ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ০১ মার্চ ২০২৪, ১৭ ফাল্গুন ১৪৩০

জলবায়ুর ক্ষতিতে সোচ্চার বিশ্ব

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ২১:০০, ১১ ডিসেম্বর ২০২৩

জলবায়ুর ক্ষতিতে সোচ্চার বিশ্ব

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জলবায়ু বিপন্নতায় সম্মান জানিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে

কপ-২৮ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জলবায়ু বিপন্নতায় তাঁর সারগর্ভ অবদানকে সম্মান জানিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে, যা দেশের জন্য এক অভাবনীয় অর্জন। তিনি এবারের সম্মেলনে অনুপস্থিত। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ জাতিসংঘের দেওয়া এই অসাধারণ পুরস্কার গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে। আরব আমিরাতের দুবাইতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ‘এশিয়া ক্লাইমেট মোবিলিটি চ্যাম্পিয়ন লিডার’ নামক পুরস্কার পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রদত্ত এই পুরস্কার প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে তথ্যমন্ত্রী নিয়েছেন মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের হাত থেকে

ষড়ঋতুর বিচিত্র লীলাসমৃদ্ধ আমাদের এই বাংলাদেশ। আয়তনে ক্ষুদ্র হলেও বিশ্বের সর্ববৃহৎ ব-দ্বীপ চিরায়ত বাংলা। অনন্য এক অপার মহিমায় ধন ধান্য পুষ্প ভরা সমৃদ্ধ এই দেশ কৃষি সভ্যতার অন্যতম পাদপীঠ। বিশ্বের সর্বত্র সভ্যতার পত্তন হয়েছে সমুদ্র ও নদী তীরবর্তী অঞ্চলগুলোয়। কারণ উর্বর কৃষি জমিই মানবসভ্যতাকে সামনে চলার পথ দেখায়। পুরাকালের পণ্ডিত আর ইতিহাসবিদদের অভিমত- সভ্যতার সূর্যের ঊষালগ্নে নারীদের হাত ধরে নতুন সমাজ ব্যবস্থার ভিত গড়ে ওঠে। সঙ্গত কারণে কিছু নজিরও উপস্থাপন করা হয়।

সে সময়ের আদিম পুরুষরা খাদ্য সংগ্রহের জন্য বন থেকে বনান্তরে, পাহাড়ে, জঙ্গলে ঘুরে বেড়াত। আর নারীরা ঘরে বসে কুড়িয়ে আনা খাদ্যর বীজ রোপণ করে আদি সভ্যতার প্রাথমিক শুভযাত্রা কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থাকে স্বাগত জানায়। এরপর আর সংশ্লিষ্ট মানবসমাজকে পেছনে তাকাতে হয়নি। 
মানুষের শ্রম আর প্রযুক্তিবিদ্যার ক্রমোন্নয়নে বিশ্ব এগিয়ে গেছে। আধুনিক উপলব্ধিতে সমৃদ্ধ হয়েছে তার জ্ঞানগর্ভ  ও সক্ষমতা। মানব সন্তানদের তৈরি হওয়া তেমন ঐতিহাসিক বিবর্তনে চমকও এসেছে বারে বারে। আদিম যুগে মানুষের বিপর্যস্ত কাল ও দুঃসময় অতিক্রম করার পাশাপাশি পুঁথিগত জ্ঞানার্জনও সময়ের দাবি হয়ে যায়। কিন্তু নতুন কিছু উদ্ভাবনে তাদের অপেক্ষা করতে হয়েছে দীর্ঘ সময়। এক সময় যন্ত্রসভ্যতা তার অবস্থান জানান দিলেও পর্যাপ্ত পুঁজির অভাবে তা সহসাই সকলের কল্যাণে আসেনি।

