ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

প্রসঙ্গ ইসলাম

বিদায় হজের ভাষণে মানবতার মুক্তি ও নারী পুরুষের অধিকার

মনিরুল ইসলাম রফিক

প্রকাশিত: ২০:৩৪, ২০ জুন ২০২৪

বিদায় হজের ভাষণে মানবতার মুক্তি ও নারী পুরুষের অধিকার

প্রসঙ্গ ইসলাম

দশম হিজরির অধিকাংশ সময় হজরত মুহাম্মদ (সা.) বিভিন্ন স্থানে ধর্ম প্রচারক পাঠাতে এবং বিভিন্ন গোত্রের প্রতিনিধিগণকে গ্রহণ করতে ব্যস্ত ছিলেন, অনুগত দেশ ও গোত্রদের কাছ থেকে কর আদায় করারও তিনি ব্যবস্থা করলেন। তখন তাঁর পারিবারিক জীবনে একটি দুর্ঘটনা ঘটল। হজরতের একমাত্র পুত্র ইবরাহীম প্রাণত্যাগ করলেন। তার বয়স মাত্র ১৭ কি ১৮ মাস হয়েছিল। একমাত্র পুত্রের তিরোধানে হজরত অন্তরে দারুণ আঘাত  পেলেন।

মৃত পুত্রের শয্যাপাশে বসে নীরবে তিনি অশ্রুবিসর্জন করেন। ইব্রাহীমের মৃত্যুর দিন সূর্যগ্রহণ লেগেছিল। জনসাধারণ এতে মনে করল, হজরতের পুত্রবিয়োগে প্রকৃতি এই বিমর্ষ ভাব ধারণ করেছে। হজরত যখন একথা জানতে পারলেন, তখনই এর প্রতিবাদ করা সঙ্গত মনে করলেন। লোকজনকে ডেকে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করলেন: ‘তোমাদের এ ধারণা ভুল। আমার পুত্র বিয়োগের সঙ্গে সূর্যগ্রহণের কোনো সম্বন্ধ নেই। আমার পুত্র মারা না গেলেও ঠিক ঐ সময়ে সূর্যগ্রহণ লাগত।

আল্লাহর অসংখ্য নিদর্শনের মধ্যে সূর্যগ্রহণ অন্যতম। সূর্যগ্রহণের সময় তোমরা তার অসীম কুদরতের কথা চিন্তা করে মোনাজাত করবে।’ মহামানবের কী গভীর সত্যপ্রীতি। অন্য কোনো ভ- তপস্বী হলে নিজের বুজুর্গি জাহির করার এই সুবর্ণ সুযোগ নিশ্চয়ই সে এমন করে নষ্ট করত না।
দেখতে দেখতে দশম হিজরিও শেষ হয়ে আসল। আবার হজের সময় ঘনিয়ে আসে। হজরত এবার হজ করতে যাবেন বলে নিয়ত করলেন। জিলকদ মাসের শেষেই তাঁর এই অভিপ্রায়ের কথা প্রকাশ্যে ঘোষণা করে দেওয়া হলো। সঙ্গে সঙ্গে  তুমুল উৎসাহ উদ্দীপনার সৃষ্টি হলো, দলে দলে মুসলমানেরা হজরতের সঙ্গে হজ করার মানসে মক্কায় যাওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে লাগলেন।  মহানবী হজরত (স.) এবার তাঁর স্ত্রীদেরও সঙ্গে নিয়ে চললেন। এই হজই হজরতের জীবনের শেষ হজ। যা ইতিহাসে ‘বিদায় হজ’ নামে পরিচিত।
জিলকদ মাসের পঁচিশ তারিখে হজরত রাসুলে কারীম (স.) সাহাবীদের নিয়ে হজযাত্রা করলেন। অসংখ্য নর-নারীর সে কী বিপুল সমারোহ। একত্ব ও সাম্যের সে কী মোহনীয় চিত্র! আজ ধনী-দরিদ্রে, বাদশা-গোলামে কোনো প্রভেদ নেই। সকলেই আজ সমান, সকলেরই আজ একই পোশাক, একই পরিচ্ছদ; সকলের মুখে আজ একই বাণী-একই ভাষা, একই স্বপ্ন, একই আশা, একই ধ্যান, একই ধারণা, একই লক্ষ্য, একই বাসনা।

