ঢাকা, বাংলাদেশ   বুধবার ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৩ বৈশাখ ১৪৩১

স্বাধীনতা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

ড. মোহাম্মদ বদরুজ্জামান ভূঁইয়া

প্রকাশিত: ২২:৫২, ১ মার্চ ২০২৪

স্বাধীনতা আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

.

স্বাধিকার, স্বাধীনতা মহান মুক্তিযুদ্ধে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। মাতৃসম দেশকে শৃঙ্খলমুক্ত করতে অকাতরে রক্ত দিয়েছেন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী শিক্ষকরা। জাতির যে কোনো সংকট সংগ্রামে ন্যায়, বৈষম্যহীনতা সুবিচারের পক্ষে এমন গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা সবসময়ই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় নিয়ে থাকে। স্বাধীন বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার সূচনালগ্ন থেকেই বিভিন্ন ধাপে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী-শিক্ষকরা নেতৃত্ব দিয়ে আসছেন। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা বাংলার জন্য আন্দোলনে এবং ১৯৬২ সালে বিতর্কিত শিক্ষা নীতির বিরুদ্ধে আন্দোলনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জীবন দিয়েছে এবং দাবি আদায় করেছে। ১৯৬৬ সালের জুন ঐতিহাসিক দফার সপক্ষে এবং জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবকে মুক্তির দাবিতে সারাদেশে হরতাল পালিত হয়েছিল বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের নেতৃত্বে। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা থেকে বঙ্গবন্ধুকে মুক্ত করতে ১৯৬৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকেই রক্তঝরা আন্দোলন সংগ্রাম শুরু হয়েছিল।৬৯-এর গণঅভ্যুথানের পুরো নেতৃত্বে ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। যখন বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বে সারা বাংলাদেশ একটি সমুদ্রের মোহনায় একীভূত চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে স্বাধীনতা অর্জনের অভিপ্রায়ে সকল মানুষ উদ্বেলিত চিত্তে এক অভিন্ন সত্তায় বিলীন হয়ে গেছে, সেখানেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রভাব ছিল অবিস্মরণীয়।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতা চেতনার উন্মেষকেন্দ্র। বাংলাদেশের স্বাধীনতার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবদান অবিস্মরণীয়। ১৯৭০-এর নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ বিজয়ের পর শঙ্কিত হয়ে পড়েছিল পাকিস্তানের শাসক গোষ্ঠী। তারা নিশ্চিতভাবেই ধারণা করেছিল যে, ছয় দফার বাস্তবায়ন এবার হয়েই যাবে। ফলে, প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান এবং জুলফিকার আলী ভুট্টো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে কয়েকবার সমস্যা সমাধানের জন্য আলোচনা করেন। কিন্তু ইয়াহিয়া খান এবং ভুট্টোর ষড়যন্ত্রে আলোচনা ভেস্তে যায়।

শুরু হয় তুমুল আন্দোলন দাঙ্গা-হাঙ্গামা। দেশের সাধারণ মানুষ স্বাধীনতার স্বপ্ন দেখা শুরু করে। বাংলাদেশের স্বাধীনতার ইতিহাসে ১৯৭১ সালের মার্চ ছিল উত্তাল, আবেগ, উত্তেজনায় ভরপুর মাস। ১৯৭১ সালের মার্চ হঠাৎ এক হটকারী সিদ্ধান্তে পাকিস্তানের তৎকালীন সামরিক স্বৈরশাসক প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খান জাতীয় পরিষদের অধিবেশন অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করলে বিক্ষোভে ফেটে পড়ে বাংলার আপামর জনতা। অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। মার্চ থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম সম্পূর্ণ স্থগিত হয়ে যায়। শিক্ষার্থীরা অস্ত্র লুট অস্ত্রের প্রশিক্ষণে ব্রতী হন। জাতীয় পরিষদের অধিবেশন স্থগিত হওয়ার পর সংগ্রামী ছাত্র সমাজের উদ্যোগে মার্চ বিক্ষোভ হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন প্রাঙ্গণের বটতলায়। সময় ডাকসুর তৎকালীন ভিপি আবদুর রবকে ছাত্রলীগ নেতা শেখ জাহিদ হোসেন একটি বাঁশের মাথায় পতাকা বেঁধে মঞ্চে এনে দেয়। ঐদিনই কলা ভবনের সামনে সবুজ জমিনের ওপর লাল সূর্য, তার মধ্যে হলুদে খচিত বাংলাদেশের মানচিত্র এই ডিজাইনের পতাকা উত্তোলন করা হয়।