অবিস্মরণীয় বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন ১৭৬০ সালের ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব, যা আজও যন্ত্রসভ্যতার এক অসাধারণ কালপর্ব ও দিকনির্দেশক। জেমস ওয়াট আবিষ্কার করলেন স্টিম ইঞ্জিনের নব অভ্যুদয়, যা দুনিয়াজোড়া এক পরম যুগসন্ধিক্ষণ। তার মাত্র ৩ বছর আগে ১৭৫৭ সালে ক্লাইভের হাতে বাংলার পতন আজও উপমহাদেশের এক ক্রান্তিকাল। ইংরেজ ঐতিহাসিকরাও নির্দ্বিধায় স্বীকার করেছেন ক্লাইভের হাতে বাংলা ধরাশায়ী না হলে ১৭৬০ সালে ইংল্যান্ডের শিল্প বিপ্লব হতো কি না যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। কারণ আধুনিক শিল্প বিপ্লবের জন্য যান্ত্রিক কলা কৌশল যথেষ্ট ছিল না। বরং তার চেয়ে বেশি প্রয়োজন ছিল পর্যাপ্ত পুঁজির, যা নাকি সংগৃহীত হয়েছিল অবিভক্ত সম্পদশালী বাংলা থেকে।

তারই ফলশ্রুতিতে ১৭৭৬ সালে যুগান্তকারী মহামন্বন্তর অবিভক্ত বাংলা কাঁপিয়ে দেয়। সে সময় প্রায় ১/৩ জনগোষ্ঠী অর্ধাহারে-অনাহারে মারা যাওয়ায় যে দুর্ভিক্ষ দৃশ্যমান হয় তা আজও ইতিহাসের চরম দুর্বিপাক। বাংলা নিঃস্ব হলো। কিন্তু সারাবিশ্ব পেল যান্ত্রিক উদ্ভাবনের নবতর কৌশলই শুধু নয়, ততোধিক যাপিত ও সমাজজীবনকে সফল কর্মযোগে এগিয়ে নেওয়ার ঐতিহাসিক ধারা। সেই শুরু যন্ত্রসভ্যতার অদম্য পালাক্রম। কিন্তু তার গভীরতর পর্যায়ে কত দুঃসহ কালের বীজ বপিত হয়ে গেল তার জন্য বিশ্ববাসীকে আরও দুই শতক অপেক্ষমাণ থাকতে হয়েছে। ক্রমেই বৈজ্ঞানিক নিত্য নতুন, আধুনিক ও যুগোপযোগী আবিষ্কারে পৃথিবীর গতিময়তায় অতি সাধারণ জীবনমান সমৃদ্ধ হয়েছে।

কিন্তু স্বল্পজনই তার ফল ভোগ করে মাত্র। সিংহভাগ মানুষ নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় নিজের শ্রমশক্তি ছাড়া বাকি সব হারানোর পথে। এ তো গেল বৈষয়িক সম্পদের চরম বিভাজন নীতি। যেখানে ক্ষমতাবানরা কোনো দুর্যোগকে মোকাবিলা করেননি। শিল্পায়নে আধুনিকতার পরম সন্ধিক্ষণে বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে বিশ্ব প্রত্যক্ষ করল অনন্য এক চরম দুঃসময়। যা শ্রেণি বিভেদ আর ধনের অসাম্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে প্রত্যেক নাগরিকের যাপিত জীবনকে চরম সমস্যাকবলিত করে দেয়। নৈসর্গ ও পরিবেশ বিজ্ঞানীরা সঙ্গত কারণে আওয়াজ তুলতে থাকেন শিল্পায়নের কয়লা বিদ্যুৎ থেকে যে কার্বন নিঃসরণ হয় সেখানে প্রকৃতি তার সহজাত বৈশিষ্ট্যকে বারবার হুমকির মুখে দাঁড় করাচ্ছে।

সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে সতর্ক বাণী আসল- যন্ত্রসভ্যতার লাগাম টানা জরুরি, কিংবা নৈসর্গ সহায়ক যন্ত্র উদ্ভাবন জীবন ও পরিবেশের জন্য অত্যাবশ্যক। একবিংশ শতাব্দীর তৃতীয় দশকে এসে তার চরম মাশুল গুনতে হচ্ছে তাবৎ দুনিয়াকে। বাংলাদেশের মতো স্বল্পোন্নত কিংবা উন্নয়নশীল দেশগুলো কার্বন নিঃসরণ করে মাত্র ৫%, বাকি ৯৫% নিঃসরিত হয় প্রযুক্তিবিদ্যায় সমৃদ্ধ উন্নত দেশগুলো থেকে। অথচ সমস্ত নেতিবাচক প্রতিক্রিয়ায় আবর্তিত হতে হয় আমাদের মতো অতি সাধারণ দেশের অসহায় মানুষগুলোকে। যে কারণে কপ-২৮ সম্মেলন তার সবকিছুর মূল নির্ণায়ক ১৭৬০ সাল থেকে শুরু হওয়া শিল্প বিপ্লব।

