ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ১৩ জুলাই ২০২৪, ২৯ আষাঢ় ১৪৩১

গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

প্রকাশিত: ২০:১৩, ২৬ মার্চ ২০২৩

গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি

.

একাত্তরের পঁচিশে মার্চ ইতিহাসের এক কলঙ্কময় দিন। সেদিন পাকিস্তান সেনাবাহিনী বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে গণহত্যা শুরু করেছিল। এদিন তারা রাতের আঁধারে ট্যাংক-কামান-মেশিনগান নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল মুক্তিকামী নিরীহ, নিরস্ত্র বাঙালি জাতির ওপর। ১৬ ডিসেম্বর মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আত্মসমর্পণের আগে পর্যন্ত দীর্ঘ মাস ধরেই ওরা চালিয়েছিল মানব ইতিহাসের বর্বরতম হত্যাযজ্ঞ। নারী-শিশুসহ প্রাণ গিয়েছিল ৩০ লাখ বাঙালির। তিন লাখ নারী তাঁদের সম্ভ্রম হারিয়েছিলেন। গ্রামের পর গ্রাম, নগর, জনপদ জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছিল। পৃথিবীর ইতিহাসে এত অল্প সময়ে এত বেশি সংখ্যক মানুষ হত্যার ঘটনা দ্বিতীয়টি নেই। তবু বিশ^ দরবারে এই গণহত্যার স্বীকৃতি আজও মেলেনি।

উল্লেখ্য, ১৯৪৯ সালের ডিসেম্বরে প্রথমবারের মতো জাতিসংঘে গণহত্যা প্রতিরোধ এবং সংক্রান্ত শাস্তি বিষয়ক প্রথাটি     (পড়হাবহঃরড়হ) গৃহীত হয়। আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ প্রতিরোধ দিবস প্রতিবছর ডিসেম্বর পালিত হয়। ২০১৫ সালের ১১ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘ দিনটিকে আন্তর্জাতিক গণহত্যা স্মরণ প্রতিরোধ দিবস হিসেবে ঘোষণা করে। ১৯১৫ সালে অটোমান কর্তৃপক্ষ আট লাখ আর্মেনিয়ানকে নৃশংসভাবে হত্যা করে। আটোমানরা হত্যা করে শত শত আর্মেনীয় বুদ্ধিজীবীকে। আর্মেনিয়া ওই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের চেষ্টা করলে এর বিপক্ষে অবস্থান নেয় তুরস্কসহ বেশ টি দেশ। শত বছর পর আর্মেনীয়রা জাতিসংঘের কাছ থেকে তাদের এই গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সক্ষম হয়। জাতিসংঘ ওই হত্যাকাণ্ডকে বিশ্বের নিকৃষ্টতম গণহত্যা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে।

বছর ২৫ মার্চ এক সভায় গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। গণহত্যা দিবসের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু শুধু দিবসের নয়, আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পেতে হবে একাত্তরের ৩০ লাখ নৃশংস হত্যারÑ গণহত্যার। স্বীকৃতি পেতে হলে বিভিন্ন দেশের পার্লামেন্টে আগে এই স্বীকৃতি আদায় করতে হবে। ২০০৫ সালে ইউএস কংগ্রেসে এই স্বীকৃতির জন্য চেষ্টা করা হয়েছিল। সেখানকার পার্লামেন্টের একজন গুরুত্বপূর্ণ সদস্য বলেছেন, বাংলাদেশের পার্লামেন্ট এটির স্বীকৃতি না দিলে ইউএস পার্লামেন্টে স্বীকৃতি পাওয়া সম্ভব নয়। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে অবশ্য আমাদের পার্লামেন্টে একাত্তরের গণহত্যার স্বীকৃতি মিলেছে। পাকিস্তানি লেখক জুনায়েদ আহমদ তার দেশের সরকারের পৃষ্ঠপোষকতায় একটি বইয়ে বাংলাদেশের গণহত্যার ছবিগুলো মুক্তিযোদ্ধাদের হত্যা-তাণ্ডব হিসেবে উল্লেখ করেন। একটি সেমিনারে তৎকালীন বাণিজ্যমন্ত্রী তোফায়েল আহমেদকে বইটি দেখানো হয় এবং গণহত্যার জাতীয় আন্তর্জাতিক স্বীকৃতির কথা বলা হয়। সেদিনই জাতীয় সংসদে বাণিজ্যমন্ত্রী পাকিস্তানের ওই বইটি তুলে ধরেন এবং গণহত্যার স্বীকৃতির বিষয়ে কথা বলেন। এভাবেই এসেছে জাতীয় স্বীকৃতি।

একাত্তরের গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পাওয়ার পথ বেশ দীর্ঘ জটিল। উপযুক্ত দলিলাদি সংগ্রহ করে তা যথাযথ প্রক্রিয়ায় আন্তর্জাতিক মহলে উপস্থাপন করতে হবে। আমরা আশা করব, এই কাজে গতি আসবে। সেই দিন বেশি দূরে নয়, যখন গণহত্যার আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি লাভ করতে সক্ষম হবে বাংলাদেশ।

×