ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৯ ফাল্গুন ১৪৩২

টরন্টোর চিঠি

কানাডা-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন

ড. শামীম আহমেদ

প্রকাশিত: ২০:৫৪, ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৩

কানাডা-ভারত সম্পর্কে টানাপোড়েন

ড. শামীম আহমেদ

সম্প্রতি অটোয়া এবং দিল্লির মধ্যে যে কূটনৈতিক দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে, তাতে ভারতের প্রধানমন্ত্রীর চাইতে কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো বেশি সমস্যার সম্মুখীন বলে মনে হচ্ছে। জাস্টিন ট্রুডো ক্ষমতায় আসেন ২০১৫ সালে প্রবল জনপ্রিয়তার মধ্য দিয়ে। তার বাবা পিয়েরে ট্রুডোও অত্যন্ত জনপ্রিয় প্রধানমন্ত্রী ছিলেন এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সমর্থন জানিয়েছিলেন। বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গেও ট্রুডোর আন্তরিক সম্পর্ক বিদ্যমান। গণতন্ত্র এবং আইনের শাসনের পক্ষে কানাডার অবস্থান বিশ্বের শীর্ষে। তবুও প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন এবং কিছু বিঘিœত গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া থাকা সত্ত্বেও ট্রুডো বাংলাদেশে শেখ হাসিনা সরকারের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।

বাংলাদেশের জন্য তাই ট্রুডোর নেতৃত্বাধীন লিবারেল সরকার গুরুত্বপূর্ণ বন্ধু। তবে ট্রুডো গত বেশ কয়েকবছর ধরে দেশের ভেতরে এবং বাইরে উভয় জায়গায় নানা ধরনের প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হচ্ছেন। সমালোচিত হচ্ছেন তার সরকারের নানা কূটনৈতিক অবস্থানের জন্যেও। চীন, সৌদি আরব, রাশিয়ার মতো শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলোর পরে ভারতের সঙ্গেও তার সরকার সম্প্রতি বিরোধিতায় জড়াল। যদিও ট্রুডো মনে করছেন গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন কায়েমের ক্ষেত্রে তার দেশ অনমনীয় বিধায় তার ভারতের বিরুদ্ধে এই অভিযোগ আনা জরুরি ছিল। কিন্তু কূটনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে তা কতটুকু যৌক্তিক হলো সে প্রশ্ন থেকে যায়। 
কানাডায় আসার পর প্রথম জানতে পারি যে ভারতের শিখ সম্প্রদায় খালিস্থান নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র কায়েম করতে চায় ভারত থেকে বের হয়ে। কানাডায় নাগরিকত্ব নেওয়া ভারতীয়দের মধ্যে একটা বড় অংশ এসেছে পাঞ্জাব থেকে। তাদের অনেকেই শিখ সম্প্রদায় হিসেবে নিজেদের পরিচয় দেন এবং নিজস্ব সংস্কৃতি, ধর্ম রয়েছে। কানাডায় তারা বেশ একতাবদ্ধ এবং অর্থনৈতিকভাবেও সমৃদ্ধ। ভারত খালিস্থানের দাবিকে রাষ্ট্রবিরোধী হিসেবে আখ্যা দিয়েছে এবং কানাডার মাটিতে ভারত ভেঙে অন্য একটি দেশ প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে কানাডার কোনো কার্যকরী বিরোধিতা না দেখে হতাশা এবং উষ্মাও প্রকাশ করেছে। এর আগেও ভারতের কৃষকদের পক্ষে কানাডায় জোরদার আন্দোলন হয়েছে মাসের পর মাস এবং সেক্ষেত্রেও কানাডা সরকারের নিষ্ক্রিয়তা ভারত সরকারের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ককে শীতল করেছে।

