ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৪, ১২ ফাল্গুন ১৪৩০

বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে

নাজনীন বেগম

প্রকাশিত: ২১:১০, ২৮ নভেম্বর ২০২৩

বিজয়ের দ্বারপ্রান্তে

প্রতিবার বিজয় দিবস এলে নতুন করে স্বাধীনতার উপলব্ধি আসে বাঙালির মনে

স্বাধীনতা শব্দটি আসলে কোনো বিশেষ ক্ষণ, দিন, মাসে আটকে থাকে না। তার বিস্তৃতি এত বেশি সম্প্রসারিত যে, মাস, যুগ সেখানে বাহুল্য মাত্র। প্রতিবার বিজয় দিবস এলে নতুন করে স্বাধীনতার উপলব্ধি আসে বাঙালির মনে। যে উৎসারিত মনোশক্তিতে স্বাধীনতাকে বারবার স্বাগত, অভিনন্দন জানিয়েও মনে হয় কিছুই দেওয়া গেল না। আরও বহু কিছু দিতে হবে স্বাধীন দেশ আর জাতিকে

বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের সোনার বাংলা আর তাঁর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আধুনিক ও স্মার্ট বাংলাদেশ। ১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বর নয় মাসের লড়াকু অভিযাত্রার যবনিকাপাতে বাংলাদেশ স্বাধীনতা অর্জন করে বিশ্বকে চমকে দেয়। তার পটভূমি, এগিয়ে চলা এবং শেষ অবধি পরিণতি লাভ ঐতিহাসিক যাত্রাপথ তো বটেই, পাক ভারত উপমহাদেশের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে আবহমান বাংলা ও বাঙালি তার চিরায়ত বৈভব আর ঐশ্বর্যে যে মিলন সৌধ তৈরি করে তা আজ অবধি সম্প্রীতির বন্ধনকে অটুট রয়েছে। বহিরাগত আর্যরা এদেশে আধিপত্য বিস্তার করলেও আবহমান বাংলার শাশ্বত শৌর্যে আঁচ লাগাতে পারেনি। বিভিন্ন রাজবংশের অভ্যন্তরীণ লড়াই, প্রাসাদ ষড়যন্ত্র, ক্ষমতার দ্বন্দ্ব, আভিজাত্যের গৌরব সবই নির্দিষ্ট সীমার মধ্যে থেকে যায় বলে ইতিহাসে বিধৃত আছে। 
ভারতে ধর্মীয় অসনহশীলতায় হিন্দু মুসলমান দ্বন্দ্ব মাথা চাড়া দিলে ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগ অপরিহার্য হয়ে যায়। যা আজ অবধি অনাকাক্সিক্ষত এবং অপরিণামদর্শিতার দাবানল হিসেবে ইতিহাসে চিহ্নিত হয়ে আছে। সেখানে বাংলাদেশের অভ্যুদয়ও সেই ’৪৭-এর দেশ বিভাজনের অপ্রত্যাশিত শিকড়ের ভেতরে গেঁথেই ছিল। কারণ শুধু ধর্ম অবিভক্ত পাকিস্তানকে এক সুতায় গ্রথিত করতে বারবার হোঁচট খেয়েছে। ভাষা, চিরায়ত সংস্কৃতি, নিত্য যাপিত জীবনের আচার অনুষ্ঠান সবই বিভাজনের কঠিন আবর্তে পড়ে যায়। পাকিস্তান নামক রাষ্ট্রটি প্রথমেই ভাষার প্রশ্নে পুরো দেশের জনগোষ্ঠীকে বিচ্ছিন্নতার সহিংস আবর্তে ফেলে দেয়। সেখান থেকে শুরু হয়ে যায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বীজ বপন।

১৯৪৮ সালে জিন্নাহ কর্তৃক উত্থাপিত উর্দুই হবে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্র ভাষা- সেখান থেকেই শুরু হয় মাতৃভাষাকে স্বমর্যাদায় অধিষ্ঠিত করতে বাঙালিদের ঐতিহাসিক কর্মদ্যোতনা। বিজয়ের মাস যখন তার শুভাগমনের পদধ্বনিতে আমাদের সচকিত করে সঙ্গে সঙ্গেই সাড়া জাগায় মাতৃভাষার অভাবনীয় গৌরবের ইতিহাস। ভাষা আন্দোলনের লড়াকু সৈনিকরা স্বাধীনতার মন্ত্রে উজ্জীবিত হয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসকে সাবলীলতায় এগিয়ে দেয়। তাই বাংলাদেশের স্বাধীনতা আর মাতৃভাষার আন্দোলন একে অপরের সহায়ক এবং পরিপূরকও বটে। আর এটাই কবিগুরুর ভাষায় সন্ধ্যা প্রদীপ জ্বালানোর আগে সলতে পাকানো ছাড়া অন্য কিছু নয়।