মানুষ মাত্রই যে এক আদমের সন্তান- বৈচিত্র্যের  মধ্য দিয়েও এ সত্য আজ যেন মূর্ত হয়ে দেখা দিল। পথ হতেও অসংখ্য মুসলমান এই মহাহজে যোগদান করলেন। প্রায় দুই লাখ মুসলমান সঙ্গে নিয়ে হজরত জিলহজ মাসের পাঁচ তারিখে মক্কা শরীফে উপনীত হলেন।
মক্কার প্রবেশ দ্বারে পৌঁছে হজরত কাবাগৃহকে দেখতে পেলেন। তৎক্ষণাৎ ভক্তিগদগদকণ্ঠে দুই হাত তুলে মোনাজাত করলেন :  ‘ইয়া আল্লাহ, এই গৃহকে চিরকল্যাণ ও চিরমহিমায় ম-িত কর এবং যারাই এখানে হজ করতে আসবে, তাদের সুখ-শান্তি ও মান-মর্যাদা বৃদ্ধি কর।’
হজরত অতঃপর ভক্তবৃন্দকে নিয়ে কাবাগৃহে উপস্থিত হলেন সাতবার একে তাওয়াফ (প্রদক্ষিণ) করলেন। হজের দিন এলো। লাখ লাখ মুসলমানের ‘লাব্বায়েক’ ধ্বনিতে কাবা প্রাঙ্গণ মুখরিত হয়ে উঠল। কী বেহেশতী দৃশ্য আজ! মূর্তি নেই, পুরোহিত নেই। আছে সে সর্বশক্তিমান আল্লাহ, আর তাঁর রাসূল, আর তাঁর উম্মত। এতদিন আল্লাহ, তাঁর রাসূল এবং তাঁর ধর্ম নির্বাসিত হয়েছিল, আজ সেখানেই উঠছে আল্লাহর গুণগান, সেখানেই দেখছি মুসলমান, সেখানেই উড়ছে মুসলমানের বিজয়-নিশান।
নূরনবী হজরত মুসলমানগণকে নিয়ে আরাফাতের দিকে চললেন। তারপর মীনা উপত্যকায় উপস্থিত হয়ে বিশাল জনতার সম্মুখে দাঁড়িয়ে নি¤œলিখিত খোৎবা (ভাষণ) দান করলেনঃ ১. ‘হে আমার প্রিয় ভক্তবৃন্দ, আজ যে কথা তোমাদেরকে বলব, মনোযোগ দিয়া শ্রবণ করিও। আমার আশঙ্কা হচ্ছে, তোমাদের সঙ্গে একত্রে হজ করার সুযোগ আর আমার ঘটবে না।
 ২. হে মুসলিম জাতি, আঁধার যুগের সমস্ত ধ্যান-ধারণাকে ভুলে যাও, নব আলোকে পথ চলতে শিখ। আজ হতে অতীতের সমস্ত মিথ্যা-সংস্কার, অনাচার ও পাপ-প্রথা বাতিল হয়ে গেল।
 ৩. মনে রেখ ও-সব মুসলমান ভাই ভাই। কেউ কারও চেয়ে ছোট নও, কারও চেয়ে বড় নও। আল্লাহর চোখে সকলেই সমান। ৪. নারীজাতির কথা ভুলিও না। নারীর ওপর পুরুষের যেরূপ অধিকার আছে, পুরুষের ওপর নারীরও সেরূপ অধিকার আছে। তাদের প্রতি অত্যাচার করিও না। মনে রাখিও- আল্লাহকে সাক্ষী  রেখে তোমরা তোমাদের স্ত্রীগণকে গ্রহণ করেছ।
৫. সাবধান! ধর্ম সম্বন্ধে বাড়াবাড়ি কর না। এই বাড়াবাড়ির ফলেই অতীতে বহু জাতি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে।
৬. প্রত্যেক মুসলমানের ধন-প্রাণ পবিত্র বলে জানবে। যেমন পবিত্র আজিকার এই দিন- ঠিক তেমনি পবিত্র তোমাদের পরস্পরের জীবন ও ধন-সম্পদ।
