ঢাকা, বাংলাদেশ   শনিবার ২২ জুন ২০২৪, ৮ আষাঢ় ১৪৩১

ভাঙতে হবে অপশক্তির বেড়াজাল

নূরুর রহমান খান

প্রকাশিত: ২০:৫০, ২০ মার্চ ২০২৩

ভাঙতে হবে অপশক্তির বেড়াজাল

ফেব্রুয়ারি ফিরে ফিরে আসে। চেতনা ফিরে ফিরে যায়। ৬৭/৬৮ বছর আগের স্মৃতি এখনো অম্লান

ফেব্রুয়ারি ফিরে ফিরে আসে। চেতনা ফিরে ফিরে যায়। ৬৭/৬৮ বছর আগের স্মৃতি এখনো অম্লান। বড় দুই দাদার সঙ্গে ২১ ফেব্রুয়ারিতে নগ্নপদে প্রভাতফেরিতে যেতাম, হাতে একটি-দুটি ফুল, মৌন মিছিল। গন্তব্য ও উদ্দেশ্য শহীদ মিনার হয়ে আজিমপুর গোরস্থানে শহীদদের কবরে শ্রদ্ধাবনতচিত্তে অর্ঘ্য প্রদান। মনে পড়ে সেই বৃদ্ধা মাতার অশ্রুসজল মুখাবয়ব। তিনি কোনো ভাষা শহীদের গর্বিতা জননী। চলৎশক্তিহীন, ন্যূব্জ দেহ, অপরের সাহায্যে এসেছেন সন্তানের কবর জিয়ারত করতে।

এভাবে বছরের পর বছর কেটে গেছে। রাষ্ট্রভাষা বাংলা স্বীকৃতি পেলেও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে কি-না বুকে হাত দিয়ে বলতে পারি না। লাখো প্রাণের বিনিময়ে এলো বহু কাক্সিক্ষত স্বাধীনতা। অনেক কিছু পরিবর্তন হয়ে গেল। একুশের প্রভাতফেরি হয়ে গেছে বিশের দিবাগত রাতের দ্বিতীয় প্রহরের উৎসব। শ্রদ্ধা-আন্তরিকতার স্থান দখল করে নিল আত্মম্ভরিতা। সালাম-বরকত-রফিক-শফিকের রক্তভেজা সিঁড়ি বেয়ে ভিভিআইপিদের সদম্ভ পদচারণা। তাঁরা শহীদ মিনারে আসেন, সঙ্গে থাকে পাদুকাবাহক। পাদুকামুক্ত হয়ে শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা ঝেড়ে অতঃপর পাদুকাযুক্ত হয়ে প্রত্যাবর্তন।

এখানে কঠোরভাবে ‘প্রোটোকল’ মানা বাধ্যতামূলক। সেই অনুসারে ভাষা আন্দোলনের সূতিকাগার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ১০/১২ নম্বরে অথবা তারও নিচে পড়েন। তিনি সেখানে প্রথমাবধি সপার্ষদ উপস্থিত থেকে অভ্যর্থনার কাজটি সুসম্পন্ন করেন। আগে এসব বালা-মুসিবত ছিল না।
একুশের প্রভাতফেরি এখন রাত্রিকালীন সফর। স্বাধীনতার পরবর্তী বছর একুশের রাতে শহীদ মিনারকে কলঙ্কিত করেছিল ন্যক্কারজনক একটি ঘটনা। তারপর থেকে ২১ ফেব্রুয়ারিতে আর শহীদ মিনারে যাই না। টেলিভিশনের পর্দায় দেখি। শহীদদের উদ্দেশে ঘরে বসেই নিবেদন করি শ্রদ্ধা।

