ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

নোবেলের দেশ থেকে

সমরনায়ক বুদ্ধিজীবী আবদুর রশিদ

দেলওয়ার হোসেন

প্রকাশিত: ২০:৫১, ২০ জুন ২০২৪

সমরনায়ক বুদ্ধিজীবী আবদুর রশিদ

আবদুর রশিদ

সমাজে কিছু মানুষের জন্ম হয় যারা নিজের অনন্য গুণ,  বৈশিষ্ট্য এবং কীর্তির কারণে পরিণত হন আইকনে। এর জন্য সমাজে অর্জন করেন ভক্তি ও শ্রদ্ধার আসন। এটিই তার জীবনের সবচেয়ে বড় পুরস্কার। জীবদ্দশায় একজন সম্মানিত ব্যক্তির কাছে এর চেয়ে আর বেশি কিছু চাওয়া এবং পাওয়ার থাকে না। তারা হন মানুষের ভালোবাসায় ধন্য, বরণীয় এবং স্মরণীয়। তাদের আদর্শ হয় অনুকরণীয়। তারা হন অনুপ্রেরণার উৎস এবং মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত। তাদের জীবনাচার, চিন্তা এবং দর্শন সমাজকে করে প্রভাবিত। মানুষ হয়ে ওঠেন তার অনুগামী এবং প্রলুব্ধ। লুব্ধক এই মানুষগুলোই সমাজ জীবনে আশা-ভরসা এবং পথ প্রদর্শকের প্রতীক।
এমন একজন মানুষ ছিলেন সেনাবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আবদুর রশিদ। সামরিক ও নিরাপত্তা বিষয়ক জ্ঞানের দূরদর্শী বিশ্লেষক- এক কথায় আলোকিত প্রাজ্ঞজন। তার আরেকটি বড় পরিচয়- তিনি ছিলেন একজন মহান দেশপ্রেমিক সন্তান ও বীর মুক্তিযোদ্ধা। সূক্ষ্ম জীবনবোধ সম্পন্ন, অত্যন্ত মার্জিত ও মানবিক এই মানুষটির পরিশীলিত চিন্তা, যুক্তি, প্রকাশ, বিনয়, পরমতসহিষ্ণুতা ও অসাধারণ সহনশীলতা ছিল একটি দুর্লভ গুণ।

পরিমিত ভাষা, সাবলীল কথন ও ব্যাখ্যায় তার সরল ব্যক্তিত্বের দ্যুতি এতটাই প্রোজ্জ্বল হয়ে উঠত যে, টিভি টক শোর দর্শক-শ্রোতা বিমুগ্ধ চিত্তে নিমিষেই তার ভক্ত ও অনুরাগী হয়ে উঠতেন। সুদর্শন না হলেও আকর্ষণ ছিল তার মৃদুভাষী ব্যক্তিত্ব এবং মনোযোগ কাড়া কথনে। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যই ছিল তার অলংকার। সেই অলংকারের গুণে তিনি অর্জন করেছেন বিশিষ্ট বুদ্ধিজীবীর আসন। টক শো বা বিশেষ বিষয়ে বিদগ্ধজনের আলোচনায় তার উপস্থিতি সব সময় হয়ে উঠতো অপরিহার্য।

