা শক্তপোক্ত করতে হলে আমাদের শ্রমশক্তি আর সাধারণ মানুষকে প্রাণবন্ত আধুনিক করে তুলতে হবে। দেশে সংস্থা বা যোগ্য মানুষের অভাব নেই। অভাব নেই ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের। এখন চাইলেই এ কাজ শুরু করা যায়। বলছিলাম, দেশ ও দেশের মানুষের ভালোমন্দের কথা। তাদের ভালোমন্দের অন্যতম সূতিকাগার রেমিটেন্স। তার জোগানদাতাদের দেশে-বিদেশে ভালো রাখা আর তাদের প্রতি শ্রদ্ধা থাকলেই সমস্যার সমাধান সহজ হয়ে উঠবে। 

[email protected]

×