ঢাকা, বাংলাদেশ   বৃহস্পতিবার ২৫ জুলাই ২০২৪, ১০ শ্রাবণ ১৪৩১

চামড়া শিল্পের উন্নয়ন

প্রকাশিত: ২০:০৪, ১৫ জুন ২০২৪

চামড়া শিল্পের উন্নয়ন

.

কোরবানি ঈদ এলে দেশের চামড়াশিল্প গণমাধ্যমের আলোচনায় উঠে আসে। ঈদুল আজহায় দেশে বিপুল পরিমাণ পশু জবাই হয়। সে হিসাবে কাঁচা চামড়ার জোগানও বিপুল। ন্যায্য দাম না পেয়ে বেপারিরা চামড়া বিক্রি না করে পথের ধারে ফেলে দেন, এসব সংবেদনশীল খবর আসে পত্রপত্রিকায়। সত্যি বলতে কি, আড়ালেই থেকে যায় বিপুল সম্ভাবনা সত্ত্বেও দেশের চামড়াশিল্পের রুগ্ণ দশার বাস্তবতা। দেশে উন্নত মানের কাঁচা চামড়ার বিপুল সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও চামড়া শিল্প কেন বিকশিত হতে পারেনি, তা নিয়ে অবশ্যই আমাদের ভাবতে হবে।

দেশীয় চামড়া শিল্পের বিকাশ না হওয়ার অন্যতম প্রধান কারণ, দেশের চামড়া শিল্পের কমপ্লায়েন্স (দূষণমুক্ত উন্নত কর্মপরিবেশ) অর্জন করতে না পারা। বাংলাদেশ ক্ষুদ্র কুটির শিল্প করপোরেশনের (বিসিক) এক গবেষণা অনুসারে, জন্য যেসব কারণ দায়ী, তার মধ্যে উলেখযোগ্য হলো, সাভারের চামড়া শিল্প নগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগারের (সিইটিপি) সক্ষমতার অভাব, কমপ্লায়েন্স সম্পর্কে ট্যানারি মালিকদের যথাযথ ধারণা না থাকা, কঠিন বর্জ্যরে অব্যবস্থাপনা ট্যানারির অভ্যন্তরীণ পরিবেশের মান উন্নত না হওয়া। এসব কারণে চামড়া শিল্পের মানসনদ প্রদানকারী আন্তর্জাতিক সংস্থা লেদার ওয়ার্কিং গ্রুপ (এলডব্লিউজি) থেকে স্বীকৃতি পাচ্ছে না সাভারে অবস্থিত ট্যানারিগুলো। ফলে, দেশে প্রক্রিয়াজাত চামড়া ইউরোপের বদলে চীনের বাজারে কম দামে রপ্তানি করতে হচ্ছে।

মূলত পরিবেশদূষণ অনুন্নত কর্মপরিবেশের কারণে দেশীয় চামড়া শিল্পে এমন একটি পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে যে, একদিকে কাঁচা চামড়ার উপযুক্ত মূল্য না পেয়ে বঞ্চিত হচ্ছেন চামড়া ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে এতিমখানা, মাদ্রাসা দরিদ্র জনগোষ্ঠীর মানুষ; অন্যদিকে অনেক দেশীয় চামড়াজাত পণ্য উৎপাদনকারী কোম্পানিকে বিদেশ থেকে এলডব্লিউজি সনদপ্রাপ্ত চামড়া আমদানি করতে হচ্ছে। গত এক দশকে চামড়ার জুতা থেকে শুরু করে সব ধরনের পণ্যের দাম উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পেলেও বিস্ময়করভাবে কাঁচা চামড়ার দাম প্রায় অর্ধেক হয়ে গেছে। চামড়া শিল্পের দূষণের সমস্যা আজকের নয়। হাজারীবাগে থাকাকালে ট্যানারিগুলো প্রতিদিন প্রায় ২১ হাজার ৬০০ ঘনমিটার তরল বর্জ্য পরিশোধন না করেই সরাসরি বুড়িগঙ্গা নদীতে ফেলত। বুড়িগঙ্গা নদীর দূষণ কমাতে শিল্প মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এবং বিসিকের নেতৃত্বে সাভারের হেমায়েতপুরে হাজার ৭৯ কোটি টাকা ব্যয়ে গড়ে তোলা হয় চামড়াশিল্প নগর।

৫৪৭ কোটি টাকা ব্যয় করা হয় কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধনাগার বা সিইটিপি নির্মাণে। বিপুল অর্থ ব্যয় করে দুই বছরের বদলে নয় বছর সময় নিয়ে নির্মিত সিইটিপি চামড়া শিল্পের সব ধরনের বর্জ্য পূর্ণমাত্রায় পরিশোধনে সক্ষম নয়। শ্রমিকদের প্রসঙ্গটিও এড়িয়ে যাওয়ার নয়। বাংলাদেশ লেবার ফাউন্ডেশন গবেষণা সংস্থা ্যাপিডের যৌথভাবে করা জরিপ অনুসারে, জরিপে অংশ নেওয়া ৯৫ শতাংশ শ্রমিকেরই কোনো নিয়োগপত্র নেই। অর্ধেকের বেশি শ্রমিক সরকারঘোষিত ন্যূনতম মজুরি ১৩ হাজার ৫০০ টাকার কম মজুরি পান। শ্রমিকদের ওভারটাইম করতে হয় বাধ্যতামূলকভাবে। বাংলাদেশের চামড়ার গুণগত মান ভালো। এখানে শ্রম তুলনামূলক সস্তা। ফলে, কোনো ধরনের কাঁচামাল আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি ছাড়াই চামড়া শিল্পের বিকাশের ব্যাপক সম্ভাবনা রয়েছে। সেই সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে সন্তোষজনক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন মোটেও অসম্ভব নয়। সেজন্য চাই সব পক্ষের সদিচ্ছা সক্রিয়তা, দেশকল্যাণ চিন্তা এবং গঠনমূলক পরামর্শ।

 

×