ঢাকা, বাংলাদেশ   শুক্রবার ১৩ মার্চ ২০২৬, ২৮ ফাল্গুন ১৪৩২

হট্টগোলের মধ্যে ভাষণ দিলেন রাষ্ট্রপতি

প্রথম দিনেই বিরোধী দলের ওয়াকআউট

সংসদ রিপোর্টার

প্রকাশিত: ০০:২২, ১৩ মার্চ ২০২৬

প্রথম দিনেই বিরোধী দলের ওয়াকআউট

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি বক্তব্য প্রদানকালে বিরোধীদলীয় সদস্যরা হাতে প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিবাদ জানায়

বিরোধী দলের ওয়াকআউটে সূচনা হলো ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের। বৃহস্পতিবার সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতির ভাষণের প্রতিবাদ জানাতে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন বিরোধী দলের এমপিরা স্লোগান, প্ল্যাকার্ড নিয়ে প্রতিবাদ জানানোর সময় ব্যাপক হট্টগোলের সৃষ্টি হয়। তীব্র প্রতিবাদ ও হট্টগোলের মধ্যেই ভাষণ দিতে হয় রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনকে।

এক পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্যরা সংসদ থেকে ওয়াকআউট করে চলে যান। বৃহস্পতিবার বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে রাষ্ট্রপতি মোহাম্মদ সাহাবুদ্দিন ভাষণ শুরু করলে প্রথমে বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান ‘না না না’ বলে প্রতিবাদ করতে থাকেন। এ সময় রাষ্ট্রপতির উদ্দেশে জুলাইয়ের গাদ্দার লেখা সম্বলিত প্ল্যাকার্ড প্রদর্শন করেন বিরোধী দলের এমপিরা।
অধিবেশন চলাকালে বেলা ৩টা ৪০ মিনিটে সংসদের অধিবেশন কক্ষে রাষ্ট্রপতির আগমন বার্তা ঘোষণা করেন স্পিকার মেজর (অব.) হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এ সময় বিরোধী সদস্যরা বিক্ষোভ শুরু করেন। বিক্ষোভের মধ্যেই বিউগলের সুর বেজে ওঠে। অধিবেশন কক্ষে প্রবেশ করেন রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন। তিনি স্পিকারের ডান পাশে রাখা নির্ধারিত আসনের সামনে দাঁড়ান। তখন জাতীয় সংগীত বেজে ওঠে এবং অধিবেশন কক্ষের মনিটরে জাতীয় পতাকা প্রদর্শিত হয়। সরকার দলীয় সদস্যরা দাঁড়িয়ে শ্রদ্ধা জানালেও বিরোধী জোটের সদস্যরা বসে পড়েন। প্রথমে বিরোধীদলীয় সদস্যরা বসে থাকলেও জাতীয় সংগীতের মাঝ পর্যায়ে বিরোধীদলীয় সদস্যরাও দাঁড়ান।
জাতীয় সংগীত পরিবেশন শেষে নির্ধারিত আসনে বসেন রাষ্ট্রপতি। অন্যদিকে প্ল্যাকার্ড হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করতে থাকেন জামায়াত-এনসিপি জোটের সদস্যরা। তারা রাষ্ট্রপতিকে উদ্দেশ করে ‘খুনি’, ‘কিলার চুপ্পু’, ‘ফ্যাসিস্ট চুপ্পু’, ‘গেট আউট চুপ্পু’ বলতে থাকেন। তাদের শৃখলা বজায় রাখার জন্য বারবার অনুরোধ জানান স্পিকার। আর রাষ্ট্রপতি তার জন্য নির্ধারিত ভাষণ ডায়াসের সামনে দাঁড়িয়ে থাকেন। বিরোধীদলীয় উপনেতা ডা. আব্দুল্লাহ মো. তাহের, চিফ হুইপ নাহিদ ইসলাম ও হাসনাত আব্দুল্লাহর নেতত্বে স্লোগান দিতে থাকেন। 