তার অবস্থান ও প্রয়োজন অনিবার্য হয়েছে নিজের অনন্য মেধা ও গুণের কারণে। চুম্বকের মতো মানুষ ও দর্শক-শ্রোতাকে কাছে টেনেছেন নিজের মায়াজাল সৃষ্টির অসাধারণ ক্ষমতা ও শক্তি দিয়ে। মন ছুঁয়ে গেছে তার শাণিত যুক্তি ও জ্ঞানের ভা-ার উপস্থাপনে।
সামরিক ব্যক্তির ক্ষেত্রে বুদ্ধিজীবী পরিচয় যুক্ত হওয়ার প্রচলন আমাদের সমাজে তেমন প্রচলিত ছিল না এবং এখনো তেমন নেই। কিন্তু এই প্রথা ভেঙে হাতে গোনা যে কজন সামরিক ব্যক্তিত্ব বেসামরিক বা সিভিল সমাজে, মিডিয়ায় নিজের পরিচয়কে এভাবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তার মধ্যে নিজের অবস্থানকে নক্ষত্রের পর্যায়ে নিয়ে গেছেন জেনারেল আবদুর রশিদ। বলা যায়, তিনিই এই যাত্রার সার্থক শিরোমণি। একজন স্টার। ইনটেলেকচুয়াল স্টার।
প্রসঙ্গে একটি কথা এসে যায়। আমার শিশু- কিশোরকাল কেটেছে সেনানিবাস এলাকায়। এলাকার প্রধান সড়ক কিংবা মাঠে সকাল-বিকাল সুশৃঙ্খল সেনা সদস্যদের সারিবদ্ধ পিটি-প্যারেড দেখেছি নিয়মিত। লোকসমাজে সৈনিকদের সম্পর্কে তেমন উচ্চবাচ্য বা অনুপ্রেরণাদায়ক ইতিবাচক কথা শোনা যেত না পাকিস্তান আমলে। খুব বেশি করে শুনতাম– হুকুমের তাঁবেদার সৈনিকদের তেমন লেখাপড়া, বিদ্যা-বুদ্ধি কিংবা উচ্চাভিলাষ থাকে না বা থাকতে নেই। পিটি-প্যারেড ও লেফট-রাইট করার জন্য সক্ষম-সুঠাম দেহই যথেষ্ট।

পেশী ও হাঁটু মজবুত হলেই চলে। অস্ত্র চালনা ও পিটি-প্যারেডের সক্ষমতাই বড় যোগ্যতা। বাহিনীর নিজস্ব ক্ষেত্র এবং কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বেসামরিক অঙ্গনের মতো বিশাল সীমানায় বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চার কাজ, দায়িত্ব পালন ও তার সাধনা-গবেষণার মতো পরিবেশ এবং প্রয়োজনই বা কোথায়- এমনটি ভাবা হতো। তাই সিভিল সমাজের সকল বুদ্ধিবৃত্তিক কাজের স্রোতধারায় সৈনিকের স্থান তেমন নেই। এমন মনোভাব, আচার ও দৃষ্টিভঙ্গির বিদ্যমান ধারায়  সৈনিক জীবন ও পেশার মানুষ প্রায় অনুপস্থিত।
কিন্তু বাস্তব অবস্থা এই তথাকথিত মনোভাবের সঙ্গে মোটেও সঙ্গতিপূর্ণ নয়। বাস্তব ও আধুনিক চিন্তাধারায় আজ এই পেশার কমিশন সার্ভিস- স্মার্টনেস এবং মেধাশক্তির বিচারে সুপিরিওর সার্ভিসের মতো মর্যাদা ও কৌলিন্য লাভ করেছে। স্বদেশ এবং আন্তর্জাতিক পরিম-লে বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাদের সেবা, অংশগ্রহণ এবং অনন্য ভূমিকা পালনে তারা অপরিহার্য অংশ হিসেবে কাজ করছেন বিশেষ দায়িত্ব ও গুরুত্বের সঙ্গে। সেনাজীবন ও পেশা ছিল সাধারণ জনমানুষের জীবনে সহাবস্থান থেকে দূরে, আলাদা এবং গ-িবদ্ধ। কঠোর বিধি-নিষেধের বেড়াজালে আবদ্ধ।

কিন্তু আজ বিশ্বায়নের যুগে পরিস্থিতি পাল্টেছে। বেসামরিক জীবন ও পেশার মূলধারার ভেতর তাদের অংশগ্রহণ প্রায় নৈমিত্তিক পর্যায়ে এসে গেছে। নিকট অতীতের বাস্তবতা থেকে বেরিয়ে এসে বর্তমানের পরিবর্তিত দৃষ্টিভঙ্গি পরিণত হয়েছে জনবান্ধবে। সৈনিক পেশার মানুষজনের বিচরণ, অংশগ্রহণ বেসামরিক সমাজ জীবনে গ্রাহ্য ও বিস্তৃত হয়েছে গঠনমূলক ভূমিকায়। মিলিটারি এবং সিভিলিয়ান শ্রেণিভেদের ভেদ বুদ্ধি ও মানসিক দূরত্ব বহুলাংশে কমেছে।

