ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

একটু চিন্তার খোরাক

ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

প্রকাশিত: ২০:৩২, ১৯ জুন ২০২৪

একটু চিন্তার খোরাক

ডা. মামুন আল মাহতাব (স্বপ্নীল)

বাংলাদেশ এন্ডোক্রাইন সোসাইটির সেমিনারে লেকচার শেষে যখন ঢাকা ক্লাব থেকে বিমানবন্দরের দিকে ছুটছি, ঘড়ির কাঁটা তখন তিনটা ছুঁই ছুঁই। সিলেটের পথে হযরত শাহজালালের রানওয়েতে ডানা মেলতে ইউএস বাংলার এটিআর-এর এক ঘণ্টাও বাকি নেই। বিমানবন্দর যখন পৌঁছেছি, তখনো বিমান ছাড়তে ৪০ মিনিটের বেশি বাকি। পথে ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের তেজগাঁও র‌্যাম্পে ওঠার মুখটায় যানজট না থাকলে নিশ্চিত করে বলতে পারি আরও আগেই পৌঁছানো যেত বিমানবন্দরের ডোমেস্টিক টার্মিনালে। কথা ছিল সিলেটে রোগী দেখে পরদিন শুক্রবার দুুপুরে ঢাকায় ফিরব। ফিরতে হলো সেদিন রাতেই।

প্রধানমন্ত্রী পরদিন শেখ ফজিলাতুন নেছা মেমোরিয়াল কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতালে সকাল-সকাল চলে আসবেন নিজ স্বাস্থ্য পরীক্ষার জন্য। আমি ঐ হাসপাতালের খ-কালীন লিভার কনসালট্যান্ট। প্রধানমন্ত্রীর সান্নিধ্যে আসার এতটুকুও সুযোগ হাতছাড়া করতে রাজি নই।
শুক্রবার সকালে প্রধানমন্ত্রী গাজীপুরে পৌঁছাবেন সকাল ন’টায়। মনে দুরু-দুরু শঙ্কা- সময়মতো পৌঁছাতে পারব কিনা।  সেদিন থেকেই ঢাকাবাসীর ঈদযাত্রার শুরু। ভোর-ভোর বাসা থেকে বের হয়ে প্রধানমন্ত্রীর উপস্থিতির ঢের আগেই পৌঁছে গেলাম হাসপাতালে। পথে যানবাহুল্য আছে ঠিকই, তবে যানজট নেই।

আমিনবাজারের পর থেকে হাজারো গাড়ি ধীরে ধীরে এগোচ্ছে ঠিকই, তবে থেমে থাকছে না। প্রধানমন্ত্রীর অনুষ্ঠান শেষে আবার পড়িমরি দে ছুট। চারটের আগেই যে আবারও ইউএস বাংলায় চাপতে হবে। এবারের গন্তব্য শাহ আমানত আর কারণটা ডাক্তার মাহমুদ। চট্টগ্রাম নিবাসী এই বন্ধুবরও লিভার বিশেষজ্ঞ। তার লিভার কেয়ার সোসাইটির উদ্যোগে গ্লোবাল ফ্যাটি লিভার ডে উপলক্ষে একটি সেমিনারের আয়োজন করেছে সেখানে। মাহমুুদের প্রবল আগ্রহ আমি অবশ্যই একটা লেকচার দেই। অগত্যা ঢেঁকি গিলতেই হচ্ছে। রাতে সেমিনারের চমৎকার আয়োজন আর তারচেয়েও সুস্বাদু ডিনার উপভোগ শেষে ভোর-ভোর ঘুম থেকে উঠে আবারও দে ছুট বিমানবন্দরে এবং সেখান থেকে সকাল সকালই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ে। হিসাব করে দেখলাম গত দু’দিনে দেশের তিনটি জেলায় উপস্থিত ছিলাম, কাজ করেছি এবং স্বস্তিতেই কাজ শেষে পরবর্তী গন্তব্যেও গিয়ে হাজির হয়েছি।
ক’দিন আগে বিদেশ গিয়েছিলাম। বিদেশ মানে প্রতিবেশী ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী আগরতলায়। ওখানে দারুণ একজন মানুষ আছেন অধ্যাপক প্রদীপ ভৌমিক। ত্রিপুরার প্রথম লিভার বিশেষজ্ঞ, আমার আত্মার আত্মীয়। প্রদীপ ভৌমিকের সঙ্গে আত্মীয়তাটা এভাবে বলার কারণ, তিনি আদতে আমার আত্মীয় নন। তার পূর্ব পুরুষের আদি নিবাস এদেশের নোয়াখালীতে হলেও, তার প্রয়াত বাবার মতো তার পাসপোর্টটির রং নীল। আমার শিকড় সিলেট শহরে আর পাশাপাশি পাসপোর্টটি সবুজ। তারপরও প্রদীপ ভৌমিক এমনভাবে কাছে টেনে নিয়েছেন আর প্রতিবার দেখা হলে এমনভাবে কাছে টেনে নেন, যা পরমাত্মীয়র কাছ থেকেও সব সময় প্রত্যাশিত নয়।