এ সময় তারা বলেন, ‘ফ্যাসিবাদ-গণতন্ত্র এক সঙ্গে চলবে না’, ‘ফ্যাবিবাদের দোসররা, হুঁশিয়ার সাবধান’। তারা টেবিল চাপড়ে ও চিৎকার করে অধিবেশন কক্ষে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি করেন। এই হট্টগোলের মধ্যে বিএনপির কয়েকজন এমপি বলতে থাকেন, আপনারা কাজটি ঠিক করছেন না, রাষ্ট্রপতিকে অর্ধেক মানছেন, অর্ধেক মানছেন না। তাকে অসম্মান করছেন। বেশিরভাগ সরকার দলীয় সদস্যরা চুপচাপ বসে ছিলেন।
বিক্ষোভকালে মাইক ছাড়াই বিরোধী দলের পক্ষ থেকে রাষ্ট্রপতিকে ইমপিচমেন্ট, পদত্যাগ ও গ্রেপ্তারের দাবি জানানো হয়। বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান মাইক ছাড়াই বলেন, ‘এই রাষ্ট্রপতি স্বৈরাচার ও ফ্যাসিবাদের সহযোগী, দালাল। এই সংসদে আমরা তার ভাষণ মেনে নিতে পারি না।’
এ পর্যায়ে হাসনাত আব্দুল্লাহ আসন ছেড়ে রাষ্ট্রপতির ডায়াসের দিকে তেড়ে যান। কিন্তু তাকে বাধা দেন বিরোধী দলীয় উপনেতা। তিনি দুই হাত প্রসারিত করে বিরোধী দলীয় সদস্যদের বাইরে নিয়ে যান।
প্রায় চার মিনিট অচলাবস্থার পর রাষ্ট্রপতি তার ভাষণ শুরু করেন। এরমধ্যেও বিরোধী দলের বিক্ষোভ চলতে থাকে। এক পর্যায়ে স্লোগান দিতে দিতে সংসদ থেকে ওয়াকআউট করেন বিরোধীদলীয় সদস্যরা। পরে রাষ্ট্রপতি তার নির্ধারণ ভাষণ শেষ করেন এবং স্পিকার অধিবেশন মূলতবি করেন।
রাষ্ট্রপতি তিনটি কারণে অপরাধী- জামায়াত আমির ॥ ‘রাষ্ট্রপতি তিনটি কারণে অপরাধী, তার বক্তব্য আমরা এই মহান সংসদে শুনতে পারি না’ বলে মন্তব্য করেছেন বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান। 
বৃহস্পতিবার জাতীয় সংসদের অধিবেশন চলাকালে রাষ্ট্রপতির ভাষণ ঘিরে বিরোধী দলের ওয়াকআউটের পর বাইরে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলার সময় এই মন্তব্য করেন তিনি। 
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘এই সংসদ জুলাই শহীদের রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। আমরা অনুরোধ করেছিলাম, যারা ফ্যাসিস্ট সরকারের দোসর ছিল তারা যেন এখানে কোনো বক্তব্য রাখতে না পারে।’ 
এ সময় রাষ্ট্রপতির বিরুদ্ধে তিনটি অভিযোগ তুলে ধরেন জামায়াত আমির- প্রথমত তিনি অতীতে সংঘটিত হত্যাকা-ের বিরুদ্ধে কোনও অবস্থান নেননি। তার ভাষায়, ‘রাষ্ট্রের অভিভাবক হিসেবে তিনি সেই সময়ের কোনো খুনের বিরুদ্ধেই প্রতিবাদ করেননি এবং কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেননি।’ 
দ্বিতীয় অভিযোগ হিসেবে তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্ট জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে রাষ্ট্রপতি বলেছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পদত্যাগ করেছেন এবং তিনি তা গ্রহণ করেছেন। কিন্তু পরবর্তীকালে বিভিন্ন গণমাধ্যমে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি সেই বক্তব্য অস্বীকার করেছেন।’ এতে তিনি জাতির সামনে ‘মিথ্যাবাদী’ হিসেবে প্রমাণিত হয়েছেন বলে দাবি করেন শফিকুর রহমান। 