পরিচিত এক অধ্যাপিকা ২১ ফেব্রুয়ারির বেলা ১১টা থেকে ১২টার মধ্যে তার দুই শিশু সন্তানকে নিয়ে নিয়মিত শহীদ মিনারে যেতেন এবং শহীদদের উদ্দেশে তাদের হাত দিয়ে পুষ্পস্তবক অর্পণ করে শ্রদ্ধা নিবেদন করতেন। ১৯৯০-এর ২১ ফেব্রুয়ারিতে পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করতে গিয়ে তিনি একটু বিপাকে পড়েন। চার বছরের পুত্র কিছুতেই নির্দিষ্ট গণ্ডির ভেতরে থেকে পুষ্প অর্পণ করবে না। সে শহীদ মিনারের বেদিতে উঠে ফুল দেওয়ার জন্য বায়না নয়, জেদ ধরল। তার আকুতি দেখে একজন স্কাউট বা ভলান্টিয়ার সস্নেহে তাকে মূল বেদি পর্যন্ত নিয়ে গেল এবং শিশুটির ইচ্ছে পূরণ হলো।

উপস্থিত সাংবাদিক ও ফটো সাংবাদিকদের দৃষ্টি তখন এই ভাই-বোনদের দিকে। পরদিন দৈনিক পত্রিকায় এবং একটি সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রচ্ছদে তাদের ছবি প্রকাশিত হয়েছিল। এখন তারা যৌবনে পদার্পণ করেছে। ফেব্রুয়ারির স্মৃতি হয়ত তাদের আর চঞ্চল করে না।
আমরা বছরে দু’বার বাঙালি হই। একুশে ফেব্রুয়ারি এবং ১ বৈশাখে। বছর তিনেক আগে একটি দৈনিকে প্রকাশিত ‘আমরা যেন মৌসুমি বাঙালি না হই’ শীর্ষক লেখাটি হয়ত অনেকে পড়েছেন। একজন বিচারপতি ভাষার মাসে শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেছিলেন বাংলায় রায় লিখে। তাঁর আগেও একাধিক বিচারপতি বাংলায় রায় দিয়েছেন। পথিকৃৎদের কৃতিত্ব অবশ্যই তাঁদের প্রাপ্য।

১৯৪৭-এর ১৫ সেপ্টেম্বরে কাজী মোতাহার হোসেন ‘রাষ্ট্রভাষা ও পূর্ব পাকিস্তানের ভাষা সমস্যা’ প্রবন্ধে লিখেছেন- ‘পূর্ব পাকিস্তানে সরকারি চাকরি করতে হলে প্রত্যেককে বাংলা ভাষায় মাধ্যমিক মান পর্যন্ত পরীক্ষা দিয়ে যোগ্যতা প্রমাণ করতে হবে। অন্যথায় শিক্ষানবিসী সময়ের পরে অযোগ্য ও জনসাধারণের সহিত সহানুভূতিহীন বলে এরূপ কর্মচারীকে বরখাস্ত করা হবে।’ এখন তো বাংলা সাংবাধিনকভাবে স্বীকৃত রাষ্ট্রভাষা। বঙ্গবন্ধুরও কঠোর নির্দেশ ছিল সর্বস্তরে বাংলা ব্যবহার করতে হবে।

বাংলাদেশের সংবিধান ইংরেজিতে রচিত এবং বাংলায় অনূদিত হলেও সুস্পষ্টভাবে উল্লিখিত যে, ভাষাগত কারণে সংবিধানের কোনো ধারা বা উপধারা কিংবা অনুচ্ছেদ নিয়ে যদি সংশয় দেখা দেয় তাহলে বাংলায় অনূদিত ভাষ্যই গ্রাহ্য হবে। তা সত্ত্বেও বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন, বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান- সর্বত্র মাতৃভাষা প্রত্যাশিত মর্যাদা থেকে বঞ্চিত। এমনকি মন্ত্রণালয়-সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কেরানিকুলও ইংরেজিতে লিখতে আগ্রহী। ভুল ইংরেজি লিখে তারা শর্মিন্দা হন না, কিন্তু মাতৃভাষা ব্যবহারে লজ্জাবোধ করেন। এ দাস মনোবৃত্তি থেকে কবে মুক্তি পাব কে জানে!
ষাটের দশকে আবাসিক ভবন, বিপণিবিতান কিংবা সন্তানদের শ্রুতিমধুর অর্থবহ বাংলা নাম রাখার একটা প্রবণতা ছিল। বিয়ে অথবা যে কোনো শুভ অনুষ্ঠানের নিমন্ত্রণপত্র বাংলায় লেখা সুরুচি, আভিজাত্য ও সাংস্কৃতিক চেতনার পরিচয় বহন করত। এখন সামর্থ্যরে বাইরে গিয়েও অনেক দম্পতি তাদের সন্তানদের ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়াতে সমধিক উৎসাহী। কারণ, এটা শুধু সন্তানদের জাগতিক সাফল্যের সোপানই নয়, মর্যাদার মাপকাঠিও বটে।