এহেন প্রদীপ ভৌমিক তার হেপাটাইটিস ফাউন্ডেশন ত্রিপুরার সহকর্মীদের নিয়ে ভূভারতে অসাধ্য সাধন করেছেন। সেদেশে আনুষ্ঠানিকভাবে সরকারি পর্যায়ে হেপাটাইটিস বি’র টিকাদান শুরু হওয়ার অনেক আগেই তিনি ত্রিপুরা রাজ্যের প্রায় চল্লিশ শতাংশ মানুষকে হেপাটাইটিস বি’র ভ্যাকসিনের আওতায় নিয়ে এসেছেন। এবারে ত্রিপুরায় যাওয়ার উদ্দেশ্য ছিল প্রদীপ ভৌমিক ও তার হেপাটাইটিস ফাউন্ডেশন ত্রিপুরার উদ্যোগে আয়োজিত লিভারকনে যোগ দেওয়া। পাশাপাশি আমরা একটা দারুণ কাজও করে ফেলেছি প্রদীপ ভৌমিককে সামনে রেখে। এবারে ত্রিপুরায় বাংলা লিভার ককাস, সংক্ষেপে ‘বালিকার’ আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হলো।

সংগঠনটির সভাপতি প্রদীপ ভৌমিক আর যুগ্মসাধারণ সম্পাদক আমি। পৃথিবীর আনাচে-কানাচে ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা লিভার বিশেষজ্ঞ আর লিভার গবেষকদের একটা প্ল্যাটফর্মে তুলে এনে বাঙালির লিভার চিকিৎসা আর লিভারবিষয়ক গবেষণায় বাঙালিদের পদচিহ্নটা জোরে-শোরে গেড়ে দেওয়া যায় কিনা, আমরা সে বিষয়টা একটু ঘেটে দেখতে চাই। আগরতলায় দারুণ জনপ্রিয় আমাদের প্রধানমন্ত্রী। এক সময়ের বিচ্ছিন্নতাবাদী আন্দোলনে যে ত্রিপুরাবাসীর নাভিশ্বাস ওঠার যোগাড় হয়েছিল, তারা আজ প্রতি রাতে শান্তিতে ঘুমান আর দফায় দফায় ত্রিপুরায় যাওয়ার কারণে আমার যা উপলব্ধি, তা হলো প্রতি রাতের সুখনিদ্রা শেষে তারা যাকে ধন্যবাদ দেন তিনি আর কেউ নন শেখ হাসিনা। কারণ, ত্রিপুরাসহ উত্তর-পূর্ব ভারতজুড়ে বিএনপি স্পন্সরড বিচ্ছিন্নতাবাদীদের ঘাঁটিগুলো বাংলাদেশ থেকে উপরে দিয়েছেন শেখ হাসিনাই।
আমরা কথায় কথায় বুঝে না বুঝে আমাদের উন্নয়নের মহাসড়ক যাত্রার কথা প্রায়ই আমাদের কথায় আর লেখায় তুলে আনি। কিন্তু কয়জন একটু মন দিয়ে চিন্তা করে দেখি যে, আমাদের উন্নয়নের মহাসড়কে ছুটে চলা, তা আমাদের দৈনন্দিন জীবনযাত্রাকে আর বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তিকে কিভাবে খোল-নালচে বদলে দিয়েছে। বিমানে চড়ে অভ্যন্তরীণ ভ্রমণ আর ট্রেনে চেপে সাম্প্রতিক বিদেশ যাত্রার গপ্পগুলো একারণেই বললাম। কেউ যদি লেখাটি এ পর্যন্ত পড়েন, আশা করি তিনি লেখাটির পরবর্তী পর্যায়ে যাওয়ার আগে একটুখানি থামবেন এবং বিষয়গুলো নিয়ে ভাববেন।
আর যে শেখ হাসিনার জন্য এত কিছু, এবারে তার বিষয়ে একটু বলি। গাজীপুরে শেখ ফজিলাতুন নেসা মেমোরিয়াল কেপিজে স্পেশালাইজড হাসপাতালে প্রধানমন্ত্রীকে বরণ করে নিতে যখন হাসপাতালটির প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে আছি, তখন মাথায় চিন্তা একটাই, ‘কিন্তু কিভাবে?’ আমরা নিশ্চিত আশপাশে মন্ত্রিসভার সদস্য, সংসদ সদস্য এবং প্রশাসনের যে সব ঊর্ধ্বতন কর্তাব্যক্তিরা সারিবদ্ধভাবে উপস্থিত, তাদের চিন্তাও তখন ঐ একটাই, যদিও তারা মুখে কিছু বলছেন না। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে সেখান থেকে স্পষ্টই দেখা যাচ্ছে সামনের মহাসড়কটি, যেখানে চলমান সারি সারি গাড়ির বহর। এই বহরকে থমকে দিয়ে কিভাবে প্রধানমন্ত্রীর বহরটি হাসপাতালে পৌঁছবে সেটাই তখন আমাদের সমস্ত চিন্তাজুড়ে।