স্বাধীনতার আন্দোলনে বিশ্ববিদ্যালয়ের আমতলা, বটতলা, মধুর ক্যান্টিনের অবদানও অনস্বীকার্য। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে থাকা তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানকেবঙ্গবন্ধুউপাধি দেওয়া হয়েছিল। মার্চের ভাষণে বঙ্গবন্ধু থেকে শেখ মুজিবুর রহমান জাতির পিতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। মার্চ, সন্ধ্যা ৭টা হতে সকাল ৭টা পর্যন্ত ঢাকায় অনির্দিষ্টকালের জন্য কার্ফু জারি। কার্ফু ভেঙে বিক্ষুব্ধ নগরীর ভয়াল গর্জন। বিভিন্ন স্থানে মিছিল সমাবেশ, গুলিবর্ষণ। পল্টনে জনসভা গণমিছিলের ডাক, ভাষণ দেবেন শেখ মুজিবুর রহমান। মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলা থেকে বাংলাদেশের পতাকা জনসম্মুখে প্রদর্শিত হয়। মার্চ স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতৃত্বে পল্টন ময়দানে স্বাধীনতার প্রস্তাব, জাতীয় সঙ্গীত শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান পালিত হয়। তবে মার্চ বেলা ১১টায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা স্বাধীনতার সপক্ষে সক্রিয় ভূমিকায় নামেন। , মার্চ সকাল ৮টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত হরতাল পালিত হয়। এই হরতাল সফল করার জন্য রাজপথে নেমেছিল এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্ররা। ঐতিহাসিক মার্চের ভাষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ছিল সরব উপস্থিতি। এই ভাষণের পর থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ সশস্ত্র সংগ্রামের জন্য নিজেদের প্রস্তুত করতে থাকে। ২৩ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে পল্টনে বাংলাদেশের জাতীয় পতাকা উত্তোলন করে মার্চপাস্ট করে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িতে এসে বঙ্গবন্ধুর হাতে পতাকা তুলে দিয়েছিল। এই ধাপের আন্দোলন-সংগ্রামে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছিল কেন্দ্রবিন্দু।

পাকিস্তানি বাহিনী কর্তৃক যে নির্মম পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হয়েছিল, তার প্রধান লক্ষ্যবস্তু ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। ইয়াহিয়া খান, জুলফিকার আলি ভুট্টো, টিক্কাখান, রাও ফরমান আলি, খাদিম রাজা নামের রক্তপিপাসুরাঅপারেশন সার্চলাইটনামে পঁচিশে মার্চ রাতে ভয়ংকর গণহত্যা শুরু করেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। এটি স্বাধীনতা-সংগ্রামের তৃতীয় ধাপ তথা চূড়ান্ত ধাপ। মানবতার ইতিহাসে পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সবচেয়ে জঘন্যতম অপরাধ করেছিল নিরস্ত্র নিরীহ শত শত ছাত্র এবং অনেক শিক্ষককে হত্যা করে। ইকবাল হল (বর্তমান জহুরুল হক হল), জগন্নাথ হল, সলিমুল্লাহ হল, রোকেয়া হলে যে বর্বরোচিত হামলা চালানো হয়েছিল, তা বিশ্ব ইতিহাসের অন্যতম জঘন্য ঘটনা। ওই রাতে নয়জন শিক্ষক শহীদ হন। জহুরুল হক হলের প্রায় দুইশ ছাত্র, জগন্নাথ হলে চৌত্রিশজনসহ আরও অনেক ছাত্র, শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সেদিন শহীদ হয়েছিলেন। ২৫ মার্চ রাতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথিতযথা শিক্ষক গোবিন্দ চন্দ্র দেব, জোতির্ময় গুহ, সরাফত আলীসহ অনেকে নিহত হন। কিন্তু তারপরও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীকে তারা দমিয়ে রাখতে পারেনি। বাংলাদেশকে হানাদার মুক্ত করার জন্য এঁরা ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন যুদ্ধ-ময়দানে। মুক্তিযুদ্ধের সংগঠনে বা মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের ছিল সবিশেষ ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনাকারী নেতাদেরই কেবল এই প্রতিষ্ঠান সরবরাহ করেনি, হাজার হাজার ছাত্র-শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারী সক্রিয়ভাবে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন।