বিদেশে বহুভাষীর মর্যাদা এবং উপার্জনের সুবিধা ও পরিধি অনেক বেশি। সে সুযোগ যাতে ভালোভাবে কাজে লাগাতে পারে এজন্যই ইংরেজি মিডিয়ামে পড়ানো। বহু ভাষা আয়ত্ত করা প্রশংসনীয়। কালের স্রোতকে অস্বীকার করা নির্বুদ্ধিতার পরিচায়ক। কিন্তু বিদেশী ভাষা তো মাতৃভাষার বিকল্প হতে পারে না। বাংলাদেশ থেকে যেসব শিক্ষার্থী বিদেশে গিয়ে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন, সুনাম এবং দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন, প্রতিষ্ঠিত হয়েছেন তাদের শতকরা ক’জন বাংলাদেশে ইংরেজির মাধ্যমে লেখাপড়া করেছেন তার কোনো নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যান আছে কি?

এটা ঠিক ইংরেজি মাধ্যমে পড়ুয়া ছেলেমেয়েদের ঝঢ়ড়শবহ ঊহমষরংয খুব ভালো। কিন্তু অন্যান্য বিষয়ে তারা বাংলা মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অনেকটা পিছিয়ে। তার চেয়েও মারাত্মক তারা অনেকটা শেকড়বিহীন ভাসমান শেওলার মতো। দেশে দাম্ভিক, বিদেশী স্থায়ী হলে তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক। এজন্য তাদের অভিভাবকরাই অনেকটা দায়ী। ঘরে সংসারে তারা সন্তানদের সঙ্গে মাতৃভাষায় কথা বলতে অনাগ্রহী, পাছে তাদের ধার কমে যায়, নিজেদের ঝসধৎঃ প্রতিপন্ন করতে না পারে এমন একটা আতঙ্কে কুঁকড়ে থাকেন। তারা বাবা-মাকে ড্যাড-ড্যাডি-পাপা-মম বলে সম্বোধন করে।

চাচা, ফুফা, মামা, খালু সবাই ‘আঙ্কেল’ আর খালা, মামি, চাচি, ফুপু সকলেই ‘আন্টি’। আমরা অভিভাবকরা আমাদের সন্তানদের বোঝাতে পারিনি কিংবা চেষ্টাও করিনি যে, প্রত্যেক ভাষারই একটা বিশেষত্ব বা বৈশিষ্ট্য আছে। আমরা চাচা-চাচি, ফুপা-ফুপু ইত্যাদি সম্বোধনে বুঝি সম্পর্কটা হচ্ছে পিতৃ সম্পর্কিত। তেমনি মামা-মামি, খালা-খালু ইত্যাদি সম্বোধনে বুঝি সম্পর্কটা একান্তই মাতৃ সম্পর্কিত। আবার ইংরেজি এক ুড়ঁ দ্বারা তুই-তুমি-তোমরা-আপনি সবই বোঝানো যায়। কিন্তু বাংলায় সম্মানার্থে এবং তুচ্ছার্থে ভাব ও বাক্য অনুযায়ী তুই-তুমি-তোমরা-আপনি ইত্যাদি ব্যবহার করি।
ভাষার মাসের পরেই আসে বহু দুঃখ-সুখের স্মৃতিবিজড়িত স্বাধীনতার মাস মার্চ। কত প্রিয় মুখ, আত্মজন হারানোর বেদনা নিয়ে আমরা উদ্্যাপন করি স্বাধীনতা দিবস। উজ্জীবিত হই। উজ্জ্বলতর ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখি। একই সঙ্গে একটা অজ্ঞাত শঙ্কায়ও আতঙ্কিত হই। দেশ আবারও কোনো দুর্যোগের ঘনঘটার সম্মুখীন নয় তো? স্বাধীনতাবিরোধীরা কখন কোন মূর্তিতে আবির্ভূত হবে কে জানে। তবে এটা নিশ্চিত এই অপশক্তি সক্রিয় এবং সুযোগের অপেক্ষায় ওঁৎ পেতে রয়েছে। তার আলামত বিভিন্নরূপে দেখা যাচ্ছে। ৩ মার্চের পঞ্চগড়ের ঘটনা কি বিচ্ছিন্ন কোনো কিছু? না-কি পূর্ব পরিকল্পিত।

