ঢাকা, বাংলাদেশ   রোববার ১০ ডিসেম্বর ২০২৩, ২৬ অগ্রাহায়ণ ১৪৩০

প্রসঙ্গ ইসলাম

মহানবীর (স.) মহাজন্মোৎসব

মনিরুল ইসলাম রফিক

প্রকাশিত: ২০:৪৯, ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৩

মহানবীর (স.) মহাজন্মোৎসব

প্রসঙ্গ ইসলাম

লাখো কোটি রাসুল প্রেমিক মুমিন মুসলমানের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পাক্ সকাশে নিবেদন করছি অসংখ্য দরুদ ও সালাম। আজ ঐতিহাসিক ১২ রবিউল আউয়াল-কুল মাখলুকাতের জন্য সে অবিস্মরণীয় দিন– যেদিন (খ্রি. ৫৭০ সাল) কুসংস্কারাচ্ছন্ন পথহারা মানুষের তিমির আকাশে এক অত্যুজ্জ্বল নক্ষত্রের ন্যায় সর্বশক্তিমান আল্লাহ তায়ালা গোটা সৃষ্টির জন্য শান্তির পয়গাম্বররূপে পাঠিয়েছিলেন পৃথিবীর সর্বকালের সর্বযুগের শ্রেষ্ঠ মহামানব হযরত মুহাম্মদকে (স.)। ৬৩ বছর বয়সে ৬৩২ খ্রিস্টাব্দের এই দিনেই তিনি তাঁর জীবনের চূড়ান্ত সফলতা প্রদর্শন করে ওফাতপ্রাপ্ত হন। তাই তাঁর বেলাদত ও ওফাত দুদিক দিয়েই দিনটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। তবে অধিকাংশ উম্মতে মুহাম্মদীর কাছে এদিন ‘ঈদে মিলাদুন্নবী (স.) বা নবীজীর জন্মোৎসব নামেই অধিক স্মরণীয়-বরণীয় হয়ে আছে।
বছর ঘুরে দিনটি আসতেই মুসলিমদের মনে এক নয়া জাগরণ ও অনুভূতি দেখা দেয়। নদীর পানি যেমন এক বিশেষ সময়ে কানায় কানায় ভর্তি হয়, বসন্তের পরশে প্রকৃতি সবুজ-শ্যামল রূপ পরিগ্রহ করে বসুন্ধরায় তারুণ্যের জোয়ার নিয়ে আসে, তেমনি হিজরি সালের এ মাস এদিন এলেই মুসলিম জাহানের দিকে দিকে এক জাগরণী উল্লাস শুরু হয়। এ জাগরণ নবী প্রেমের জাগরণ, জাগরণ ইসলামী আদর্শের প্রচার ও প্রসারের মহড়া, এ জাগরণ মহানবীর মহাজীবনের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শনের উৎসর্গিত আকুতি। কেননা, তাঁর পবিত্র জীবনকে পাথেয় করেই আমাদের পথচলা।

তাঁর জীবনের সুন্দরতম পথই আমাদের একমাত্র অবলম্বন। মানবতাকে তিনি মুক্ত স্বাধীন আসনে বসিয়েছেন এবং চির মুক্তির পথ বাতলে দিয়েছেন। আল্লাহ সুবাহানাহু তায়ালা তাঁকে সারা কায়েনাতের জন্য রহমত বা আশীর্বাদ স্বরূপ প্রেরণ করেছেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনে আল্লাহ বান্দাদের সম্বোধন করে বলেন, ‘লাকাদ কানা লাকুম ফি রাসুলিল্লাহি উসওয়াহ– অবশ্যই আল্লাহর নবীর (স.) জীবন চরিতের মধ্যে তোমাদের জন্য রয়েছে সর্বোত্তম সুন্দর আদর্শ।’ কেবল দুনিয়ার সুখ-শান্তি ও উৎকর্ষ সাধনের জন্য নয়; বরং স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সেতুবন্ধ রচনার জন্যও তাঁর অনুসরণ প্রয়োজন। আল কুরআন বলেছে, ‘আল্লাহর সঙ্গে সুসম্পর্ক ও প্রীতিময় বন্ধন গড়ে তুলতে চাইলে মহানবীর অনুসরণ কর।’