এই বাস্তবতায় জেনারেল আবদুর রশিদের মতো সমর পেশার গুণীজনেরা বেসামরিক শ্রেণির কাতারে তারকা ব্যক্তিত্বের অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন নিজস্ব কীর্তির গুণে। নিজেই তার গুণমুগ্ধ হয়ে তাকে অনুসরণ করেছি ফিলোসফার গাইডের মতো। মাত্র একটি ঘটনাই আমাকে চুম্বকের মতো আচমকা তার কাছে টেনে নিয়ে গেছে। তার আকর্ষণীয় বুদ্ধিবৃত্তিক চিন্তা ও দুর্লভ সহনশীল গুণের কারণে। আক্রমণাত্মক উগ্র মিলিটারি মেজাজ বলে কথিত এই পেশাজীবীদের ভেতর এমন দুর্লভ গুণ থাকতে পারে, তা সাধারণ চিন্তায় বিশ্বাসযোগ্যতার মধ্যে পড়ে না।

কিন্তু জেনারেল রশিদের বিনয়, সহিষ্ণুতা, সংযম ও মেধাশক্তি প্রচলিত সেই মনোভাবের বিষয়টিকে অসাড় প্রমাণিত করেছে। মিডিয়ায় সিভিল অনুষ্ঠানে জেনারেল আবদুর রশিদের ধূমকেতুর মতো আবির্ভাব এক নতুন বার্তা নিয়ে হাজির হয়েছে।
সমাজে অধ্যাপক শ্রেণি পেশার ব্যক্তি এবং সেই ব্যক্তি যদি বিশেষ করে কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়ে থাকেন, তাহলে নমস্য ও পূজনীয় হিসেবে বিবেচিত হন সাধারণ মানুষের কাছে। কোনো বিতর্ক বা আলোচনায় তার পাশে দাঁড়াবার মতো অন্য শ্রেণি পেশার কেউ তেমন গ্রহণযোগ্য বলে সহজে বিবেচিত হন না-এমনটা খুব অস্বাভাবিক নয়। জ্ঞান এবং প্রাজ্ঞতার বিবেচনায় সিভিলিয়ান ব্যক্তিকেই বুদ্ধিজীবী বা অপেক্ষাকৃত সুপিরিয়র ভাবা হয়। অধ্যাপক মানেই বিশেষ মেধা ও অগাধ জ্ঞানসম্পন্ন প-িত ব্যক্তি, এমন ধারণা বেশ প্রতিষ্ঠিত। এই বিশেষ ধারণার কারণে তার মর্যাদা এবং গুরুত্ব স্বাভাবিক ভাবেই থাকে শীর্ষস্থানে।
বছর কয়েক আগে একদিন টিভি চ্যানেলে টক শো দেখছিলাম। আলোচনায় অংশ নেওয়া সিভিল সমাজের কয়েকজনের মধ্যে ছিলেন জেনারেল আবদুর রশিদ এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক, বিশ্লেষক শাহিদুজ্জামান। তার অনেক টক শোই দেখেছি। জ্ঞানগর্ভ আলোচনাও শুনেছি। ঐদিন টক শোতে তার আলোচনার পর যখন আবদুর রশিদের আলোচনার পালা শুরু, তখন আমি ভাবছিলাম খুব বেশি সুবিধা হয়তো তিনি করতে পারবেন না।