ভারত বারবার বলেছে, তারা মনে করছে কানাডা সরকার প্রচ্ছন্নভাবে ভারতের উগ্র জাতীয়তাবাদী গোষ্ঠীকে কার্যত তাদের দেশে আশ্রয় ও সমর্থন দিয়ে আসছে এবং এটি অগ্রহণযোগ্য বলেও তারা মনে করে। অন্যদিকে কানাডা বলেছে, তারা যে কারও মতপ্রকাশের স্বাধীনতায় বিশ্বাসী এবং এ বিষয়ে তারা কোনো অবস্থান নেবে না। এখানে উল্লেখ্য যে, কোনো ভারতীয় কানাডার নাগরিকত্ব গ্রহণ করতে চাইলে তাকে ভারতের নাগরিকত্ব ত্যাগ করতে হয়। ভারত দ্বৈত নাগরিকত্ব অনুমোদন করে না। ফলশ্রুতিতে কানাডার অভ্যন্তরে যারা স্বাধীন খালিস্থানের দাবি করছে, ভারত তাদেরকে কানাডিয়ান নাগরিক হিসেবে উল্লেখ করে এবং এটি কানাডিয়ানদের ভারতের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে নাক গলানো হিসেবে উল্লেখ করেছে। নানা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মোদি কানাডার প্রধানমন্ত্রীকে এই বিষয়ে শক্ত অবস্থান নিতে বললেও কানাডা তা না করায় তাদের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্কের অবনমন হয়েছে। 
সম্প্রতি ভারতে অনুষ্ঠিত জি-২০ অধিবেশনে ভারত সরকার ট্রুডোকে কার্যত একঘরে করে রাখে এবং তার সঙ্গে শীতল ব্যবহার করে। এমনকি এমনভাবে এই সম্মেলনের নানা অধিবেশন এবং দ্বিপাক্ষিক সভাগুলো নির্ধারণ করে, যাতে কানাডাকে কোনো গুরুত্ব দেওয়া হয়নি। এছাড়াও মোদি ট্রুডোকে বেশ কড়া ভাষায় তার শঙ্কার কথা এই অধিবেশনে জানান বলেও জানা গেছে। মোটামুটি একঘরে এবং অপমানিত জাস্টিন ট্রুডো কানাডায় ফিরে তার প্রতিক্রিয়ায় এই ধরনের কঠিন অভিযোগ ভারতের বিরুদ্ধে এনেছে বলে মনে হয়েছে। এটি খেয়াল রাখা দরকার যে, কানাডা রাষ্ট্র হিসেবে অত্যন্ত ভদ্র হিসেবে বিবেচিত এবং জাস্টিন ট্রুডোও একজন ‘সফট স্পোকেন’ নেতা হিসেবে পরিচিত। তাই ট্রুডো যেভাবে গত সপ্তাহে প্রেস কনফারেন্সে ভারতের কূটনৈতিক একজন কানাডিয়ান শিখ সম্প্রদায়ের নাগরিককে খুনের বিষয়ে সরাসরি অভিযুক্ত করেন, তা অনেককেই বিস্মিত করেছে।

এই প্রতিবাদ কূটনৈতিক ভাষায় কিংবা কূটনৈতিক ‘চ্যানেলে’ও জানানো যেত। কিন্তু তা না করে ট্রুডো কার্যত সরাসরি বিবাদে জড়িয়েছেন বলেই অনেকে মনে করছে। কানাডার এই অভিযোগ যে অসত্য এমনটি বলা যাচ্ছে না। ভারতের যে কূটনৈতিককে দায়ী উল্লেখ করে বহিষ্কার করেছে কানাডা, তিনি মূলত কানাডায় ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর প্রধান। শক্তিশালী রাষ্ট্রগুলো সাধারণত তাদের গুরুত্বপূর্ণ হাই কমিশন বা এম্বেসিগুলোতে শীর্ষ গোয়েন্দা নিয়োগ দিয়ে থাকে এবং এটি গোপন কিছু নয়। কূটনৈতিকরা যে কোন দেশে ‘ইনডেমনিটি’ পেয়ে থাকেন। ফলশ্রুতিতে তারা খুনের মতো বড় অপরাধে জড়িত থাকলেও সে দেশের রাষ্ট্র তার বিরুদ্ধে কোনো আইনগত ব্যবস্থা নিতে পারে না বহিষ্কার করা ছাড়া। কানাডাও ঠিক তাই করেছে। কিন্তু করার ধরনটা ছিল আক্রমণাত্মক এবং সরাসরি ভারতকে যুদ্ধে আমন্ত্রণ জানানোর শামিল। 
কানাডার কাছে থাকা তথ্য যদিও তারা প্রকাশ্যে কারও সঙ্গে ‘শেয়ার’ করেনি। কিন্তু দুটি কারণে সবাই মনে করছে এই তথ্য সত্য। প্রথমত, কানাডা রাষ্ট্র হিসেবে গণতন্ত্র এবং শিষ্টাচার বজায় রাখার ক্ষেত্রে সমগ্র বিশ্বে শীর্ষে অবস্থান করছে। ট্রুডোও একজন রাজনীতিক হিসেবে নীতিগত অবস্থান থেকে সততার পরিচয় দিয়েছেন সবসময়। তাই ব্যক্তিগত উষ্মার ভিত্তিতে তিনি সরাসরি ভিত্তিহীন অভিযোগ আনবেন এমনটি কেউ ভাবছেন না। দ্বিতীয়ত, কানাডা, আমেরিকা, যুক্তরাজ্য, অষ্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ড ‘ফাইভ আইজ এলায়েন্স’ বলে একটি গোয়েন্দা তথ্য ভাগাভাগি নেটওয়ার্কের সদস্য বহু বছর ধরে। অর্থাৎ এই ৫টি দেশ তাদের সকল গুরুত্বপূর্ণ গোয়েন্দা তথ্য একে অপরের সঙ্গে শেয়ার করে। তাই ইমিগ্রেশন ভিসা ইত্যাদির ক্ষেত্রে এই ৫টি দেশের একটি দেশ কোনো ব্যক্তির বিষয়ে হ্যাঁ বা না বলা মানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই তাতে ৫টি দেশেরই সহমত হওয়া নির্দেশ করে।

