ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বৃহস্পতিবার ভাষণ দেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেছেন, জনগণের রাজনৈতিক এবং অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ছাড়া দেশে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব নয়। জাতীয় অগ্রগতি ও উন্নয়নের জন্য সরকারি ও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা জাতির কাছে দায়বদ্ধ। ব্যক্তির চেয়ে দল বড়, দলের চেয়ে দেশ বড়- এ বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ হয়ে সবাই মিলেমিশে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করলে আমরাই ভবিষ্যত প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ বাংলাদেশ গঠন করতে সক্ষম হব, ইনশা আল্লাহ।
বৃহস্পতিবার স্পিকার মেজর (অব) হাফিজ উদ্দিন আহমদ বীরবিক্রমের সভাপতিত্বে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি এসব কথা বলেন। তিনি বলেন, গণঅভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে ফ্যাসিবাদী সরকারের পতন ঘটেছে।
রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে বলেন, রাষ্ট্র পরিচালনার সকল কার্যক্রমে জনগণের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠা ও চর্চার ক্ষেত্রে বর্তমান সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। একটি ভঙ্গুর অর্থনৈতিক পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে সরকার একটি ন্যায়ভিত্তিক, মানবিক, স্বনির্ভর ও গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার পথে এগিয়ে চলেছে। এক্ষেত্রে নবগঠিত সরকারের সামনে দারিদ্র্য বিমোচন, দুর্নীতি দমন ও আইন-শৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই বিরাট চ্যালেঞ্জ।
তিনি বলেন, পথ কঠিন হলেও রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে এই বাধা অতিক্রম অসম্ভব নয়। সরকারি এবং বিরোধী দলগুলো ঐকমত্যের ভিত্তিতে কাজ করলে খুব সহজেই দ্রুততার সঙ্গে লক্ষ্যে পৌঁছানো যাবে। যেসব পরিকল্পনাকে সামনে রেখে বর্তমান সরকার জনরায়ে সরকার গঠন করতে সক্ষম হয়েছে, সে অনুযায়ী কাক্সিক্ষত লক্ষ্যে দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে বলে আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি।
রাষ্ট্রপতি বলেন, ১৯৭১ সালের বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের অর্জন, ২০২৪ সালের দেশ এবং জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার যুদ্ধসহ এ যাবৎকালে দেশের ইতিহাসে সকল গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদদের আকাক্সিক্ষত বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার কার্যক্রম অব্যাহত রেখেছে।
রাষ্ট্রপতি বলেন, বর্তমান সরকার ‘করব কাজ, গড়ব দেশ, সবার আগে বাংলাদেশ’ নীতি নিয়ে কাজ করছে। দুর্নীতি দমন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণ বর্তমান সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার। নারীর উন্নয়নকে গুরুত্ব দিয়ে বর্তমান সরকার দেশের প্রতিটি পরিবারকে ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার ব্যবস্থা সরকার করেছে বলেন রাষ্ট্রপতি। তিনি দারিদ্র্য বিমোচন, সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের নেওয়া বিভিন্ন পদক্ষেপ তুলে ধরেন।
নারীদের জন্য স্নাতকোত্তর পর্যন্ত অবৈতনিক পড়াশোনা ও ক্ষুদ্র ঋণ কর্মসূচি সরকার নিয়েছে বলেন রাষ্ট্রপতি। প্রতিবছর ৫ কোটি বৃক্ষরোপণের কাজ শুরু হয়েছে বলে জানান তিনি। সামাজিক, প্রযুক্তি, অর্থনৈতিক, আইনশৃঙ্খলা বিভিন্ন ক্ষেত্রে সরকারের নেওয়া নানা পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন রাষ্ট্রপতি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের উদ্বোধনী ভাষণে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন মহান মুক্তিযুদ্ধের লাখো শহীদ এবং বীর মুক্তিযোদ্ধাদের শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করেছেন। তিনি বলেন, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে আজকের এই স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশ। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান বীর উত্তম, স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসের সব অবিসংবাদিত নেতার অবদানকেও আমি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি। আমি, তিনবারের নির্বাচিত সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির সাবেক চেয়ারপারসন, দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়ার অবদানকে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করছি, যিনি দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেছেন। গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে প্রতিবার সামনের কাতারে থেকে আপসহীন নেতৃত্ব দিয়েছেন।
রাষ্ট্রপতি বলেন, একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই মহান সংসদের যাত্রা শুরু হলো। বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে এই নির্বাচনে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ গণতন্ত্রের ইতিহাসে উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে।
মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের এই উদ্বোধনী অধিবেশন বাংলাদেশের ইতিহাসে এক ঐতিহাসিক মুহূর্ত। একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিয়ে এই মহান জাতীয় সংসদের যাত্রা শুরু হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও এই নির্বাচন আয়োজনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি আন্তরিক অভিনন্দন।
তিনি বলেন, ‘অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আয়োজনের জন্য নির্বাচন কমিশন, মাঠ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের নিরলস পরিশ্রম, নির্বাচনে অংশগ্রহণকারী সব রাজনৈতিক দল ও ব্যক্তির আন্তরিক উদ্যোগ এবং সাধারণ জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ভবিষ্যতের জন্য একটি উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে থাকবে। বর্তমান সংসদে বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি ও সমমনা দলগুলো দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে বিপুল ভোটে জয়লাভ করেছে। আমি এই সংসদে আপনার মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং তার নেতৃত্বে গঠিত নতুন সরকারকে আন্তরিক অভিনন্দন জানাচ্ছি। আমি এই মহান জাতীয় সংসদে নির্বাচিত সব সংসদ সদস্যকেও অভিনন্দন জানাচ্ছি।’
রাষ্ট্রপতি তাঁর ভাষণে বলেন, হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়েছে। বাংলাদেশে গণতন্ত্রের ইতিহাসে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট মাসে ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থান একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। সবার সম্মিলিত আন্দোলনে ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে। আওয়ামী লীগ বাংলাদেশকে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বানিয়ে ২০০১ সালের জুনে ক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়।
তিনি বলেন, ২০০১ সালের অক্টোবরে পূর্ববর্তী সরকারের রেখে যাওয়া দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশের দায়িত্ব নিয়ে বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন সরকার দুর্নীতি দমনে কঠোর পদক্ষেপ গ্রহণ করে। এছাড়া দুর্নীতি প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪ প্রণয়ন করে। এর ফলে বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়ন হওয়ার কলঙ্ক থেকে মুক্তি পায় বাংলাদেশ।
মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, কোটা সংস্কার আন্দোলন এক পর্যায়ে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী আন্দোলনে রূপ নেয়। দেশের ছাত্র-জনতা, কৃষক-শ্রমিক, শিক্ষক, সাংবাদিক, বুদ্ধিজীবী, প্রবাসী তথা সব শ্রেণি-পেশার মানুষ, গণতন্ত্রের পক্ষের রাজনৈতিক দলসহ সবার সম্মিলিত আন্দোলনের ফলে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট তৎকালীন ফ্যাসিস্ট সরকারের পতন ঘটে। হাজারো শহীদের রক্তের ওপর দিয়ে তাঁবেদার ও ফ্যাসিবাদমুক্ত নতুন গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের সূচনা হয়।