থমকে গেলাম প্রধানমন্ত্রীর বহরকে হাসপাতালের প্রধান ফটকটি দিয়ে প্রবেশ করতে দেখে। তিনি ঐ সারি সারি গাড়ির বহরের ভেতর দিয়েই তার নিজের বহরটি নিয়ে এসে উপস্থিত হয়েছেন। তার স্বাস্থ্য পরীক্ষা যাত্রায় যাতে কারও ঈদযাত্রায় এতটুকুও ব্যাঘাত না ঘটে, এ বিষয়ে তার সতর্ক দৃষ্টি। হাসপাতালে পদার্পণ এবং কুশল বিনিময় শেষে আমরা যখন তাকে নিয়ে পরীক্ষা করাতে যেতে উদ্যত, তখন যারপরনাই বিস্মিত প্রধানমন্ত্রী আর ততোধিক লজ্জিত তার আশপাশে আমরা সবাই। টিকেট না কেটে এবং পরীক্ষা-নিরীক্ষার মূল্য পরিশোধ না করে তিনি এক পাও এগোবেন না। অতএব তথাস্তু। এ দেশের অনেক মানুষের প্রথাগত চিন্তার বিপরীতে, নিজ স্বাস্থ্যের সুরক্ষায় তার আস্থা দেশের চিকিৎসক, হাসপাতাল আর চিকিৎসা ব্যবস্থায়। 
একজন মানুষ যিনি বদলে দিয়েছেন আমাদের দৈনন্দিন দিনকাল, তার দৈনন্দিন যে কতটা সাধারণ এমন একটি অসাধারণ ঘটনার বর্ণনা এখানে না বললে মনে হয় লেখাটি অপূর্ণ রয়ে যাবে। আমরা যারা তার অনুসারী হওয়ার দাবিদার তারা যদি সত্যি সত্যি তাকে অনুসরণের চেষ্টা করতাম আর যারা আমাদের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তথাকথিত বিরোধী দলের ধ্বজা তুলে, কারণে কম এবং অকারণে বেশি তার সমালোচনায় মাতেন, তারা যদি আরও একবার তার সমালোচনা করার আগে এই ছোট দু-একটি জিনিস একটু বিবেচনায় নিতেন, আমরা নিশ্চিত বঙ্গবন্ধুর সোনার বাংলা আর শেখ হাসিনার স্মার্ট বাংলাদেশের জন্য আমাদের অপেক্ষা ২০৪১-এর আগেই ফুরিয়ে যেত।


লেখক : ডিভিশন প্রধান
ইন্টারভেনশনাল হেপাটোলজি ডিভিশন
বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ^বিদ্যালয় ও 
সদস্য সচিব, সম্প্রীতি বাংলাদেশ

×