প্রিয়নবী (স.) এসেছিলেন ইহপারলৌকিক জীবনে মানুষকে সফলতার দ্বারপ্রান্তে পৌঁছে দিতে। ইসলামের মতে: ‘আদ্ দুনিয়াউ মাজরায়তুল আখিরাহ অর্থাৎ দুনিয়ার জীবন পরকালীন জীবনের শস্যক্ষেত্র স্বরূপ।’ এ দুনিয়াকে আল্লাহর রঙে রাঙিয়ে তুলতে পারার মধ্যেই নিহিত রয়েছে আখিরাতে মুক্তির নিশ্চয়তা। কুরআন শরীফ তাই আমাদের একটি দোয়া বারবার বলার জন্য শিক্ষা দিয়েছেÑ ‘রাব্বানা আতিনা ফিদ্দুনিয়া হাসানাহ, ওয়াফিল আখিরাতে হাসানাহ, ওয়া কিনা আজাবান নার- হে প্রভু! আমাদের দুনিয়ায় কল্যাণ দাও, আখিরাতে মুক্তি দাও আর বাঁচাও দোজখের ভয়াবহতা থেকে।’

উল্লেখ্য, আয়াতটিতে দুনিয়ার কল্যাণকামিতার কথা আল্লাহ সর্বাগ্রে শিক্ষা দিচ্ছেন। মহানবী (স.) ব্যক্তিজীবন থেকে সমাজ জীবন, সমাজ জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় জীবন আর রাষ্ট্রীয় জীবন থেকে আন্তর্জাতিক জীবন পর্যন্ত সর্বাত্মক আদর্শিক বিপ্লব ঘটিয়ে এনেছিলেন অভাবিতপূর্ণ শান্তি ও সমতা। সে সময় তাঁর বিপ্লবপূর্ব অস্বস্তিকর বিশ্ব পরিস্থিতি বিশেষত আরব পরিস্থিতির জন্য দুটো দিককে তিনি দায়ী করেছিলেন। (১) মানুষের ওপর মানুষের প্রভুত্ব সৃষ্টির কারণে সাধারণ মজলুম মানুষের দুর্ভোগ (২) নেতৃত্বে অযোগ্যতা, কথা ও কাজে ফারাক।
মহানবী (স.) ব্যক্তিশুদ্ধি ও সমাজ সচেতনতা সৃষ্টির সঙ্গে সঙ্গে হজরত মনোযোগ দিলেন এমন নেতৃত্ব সৃষ্টির, যারা জ্ঞান-গরিমায় হবে বলীয়ান, আদর্শে অটল, কথা ও কাজে হবেন অপূর্ব সমন্বয়কারী। সমাজে সুদীর্ঘ সময় ধরে সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালানোর মাধ্যমে তিনি যখন শাসক ও শাসিতের মাঝে, গোলাম ও মনিবের মাঝে, সাধারণ ও অসাধারণের মাঝে এ মন মেজাজ আর মানসিকতা সৃষ্টি করতে পারলেন, তখন দেখা যায় সে মক্কা মদিনা কেন্দ্রিক আদর্শিক সুবাস ছড়িয়ে পড়ল দিগি¦দিক। সমকালীন অন্যান্য নেতৃত্ব, মতামত তাঁর সমৃদ্ধ চিন্তাধারার কাছে হার মানল। অনুসৃত হয়ে চলল তাঁর জীবন দর্শন ক্রমাগত অন্যান্য স্থানে। এভাবে তাঁর ওফাতউত্তর যুগেও তারই যোগ্য অনুসারীদের বদৌলতে বিশ্বের এক বিশাল স্থানজুড়ে মহানবী হয়ে যান এক মুকুটহীন সম্রাট, প্রেরণার উৎস, আদর্শের দৃষ্টান্ত, অনুসরণের মূর্ত প্রতীক।

যার কোনো মৃত্যু নেই, যার কোনো ক্ষয় নেই। তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিতরা দুনিয়া আখেরাতের বিষয়ে সচেতন হয়ে সহজ, সরল অথচ বীরত্বপূর্ণ জীবনযাপন করছিলেন। এ কথা আজ ইতিহাস হয়ে গেলেও বেশি দিন আগের কথা নয়। মহানবী ও তাঁর সাহাবাদের বীরত্বপূর্ণ কাহিনী আজও অম্লান, উজ্জ্বল। আমরা এমন এক নবীর (স.) সৌভাগ্যবান উম্মত, যিনি জীবনের সর্বক্ষেত্রে বিচরণ করে গেছেন এবং জীবন সমস্যার সমাধানে যুগোত্তীর্ণ আদর্শ রেখে গেছেন। 