প্রতি বছরই পঞ্চগড়ে আহমদিয়া মতাবলম্বীরা বার্ষিক সম্মেলন বা সালানা জলসার আয়োজন করেন। এর আগে তাদের ওপর সংঘবদ্ধ আক্রমণ কিংবা তাদের বাড়িঘরে আগুন দেওয়া অথবা লুটপাটের ঘটনা শোনা যায়নি। বছর তিরিশেক পূর্বে সারাদেশে আহমদিয়াদের নানাভাবে লাঞ্ছিত এবং ঢাকায় তাদের সমাবেশ উপলক্ষে এক শ্রেণির উগ্রবাদী আহমদিয়াদের জীবনে বিভীষিকার সৃষ্টি করে। রাতের অন্ধকারে তাদের অসহায় ছেলেমেয়েরা ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় আবাসিক এলাকায় এসে সাহায্য চেয়েছে। তাদের জানমালের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে আকুতি জানিয়েছে।

কিশোর-কিশোরীদের ভীতসন্ত্রস্ত করুণ মুখাবয়ব এখনো আমাদের তাড়িত করে। কোনো ব্যক্তি নিজেকে মুসলমান দাবি করলে তাকে অমুসলিম বা কাফের ফতোয়া দেওয়া কতটা ধর্মসম্মত তা ধর্মপ্রাণ মানুষের বিচার্য। ২০১৫-১৬ সালে মহররম মাসে শিয়া মতাবলম্বীদের মিলন কেন্দ্র বকশীবাজার হোসেনী দালানে বোমা ফাটিয়ে মানুষকে হতাহত করার তদন্ত হলেও ফল কী তা সঠিকভাবে জানা যায়নি। অসাম্প্রদায়িক চেতনার লালনক্ষেত্র বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর, উপাসনালয়ে অগ্নিসংযোগ, প্রতিমা ভাঙচুরের সংবাদ প্রায়ই পত্রিকায় আসে। অনেক সময় ‘ফেসবুকে’ ভুয়া স্ট্যাটাস দিয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করা হচ্ছে।
২০২১-এর ঈদুল ফিতরের নামাজ পড়তে গিয়ে চরম বিরক্তি নিয়ে ফিরেছিলাম। ইমাম সাহেব বয়ান করছিলেনÑ অনেকে বলেন যে, ‘ধর্ম যার যার উৎসব সবার’। এটা ঠিক নয়, ঈদের উৎসব শুধু মুসলমানদের।’ ইমাম সাহেব নিশ্চয়ই জানেন ঈদ অর্থ ‘আনন্দোৎসব’। সুতরাং ভিন্ন মতাবলম্বী কেউ যদি এই উৎসবে যোগ দেন তাহলে উৎসবের জৌলুস ও পরিধি আরও বৃদ্ধি পায়। উৎসব হবে মহিমান্বিত। এর ফলে যে কোনো মতাবলম্বী মানুষের ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় নিতে কোনো বাধা নেই। ‘ইসলাম’ শব্দের অর্থ শান্তির ধর্ম এবং যিনি এই মতে বিশ্বাসী তিনি মুসলমান।
নির্বাচনের আগে সরকারকে ব্যতিব্যস্ত রাখতে অথবা বেকায়দায় ফেলার জন্য এমন পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হয়নি তো? সন্দেহটা অমূলক নয়। বিরোধী দলের একজন বড় নেতা সেখানকার প্রভাবশালী ব্যক্তিও বটে। তিনি অহরহ নির্বাচন প্রতিহত করার কথা বলছেন। এখন যেখানে-সেখানে বিস্ফোরণ ঘটছে। আগুন লাগছে। ব্যাপারটা কি একান্তই কাকতালীয়, না অন্য কিছু? গোয়েন্দা বিভাগের প্রতিবেদনের জন্য আমরা অপেক্ষা করছি।
কয়েকটি বিষয়ে সরকারের কঠোর নির্দেশনার অভাব অথবা নির্দেশ অগ্রাহ্যকারীদের প্রতি নমনীয় মনোভাব স্বাধীনতার মাসে আমাদের পীড়িত করে। বহু শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে বিশেষ করে মাদ্রাসায় জাতীয় সংগীত পরিবেশন, জাতীয় পতাকা উত্তোলন, অধ্যক্ষ/অধ্যক্ষা এবং মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল বা প্রধানের কক্ষে জাতির জনকের ছবি টাঙানো অলিখিতভাবে নিষিদ্ধ। অথচ তারা রাষ্ট্রীয় অনুদানে হৃষ্টপুষ্ট এবং মেদবহুল। এদের বিরুদ্ধে কঠোরতম ব্যবস্থা গ্রহণে সরকার কেন অনাগ্রহী তা বোধগম্য নয়। মৃত্যুদ-প্রাপ্ত যুদ্ধাপরাধীদের বিচার আপিল বিভাগে কেন বছরের পর বছর নিদ্রামগ্ন?

