ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

উৎসবে অবকাশে বৃক্ষরোপণ

ড. এম মেসবাহ উদ্দিন সরকার

প্রকাশিত: ২০:১০, ২১ জুন ২০২৪

উৎসবে অবকাশে বৃক্ষরোপণ

.

ঈদের লম্বা বন্ধে অনেকেই শহর থেকে গ্রামে আছেন ঈদ উদ্যাপন করতে। নাড়ির টানে পরিবার-পরিজনের সঙ্গে ঈদ উদ্যাপন করার এই রেওয়াজ বাংলাদেশের এক ঐতিহ্য। আনন্দের এই ভাগাভাগি ছড়িয়ে পড়ে নিজ পরিবার-পরিজনের বাইরে প্রতিবেশী বাল্যবন্ধুদের মাঝেও। কোরবানির মাংস ভাগাভাগি শেষে বিভিন্ন গ্রামীণ খেলাধুলণ্ড যেমনÑ হা-ডু-ডু, ফুটবল, ক্রিকেট, নৌকাবাইচ, মোরগ ষাঁড়ের লড়াই ইত্যাদি চলে পাড়ায়-মহল্লায়। এসব খেলাকে কেন্দ্র করে গ্রামের ছোট-বড় সবাই একত্রিত হয়, আবার অনেক সময় খেলাকে কেন্দ্র হাতাহাতি, সংঘর্ষও হয়। ফলে আনন্দের পরিবর্তে বিষাদ নেমে আসে, হয় মামলা-মোকদ্দমাও।

যদিও সভ্যতার বিকাশের ফলে এগুলোর অনেক হারিয়ে গেছে আমাদের ইতিহাস থেকে। অবশ্য চ্যানেল আইয়ে শাইখ সিরাজের আয়োজনে এই ধরনের কিছু খেলাধুলাকৃষকের ঈদ উদ্যাপনঅনুষ্ঠান দেখানো হয়। যা হোক, অনেকেই এই ছুটির সঙ্গে আরও কিছুদিন ছুটি বাড়িয়ে গ্রামে যায় জমিজমা, ঘর-দুয়ার ঠিক করার জন্য। এখানেও সীমানা নিয়ে হয় ধাক্কাধাক্কি, মারামারি। আপন ভাই-বোনদের মধ্যে হয় রেষারেষি, হাসাহাসি করে প্রতিবেশী। গ্রামবাসীরা শহর থেকে যাওয়া আপনজনকে কেন্দ্র করে ছেলে-মেয়েদের বিয়ের আয়োজন করে থাকেন। ধুমধাম করে বিয়ে হয়, চলে বর-যাত্রীর আসা-যাওয়া। যদিও থাকে না গ্রামের মহিলাদের সমবেতকণ্ঠে হলুদ বাটা, মেহেদি বাটার সেই গান, পালকিওয়ালার ঝুমঝুম কোরাস, ঐতিহ্যবাহী পিঠা-পায়েস। তবুও এই আয়োজন ঈদের আনন্দকে আরও বাড়িয়ে তোলে কোনো সন্দেহ নেই। বর্ষার বৃষ্টির তালে তালে পরিবারের সকলকে নিয়ে একসঙ্গে বসে গরুর মাংস খিচুড়ি খাওয়ার স্বাদ যেন এক অমৃত।

গ্রামে এখনো কোরবানির মাংসের একাংশ (তিন ভাগের এক ভাগ) একত্র করে গ্রামবাসীর (যারা কোরবানি দেয়নি) মধ্যে সমহারে বণ্টনের রেওয়াজ আছে। বিকেলের পর বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মাংস আসতে শুরু করে একটি নির্দিষ্ট স্থানে। বিশাল মাংসের স্তূপে বসে গ্রামবাসীরা নামের তালিকা অনুযায়ী ভাগ করতে থাকে। সে এক অপরূপ দৃশ্য, যেন ঈদের আনন্দকে সবার মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। যদিও শহরে এই চর্চাটি একটু অন্যরকম। বিভিন্ন এলাকা থেকে গরিব মুসলিমরা ব্যাগ নিয়ে দুয়ারে দুয়ারে এসে ওই মাংস সংগ্রহ করে।  দেখা যায় একই ঘরের বাবা-মা, ছেলে-মেয়ে ব্যাগ নিয়ে দৌড়াদৌড়ি করছে, কার আগে কে কত মাংস সংগ্রহ করবে। ফলে মাংসের এই বণ্টন সঠিকভাবে হচ্ছে না শহরে। যারা বেশি দৌড়াতে পারে তারা বেশি সংগ্রহ করতে পারে। অসুস্থ কিংবা অক্ষম গরিব ব্যক্তিটি কোনো মাংসই সংগ্রহ করতে পারে না। অনেকে আছে কোরবানি দেওয়ার সামর্থ্য রাখে না, আবার এভাবে মাংস সংগ্রহ করতেও সংকোচ বোধ করে।