৭. হে মুসলমানগণ, হুঁশিয়ার! নেতৃ-আদেশ কখনো লঙ্গন কর না। যদি কোনো কর্তিত-নাশা কাফ্রী ক্রীতদাসকেও তোমাদের আমির করে দেওয়া হয় এবং সে যদি আল্লাহর কিতাব মতে তোমাদের চালনা করে, তবে অবনত মস্তকে তার আদেশ মেনে চলবে। ৮. দাস-দাসীদের প্রতি সর্বদা সদ্ব্যবহার করিও। তাদের ওপর কোনোরূপ অত্যাচার করিও না। তোমরা যা খাবে, তাদেরকেও তা খাওয়াবে; যা পরবে, তা-ই পরাবে। ভুলে যেও নাÑ তারাও তোমাদের মতো মানুষ।
৯. সাবধান! পৌত্তলিকতার পাপ যেন তোমাদেরকে স্পর্শ না করে। শিরক কর না, চুরি কর না, মিথ্যা কথা বল না, ব্যভিচার কর না। সর্বপ্রকার মলিনতা হতে নিজেকে মুক্ত করে পবিত্রভাবে জীবনযাপন করবে। চিরদিন সত্যাশ্রয়ী হও। ১০. মনে  রেখ- একদিন তোমাদিগকে আল্লাহর নিকটে ফিরে যেতে হবে। সেদিন তোমাদের কৃতকর্মের জন্য জবাবদিহি করতে হবে। ১১. বংশের গৌরব কর না। যে ব্যক্তি নিজ বংশকে হেয় মনে করে অপর কোন বংশের নামে আত্মপরিচয় দেয়, আল্লাহর অভিশাপ তার ওপর  নেমে আসে।
১২. হে আমার উম্মতগণ, আমি যা রেখে যাচ্ছি, তা যদি তোমরা দৃঢ়ভাবে ধারণ করে থাক, তবে কিছুতেই তোমাদের পতন হবে না। সে গচ্ছিত সম্পদ কী? তা আল্লাহর কুরআন এবং তার রাসূলের আদেশ।
 ১৩. নিশ্চয় জানিও, আমার পর আর কেউই নবী নেই। আমিই শেষ নবী। ১৪. যারা উপস্থিত আছ, তারা অনুপস্থিত সকল মুসলমানের নিকট আমার এই সকল বাণী পৌঁছে দিও।’
হজরতের মুখম-ল ক্রমেই জ্যোতিদীপ্ত হয়ে উঠতে লাগল। কণ্ঠস্বর ক্রমেই করুণ ও ভাবগম্ভীর হয়ে আসল। ঊর্ধ্ব আকাশের দিকে মুখ তুলে তিনি আবেগভরে বলতে লাগলেন: হে আল্লাহ,  হে আমার  প্রভু, আমি কি তোমার বাণী পৌঁছিয়ে দিতে পারলাম? আমি কি আমার কর্তব্য সম্পাদন করতে পারলাম?’
লক্ষ কণ্ঠে নিনাদিত হলো : ‘নিশ্চয়! নিশ্চয়!’ তখন হজরত কাতর কণ্ঠে পুনরায় বলতে লাগলেন: ‘হে প্রভু, শ্রবণ করো, সাক্ষী থাকো; ওরা বলছে, আমার কর্তব্য আমি পালন করেছি।’ ভাবের আতিশয্যে হজরত নীরব হয়ে থাকলেন। বেহেশতের জ্যোতিতে তাঁর মুখ-কমল উজ্জ্বল হয়ে উঠল।
এই সময়ে কুরআনের শেষ আয়াত নাযিল হলো : ‘(হে মুহাম্মদ) আজ আমি তোমাদের দ্বীনকে সম্পূর্ণ করলাম এবং  তোমাদের ওপর আমার নিয়ামত পূর্ণ করে দিলাম। ইসলামকেই  তোমাদের ধর্ম বলে মনোনীত করলাম।’-(৫:৩)।
হজরত ক্ষণকাল ধ্যানমৌন হয়ে রইলেন। বিশাল জনতা তখন নীরব। কিছুক্ষণ পরে তিনি নয়ন মেলে করুণ স্নেহমাখা দৃষ্টিতে সে জনসমুদ্রের প্রতি তাকিয়ে বললেন: ‘বিদায়! বন্ধুগণ বিদায়!!’
একটা অজানা বিয়োগ-বেদনা সবারই হৃদয়ে ছায়াপাত করে গেল। (সূত্র বিশ্ব নবী, গোলাম মোস্তফা)।

লেখক :  অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব

[email protected]

×