তিনি বলেন, ‘আমি ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে শহীদ ও আহতদের এবং দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে গুম, খুন, বিচার বহির্ভূত হত্যাকা- এবং ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলনে নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার সাধারণ মানুষ ও রাজনৈতিক দলের সদস্যদের কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করছি, যাদের অসামান্য ত্যাগের মাধ্যমে বাংলাদেশ ফ্যাসিবাদমুক্ত হয়ে গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানে সহস্রাধিক মানুষ শহীদ হয়েছেন। নারী, পুরুষ, শিশুসহ আহত ও পঙ্গু হয়েছেন কমপক্ষে ৩০ হাজার মানুষ। পাঁচ শতাধিক মানুষ চোখ হারিয়ে অন্ধত্ব বরণ করেছেন।’
রাষ্ট্রপতি বলেন, ২০০৬ সালের অক্টোবর মাসে বিএনপি যখন রাষ্ট্রক্ষমতা থেকে বিদায় নেয়, তার অনেক আগেই বিশ্বে দুর্নীতিতে চ্যাম্পিয়নের কলঙ্ক থেকে মুক্ত হয়ে বাংলাদেশ এশিয়ার ইমার্জিং টাইগার হিসেবে স্বীকৃতি পায়। এবারও দুর্নীতি দমন এবং আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণই হবে বর্তমান সরকারের প্রথম এবং প্রধান অগ্রাধিকার।
রাষ্ট্রপতি ব্যাংক খাতের সুশাসন ফিরিয়ে আনা এবং পুঁজিবাজারের অনিয়ম তদন্তে কঠোর পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ব্যাংক খাতে জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এবং খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণে অর্থনৈতিক সংস্কার কমিশন গঠন করা হবে। পাশাপাশি পুঁজিবাজার সংস্কারে একটি পৃথক কমিশন গঠন করা হবে; যার মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শাসনামলে হওয়া সব অনিয়ম তদন্ত হবে।
তিনি বলেন, ২০২৩-২৪ অর্থবছরের তুলনায় ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বাংলাদেশের অর্থনীতি অনেকটা স্থিতিশীল হয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারি মাসে মূল্যস্ফীতি কমে ৮ দশমিক ৫৮ শতাংশে দাঁড়িয়েছে; যা সামনের দিনগুলোতে আরও কমবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়াও ২০২৬ সালের ১৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ৩৪ দশমিক ৭৮ বিলিয়ন ইউএস ডলারে উন্নীত হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বলেন, আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। বর্তমান সরকার বিচার বিভাগের কার্যকর স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, মামলার জট হ্রাস ও বিচারপ্রাপ্তি হয়রানিমুক্তকরণ, দুর্নীতিমুক্তকরণে বিচারসেবার আধুনিকায়ন, বিচারপতি নিয়োগ আইন প্রণয়ন, জুডিশিয়াল কমিশন গঠন, সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিল ব্যবস্থার ধারাবাহিকতা রক্ষায় কাজ করছে। আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয় কর্তৃক অন্তবর্তীকালীন সরকারের মেয়াদে ২০টি অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।
নতুন সংসদের সাফল্যে কামনা করে রাষ্ট্রপতি বলেন, ফ্যাসিবাদী শাসনামলে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান নির্বাচন কমিশনের প্রতি জন-আস্থা শূণ্যের কোঠায় নামিয়ে আনা হয়েছিল। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে এসেছে। নির্বাচন কমিশন যাতে জনগণের আস্থা ও বিশ্বাসে বলীয়ান থাকতে পারে বর্তমান সরকার আগামী দিনের নির্বাচনি কার্যক্রমে সেটি সমুন্নত রাখবে। নির্বাচন কমিশনের মতো দেশের প্রতিষ্ঠানগুলো যাতে আইনানুযায়ী স্বাধীনভাবে নিজেদের কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে বর্তমান সরকার সেটি নিশ্চিত করবে।
এর আগে, রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে ভাষণ দেওয়ার জন্য অনুরোধ জানান স্পিকার হাফিজ উদ্দিন। এ সময় বিরোধী দল জামায়াত ও এনসিপির সংসদ সদস্যরা দাঁড়িয়ে প্রতিবাদ জানান। তাদের হাতে বিভিন্ন স্লোগান লেখা প্ল্যাকার্ড দেখা যায়। প্ল্যাকার্ডে জুলাই নিয়ে গাদ্দারি চলবে না, জুলাইয়ের সঙ্গে বিশ্বাসযোগ্যতা বন্ধ করসহ বিভিন্ন স্লোগান লেখা রয়েছে। স্পিকার এ সময় সবাইকে শান্ত থাকতে আহ্বান জানান। তবে শেষ পর্যন্ত অধিবেশন থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধী দলের সদস্যরা।
প্যানেল হু