জেনারেল রশিদ সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সাবলীল ভঙ্গিতে বিনয়ের সঙ্গে মৃদু ভাষায় অধ্যাপক শাহিদুজ্জামানের যুক্তি খ-ন করতে গিয়ে পড়লেন ভীতিকর এক তোপের মুখে। আগে থেকেই ক্ষিপ্ত ও অসংযত শাহিদুজ্জামান অশালীন ভাষায় শুধু আক্রমণ নয়, প্রায় শারীরিকভাবেও আক্রমণ করে বসেন আবদুর রশিদকে। এই দৃশ্য দেখে স্তম্ভিত হয়ে যাই। ভেবেছিলাম, মিলিটারি পেশা, স্বভাব ও মেজাজের মানুষ আবদুর রশিদের জবাব দেবেন পাল্টা আচরণের মাধ্যমে। এই আচরণ নিমিষে আমাকেও ভীষণ উত্তেজিত করে তুলেছিল। অকল্পনীয় ছিল একজন মর্যাদাসম্পন্ন অধ্যাপকের এই আচরণ। নিজের ক্ষোভ ও উত্তেজনা সংবরণ করতে পারছিলাম না কিছুতেই এই দৃশ্য দেখে।
বিস্ময়ের সঙ্গে লক্ষ্য করলাম, জেনারেল রশিদ বিন্দুমাত্র আবেগতাড়িত ও উত্তেজিত না হয়ে অসহায় ও পর্যুদস্ত নিরীহ মানুষের মতো বিনয়ের সঙ্গে অধ্যাপক শাহিদুজ্জামানকে শান্ত হতে বলছিলেন। তবু শাহিদুজ্জামান ক্ষান্ত হননি। তাকে সংযত ও অনুতপ্ত হতেও দেখা গেল না। যারপরনাই বিস্মিত হলাম একজন মিলিটারিম্যানের বিস্ময়কর সংযম, সহিষ্ণুতা, বিনয়, ভদ্রতা, বিরল মনুষ্যত্ব- আত্মমর্যাদা বোধ ও নির্বিবাদী চরিত্র দেখে। দেখলাম, তার শান্ত স্বভাব ও বিনয়ের স্বরূপ দেখে। দেখেছি সুশিক্ষা ও জ্ঞানের মার্জিত বহির্প্রকাশ।
এই ঘটনায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন ছাত্র হিসেবেই শুধু নয়, একজন সাধারণ মানুষ হিসেবেও যে তীব্র ক্ষোভ, অপমান, গ্লানি বোধ করেছি, তা কোনোদিনই মুছে ফেলা যাবে না জীবন ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলংকের ইতিহাস থেকে। যারা টিভি পর্দায় এই ঘটনাটি দেখেছেন, তারা কেউ নিশ্চয়ই ভোলেননি এই নিন্দনীয় স্মৃতি। ভীষণ ব্যথিত হয়েছি। মর্মাহত হয়েছি। জেনারেল রশিদের অপমানে চরম আত্মগ্লানিতে ভুগেছি। তার বিরল গুণ, বিনয়ী আচরণ দেখে মুগ্ধ হয়েছি।

পরদিনই ফোনে যোগাযোগ করে তার প্রতি আমার মর্মবেদনা ও  অগাধ শ্রদ্ধা-ভালোবাসার কথা জানিয়েছি। ফেসবুকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠিয়েছি। বেশ কয়েকবার টেলিফোনে কথাও বলেছি। তিনি কতটা নিজ পরিবার ও স্বজনবান্ধব ছিলেন তার নমুনা ফেসবুকে নিয়মিত শেয়ার করতে দেখেছি। যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী তার সন্তান ও নাতিরা কতটা প্রিয় ছিল, তাদেরকে নিয়ে তিনি নীলিমায় নীল জ্যোৎস্নার মতো কতটা সুখী এবং আনন্দে ভরপুর ছিলেন, তা খুব গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধি করতাম।

আর ভাবতাম, আহা- তার মতো এমন একটা মানুষ হওয়ার জীবন যদি পেতাম...। যেখানেই থাকুন অপার শান্তি ও ভালোবাসায় থাকুন জাতির বীর মুক্তিযোদ্ধা জেনারেল আবদুর রশিদ। জাতির মাঝে আপনি অমর থাকুন একটি সুবাসিত ফুলের গাছের মতো।

স্টকহোম, ১৭ জুন, ২০২৪
(লেখক সুইডেন প্রবাসী সাংবাদিক)

[email protected]

×