এটি পরিষ্কার যে, ভারতের গোয়েন্দা প্রধানের কানাডার মাটিতে এই হত্যাকা-ে জড়িত থাকার বিষয়ে কানাডার কাছে যে তথ্য আছে, তা তারা ফাইভ আইজ এলায়েন্সের অন্য দেশগুলোর সঙ্গে আগেই শেয়ার করেছিল এবং তারাও এই তথ্য-প্রমাণে সন্তুষ্ট। তবে কূটনৈতিক সূূত্রে জানা গেছে যে, কানাডা এই অভিযোগ উত্থাপনের পরে তার বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর সমর্থন চেয়েছিল একই অভিযোগে ভারতকে অভিযুক্ত করতে কিংবা তাদের সরাসরি সমর্থন দিতে। কিন্তু দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য সেটি ঘটেনি। ধারণা করা হচ্ছে, পশ্চিমা বিশ্বের বন্ধু রাষ্ট্রগুলোর এই বিষয়ে প্রকাশ্যে ভূমিকা নিতে অপারগতা কানাডা বিশেষত জাস্টিন ট্রুডোকে ক্ষুব্ধ করেছে এবং তিনি একাই ভারতকে অভিযুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেন।

কানাডার সঙ্গে এত ভাল সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও ফাইভ আইজ এলায়েন্স রাষ্ট্রগুলো কেন তার পক্ষে সরাসরি অবস্থান নিল না, সেটি বুঝতে হলে আমাদের দেখতে হবে ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তির দিকে। চীনের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ও শত্রুভাবাপন্ন সম্পর্কের কারণে পশ্চিমা দেশগুলো ভারতকে গুরুত্ব দিচ্ছে ইন্দো প্যাসিফিকে তাদের শক্তি বাড়ানোর জন্য। এছাড়াও ভারতের অর্থনীতি ২০৩০ সালে জাপান ও জার্মানিকে ছাড়িয়ে তৃতীয় অবস্থানে চলে আসবে। ঠিক আমেরিকা ও চীনের পরেই। তাই তাদের অর্থনৈতিক গুরুত্ব অপরিসীম। যুক্তরাজ্য অল্প কিছুদিনের মধ্যে ভারতের সঙ্গে একটি ‘ফ্রি ট্রেড’ চুক্তি সম্পাদন করতে চাচ্ছে। তাই এই মুহূর্তে তারা সরাসরি ভারতের সঙ্গে কোনো বিরোধে জড়াবে না এবং এই চুক্তি সাধনের আলোচনায় এই ঘটনার উল্লেখ করবে না বলে ইতোমধ্যেই জানিয়ে দিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্র বলেছে, তারা কানাডার এই অভিযোগগুলোকে গুরুত্ব দিয়ে দেখছে এবং তদন্তের শেষ দেখার বিষয়ে আগ্রহী। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ দেশগুলোও সতর্ক মন্তব্য করেছে। রাশিয়া এবং চীনকে ‘শিক্ষা’ দিতে পশ্চিমা বিশ্বগুলো ভারতকে বন্ধু হিসেবে বেছে নিয়েছে এবং কানাডার অনুরোধে কোনোভাবেই সেই অবস্থান থেকে সরে আসতে চাচ্ছে না, যদিও তারা জানে কানাডার অভিযোগ সম্ভবত সত্য। এটি মনে রাখা দরকার, পশ্চিমা দেশগুলো ঐতিহাসিকভাবেই গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন কায়েমের ক্ষেত্রে সবসময় আগে নিজের স্বার্থ নিশ্চিত করে। বন্ধুর ক্ষেত্রে এইসব বিষয়ের সত্যতা তাদের বিচলিত করে না। বরং এটি জানা গেছে যে, জাস্টিন ট্রুডোর এই প্রকাশ্য ঘোষণায় তারা সবাই একটি অস্বস্তির মধ্যে আছে। অনেকটা শ্যাম রাখি না কুল রাখি অবস্থা তাদের। 