তৃতীয় অভিযোগের প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘জুলাই অভ্যুত্থানের পর নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংস্কার পরিষদের সদস্য ও সংসদ সদস্য- এই দুই ভূমিকায় দায়িত্ব পালনের বিষয়টি একটি অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছিল। কিন্তু গেজেট প্রকাশের ৩০ দিনের মধ্যে সংস্কার পরিষদের অধিবেশন আহ্বান করার কথা থাকলেও রাষ্ট্রপতি তা করেননি।’ 
শফিকুর রহমান দাবি করেন, গণভোটে ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁ’ ভোট দিলেও সেই অনুযায়ী উদ্যোগ না নেওয়ায় রাষ্ট্রপতি জনগণকে অসম্মান করেছেন।  এসব কারণেই তারা রাষ্ট্রপতির ভাষণ শুনতে রাজি নন বলে জানান তিনি। একই সঙ্গে সরকারি দলকে রাষ্ট্রপতির ভাষণ বন্ধ করার আহ্বান জানানো হলেও তাদের সেই আহ্বান গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ করেন তিনি। 
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ‘আমরা সংক্ষুব্ধ হয়ে সংসদ থেকে বের হয়ে এসেছি। ভবিষ্যতেও সংসদে কোনও অন্যায় হলে আমরা তার বিরুদ্ধে অবস্থান নেবো এবং জনগণের অধিকার রক্ষায় লড়াই চালিয়ে যাবো।’
এটা বিরোধী দলের স্ববিরোধিতা : স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী 
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের ভাষণ চলাকালে বিরোধী দলের ওয়াক-আউট ও প্রতিবাদের ঘটনাকে কেন্দ্র করে মুখ খুলেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহ উদ্দিন আহমদ।
তিনি বিরোধী দলের এই অবস্থানের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বলেন, ‘এই রাষ্ট্রপতিই ৫ ও ৬ আগস্ট তাদের সঙ্গে আলোচনা করেছেন এবং তাঁর কাছেই অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টারা শপথ নিয়েছেন। তাদের দু-একজন এই সংসদেও আছেন। তাহলে এখন এই বিরোধিতা কেন?’
বৃহস্পতিবার বিকেলে সংসদ অধিবেশন মুলতবি হওয়ার পর সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা বলেন।
বিরোধীদলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমানের বক্তব্যের প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘যে রাষ্ট্রপতির সঙ্গে তারা ৫ আগস্টের বিকাল বেলা এবং ৬ আগস্ট আলাপ-আলোচনা করেছেন, যাদের উপস্থিতিতে অন্তর্বর্তী সরকার শপথ নিয়েছে- সেই রাষ্ট্রপতিকে আজ কেন অস্বীকার করা হচ্ছে? তাদের দলের (বিরোধী দল) দু-একজন তো এই সংসদের সদস্য হিসেবেও শপথ নিয়েছেন। এই স্ববিরোধিতা কেন, সেটা তাদেরই জিজ্ঞেস করা উচিত।’
তবে সংসদীয় গণতন্ত্রে ওয়াক আউটকে একটি স্বাভাবিক সংস্কৃতি হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘গণতান্ত্রিক কালচারে ওয়াক আউট নতুন কোনও ঘটনা নয়, তারা এটি করতেই পারেন।’
সংসদ কেমন হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, ‘অবশ্যই সংসদ অর্থবহ হবে। এটি হবে জাতীয় সব সমস্যা ও ইস্যুর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু। আমরা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের পথে হাঁটবো। ফ্যাসিবাদবিরোধী যে জাতীয় ঐক্য আমাদের মধ্যে সৃষ্টি হয়েছে, সেই ঐক্য আমরা ধরে রাখব এবং জাতীয় যে কোনো ইস্যুতে ঐক্যবদ্ধভাবে এগিয়ে যাব।’

প্যানেল হু

×