কিন্তু কেন আজ মহান পয়গাম্বরে খোদার উম্মত মুসলিম বীর জাতি ক্ষয়ী, শ্রান্ত, ক্লান্ত, দিকভ্রান্ত? সর্বত্র লাঞ্ছিত পদদলিত হচ্ছে তারা। বিশ্বের এক প্রান্তর থেকে অন্য প্রান্তর, যারা আজ গণতন্ত্রের ফেরিওয়ালার ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে, তাদের প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষ মদদে মুসলিম নিধন চলছে আরব-অনারব সবখানে। মধ্যযুগীয় বর্বরতার কথা আমরা পড়েছি, কিন্তু আজকের এ সভ্য জগতের বর্বরতার আকৃতি প্রকৃতি বীভৎসতা সে কলঙ্ককেও ছাড়িয়ে গেছে। কেন আমরা এ ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তে নিষ্পেষিত হতে চলেছি? কথায় আছেÑ শরীর দুর্বল হয়ে পড়লে রোগে আক্রমণ করতে পারে সহজে। আজ মুসলমানদের বেলায়ও তা-ই হয়েছে। ইমান নামের দুর্জয় শক্তি ও রূহের খোরাককে মুসলমানরা প্রায় হারিয়ে ফেলেছে। পারস্পরিক ভ্রাতৃত্ববোধ, সমতা, সহমর্মিতা, জ্ঞান-গরিমা ও নেতৃত্ব আজকের মুসলমানদের কাছে এক বিস্মৃত বিষয়। এ জন্যই আজ দিকে দিকে মুসলমানদের লাঞ্ছনার খবর। নিজেদের কখনো দুর্বল ভাবতে নেই। ঐতিহ্য সচেতন জাতি কখনো পরাভূত হয় না। 
আজ আমাদের বড় প্রয়োজন হুজুরপুর নূর (স.)-এর প্রেম ও আদর্শে উদ্ভাসিত মানুষের– যারা ভক্তিতে, কথায় ও কাজের মধ্যেই তাঁর মহান সিরাতের প্রতিফলন ঘটাবে, বাস্তবায়িত করবে নবী আদর্শ, পুনরুজ্জীবিত করবে ইসলামের সোনালি যুগের। ভ্রান্তি ও অজ্ঞতা নয়, চাই জ্ঞান, ধর্মানুরাগ, খোদাভীতি ও দায়িত্ব সচেতনতা; চাই খালিস মুঘলিস মুমিন চরিত। ঈদে মিলাদুন্নবীর (স.) এ পবিত্র দিনে আমাদের এ আত্মপলব্ধি সময়েরই দাবি। তাহলেই কেবল হবে উৎকর্ষ ব্যক্তিত্বের, সৃষ্টি হবে নেতৃত্বের। আমাদের বিশ্বাস করতে হবে নবী আদর্শকে অকৃপণ ও অকৃত্রিমভাবে ব্যক্তিজীবনে প্রতিফলন আর সমাজ জীবনে বাস্তবায়ন ছাড়া বিশ্বজনীন তো নয়-ই, জাতীয়ভাবেও হিংসাদ্বেষবিমুক্ত, ভ্রাতৃত্বসুলভ পরিবেশ আর বীরত্বপূর্ণ ধারা পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়।

রাসুল (স.) এর পবিত্র পয়দায়েশ ওফাতের এ মহান দিবসে আমাদের নবীজীর জীবনাদর্শ সম্পর্কে জানার জন্য নতুন করে প্রত্যয় গ্রহণ করতে হবে। তাঁর হায়াতে তাইয়্যিবা আমাদের জন্য ‘উসওয়ায়ে হাসানাহ’– দুনিয়ার জন্য সর্বোত্তম কল্যাণকর আদর্শ ও পথনির্দেশ। তাঁর স্মরণ আমাদের জন্য বরকত, তাঁর ওপর দরুদ ও সালাম পেশ করা আমাদের দুনিয়া আখিরাতে নাজাতের উসিলা। 

লেখক :  অধ্যাপক, টিভি উপস্থাপক ও জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত খতিব
[email protected]