জাস্টিন ট্রুডো গত কয়েক বছর ধরেই দেশের অভ্যন্তরে জনপ্রিয়তা হারাচ্ছেন। দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধি, বাসা ভাড়া এবং বাড়ির দাম নাগালের বাইরে চলে যাওয়া, দেশের অভ্যন্তরে দুর্বল হওয়া অর্থনীতিকে গুরুত্ব না দিয়ে আমেরিকার প্ররোচনায় ইউক্রেনকে হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্ধ দেওয়া, দেশের নাগরিকদের জীবন মানের উন্নয়ন করে প্রতিবছর লাখ লাখ ইমিগ্রেন্টকে আনা ইত্যাদি কারণে তিনি বর্তমানে আগের মতো জনপ্রিয় নেই। জরিপে দেখা যায়, বিরোধী দলের চাইতে তার দল জনপ্রিয়তায় ১২ পয়েন্ট পিছিয়ে আছে। ট্রুডোর এই অভিযোগ এবং কূটনৈতিক বহিষ্কারের প্রতিক্রিয়ায় ভারতও কানাডার একজন কূটনৈতিককে বহিষ্কার করেছে এবং বলেছে, কানাডার অন্য কূটনৈতিকদেরও ফিরিয়ে দিতে। কারণ, সাধারণ মানুষের ক্রমবর্ধমান অসন্তোষের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের মাটিতে তাদের নিরাপত্তা বিঘিœত হতে পারে।

এছাড়াও ভারত কানাডিয়ানদের ভিসা প্রসেস করা স্থগিত করেছে, যার মূল শিকার হবে কানাডায় অবস্থানরত অন্তত ১৪ লাখ ভারতীয় কানাডিয়ান। ধারণা করা হচ্ছে, ভারত আরও প্রতিহিংসামূলক ব্যবস্থা নিতে পারে আগামী দিনগুলোতে। অতীত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, পশ্চিমা দেশগুলো প্রয়োজন মতো শত্রুকে বন্ধু বানাতে সিদ্ধহস্ত হলেও কানাডার প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডো সেক্ষেত্রে অতটা সিদ্ধহস্ত নন। গত অর্ধযুগে যাদের সঙ্গে কানাডার সম্পর্ক খারাপ হয়েছে, যেমন- চীন, রাশিয়া, সৌদি আরব-  কারও সঙ্গেই তাদের সম্পর্ক আর ভালো হয়নি। সার্বিকভাবে কানাডা এবং জাস্টিন ট্রুডো হয়তো গণতন্ত্র এবং আইনের শাসন বিবেচনায় সঠিক কিন্তু কূটনৈতিক ক্ষেত্রে ব্যর্থ, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। অন্যদিকে পশ্চিমা বিশ্বের মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা, চাঁদের অন্ধকার দিকে প্রথম যান পাঠানোর অহংকার এবং দেশের ভেতর ব্যাপক জনসমর্থন মোদিকে বর্তমানে ‘কনফিডেন্স’ দিচ্ছে। সর্বোপরি পরিস্থিতির আশু উন্নয়নের কোনো সুযোগ  দেখছি না। 
টরন্টো, কানাডা
২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ 

×