এই প্রতিষ্ঠানটি কেবল স্বাধীনতা আন্দোলনের বীজ রোপণ করেই থমকে যায়নি, আন্দোলনের ভিত্তিমূলক উপাদান সরবরাহ করেছে, আন্দোলনকে বেগবান করেছে এবং মুক্তিযুদ্ধের সংগঠন পরিচালনায় ব্যাপক ভূমিকা রেখেছে। স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম পর্যায়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র শিক্ষকরা যার যার অবস্থান থেকে নানাভাবে যুদ্ধে যোগদান করেন। ছাত্রদের অধিকাংশই তারুণ্যের উদ্দীপনা নিয়ে দেশপ্রেমে মত্ত হয়ে মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন এবং বিপুলসংখ্যক ছাত্র মহান মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হন। ছাত্রনেতাদের কেউ কেউ সম্মুখযুদ্ধে অংশগ্রহণ করেন, আবার কেউ কেউ রণাঙ্গনের বাইরে থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহায়তা করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নেতৃত্বে সমগ্র বাংলাদেশ থেকে মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া প্রায় হাজার  হাজার ছাত্রলীগ নেতা-কর্মী শহীদ হয়েছেন। বিজয়কে ত্বরান্বিত করতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রসমাজ এবং শিক্ষকদের অবদান অনন্য।

সাধারণত বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্ম দেয় রাষ্ট্র। কিন্তু ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্ষেত্রে ব্যত্যয় ঘটেছে প্রচলিত নিয়মের। বরং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ে অনন্য অবদান রেখেছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। ১৯২১ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) এই ভূখ- সংঘটিত সব আন্দোলন-সংগ্রামে তাৎপর্যপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। সময়ে শাসক- শোষক শ্রেণির অন্যায়-অত্যাচারের বিরুদ্ধে যত আন্দোলন-সংগ্রাম হয়েছে, সেগুলোতে চালকের আসনে ছিল পাশ্চাত্যের অক্সফোর্ড খ্যাত এই বিশ্ববিদ্যালয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ভাষা আন্দোলন স্বাধীনতাযুদ্ধ। প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ের নেতৃত্বে সংঘটিত বিভিন্ন আন্দোলন-সংগ্রাম ত্যাগের ইতিহাস ধারণ করে আছে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় নির্মিত ভাস্কর্য স্থাপনাগুলো। ১৯৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে চরম ত্যাগ স্বীকার করেন শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ গোটা বিশ্ববিদ্যালয় পরিবার। পৃথিবীর ইতিহাসে একটি দেশের স্বাধীনতার জন্য এমন ত্যাগ কোনো বিশ্ববিদ্যালয় করেনি।

বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারের শহীদ সদস্যদের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানোর জন্যস্মৃতি চিরন্তনস্মৃতিফলকটি নির্মাণ করা হয় ১৯৯৫ সালে। স্থাপনাটি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাংলোর সামনে (ভিসি চত্বর) অবস্থিত। কালো গ্রানাইটে নির্মিত এই স্থাপনায় ঢাবির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ১৯৫ জন শহীদের নাম লেখা আছে। এছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে আপামর জনতার অবদানকে তুলে ধরতে তিনজন বীর মুক্তিযোদ্ধার স্বরূপ চিত্রিত অপরাজেয় বাংলা ভাস্কর্যটি কলাভবনের পাদদেশে ঐতিহাসিক বটতলার সামনে অবস্থিত। অন্যদিকে রাজু ভাস্কর্য, স্বাধীনতা সংগ্রাম ভাস্কর্য, রাউফুন বসুনিয়া ভাস্কর্য, সপ্তশহীদ স্মৃতিস্তম্ভ, নিঝুম স্থাপত্য, চারুকলার জয়নুল স্মৃতি ভাস্কর্যসহ অন্য অনেক ভাস্কর্য স্থাপিত হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, যেগুলো স্বাধীনতা সংগ্রামসহ অন্যান্য গণতান্ত্রিক আন্দোলনের নানা স্মৃতি বহন করছে।

বাংলাদেশের ইতিহাস মানেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস। তাই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় জ্ঞান-গরিমায় যেমন অনন্য, তেমনি বাঙালি জাতীয়তাবাদের স্ফুরণ বিকাশে তার ভূমিকা ঈর্ষণীয়। তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা আন্দোলন মুক্তিযুদ্ধে তার ভূমিকা হচ্ছে সার্বিক। যে দেশের জাতির পিতা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এই বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্র, তাদের গর্বের জায়গা আরও সুবিস্তৃত। এখন আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে এটা আরও সমৃদ্ধিশালী করা।

লেখক : অধ্যাপক, ট্রেজারার

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়

×