আত্মীয়-স্বজন থেকে মাংস পেলে তারা খায়, অন্যথায় মুখ বন্ধ। তবে বিকেল তিন-চারটার পর সংগ্রহকৃত মাংস রাস্তার মাথায় বিক্রি করতেও দেখা যায়। ফ্রেশ মাংস, মূল্যও একটু কম, তাই অনেকে ডানে-বামে না তাকিয়ে কিনে নিয়ে যান। শহরের কোরবানি ঈদে গত কয়েক বছর যাবৎ একটি নতুন সংস্কৃতিতে পরিণত হয়েছে। বৃত্তশালী শহরবাসীরা অনেকেই অনলাইনে গরু কেনার সংস্কৃতিতে ধাবিত হচ্ছে। গরু কাটাকাটিতেও নিয়োগ করা হয় পেশাদার কসাই, যা গ্রামের সংস্কৃতির পুরো বিপরীত।

সময়টাতে শহরে চোরের উপদ্রব বেড়ে যায়। এজন্য গ্রামে যাওয়ার সময় ঘরের দরজা-জানালা সঠিকভাবে  তালাবদ্ধ করে যাওয়া উচিত। অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাড়ির দারোয়ান বুয়ার যোগসাজশে মালিকের অনুপস্থিতিতে বড় ধরনের চুরি-ডাকাতি হয়ে থাকে। এক্ষেত্রে বাড়িতে সিসি ক্যামেরার সংযোগ থাকলে দূর থেকেও সবকিছু অবলোকন করা যায়। এছাড়াও গ্রামে যাওয়ার সময় গ্যাসের চুলা, পানির ট্যাব, টিভি, এসির কানেকশন সঠিকভাবে বন্ধ না করে গেলে বড় ধরনের দুর্ঘটনা হতে পারে। বারান্দায় রাখা ফুলের টব, এসির পানির কানেকশন লাইন এবং পানি জমে থাকতে পারে এমন পাত্রগুলো পরিষ্কার করে উপুড় করে রেখে গেলে এডিস মশার উপদ্রব থেকে রক্ষা পাওয়া যাবে। সমগ্র বাংলাদেশে রাসেল ভাইপারের উপদ্রব দেখা দিয়েছে।  তাই ঈদে বাড়িতে এসে নিজ বাড়ির ঝোপঝাড়, গাছের ডালাপালা পরিষ্কার করতে সাবধানতা জরুরি। প্রতিবছরই ঈদে বাড়ি যাওয়ার সময় সড়ক লঞ্চ দুর্ঘটনা একটি নিয়মিত ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। আসলে সময়ের চেয়ে জীবনের মূল্য অনেক বেশি। তাই প্রতিকূল আবহাওয়ায় এবং অতিরিক্ত বোঝাই লঞ্চে আরোহণ না করাই ভালো। বেশি লাভের আশায় সড়কপথে অতিরিক্ত গতিতে গাড়ি চলছে কি না তা নিয়ন্ত্রণ করবে হাইওয়ে পুলিশ। যাত্রীগণ অবশ্যই লক্কড়-ঝক্কড় গাড়ি পরিহার করবেন, ড্রাইভারের সঙ্গেও ভালো আচরণ করবেন।

উন্নয়নের ধারাবাহিকতায় গ্রামগুলোও এখন শহরে পরিণত হতে যাচ্ছে। তাই সর্বত্র গাছ কাটার হিড়িক দেখা যায়। প্রচন্ড তাপমাত্রা কার্বন নিঃসরণের জন্য সবচেয়ে উত্তম মাধ্যম হচ্ছে গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি করা। কিন্তু শহরে গাছ লাগানোর পরিবর্তে গাছ কাটার প্রতিযোগিতা চলে আবাসনের জন্য। 