আমরা এখন চতুর্থ শিল্প বিপ্লবের মধ্য দিয়ে অত্যাধুনিক যন্ত্রসভ্যতার দুঃসহ কাল পাড়ি দিচ্ছি। দুঃসহই বটে। ষড়ঋতুসমৃদ্ধ সৌন্দর্যম-িত বাংলাদেশও তার সহনীয় প্রকৃতি থেকে ক্রমাগত দূর থেকে দূরান্তরে অন্তর্হিত। শীতকালে শীতের আবহ প্রত্যক্ষ করতে সময় পার করে দিতে হয়। আবার গ্রীষ্মকালে অবিরাম বারিধারায় সারাদেশে জলসিক্ততার প্লাবন বয়ে যায়। নদী ভাঙনের কূল-কিনারা তো নেই-ই। আবার সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বেড়ে উপকূলীয় অঞ্চলের বাসিন্দাদের নিত্য দুর্ভোগ যেন দুঃসময়ের চরম দুর্বিপাক। বিভিন্ন সামাজিক গবেষণায় উঠে আসছে নারী ও শিশুদের ওপর পরিবেশ বিপন্নতার আগ্রাসী মনোভাব সমধিক।

মাতৃত্বকালীন নারীদের নিরাপদ-নির্বিঘ্নে সময় পার করতে হরেক সমস্যার মোকাবিলা করতে হয়। প্রযুক্তির মহাসমারোহে সিজারিয়ান অপসারণ করে সন্তানের পৃথিবীর আলো দেখা যেন নিয়মিত পরিবেশ-পরিস্থিতি। গত শতাব্দীর অন্তিম লগ্ন থেকেই আওয়াজ উঠছে বলিষ্ঠকণ্ঠে প্রকৃতিকে তার সহজাত বৈশিষ্ট্য দিতে না পারলে বিশ্বময় যে তিক্ততার আবহ তৈরি হবে সেখানে ধনী-গরিব নির্বিশেষে সকলকেই বিপদাপন্ন পরিস্থিতি সামাল দিতে হবে। তেমন অসময় আর অসহনীয় পরিবেশকে মোকাবিলা করেই আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশ বিপন্ন যাত্রাপথকে আলিঙ্গন করছে। কপ সম্মেলন অনেকবার অনুষ্ঠিত হলেও আজ পর্যন্ত দূষণ প্রক্রিয়ায় তার প্রভাব সামান্যই বলা যায়। দূষণ তার যথানিয়ম আর ব্যাপ্তিতে সংশ্লিষ্ট মানুষকে দিন দিন নাজেহাল করেই যাচ্ছে।  
তবে দূষণ প্রক্রিয়ায় বাংলাদেশের অবস্থা কতখানি শোচনীয় তাও বিবেচ্য বিষয়। পরিবেশ বিপন্নতায় দেশের সমুদ্র ও নদী পরিবেষ্টিত উপকূলীয় জনগোষ্ঠী নিত্য লড়াই-সংগ্রাম করে টিকে থাকে। প্রকৃতির ওপর অনাচার আর নিপীড়নের মাশুল গুনতে হয় এসব অধিবাসীকে। তবে সব কপ সম্মেলনে আমাদের মতো দেশকে সাহায্য-সহযোগিতায় পাশে থাকার জন্য ধনী দেশগুলোর প্রতি যে উদাত্ত আহ্বান সেটাকেই জিইয়ে রেখে সম্মেলন সমাপ্ত হয়। কিন্তু সেভাবে মূল কার্যক্রম আজ অবধি দৃশ্যমান হয়নি। এবারের ‘লস অ্যান্ড ড্যামেজ ফান্ড’ নাকি প্রথম থেকেই ক্ষতিগ্রস্ত জনগণকে আশার আলো দেখাচ্ছে। কপ-২৮ সম্মেলনে নতুন বার্তা আশা জাগানিয়া হলেও কার্যক্ষেত্রে তার প্রয়োগ কতখানি হবে তা সময়ই নির্ধারণ করবে।