আমাদের স্বাধীনতা সংগ্রামের মহানায়ক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান শুধু জাতির জনকই নন বরং ভাষা আন্দোলনের জন্য লড়াই করা পাকিস্তানিদের হাতে আটক প্রথম ভাষা সংগ্রামীও। রেসকোর্স ময়দানে ১৯৪৮ সালে যখন জিন্নাহ শুধু উর্দুকেই রাষ্ট্রভাষা ঘোষণা দিলেন তখন বঙ্গবন্ধুও সেখানে হাজির ছিলেন। তিনি তাঁর স্বভাবসুলভ তর্জনী উঁচিয়ে দীপ্ত কণ্ঠে উচ্চারণ করলেনÑ না, বাংলাও হবে পাকিস্তানের আরও একটি রাষ্ট্রভাষা। সেখান থেকেই যে সংগ্রামী দুঃসহ অভিগমন আপামর বাঙালিকে এক সুতায় বেঁধে দিল তারই অনিবার্য পরিণতি ১৯৭১ সালের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ। নয় মাসের অসহনীয় অস্থিরতা আর লড়াকু পথযাত্রাকে আলিঙ্গন করতে বীর বাঙালি যে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়ে তারই সুনির্দিষ্ট যাত্রাপথে বিজয় রথ এগিয়ে যায়। নয় মাসের লড়াকু আর নিবেদিত মুক্তির সংগ্রাম সহজেই তার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে পারেনি।

বহু ত্যাগ-তিতিক্ষা আর সম্ভ্রমহানিকে আলিঙ্গন করে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে দুঃসাহসিক অভিযাত্রায় দেশ স্বাধীনতা লাভ করে। বিজয় নিশান ছিনিয়ে আনতে সাধারণ বাঙালিরা অকুতভয় লড়াকু সৈনিকদের সহযোগিতা করেন। তাদের থাকা, খাওয়া, সংগ্রামী দুঃসময়ে সাহচর্য দেয়া ছাড়াও যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধাদের চিকিৎসার ভারও নিতে হয় দেশে অবস্থান করা অগণিত বাঙালিকে। আহতদের শুধু চিকিৎসা নয় বরং নিয়মিত স্বাস্থ্য পরিচর্যায় সুস্থ করে তোলাও ছিল দুঃসহ পরিস্থিতির ন্যায্যতা। তাই শুধু লড়াইয়ের ময়দান কিংবা গুপ্ত আক্রমণই নয় বরং ঘরে বসেও বহু নারী-পুরুষ সংগ্রামী অভিগমনকে যাপিত জীবনের অনুষঙ্গ করে নিতে মোটেই দেরি করেননি। তা না হলে বিজয় কেতন ওড়াতে আরও যে কত সময় লাগত তা বলা মুশকিল।