ফলে তাপমাত্রা এক অসহনীয় পর্যায়ে চলে গেছে, যা মানুষের জীবনযাত্রাকে মারাত্মক ব্যাহত করছে। শহরের গ্লাস করা এসি রুমে বসে তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণের জন্য যতই সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করা হোক না কেন, তাতে তাপমাত্রা মোটেও কমবে না। একমাত্র উপায় হচ্ছে গাছকে রক্ষা করা, আরও বেশি করে গাছ লাগানো এবং এটিকে দেশব্যাপী একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত করা। কয়েক বছর আগে  প্রাকৃতিক নৈসর্গের দেশ সুইজারল্যান্ডের একটি সংস্থা জানিয়েছিল যে, অন্তত লাখ কোটি বৃক্ষরোপণ করতে পারলে পৃথিবী আবার ১০০ বছরের আগেকার পরিবেশ ফিরে পাবে। অবশ্য শতবর্ষ পূর্বেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছিলেন- ‘দাও ফিরে সে অরণ্য লও নগর।গ্রামের মানুষ আগে গাছের ছায়ায় বসে পল্লীগীতি, ভাটিয়ালি ইত্যাদি গান শোনাতেন। ক্লান্ত পথিক গাছের ছায়ায় ঘুমিয়ে পড়তেন। তাই হয়তো পল্লীকবি জসীমউদ্দীন লিখেছিলেনতুমি যাবে ভাইÑযাবে মোর সঙ্গে, আমাদের ছোট গাঁয়, গাছের ছায়ায় লতায় পাতায় উদাসী বনের বায়।রবিঠাকুরও লিখেছিলেনকী শোভা, কী ছায়া গো, কী স্নে, কী মায়া গো- কী আঁচল বিছায়েছ বটের মূলে, নদীর কূলে কূলে।’  ষড়ঋতুর বাংলাদেশে অনেক কবি, সাহিত্যিক বাংলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য নিয়ে অনেক গল্প, কবিতা লিখে গেছেন, যা আজ বাস্তবে কিছুই নেই। একমাত্র গ্রীষ্মকাল ছাড়া কোনো ঋতুরই অস্তিত্ব আছে বলে মনে হয় না। মানুষের দ্বারা বৃক্ষ নিধনই এর প্রধান কারণ।

নদীর তীরের সেই বটবৃক্ষের স্থানে গড়ে উঠেছে শত শত অবৈধ ইটভাঁটি এবং শিল্প-কারখানা, যা প্রতিনিয়ত প্রাকৃতিক পরিবেশকে দূষিত করে চলেছে। আর এর নেতিবাচ প্রভাব পড়ছে মানুষ জীবজন্তুর জীবনে। একটি স্বাভাবিক পরিবেশের জন্য প্রতিটি এলাকায় ২৫ শতাংশ বনভূমি থাকা দরকার। অথচ বাংলাদেশে তা আছে মাত্র শতাংশের কাছাকাছি। অর্থাৎ ১৭ শতাংশই ইতোমধ্যে ধ্বংস হয়ে গেছে। তাহলে বুঝতে আর বাকি  থাকে না যে, বর্তমান প্রজন্ম কত মারাত্মক  স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে বসবাস করছে। এই অবস্থান থেকে ঘুরে দাঁড়াতে আমাদেরই কাজ করতে হবে। তাই উৎসবে অবকাশে প্রত্যেকে অন্তত একটি করে গাছ লাগাই বাড়ির আঙ্গিনায়, রাস্তার পাশে কিংবা পরিত্যক্ত কোনো স্থানে।

উপকূলীয় অঞ্চলের লোকজনকে এই কাজটি আরও বেশি করে করা দরকার, যা শুধু তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণই নয়, ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা বুলবুলের মতো ক্ষয়ক্ষতি থেকেও রক্ষা করতে সহায়তা করবে। আগামী কয়েক বছর এই চর্চাটি অব্যাহত রাখলে বাংলাদেশ এক সময় সুইজারল্যান্ডের চেয়েও প্রাকৃতিক ভূ-স্বর্গে পরিণত হবে। বাংলাদেশ ফিরে পাবে তার প্রাণ, পরিণত হবে স্বচ্ছ, সবুজ শ্যামল বাংলায়। ঈদে বিদ্যমান সকল সংস্কৃতি সতর্কতার সঙ্গে নতুন করে সংযুক্ত হোক বৃক্ষরোপণের অভ্যাস।

লেখক : অধ্যাপক, তথ্যপ্রযুক্তিবিদ, আইআইটি, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়

×