এসব প্রশ্নের সদুত্তর পাওয়া না গেলে উন্নয়নের জোয়ার সত্ত্বেও নৌকা চড়ায় আটকে পড়ার আশঙ্কা আছে। আমরা যেন বিস্মৃত না হই বঙ্গবন্ধু যখন শক্ত হাতে নৌকার হাল ধরেছিলেন তখন বন্ধুর লেবাসধারী মোশতাকও একই নৌকার সওয়ারি ছিল। সরকারের ভেতরে ঠাঁই পাওয়া মোশতাকের ছদ্মবেশী ছানাপোনারা, যাদের একটা বড় অংশ ব্যবসায়ী ও শিল্পপতি, তারা সরকারকে পকেটস্থ করতে সদাসচেষ্ট। তারা জানে নির্বাচনে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন এবং তারাই সেই অর্থের যোগানদার। সুতরাং সরকারকে তাদের কথা শুনতেই হবে। তাই সরকার অসাধু ব্যবসায়ীদের সিন্ডিকেট ভাঙতে পারছে না এবং পারবেও না।

সর্বোপরি, আমলা নামক অক্টোপাস তো রয়েছেই। তারা মনে করেন আমরা স্থায়ী, সরকার অস্থায়ী এবং মন্ত্রী-এমপিরা শিক্ষা-দক্ষতা-অভিজ্ঞতায় তাদের সমকক্ষ নয়। সরকার তাদের ওপর নির্ভরশীল। তারা বেঁকে বসলে সরকারের গদিও উল্টে যেতে পারে। অবসর গ্রহণের পরেও তারা বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হয়ে বসেন। সরকার দুর্বল হলে তারাই মামদোভূত হয়ে সরকারের ঘাড়ে সওয়ার হন। সরকার যদি নির্বাচনের বিষয় মাথায় রেখে ও দলীয় চাপে কোনো আত্মঘাতী নীতি গ্রহণ করে তাহলে বলতে হয় সারমেয়র লাঙ্গুলে যতই ঘি মর্দন করুন কোনো ফায়দা হবে না। পক্ষান্তরে নিজেদের ভোট ব্যাংকে টান পড়বে।
আমরা আশাবাদী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এই অপশক্তির বেড়াজাল ভেঙে বেরিয়ে আসতে সমর্থ হবেন। শেখ হাসিনাকে সাধারণ মানুষ ভালোবাসে, বঙ্গবন্ধুর মতোই শ্রদ্ধা করে এবং তাঁর বলিষ্ঠ নেতৃত্বের ওপর আস্থাশীল। জনগণের ওপর ভরসা থাকলে ধর্মীয় লেবাসধারী গোষ্ঠী এবং ক্যান্টনমেন্টপ্রসূত কোনো রাজনৈতিক দলের সমর্থনের জন্য শেখ হাসিনাকে হা-পিত্যেশ করতে হবে না।
লেখক : প্রাক্তন অধ্যাপক, ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়

×