স্বাধীনতা সংগ্রামের অস্থির সময়ে লড়াইয়ের ময়দান ছাড়াও অন্য আর এক বিধ্বংসী আক্রমণ সারাদেশকে লজ্জায়, অপমানে আধোবদনও করে দেয় কয়েক লাখ অসহায় নারীর সম্ভ্রমহানিতার চরম নৃশংসতায়। দেশ এমনি এমনি স্বাধীনতা নামক মহান অর্জনকে ধরতে পারেনি। ৩০ লাখ প্রাণের বিনিময়ে আর অসংখ্য রমণীর কমনীয় শৌর্যকে ক্ষতবিক্ষতের পরিণাম থেকেই আসে মুক্তির স্বাদ। তখনকার নৃশংস আদিমতম অনাচার আর অত্যাচারের নির্মমতা ভোলা যায় না। মন থেকে মুছে ফেলতে কষ্ট হয় বেদনায় জর্জরিত হওয়াও মুক্তিযুদ্ধের অসহনীয় ক্ষতবিক্ষত আঁচড়। সঙ্গত কারণে বিজয় দিবস তার আগমনী বার্তা জানান দিলে অসংখ্য মানুষ হাহাকার, চিৎকারে জর্জরিত হন, যা বাঙালির হৃদয়কে আজও ভয়ঙ্কর সব স্মৃতি স্মরণ করিয়ে দেয়।
১৯৭১ সালের ১৬ ডিসেম্বরের ২ দিন আগে ১৪ ডিসেম্বর যে অকথ্য নির্যাতনে মেধা ও মননের ওপর প্রাণহানির সহিংসতা চালানো হয় তাও ইতিহাসের এক নির্মম যন্ত্রণা। দেশের সৃজন ও মনন দ্যোতনায় সিদ্ধ বুদ্ধিবৃত্তির মহানায়কদের পাশবিক নির্যাতনে পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেয়ার মাধ্যমে দেশের সভ্যতা সূর্যকে অস্তমিত করা অপচেষ্টা চালানো হয়েছিল, যা কখনও ভোলার মতো নয়। জাতিকে মেধাশূন্য করার যে ক্ষতবিক্ষত আঁচড় তা আজও বাঙালির মেধা ও মননে চিরস্থায়ী বেদনায় জর্জরিত হয়ে আছে। আর ৩০ লাখ শহীদানের আত্মোৎসর্গতায় যে বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা ও মুক্তির আস্বাদ জাতিকে পূর্ণ করে, সেখানে লাখো মুক্তি সংগ্রামীর মূল্যবান জীবনও কোনোভাবেই উপেক্ষিত হতে পারে না। বিজয় কেতনকে তার অবস্থানে নিয়ে যেতে আপামর বাঙালিকে যে মরণপণ যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়তে হয় তাও ঐতিহাসিক মহাদুর্বিপাক। 
স্বাধীন বাংলার স্থপতির অনন্য ভূমিকায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের দুঃসাহসিক আর ঐতিহ্যিক কর্মদ্যোতনা আজ অবধি স্বাধীন ও সমৃদ্ধির বাংলাদেশকে অভীষ্ট সোপানে পৌঁছে দিতে বদ্ধপরিকর। উত্তাল মার্চের অবিস্মরণীয় ঘটনাপঞ্জিতে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান যে ঐতিহাসিক দায়বদ্ধতায় নিজেকে সম্পূর্ণরূপে উৎসর্গ আর নিবেদন করেছিলেন তাও স্বাধীন বঙ্গভূমির অনন্য শৌর্য। ৭ মার্চের ঐতিহাসিক ভাষণ আজ অবধি বাংলার ইতিহাসের এক স্মরণীয় ও বরণীয় দলিল। যা বিশ্ব ঐতিহ্যের অংশীদার হতেও সময় লাগেনি। ভাষা সংগ্রাম, মুক্তিযুদ্ধের বিজয় কেতন আর স্বাধীন বাংলাদেশের সঙ্গে একীভূত হয়ে আছেন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। তাঁর স্বপ্নের সোনার বাংলা আজ আধুনিক ও প্রযুক্তির বাংলাদেশ থেকে স্মার্ট দেশে উপনীত হওয়া এক অবিস্মরণীয় গৌরবগাঁথা।

তাঁর কন্যা শেখ হাসিনার নিরন্তর কর্মযোগ আর পিতার রেখে যাওয়া স্বপ্নের পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্যে দেশাত্মবোধের অনন্য মহিমায় দেশকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন উন্নত বিশ্বের কাতারে। বঙ্গবন্ধুর আদর্শিক চেতনায় সমর্পিত হয়ে যারা দেশের পরাধীনতার শৃঙ্খল মুক্তির লড়াইয়ে উৎসর্গিত হয়েছেন তাদের আকাক্সক্ষা ছিল শুধু একটি স্বাধীন মাতৃভূমি। যেখানে বিজয় কেতন উড়িয়ে লাল সবুজের ঝলমলে পতাকা তুলে ধরা ছাড়াও মুক্ত দেশে নির্মল পরিবেশে আপামর জনগোষ্ঠীর জীবনমান হবে নিরাপদ। সেই স্বাধীন বাংলাদেশ তার উন্নয়নের পালাক্রমে ৫২ বছর অতিক্রম করার অনন্য মাহেন্দ্রক্ষণে। এ যেন বিস্ময়কর এক অভাবনীয় অনুভূতি। 
স্বাধীনতা শব্দটি আসলে কোনো বিশেষ ক্ষণ, দিন, মাসে আটকে থাকে না। তার বিস্তৃতি এত বেশি সম্প্রসারিত যে, মাস যুগ সেখানে বাহুল্য মাত্র। প্রতিবার বিজয় দিবস এলে নতুন করে স্বাধীনতার উপলব্ধি আসে বাঙালির মনে। যে উৎসারিত মনোশক্তিতে স্বাধীনতাকে বারবার স্বাগত, অভিনন্দন জানিয়েও মনে হয় কিছুই দেওয়া গেল না। আরও বহু কিছু দিতে হবে স্বাধীন দেশ আর জাতিকে। ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অনুভব, প্রচেষ্টা, সমর্পণ বৃহত্তর পরিবেশে একসঙ্গে মিলেমিলে স্বাধীনতাকে চিরস্থায়ী মর্যাদায় অভিষিক্ত করাই আপামর জনগোষ্ঠীর পরম চাওয়া-পাওয়া।

লেখক : সাংবাদিক

×