সম্মেলন থেকে গণমাধ্যমে তা প্রকাশ পাওয়া কতখানি ক্ষতি আর উদ্বেগ প্রশমিত করবে সেটাও ধারণার বাইরে। তবে আমাদের বাংলাদেশের অবস্থান সত্যিই নজরকাড়া। বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জলবায়ু বিপন্নতার ওপর যে সুউচ্চ কণ্ঠ তা সংশ্লিষ্ট সবাইকে যেন চমকে দিয়েছে। শুধু তাই নয়, বিভিন্নভাবে তার অভিষিক্ত হওয়াও বিস্ময়। কপ-২৮ সম্মেলনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জলবায়ু বিপন্নতায় তাঁর সারগর্ভ অবদানকে সম্মান জানিয়ে পুরস্কৃত করা হয়েছে, যা দেশের জন্য এক অভাবনীয় অর্জন। তিনি এবারের সম্মেলনে অনুপস্থিত। তথ্যমন্ত্রী ড. হাছান মাহমুদ জাতিসংঘের দেওয়া এই অসাধারণ পুরস্কার গ্রহণ করেন প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে।

আরব আমিরাতের দুবাইতে অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনে ‘এশিয়া ক্লাইমেট মোবিলিটি চ্যাম্পিয়ন লিডার’ নামক পুরস্কার পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। জাতিসংঘ কর্তৃক প্রদত্ত এই পুরস্কার প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে তথ্যমন্ত্রী নিয়েছেন মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের হাত থেকে। স্বনামধন্য মহাসচিব শেখ হাসিনাকে জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর নেতৃত্বের আসনে বসিয়ে বাংলাদেশকে এক অনন্য সম্মানে অভিষিক্ত  করেন। ২০১৫ সালেও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে জাতিসংঘ কর্তৃক সর্বোচ্চ পরিবেশগত পুরস্কার ‘চ্যাম্পিয়ন অব দ্য আর্থ’ প্রদান আজ অবধি দেশের জন্য অনন্য গৌরব। 
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশের সমৃদ্ধ ও উন্নয়নে অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন।  তিনি জলবায়ুর দুঃসহ আবহকে প্রতিরোধ করতে গিয়ে শুধু বাংলাদেশ নয়, বিশ্ব পরিক্রমায় আক্রান্ত অঞ্চলগুলোকে একত্রিত করে সমস্বরে উচ্চারণ করছেন- বিশ্বব্যাপী ছড়ানো এমন বিরূপ ভাবাপন্ন প্রতিবেশকে সহনীয় পর্যায়ে আনা এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি জরুরি। দেশের জন্য নিরন্তর কর্ম দ্যোতনায় নিবেদিত হওয়া বঙ্গবন্ধুকন্যা বিশ্ব পরিসরেও তাঁর অনধিগম্য নেতৃত্বের সাড়া জাগাচ্ছেন। প্রধানমন্ত্রী দেশকে মনেপ্রাণে ভালোবাসেন। তাই দেশের নানা সমস্যা নিয়ে তিনি উদ্বিগ্ন।

কিন্তু সেসবের পরিত্রাণের উপায় বের করতে দ্বিধাহীন। সব কপ সম্মেলনেই ধনী দেশগুলোর অপেক্ষাকৃত অনুন্নত রাষ্ট্রের পাশে দাঁড়ানোর ক্রমাগত অঙ্গীকার নানাভাবে আলোচিত হয়। তবে জলবায়ু সমস্যা কোনো নির্দিষ্ট দেশের নয়, বরং আন্তর্জাতিক। কাজেই এই গুরুত্বপূর্ণ সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা ও উদ্যোগ।  
    লেখক : সাংবাদিক

×